Updates

Articles

Articles posted by Radical Socialist on various issues.

বিপ্লবী গণতন্ত্রঃ ১৯১৭তে ও তারপর

 

পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সাধারণ সভা -- ১৯১৭

 সোমা মারিক

প্রায় এক শতাব্দী ধরে, উদারপন্থীরা, রক্ষণশীলরা, এমনকি বহুলাংশে নরমপন্থী বামপন্থীরা একমত, যে রুশ বিপ্লব ছিল অগণতান্ত্রিক। উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে বাড়তে না দিয়ে, বলশেভিকরা দ্রুত গণতন্ত্র ধ্বংস করতে এগোলেন। কিন্তু সমগ্র ১৯১৭ জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্র ঠিক কতটা গণতান্ত্রিক ছিল? সত্যিই কী কোনো বিকল্প বিপ্লবী গণতন্ত্র ছিল না, যা বিন্যস্ত ছিল সোভিয়েত, ফ্যাক্টরী কমিটি, কৃষকদের জমি কমিটি ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে?

ফেব্রুয়ারী বিপ্লবে উদারনীতিবিদরা এবং বিপ্লবী গণতন্ত্রঃ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছিল, উদারনৈতিক রাজনীতিবিদরা তখন যে কোনো রকম বিপ্লব এড়াতে উদগ্রীব ছিলেন। যখন ফেব্রুয়ারী বিপ্লব শুরু হয়, তারা তখন জারের প্রতি অনুগত ছিলেন, এবং প্রধানমন্ত্রী গোলিৎসিন যখন ডুমা ভেঙ্গে দেওয়ার নির্দেশ সই করলেন, তারা তখনও আপত্তি জানান নি। উদারনৈতিক রাজনীতিবিদরা সবচেয়ে বেশীদূর যেতে রাজি হলেন, ডুমা সদস্যদের একটি বেসরকারী কমিটি তৈরী করে ঘতনাপ্রবাহের উপর নজর রাখতে। কিন্তু সেটাও ডুমার আনুষ্ঠানিক কমিটি নয়। যখন বোঝা গেল, জারের পতন অপ্রতিরোধ্য, তখনই এই বেসরকারী কমিটি নিজেকে অস্থায়ী সরকারে রূপান্তরিত করল। সুয়োশি হাসেগাওয়া প্রায় চার দশক আগে ব্যাখ্যা করেছিলেন, উদারপন্থীরা এক অসম্ভব নীতির পিছনে দৌড়েছিলেন, যা হল একদিকে এক অস্থায়ী সরকার তৈরী করা, আর অন্যদিকে সেই সরকারের ন্যায্যতা খোঁজা পুরোনো ব্যবস্থার আইনী ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মধ্যে। যদিও ডুমা ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল এবং তারা সেটা মেনেও নিয়েছিলেন, তবু তারা ভান করলেন, যেন অস্থায়ী সরকার যেটা বেরোলো সেটা ডুমা থেকে নিসৃত। জারের সঙ্গে ব্যবহারে তারা নিজেদের দেখালেন নোইরাজ্যের বিরুদ্ধে আইন-শৃংখলার রক্ষক হিসেবে। এমনকি তারা যখন দ্বিতীয় নিকোলাসের ইস্তফা দাবী করলেন, তখনও তাঁদের আশা ছিল, এর ফলে বিপ্লব ঠেকিয়ে দেওয়া যাবে।  

একবার প্রিন্স লভভের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার গঠিত হলে, এই সরকার যে কোনোরকম গণতন্ত্র আনতে উৎসাহী ছিল না, সেটা দ্রুত বোঝা গেল। ফরাসী বিপ্লবের অভিজ্ঞতার পর থেকে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল সত্ত্বর এক সংবিধান সভা ডাকা, যা নির্বাচিত হবে গণতান্ত্রিকভাবে। রুশ বিপ্লবে অস্থায়ী সরকার প্রচুর সময় কাটালো, সংবিধান সভা ডাকতে যতটা পারে দেরী করল। ৩রা মার্চ, অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল যে নির্বাচন হবে সার্বজনীন, গোপন, প্রত্যক্ষ এবং সমমানের ভোটের ভিত্তিতে। এ ছিল অবশ্যই অগ্রগতি, কারণ জারের যুগে ডুমা নির্বাচন হত পরোক্ষ, এবং শ্রেণী ভিত্তিক ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু পরের দিনই, প্রধান উদারনৈতিক দল ক্যাডেট দলের নেতা পাভেল মিলিউকভ ফরাসী রাষ্ট্রদূত প্যালিওলোগকে জানালেন, তিনি ভোটের নির্দিষ্ট তারেইখ ঘোষণা এড়াতে চেষ্টা করছেন। ১৯০৫-এর বিপ্লবের সময় থেকে রাশিয়াতে একটা শক্তিশালী নারীবাদী আন্দোলন ছিল, এবং তাদের অন্যতম বলিষ্ঠ দাবী ছিল মেয়েদের জন্য ভোটের অধিকার। নারীবাদীরা সংকিত ছিলেওন, কাওরণ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, “সার্বজনীনকথাটা মেয়েদের নিয়ে নেয় কি না সেটা অস্পষ্ট। ১১ই মার্চ, অস্থায়ী সরকারের একমাত্র সমাজতন্ত্রী সদস্য, আলেক্সান্দর কেরেনস্কী, ঘোষণা করলেন যে মেয়েদের জন্য ভোটের অধিকারকে অপেক্ষা করতে হবে সংবিধান সভা বসা পর্যন্ত। সরকারের এই বিরোধিতার জবাবে, নারীবাদীরা ১৯শে মার্চ এক বিশাল মিছিল সংগঠিত করলেন, যার দাবী ছিল মেয়েদের জন্য ভোট, এবং যাতে আসেন ৪০,০০০ মেয়ে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক মেয়েরাও এদের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু মিছিলের নেতৃত্ব বলশেভিক নেত্রী আলেক্সান্দ্রা কোলোন্তাই বক্তৃতা দিতে গেলে তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেন। অস্থায়ী সরকার বলার চেষ্টা করল যে মেয়েদের ভোট দিতে হলে নির্বাচনের দেরী হবে। নারীবাদীরা তখন প্রথমে সোভিয়েতের নরমপন্থী সমাজতন্ত্রী নেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করেন। তবে তারা সমর্থন পেলেন। তবু, আইন পালটে মেয়েদের ভোটের অধিকার স্বীকৃত হল ২০ জুলায়। ইতিমধ্যে, উদারপন্থীরা একজন দক্ষিণপন্থী সেনাপতির সঙ্গে সামরিক অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছেন, তাই এই পদক্ষেপ তাদের দিক থেকে কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ ছিল না।  

সংবিধান সভা ডাকার গোটা প্রক্রিয়াটা একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, গণতন্ত্রের প্রতি কতটা বাস্তব অবহেলা ছিল।  শুধু নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নাম ঘোষণা করতেই তিন সপ্তাহ লাগল। কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে সেটা স্থির করতে লাগল দুমাস। নানা তর্ক হল ভোটের বয়াস ১৮, না ২০, না ২১? যারা সেনাবাহিনী ছেড়ে পালিয়েছে (সংখ্যা বহু লাখ) তাদের কী ভোট থাকবে? রোমানভ পরিবারের ( জারের পরিবারের) কী ভোট থাকবে (সংখ্যা ৪৭)। মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোট পিছিয়ে দেওয়া। অবশেষে, জুন মাসে, বলশেভিকরা প্রথম সোভিয়েত কংগ্রেসের সময়ে সোভিয়্বেতের হাতে সব ক্ষমতার দাবীতে মিছিল ডাকতে চাইলে, এবং রাজধানী পেত্রোগ্রাদে তাদের শক্তি প্রবল বুঝে, চাবুকের আঘাতে অস্থায়ী সরকার কাজ করতে বাধ্য হল। ১৪ই জুন ঘোষণা করা হল, ১৭ই সেপ্টেম্বর ভোট হবে। কিন্তু জুলাইয়ের গোড়ায় উদারপন্থীরা প্রায় সকলে অস্থায়ী সরকার থেকে ইস্তফা দিলেন। নতুন করে জোট সরকার নিয়ে আলোচনা হলে তারা দাবী করলেন, ভোটের তারিখ পিছিয়ে দিতে হবে ১২ই নভেম্বর অবধি। আর একই সঙ্গে তারা জড়িয়ে পড়লেন জেনারাল কর্নিলভের ষড়যন্ত্রে। সেটা সফল হলে অবশ্যই কোনো ভোট হত না।

শ্রেণীগত স্ব-সংগঠন: সোভিয়েতগুলি

১৯০৫ সালে, সোভিয়েত তৈরী হয়েছিল তলা থেকে, দলীয় অবস্থান অগ্রাহ্য করে শ্রমিকদের উদ্যোগে। তারা তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করেছিলেন,  এবং যে কোনো দলীয় নেতা, শ্রমিক না হলে, মত দিতে পারতেন কিন্তু তাদের ভোট ছিল না। ফেব্রুয়ারী ১৯১৭তে সোভিয়েতের ডাক আসে দুদিক থেকে। জংগী শ্রমিক তথা বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরা, বিশেষ করে দুটি গোষ্ঠী, বলশেভিক দলের ভাইবর্গ জেলা কমিটি, এবং রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক দল আন্তর্জাতিকতাবাদী নামের একটি সংগঠন, যারা মেঝরাইয়নকা (ব্যক্তি সদস্য হলে মেঝরাইয়নেৎস, বহুবচনে মেঝরাইয়ন্তসি) নামে পরিচিত ছিলেন, এরা প্রথম সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন এবং এরাই প্রথম সোভিয়েত গঠনের ডাক দেন, কারণ এরা সোভিয়েতকেই দেখেছিলেন অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার হিসেবে। অন্যদিকে, মেনশেভিক্রা উদ্যোগ নিলেন প্রথমে সোভিয়েতের কার্যনির্বাহক কমিটি প্রতিষ্ঠা করার, যেখানে তারা ১৯০৫-এর ত্রুটি শুধরে নিলেন, এবং প্রথমে তাতে নেতাদের ঢুকিয়ে তবে প্রতিনিধি নির্বাচনের ডাক দেন।

কিন্তু যেখানে উদারপন্থীরা এবং নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা উভয়েই মনে করেছিলেন যে শ্রমিক এবং সৈনিকরা কার্যনির্বাহক কমিটির নেতৃত্ব মেনে চলবেন, বাস্তবে ততটা একপেশেভাবে ঘটনা ঘটে নি। মেনশেভিক আন্তর্জাতিকতাবাদী নেতা সুখানভ তার স্মৃতিচারণে চার বছর পরে লিখেছিলেন যে, মেনশেভিকদের রাজনৈতিক বীজগণিত অনুসারে, জারের সরকারের পর যে সরকার আসবে তাকে হতে হবে পুরোপুরি এক বুর্জোয়া সরকার। এখানেই শ্রমিক ও সৈনিকরা দ্বিমত হলেন। তাদের মতে, যে বিপ্লব তাদের স্বার্থ দেখবে না, সেটা আদৌ কোনো বিপ্লব নয়। তারা দাবী পেশ করা শুরু করলেন।

কার্যনির্বাহক কমিটির নেতারা যখন উদারপন্থীদের কাছে আবেদন করছিলেন যে তারা যেন ক্ষমতা হাতে তুলে নেন, এবং তার বিনিময়ে শুধু কিছু মোলায়েম দাবী করছিলেন, সেই সময়ে সৈন্যরা দাবী করছিলেন যে সামন্ততান্ত্রিক সামরিক জীবনের অবসান ঘটাতে হবে, এবং তারাই কার্যত মেনশেভিক বুদ্ধিজীবী স্কোবেলেভকে ১ নং নির্দেশ বলে খ্যাত সোভিয়েতের নির্দেশের বয়ান বলে দেন। এতে বলা হল যে সমস্ত সামরিক ইউনিটে সৈন্যদের নির্বাচিত সৈনিক কমিটি থাকবে, সোভিয়েতে সৈনিকরা নির্বাচিত প্রতিনিধি পাঠাবে, রাজনৈতিক বিষয়ে সরকারের হুকুম নয়, সোভিয়েতের মত মেনে চলবে, ডিউটি থাকলে সামরিক শৃংখলা মেনে চলবে কিন্তু সৈনিকদের জন্যও নাগরিক অধিকার থাকবে, সেনাবাহিনীতে সব সামন্ততান্ত্রিক প্রথা দূর করা হবে এবং অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে সৈনিকদের কমিটিগুলির।

অস্থায়ী সরকার যখন নগর ডুমা ধাচের সংস্থাগুলিতে প্রাণসঞ্চারের চেষ্টা করছিল,  যেগুলিতে সব শ্রেণীর মাস্নুষ নাগরিক হিসেবে ভোটদাতা হলেন, সেখানে কার্যত মুখ্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা দিল সোভিয়েতগুলি। সোভিয়েতরা এমনকি স্থানীয় স্তরেও যেভাবে কাজ করছিল, তার অর্থ হল, অক্টোবরের আগেই, দেশের ক্রমবর্দ্ধমান অংশে নগর ডুমা বা গ্রামীণ জেমস্টভোদের হাত থেকে স্থানীয় স্বায়ত্বশাসনের দায়ভার নিয়ে নিচ্ছিল সোভিয়েতরা। এবং তারা আমলাতন্ত্রকেও তাদের তত্ত্বাবধানে আনছিল। মস্কো, ইয়ারোস্লাভ, কাজান, নিকোলায়েভ, রস্টভ-অন-ডন সহ বিভিন্ন শহরে নগর সোভিয়েতগুলির নীচে স্থানীয় সোভিয়েত গড়ে উঠছিল। নগর সোভিয়েতের কাছ থেকে সামরিক নিরাপত্তা পেয়ে তারা স্থানীয় নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে থাকে। তৈরী হয় ফ্যাক্টরী কমিটি, ট্রেড ইউনিয়ন, নানা নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানে অন্য নানা কমিটি, এবং স্থানীয় মিলিশিয়া।

বড় শহরগুলির সোভিয়েতদের সঙ্গে গ্রামীণ সংগঠনদের যোগাযোগের ভিত্তিতে খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ শুরু হল। ৫ই মার্চ, পেত্রোগ্রাদের শ্রমিকরা জানতে পারলেন যে ১৮০ ট্রাক খাদ্যশস্য যাচ্ছে ব্যক্তিগত ক্রেতার কাছে। পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের খাদ্য কমিশন ঐ ট্রাকগুলি দখল করে এবং উত্তর ফ্রন্টের সৈন্যদের কাছে পাঠায়, কারণ খবর এসেছিল, ঐ ফ্রন্টে আর মাত্র একদিনের খাদ্য মজুত আছে।  

ক্রাসনোয়ারস্ক সোভিয়েতের কার্যনির্বাহক কমিটি সাইবেরিয় রেলপথ ধরে টেলিগ্রাম পাঠালো, ফাটকাবাজীর জন্য খাদ্য সরবরাহ যেন বন্ধ করা হয়। মে ১৯১৭তে মস্কো সোভিয়েতের ডাকে ৩৩৩ জন প্রতিনিধি জমায়েত হন, সারা রাশিয়া খাদ্য কংগ্রেসে। সোভিয়েত ইতিহাসবিদ আন্দ্রিয়েভ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে এরকম ব্যাপক তথ্য হাজির করেন। গ্রামাঞ্চলে সভিয়েত একটু দেরীতে আসে। কিন্তু ১৯১৭-র জুলাইয়ের শেষের মধ্যে, ৭৮টি গুবার্নিয়ার মধ্যে ৫২টি তে গুবার্নিয়া স্তরের কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত গড়ে উঠেছিল। আরো নীচের স্তরে, ৮১৩টি উয়েঝদের মধ্যে ৩৭১টিতে ইতিমধ্যে কৃষক সোভিয়েত সৃষ্ট হয়েছিল।

শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ

১৯১৭-র মার্চ থেকে শুরু করে আট ঘন্টার শ্রম দিবসের লড়াই ফ্যাক্টরীতে, এবং শিল্প স্তরে, পৌর স্তরে ও জাতীয় স্তরে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ফ্যাক্টরী শ্রমিকরা চেয়েছিলেন বেশী গণতান্ত্রিক কাজের পরিবেশ, কম শোষণ এবং আবশ্যক অধিকারসমূহ।  এই দবীগুলির সংঘাত হল মুনাফার জন্য পুঁজির চাহিদা এবং যুদ্ধের প্রয়াসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারী আকাংখ্যার সঙ্গে। এই লড়াই থেকে শ্রমিকরস বুঝলেন, তাঁদের এক নতুন ব্যবস্থার দরকার কেবল সরকারী স্তরে নয়, কর্মক্ষেত্রেও।   

তাঁরা শুরু করলেন ফ্যাক্টরী কমিটি নির্বাচন করে। এগুলির দায়-দায়িত্ব এবং উদ্দেশ্য ছিল নানা জায়গায় নানা রকম। স্টিভ স্মিথ এবং ডেভিড ম্যান্ডেলের গবেষণা এই সংগঠনগুলির উপর আলোকপাত করে। এর মধ্যে স্মিথের রেড পেত্রোগ্রাদ  অপেক্ষাকৃতভাবে বলশেভিকদের প্রতি সমালোচনামূলক, আর ম্যান্ডেলের দ্য পেত্রোগ্রাদ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড দ্য ফল অফ দ্য ওল্ড রেজিম এবং দ্য পেত্রোগ্রাদ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড দ্য সোভিয়েত সেজার অফ পাওয়ার অনেক বেশী সহানুভূতিশীল।

ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের আগে কোনো সমাজতন্ত্রী দলেরই কর্মসূচীতে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ দেখা দেয় নি। এমনকি বলশেভিকরা, যারা লেনিন দেশে ফেরার পরও অনেকটা বাঁয়ে সরেছিলেন বিশেষ  করে কামেনেভ ও স্তালিন প্রস্তাবিত অস্থায়ী সরকারের প্রতি শর্তাধীন সমর্থনের নীতি থেকে তারাও কিন্তু অস্পষ্ট ছিলেন, যে ক্ষমতা কখন সোভিয়েতদের দিকে সরবে। এপ্রিল থিসিসে লেনিন উল্লেখ করেন যে লক্ষ্য হল সামাজিক উৎপাদন ও বন্টনকে শ্রমিকদের প্রতিনিধিদের সোভিয়েতের কন্ট্রোলে আনা। কারমেন সিরিয়ানি থেকে ম্যান্ডেল, বহু লেখক দেখিয়েছেন যে রুশ ভাষায় controlশব্দটির অর্থ ইংরেজী থেকে স্বতন্ত্র। রুশ শব্দের অর্থ তদারকী, পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়। কিন্তু বাস্তব সমস্যা শ্রমিকদের ঠেলে এগিয়ে দিল। অন্যতম প্রথম আহবান ছিল ফ্যাক্টরীগুলিতে গণতান্ত্রিক বা সাংবিধানিক প্রশাসন চালু করার। কিন্তু দ্রুত পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। বুর্জোয়া শ্রেণী আটঘন্টা শ্রমদিবসের দাবীর বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াই শুরু করে। পুঁজিপতিরা প্রচার শুরু করল, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকরা মারা যাচ্ছেন, অথচ শ্রমিকরা স্বার্থপর দাবী করছে। এইভাবে তারা শ্রমিক-সৈনিক সংহতিতে ফাটল ধরাতে চাইল।

প্রচারটা কিন্তু মালিকদের বিরুদ্ধেই চলে গেল। নানা তর্কের মাঝে, শ্রমিকরা প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলিকেই প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। কিছু ফ্যাক্টরী মালিক দাবী করছিল যে পুরোদমে উৎপাদন হচ্ছে না, কারণ সরবরাহ বন্ধ। ফ্যাক্টরী কমিটিগুলি দাবী করল, যে এই ধরণের সত্যাসত্য যাচাই করার ক্ষমতা তাঁদের দিতে হবে। এইভাবে শ্রমিকদের শক্তি গঠিত হতে থাকল। মে মাসের মধ্যে এমন কি দক্ষিণপন্থী মেনশেভিকরাও সন্দেহ করছিলেন যে ধনিকশ্রেণী গোপন লক আউটের দিকে এগোচ্ছে। ১৯০৫ সালে মালিকদের সম্মিলিত পুঁজি ধর্মঘটের ফলেই আটঘন্টার লড়াই হেরে গিয়েছিল, যেটা শ্রমিকদের স্মৃতিতে তখনও ভীষণভাবে জীবিত ছিল। 

মে-মাসের মাঝামাঝি, পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত  অর্থনীতিকে চাংগা করার জন্য একটা নেহাতই মোলায়েম নিয়ন্ত্রণ আনার প্রস্তাব গ্রহণ করল। এর জবাবে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী আলেক্সান্দার কোনোভালোভ ইস্তফা দিলেন, এবং সাবধান করে দিলেন যে অদূর ভবিষ্যতে শয়ে শয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। আরেক প্রধান শিল্পপতি, রিয়াবুশিনস্কি, ব্যাখ্যা করলেন যে অর্থনীতির উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ রাষ্ট্র ছিল সোভিয়েতের নিয়ন্ত্রণাধীন। 

এই আক্রমণগুলির মোকাবিলা করতে পেত্রোগ্রাদের শ্রমিকরা শহরজোড়া ফ্যাক্টরী কমিটিদের একটি সম্মেলন ডাকলেন। ১লা জুন এই সম্মেলন সোভিয়েতদের হাতে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তুলে দিতে আহবান করে বলশেভিকদের আনা একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিল। ফ্যাক্টরী কমিটিরা পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের শ্রমিক শাখাকে বাঁ দিকে ঠেলে দিল। ৩১শে মে, এই সংগঠনটি প্রস্তাব করল যে ক্রমবর্দ্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রকৃত সমাধান রয়েছে একই সঙ্গে তলা থেকে (ফ্যাক্টরী স্তরে) এবং উপর থেকে (রাষ্ট্রের মাধ্যমে) শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করাতে।

ফ্যাক্টরী কমিটিরা সংখ্যাতে এবং প্রভাবে বাড়তে থাকল, এবং ক্রমেই বেশী বামপন্থী হতে থাকল। জুন সম্মেলনে বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী কর্মী ভি এম লেভাইন বলেন, শ্রমিকদের সক্রিয় হতে হয়েছে, কারণ শিল্পপতিরা হয় নি। কিন্তু নৈরাষ্ট্রবাদীরা যখন তলা থেকে দখল নেওয়ার দাবী তুললেন, তখন বলশেভিকরাও তার বিরুদ্ধে ছিলেন। একজন বলশেভিক প্রতিনিধি ব্যাখ্যা করেনঃ

কন্ট্রোল মানে সমাজতন্ত্র নয়...। আমাদের হাতে কন্ট্রোল তুলে নিলে আমরা হাতে কলমে শিখব, উৎপাদনের কাজ কীভাবে করতে হয়, এবং সেটাকে সংগঠিতভাবে নিয়ে যাব সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনের অভিমূখে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে, ফ্যাক্টরী কমিটিরা প্রশাসনিক দায়িত্ব হাতে তুলে নেয় ফ্যাক্টরী চালু রাখার জন্য। এর ফলে বাম-ডান দুপক্ষের সংগেই তাঁদের দ্বন্দ্ব হয়। অক্টোবরে ফ্যাক্টরী কমিটিদের জাতীয় সম্মেলনে ডেভিড রিয়াজানভ মন্তব্য করেন যে ফ্যাক্টরী কমিটির একজন সদস্য  অনিচ্ছাকৃতভাবেই পরিণত হন বিনিয়োগকারীর চরে। এর আগের একটি সম্মেলনে লেনিন বলেছিলেন, ফ্যাক্টরী কমিটিরা হল ধনিক শ্রেণীর ফাই-ফরমাইশ খাটার লোক। এর জবাবে নিউ আর্সেনাল ফ্যাক্টরীর এক প্রতিনিধি বুঝিয়ে বলেন, যদি শ্রমিকরা কাঁচা মাল জোগাড় না করেন, তা হলে ফ্যাক্টরীগুলি বেশীদিন চালু থাকবে না।

এই মতভেদ, বিতর্ক, দেখিয়ে দেয়, বিপ্লবের ঐ বছরে গণতান্ত্রিক বৈচিত্রের মধ্যে কতটা প্রাণ ছিল। তৃণমূল স্তরের সংগঠনরা একজোট হত, নানা সমস্যা সমাধান করতে, এবং সেজন্য তারা যে সব পথ বেছে নিত তা সব সময়ে নেতাদের মনঃপূত হত না।

কৃষক ও গণতন্ত্রঃ

ট্রটস্কী তাঁর রুশ বিপ্লবের ইতিহাস গ্রন্থে, কৃষক সংগ্রামের গতিপ্রকৃতি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। লেনিন প্রত্যাশা করেছিলেন যে ক্ষেতমজুররা আলাদা হয়ে যাবেন এবং নিজেদের সোভিয়েত গড়বেন। বাস্তবে তা হল না। সামন্ততন্ত্র-বিরোধী লড়াই ক্ষেতমজুর, গ্রামীণ আধা-প্রলেতারীয়, এবং গরিব ও মাঝারি চাষীকে একজোট করল। ট্রটস্কী অনেক রকম প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যেমন শহরের স্তরে জমি ও খাদ্য কমিটিদের কার্যনির্বাহক কমিটিগুলি। আবার ছিল সোভিয়েতও। কিন্তু জমি ও খাদ্য কমিটিগুলি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছিল বলেই, গ্রামস্তরে কৃষকরা তাদের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে লড়াইয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারতেন, যদিও উপরের দিকে ঐ কমিটিগুলি দক্ষিণমুখী হচ্ছিল। আন্দ্রিয়েভের বিপরীতে, ট্রটস্কী প্রস্তাব করেন, যে কৃষকরা বেশ কিছুদিন সভিয়েত সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন,এবং তার কারণ হল সোভিয়েতদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। পরে, যখন সোভিয়েতরা তাদের রাজনৈতিক গতি পরিবর্তন করে, তখন সোভিয়েতের প্রতি কৃষকের দৃষ্টিভঙ্গীও পালটায়।

অক্টোবর ও তারপরঃ

কিন্তু যে সব উদারনৈতিক ইতিহাসবিদ ১৯১৭ সালে বিপ্লবী গণতন্ত্রের এই বিষ্ফোরণকে স্বীকারও করেন,  তারাও বলেন যে অক্টোবর ছিল এক সংখ্যালঘু , ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুথান, যা এই গণতন্ত্রের অবসান ঘটাল। বাস্তবটা অনেক বেশী জটিল। কোনো অভ্যুত্থানই গণভোটের মাধ্যমে সংঘটিত হয় না। কিন্তু বলশেভিকরা, বিশেষ করে রণক্ষেত্রে বাস্তব নেতৃত্ব ছিল যে দুজনের হাতে সেই ট্রটস্কী এবং সভের্দলভ, যে রণকৌশল অনুসরণ করেন তাতে সোভিয়েতদের, এবং সৈনিকদের কমিটিগুলিকে ব্যবহার করে সেনা ছাউনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার এবং বাকিদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দরকার ছিল। সেনাবাহিনী ছাড়া, শ্রমিক আন্দোলন নিজের মধ্য থেকে লালরক্ষী বাহিনী গড়তে চেয়েছিল। রেক্স ওয়েড দেখিয়েছেন, এ ছিল একটা শ্রেণীভিত্তিক লড়াই, এবং মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীরা খুব গোড়ার দিক থেকেই এটাকে অবিশ্বাস করতেন, ও বলশেভিক ফন্দী বলে দেখতেন। জুলাইয়ের দিনগুলির পরে লালরক্ষী বা শ্রমিক রক্ষীদের উপরে বলশেভিকদের প্রভাব কমে গিয়েছিল, কিন্তু কর্নিলভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে বলশেভিক মতাদর্শগত প্রাধান্য মজবুত হয়।   

হাল আমলে রুশ বিপ্লবের বহুলপঠিত দক্ষিণপন্থী ইতিহাসবিদদের মধ্যে অন্যতম হলেন ওর্ল্যান্ডো ফাইজেস। তিনি ছাত্রপাঠ্য কিছু অনলাইন লেখা লিখেছেন, যার মধ্যে একটির শিরোনাম হল লেনিন ও অক্টোবরের ক্যু। ফাইজেস জোর করেছেন, যে লেনিন তাঁর দলকে ক্যু দেতার দিকে যেতে জোর দিয়েছিলেন, কারণ ক্ষমতা দখলকে তিনি ঐ ভাবেই দেখতেন। ফাইজেস কিন্তু লেনিন ক্ষমতা দখলকে কীভাবে দেখতেন তার আদৌ কোনো প্রমাণ দেন নি। আর, তিনি একেবারেই দেখাতে তৈরি না, যে লেনিন প্রস্তাবিত রণনীতি, যা ছিল গোটা দেশ জুড়ে অভ্যুত্থান ঘটানো, আর কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের হয়ে ট্রটস্কী ও সভের্দলভের অনুসৃত নীতি, এক ছিল না।  

অক্টোবর বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল একটি সোভিয়েত প্রতিষ্ঠান সামরিক বিপ্লবী কমিটি। অভ্যুত্থানের পরে পরে চেষ্টা করা হল সর্বোচ্চ স্তর অবধি সোভিয়েত ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তোলার। সোভিয়েত কংগ্রেস জমি, শান্তি, সোভিয়েত ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে কয়েকটি মৌলিক ডিক্রী গ্রহণ করল। সেই সঙ্গে কংগ্রেস মার্তভের প্রস্তাব গ্রহণ করল, যে সব সমাজতন্ত্রী দলদের নিয়ে একটি সরকার গঠিত হোক। কিন্তু মেনশেভিকরা এবং দক্ষিণপন্থী ও মধ্যপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীরা, এমনকি শেষে মার্তভের নেতৃত্বাধীন মেনশেভিক আন্তর্জাতিকতাবাদীরাও, সেরকম কোনো সরকারে থাকতে অস্বীকার করলেন। বলশেভিকদের সঙ্গে তাঁদের সকলের বিভাজনরেখা ছিল, নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা সরকার সোভিয়েত কংগ্রেসের অধীনে থাকবে এবং তার সিদ্ধান্তগুলি মেনে নেবে, এই নীতি গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। 

সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী দলে ভাঙ্গন হয়েছিল অক্টোবর অভ্যুত্থানের সামান্য আগে। স্পিরিদনোভা, ক্যামকভ ও অন্যদের নেতৃত্বে গঠিত বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী দল সোভিয়েত কংগ্রেসের সিদ্ধান্তগুলিকে সমর্থন করেন, এবং নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত বিশেষ কৃষক প্রতিনিধি কংগ্রেস ও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নিয়মিত কৃষক কংগ্রেসে তাঁরাই ছিলেন প্রধান শক্তি। কয়েকও মাস ধরে তাঁরা সরকারে অংশগ্রহণ করেছিলেন, এবং সেখানে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের অভ্যাস, এই পর্যায়টিকে অগ্রাহ্য করা, যার ফলে বিপ্লবী গণতন্ত্র ক্ষমতায় থেকে কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল সেটাও দেখা হয় নি।

সোভিয়েত কংগ্রেস একটি সারা রাশিয়া সোভিয়েত কার্যনির্বাহী কমিটি বা VTsIK-র নির্বাচন করেছিল। VTsIK-র কার্যবিবরণী পড়লে বোঝা যায়, এর মধ্যে বাস্তবে নানা প্রসঙ্গে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছিল, এবং বলশেভিকরাও নানা মত পোষণ করতেন। VTsIK-র মধ্যে নতুন করে সব সমাজতন্ত্রীদের নিয়ে সরকার গড়ার প্রসঙ্গ ওঠে। ১ নভেম্বরের সভার কার্যবিবরণী থেকে দেখা যায়, এ নিয়ে সেদিন দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছিল। বলশেভিকরা অন্য দলেদের সরকারে রাখতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু এই শর্তে, যে তাঁরা সোভিয়েত কংগ্রেসকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে মেনে নেবেন, এবং সরকার VTsIK-র অধীনস্থ থাকবে। নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করে দেখিয়ে দিলেন, তাঁরা আসলে সোভিয়েত ক্ষমতাকেই মানতে রাজি ছিলেন না। কৃষক কংগ্রেসের পর, VTsIK-র কলেবর দ্বিগুণ করা হয়, সমান সংখ্যক কৃষক প্রতিনিধিকে এনে।

অন্য যে কারণে নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা বিঘ্নিত হল, তা হল তাঁদের দাবী, যে কোনো জোট সরকার হলে তা থেকে লেনিন এবং ট্রটস্কীকে বাদ রাখতে হবে। বলা হয়, এটা যে আলোচনা ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে পরিণত হল, তার জন্য দায়ী বলশেভিকদের, বা বিশেষভাবে তাঁদের লেনিনবাদী উপধারার একগুঁয়েমি। বরং আমাদের বুঝতে হবে, এটা দেখায় নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীদের একগুঁয়েমিকে। তাঁরা বুর্জোয়া উদারপন্থীদের সঙ্গে জোট বাঁধতে তৈরী ছিলেন, বা গৃহযুদ্ধের সময়ে জারতন্ত্রী জেনারালদের সঙ্গেও জোট বেঁধেছিলেন, অথচ বিশেষ করে সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীরা বিপ্লবী গণতন্ত্র মানতে প্রস্তুত ছিলেন না।  

তবু একটা দাবী বারে বারে ফিরে আসে, যে বলশেভিকরাই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছিলেন। গৃহযুদ্ধের ভূমিকা, সেই সময়ে বলশেভিকদের ত্রুটি, এবং বলশেভিক বিরোধীদের ভূমিকা,  অন্যত্র আলোচনা করতে হবে, কারণ সে এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের একটা কথার উপর জোর দিতে হবে। সেটা হল, অক্টোবরের পরেও সোভিয়েতগুলি প্রাণবন্ত ছিল। আর, একটা সামরিক শৃংখলাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল গোড়া থেকে সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চেয়েছিল, এই দাবীটা সম্পূর্ণ হাস্যকর। ১৯১৭-র ফেব্রুয়ারীতে বলশেভিকদের সংখ্যা ছিল মোটামুট ২৪,০০০। জুলাইয়ের মধ্যে তাঁরা কলেবরে বেড়েছিলেন মোটামুটি দশগুণ। অক্টোবরের মধ্যে সদস্যসংখ্যা হয়েছিল প্রায় ৪,০০,০০০। স্পষ্টতই, এঁরা সকলে তথাকথিত কট্টর লেনিনপন্থী”, (অর্থাৎ ইঙ্গিত করা হচ্ছে যে এঁরা লেনিনের অন্ধ আজ্ঞাবহ ছিলেন), এমন বলা যায় না। ১৯১৭-১৮ সালে অন্তত লেনিনের ধারণা, যে একটি শ্রমিক রাষ্ট্রে যে কোনো রাঁধুনিও প্রশাসন করতে পারবে, এটার অর্থ ছিল বাস্তবে বিশ্বাস করা, যে নতুন ধরণের রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসনপদ্ধতির সরলীকরণ ঘটবে।  

গৃহযুদ্ধের আগে, অর্থাৎ ১৯১৭-র শেষদিকে এবং ১৯১৮-র গোড়ায়, মোট জাতীয়করণের মাত্র ৫ শতাংশের সামান্য বেশী হয়েছিল গণকমিশার পরিষদ,VTsIK,  বা সর্ব্বোচ্চ অর্থনৈতিক পরিষদের উদ্যোগে। অধিকাংশ জাতীয়করণ করা হয়েছিল তলা থেকে, ফ্যাক্টরী কমিটিদের উদ্যোগে, শ্রেণী সংগ্রামের তাগিদে, পুঁজিপতিরা নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করলে।  এবং সোভিয়েত ধাঁচের প্রতিষ্ঠান বাড়তেই থাকে।  আলেক্সান্ডার রাবিনোউইচ দেখিয়েছেন যে পেত্রোগ্রাদে প্রথম নগর জেলা সোভিয়েত তার নিজের বিচার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, পুরোনো বিচারকদের হঠিয়ে। তাদের ছিল একটি তদন্ত কমিশন, একটি সমাজকল্যাণ কমিশন, একটি আইন কমিশন, একটি গৃহ কমিশন, একটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা কমিশন, এবং তাদের নিজস্ব প্রেস। মে-জুন মাসে তাঁরা একটি সম্মেলন করে, যেখানে ২০১জন ভোটসহ প্রতিনিধির মধ্যে ছিলেন ১৩৪ জন বলশেভিক, ১৩ জন বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী, ৩০ জন মেনশেভিক ও মেনশেভিক আন্তর্জাতিকতাবাদী, এবং ২৪ জন সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী। রাবিনোউইচ বলেছেন, এ ছিল গৃহযুদ্ধের সাড়া পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও জনগণের সঙ্গে অর্থবহ সংযোগ ফিরিয়ে আনার এক সৎ প্রয়াস। এই বিপ্লবী গণতন্ত্রের মৃত্যু কেন হল, তা বুঝতে হলে গৃহযুদ্ধের ভূমিকা অবহেলা করা যাবে না। কিন্তু যারা অক্টোবর ১৯১৭ থেকে স্তালিনবাদ পর্যন্ত একটি সরলরেখা টেনে দেন, তাঁরা অনিবার্য ভাবেই গৃহযুদ্ধকে হয় তাচ্ছিল্য করেন, অথবা একেবারে এড়িয়ে যান। 

 

 

 

বাকু কমিউন

বাকু কমিউন 

রোনাল্ড সানি

অনুবাদ- প্রবুদ্ধ ঘোষ

সম্পাদনা – কুণাল চট্টোপাধ্যায়

 

 

বাকুর প্রাসাদের মসজিদ -- ১৯১০

বাকু কমিউনের নেতৃত্ব, যাঁরা গণতান্ত্রিকভাবে ও অহিংসভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন; তাঁদের কাহিনী রুশ বিপ্লব সম্পর্কে প্রচলিত বহু কাল্পনিক ব্যাখ্যাকে ভুল প্রমাণ করে

রুশ বিপ্লবের অধিকাংশ বিবরণ একটি শহরের গল্প বলে- পেত্রোগ্রাদ; যেখানে রোমানভ সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে এবং বলশেভিকরা ক্ষমতায় এসেছিলেন অক্টোবরে। রাজধানীতে শ্রমিক, মহিলা ও সৈনিকেরা নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছিলেন বটে, কিন্তু সমস্ত রাশিয়া জুড়ে বছরভর বিপ্লবী কার্যক্রম চালিয়ে গেছিলেন দেশের জনগণ।

দক্ষিণ-পূর্বে ১৫০০ মাইল দূরে, বাকুতে, জাতি, ধর্ম, শ্রেণি বিভক্ত জনগণ ইতিহাসের ধারা বদল করছিলেন এবং বিপ্লবী নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছিলেন। সেখানে তেলের ওপর তৈরি এক শহরে, অক্টোবর একটু দেরিতে এসেছিল

যখন এসেছিল, তখন “ককেশিয়ার লেনিন” স্তেপান শাহুমিয়ান চেষ্টা করেছিলেন জনগণের জন্যে গণতান্ত্রিকভাবে ও অহিংসভাবে ক্ষমতা দখল করতে।তিনি যে বাকু কমিউন নির্মাণ করেছিলেন, তার আখ্যান থেকে রুশ বিপ্লব ও তজ্জনিত গৃহযুদ্ধের বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিশা পাওয়া যায়।

 

তেলের শহর

দক্ষিণ ককেশাসের বৃহত্তম শহর বাকু তেলের উপরে গড়ে উঠেছিল, এবং তা ছিল চতুর্দিকে মুসলিম কৃষকের গ্রাম দিয়ে ঘেরা শ্রমিকদের এক মরূদ্যান।বিংশ শতকের শুরুতে গোটা মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের থেকে বেশি তেল উৎপাদন হত এখানে। দুর্বিষহ যাপন ও শ্রমের শর্ত সত্ত্বেও গরিব পরিযায়ীরা এই তৈলক্ষেত্রে কাজ খুঁজতে আসতেন।

বাকু শুধুমাত্র রুশ সাম্রাজ্যের শিল্পবিপ্লবের কেন্দ্রই ছিল না, বরং শ্রমিক আন্দোলনের নির্মাণঘর ছিল। বস্তুতঃ শ্রমিক ও শিল্পপতিদের মধ্যে প্রথম যৌথ দরদামের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল এখানেই, ১৯০৪ সালে। এবং এই শহরটাই ছিল সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট, বিশেষতঃ বলশেভিকদে্‌ যেমন জোসেফ স্তালিনের আশ্রয়স্থল, যখন অন্য, কম আশ্রয়দায়ী শহরে তাঁদের সংগঠনগুলি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল শাসকরা

বাকুতে শ্রেণিপার্থক্য মিশে ছিল জাতিগত বৈচিত্রের সঙ্গে। সমাজ কাঠামোর উচ্চতম স্তরে মিলেমিশে ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ইঞ্জিনিয়াররা, আর্মেনীয় ও রুশ শিল্পপতি ও আজেরবাইজানি জাহাজ-মালিকরা। রুশ ও আর্মেনীয় শ্রমিকেরা যথেষ্ট দক্ষ স্থান অধিকার করে ছিলেন, মুসলিমরা ছিলেন অদক্ষ শ্রমিক শক্তি। সবচেয়ে অস্থায়ী ও অরক্ষিত শ্রমিক হিসেবে নিকৃষ্টতম কাজ জুটত তাঁদের।

সাম্রাজ্যের সঙ্গে ককেশাসের যে শোষণমূলক সম্পর্ক, সেটা সবচেয়ে স্পষ্ট বোঝা যায় বাকু থেকে। তেল থেকে রাজস্ব সংগ্রহ সেখানে অন্য সব চিন্তাকে ছাপিয়ে যেত। বিত্তবান অভিজাতরা, মানে রুশ ও আর্মেনীয়রা- শহরের কর্তৃত্বভার সামলাত, এবং নিম্নশ্রেণির কল্যাণভার ন্যস্ত ছিল বেসরকারি দাতব্য পরিষেবার ওপর। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খুব নগণ্য সংখ্যায় অ-খ্রিষ্টিয় প্রতিনিধি ছিল এবং সরকার ঘন ঘন মার্শাল ল্‌ ও জরুরি অবস্থা জারি করত যাতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনি ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা দর্শিত হত।

সাধারণ মানুষ ও শাসক শ্রেণি উভয়েই সংস্কার চাইত। কিন্তু জার বস্তুতঃ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংস্কারের কোনও পথই খোলা রাখেনি। পরিস্থিতি দাবি করছিল কিছু বেআইনি সংগঠনের বিপ্লবী কর্মীরা সংখ্যায় কম হলেও প্রয়োজনীয় অভিমুখ ও নির্দেশ দিয়েছিল।

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারিরা খেয়াল করেছিলেন যে, বাকুর শ্রমিকেরা দক্ষতা, বেতন এবং জাতি দ্বারা বিভক্ত ছিলেন এবং রাজনীতির থেকে বেতন নিয়ে বেশি ভাবিত ছিলেন। সৌভাগ্যবশতঃ তেল-কোম্পানিগুলি অন্যদের চেয়ে বেশী প্রস্তুত ছিল, কিছু সুবিধে দিয়ে শ্রমিকশক্তিকে বিশেষতঃ দক্ষ শ্রমিকদের হাতে রাখার জন্য

অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর প্রতি লক্ষ্য নিবদ্ধ রেখে ডিসেম্বর ১৯০৪-র সাধারণ ধর্মঘট আট থেকে নয় ঘণ্টার দৈনিক কাজ ও অসুস্থতাকালীন ছুটির দাবি জিতে নিতে পেরেছিল- এমনই ভাল চুক্তিপত্র, যা জনপ্রিয় নাম পেয়েছিল খনিজ-তেলের সংবিধান।

জার দ্বিতীয় নিকোলাস যখন ১৯০৫ সালে ‘অক্টোবর ইস্তাহার’ পেশ করলেন, এবং কিছু সীমাবদ্ধ নাগরিক অধিকার ও জনগণ কর্তৃক নিবার্চিত ডুমার কথা বলা হল, বাকু তখন তৈরি করল শ্রমিকদের ডেপুটিদের সোভিয়েত। ঐ বিপ্লবী বছরের শেষ দিকটাতে এইরকম অনেকগুলি পরিষদ শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরব ছিল। কিন্তু শ্রমিকেরা লক্ষ্য নিবদ্ধ রেখেছিলেন রাজনীতিকে পরিহার ক’রে অর্থমৈতিক স্বার্থের দিকে শাহুমিয়ান দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন-

সাধারণভাবে শ্রমিকরা এখানে ভীষণই বাণিজ্যিক দল। তারা একটা নতুন অর্থনৈতিক ধর্মঘটের ব্যাপারে ভাবছে এবং আলোচনা করছে যাতে আরেকটু বেতনবৃদ্ধি হয় এবং বেশি ‘বোনাস’ মেলে।

নিরবচ্ছিন্ন পুলিশি সক্রিয়তাকে এড়িয়ে বিপ্লবীরা ১৯০৫ সালের পরেও গুপ্ত কার্যকলাপ চালাচ্ছিলেন, যখন জারতন্ত্রসাধারণভাবে শ্রমিক আন্দোলন দমন করছিল এবং বহু বিপ্লবীকে হয় রাজনীতি ছাড়তে নয়তো নির্বাসিত হতে বাধ্য করেছিল। তাঁদের পরিশ্রম সার্থক হয়েছিল ১৯১৪ সালে, ঠিক যখন রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্র চেগে উঠছে, তখন এক প্রায় ৪০,০০০ শ্রমিকের ধর্মঘটে।

এইসব সাফল্য তলে তলে জেগে ওঠা উদ্বেগগুলোকে কিছুটা ঢেকে রেখেছিল। দক্ষ শ্রমিক, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন রুশ ও আর্মেনীয়, তাঁরা ইউনিয়নে যোগদান করে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের বার্তা গ্রহণ করছিলেন; সেসময় মুসলিম শ্রমিকেরা প্রতিবাদ ও ধর্মঘটে যোগ দিচ্ছিলেন অনেক ইতস্তত ভঙ্গীতে।

পর্যবেক্ষকেরা অবজ্ঞাভরে তাঁদের বলতেন, ‘তাতার’, তাঁদের বলা হত ‘তেমনিয়ে (কালো)’ ও ‘নেসোস্নাতেলনিয়ে (রাজনীতি অসচেতন)’। বহু মুসলিম শ্রমিক আটকে ছিলেন তাঁদের গ্রামে ও ধর্মগুরুদের নেতৃত্বতলে। যদিও অল্প সংখ্যক মুসলিম সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের প্রচার করেছিলেন; কিন্তু ককেশিয়ার বৃহদ্‌সংখ্যক মুসলিম শ্রমিকের রাজনীতি বিষয়ে কোনওই আগ্রহ ছিল না।

বাকুর জাতিগত ও ধর্মগত বিভেদ এক চরম পরিণতিতে পৌঁছাল ১৯০৫-এর ফেব্রুয়ারিতে যখন আর্মেনীয় ও মুসলিমরা একে অপরের বিরুদ্ধে দাঙ্গা ও আন্তঃজাতি হত্যায় লিপ্ত হলেন। মুসলিমরা, আর্মেনীয়রা অস্ত্র হাতে নিয়েছে, মুসলিমদের মধ্যে এই ধারণা ছড়িয়ে পড়লে, আতঙ্কিত হয়ে, মুসলিমরা প্রথম আক্রমণ করলেন। পুলিশ ও সৈন্য নিষ্ক্রিয় হয়ে রইল।

আর্মেনীয় বিপ্লবী ফেডারেশন (দাশনাক), প্রায় এক দশক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অটোমান সাম্র্যাজ্যের মধ্যে আর্মেনীয়দের রক্ষা করতে। তারা তাদের ফৌজ ব্যবহার করেছিল সম্প্রদায়কে বাঁচাতে। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও উদারনৈতিকরা সরকারের নিষ্ক্রিয়তার নিন্দা করলেন, সরকারকে দুষলেন ইচ্ছাকৃত জাতিদাঙ্গা বাধানোর জন্যে। হিংসা থামার পরেও আতঙ্কের ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল, এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে মানুষ ভয় পেয়ে গেছিল যে, আরেকটা হিংসাত্মক ঘটনা অবশ্যম্ভাবী।

 

সমর্থনের ওঠাপড়া

প্রায় সমস্ত রাশিয়ার মতো বাকুও ফেব্রুয়ারি-মার্চে সংক্ষিপ্ত মধুচন্দ্রিমা উপভোগ করছিল। বুর্জোয়া এক্সিক্যুটিভ কমিটি অব্‌ পাবলিক অর্গ্যানাইজেশনস (IKOO) হাত মিলিয়েছিল সদ্য নির্বাচিত শ্রমিকদের সোভিয়েত ও তার চেয়ারম্যান বলশেভিক শাহুমিয়ানের সাথে। রুশ সৈন্য যখন অটোমান আনাতোলিয়া দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তখন মনে করা হয়েছিল যে আভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে একতা জরুরি ছিল কিন্তু পূর্বের সামাজিক ও জাতিগত বিদ্বেষ শহরের শান্তিকে তখনও বিপন্ন রেখেছিল।

যেমন পেত্রোগ্রাদে, তেমন বাকুতেওঃ সরকারের দুই কেন্দ্র- IKOO ও বাকু সোভিয়েত -- জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার ও শহরের ক্ষমতা দখলের জন্য প্রতিদ্বন্দিতা করছিল। IKOO-তে ছিল সব পেশাদারেরা -- উকিল, আমলা ও উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবিরা- অন্যদিকে সোভিয়েতের নেতৃত্বে ছিলেন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট্‌স (বলশেভিক ও মেনশেভিক), এসআর এবং দাশনাকেরা। রুশ শ্রমিকরা এবং সৈন্যদের সঙ্গে আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের একটা অংশও সোভিয়েতের সমর্থক ছিলেন; কিন্তু মুসলিমরা এর বাইরে ছিলেন ১৯১৭-র গ্রীষ্ম পর্যন্ত।

IKOO-র উদারনৈতিকরা ও পেশাদাররা বলশেভিকদের আইন-প্রশাসনের শত্রু হিসেবে, নৈরাজ্যের উদ্‌গাতা হিসেবে দেখত। বাকু সোভিয়েতের এসআর সংখ্যাগরিষ্ঠরা যুদ্ধ ও সামাজিক শান্তি বিষয়ে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের নরমপন্থাকেই সমর্থন করতঃ তারা ‘দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান’ রেখেছিল এবং কোনরকম ক্ষতিপূরণ ছাড়াই নিঃশর্ত গণতান্ত্রিক শান্তির দাবি করেছিল।

বেশিরভাগ বলশেভিকই বসন্তকালীন সময়ে এই নীতিগুলির পক্ষে ছিলেন কিন্তু, শাহুমিয়ান আরও বিপ্লবী চিন্তাধারা পোষণ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ফেব্রুয়ারির বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব আদতে ‘ইউরোপের সামাজিক বিপ্লবের সূচনা, যার প্রভাবে ক্রমশঃ সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত হবে’। তার ওপরে, শাহুমিয়ানের অনড় যুদ্ধবিরোধী অবস্থান বাকুর সৈনিকদের কাছে চক্ষুশূল ছিল। দাশনাকদের ভয় ছিল যে, সন্ধি করলে ককেশিয়াতে তুর্কি অনুপ্রবেশ ঘটে অটোমান আর্মেনীয়রা বিপদগ্রস্ত হবে, তাই তারা বলশেভিকদের লাইন মানেনি। সেইজন্যেই যে রুশ সৈন্যরা সোশ্যাল রেভ্যল্যুশনারিদের সমর্থন করেছিল, তারাই শাহুমিয়ানকে সোভিয়েতের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।  

তবে, উত্তরের দুই রাজধানীর এবং বিভিন্ন রণাঙ্গনের মতোই, বাকুও ১৯১৭-র বসন্ত ও গ্রীষ্মে বামপন্থায় ঝুঁকল। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছিল এবং কেরেনস্কির জঘন্য ‘জুন অফেন্সিভ’ সৈন্যদের রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল।

পেত্রোগ্রাদে বিপ্লবী শ্রমিক ও নাবিকেরা জুলাইয়ের গোড়ায় একটা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন, যাতে সোভিয়েতকে চাপ দিয়ে ক্ষমতা দখল করানো যায়। কিন্তু, তারা যে শুধু ব্যর্থ হয়েছিলেন তা-ই নয় বরং বাকু ও পেত্রোগ্রাদের সোভিয়েত অল্প সময়ের জন্য বলশেভিকদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল, কারণ আপাতঃভাবে এই ব্যর্থ বিপ্লবের তারাও অংশীদার বলে মনে হচ্ছিল।

লেনিন ফিনল্যান্ডে আত্মগোপন করেছিলেন এবং সদ্য বলশেভিক নেতৃপদে আসা ট্রটস্কি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। শাহুমিয়ান এবং তাঁর সহকারী আলেশা ঝাপারিদঝে কমরেডদের প্রাণপণে রক্ষা করছিলেন। কিন্তু রাজধানীর ঘটনায় বলশেভিকদের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল আর, তাঁরা আপাতঃভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন হঠকারী হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছিলেন।

এই ধারণা অচিরেই উল্টোখাতে বইল যখন প্রতিবিপ্লবী জেনারেল লাভর কর্নিলভ পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের বিরুদ্ধে সামরিক বিদ্রোহ করল। ইতিমধ্যেই বাকুতে প্রবল অনাহার দেখা দিল, বিশেষতঃ দরিদ্র মুসলিমরা ক্লিষ্ট হল বেশি। শ্রমিকেরা সর্বাত্মক ধর্মঘট গড়ে তুললেন, অনিচ্ছুক তেল মালিকরা আত্মসমর্পণ করলেন, যদিও  চুক্তি সইয়ের ডাক পড়লে তারা যতটা সম্ভব ধীরগতিতে সেদিকে এগোলেন।

স্থানীয় বলশেভিকরা এই বিক্ষোভের ঢেউ ব্যবহার করে সোভিয়েতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বললেন। যখন লেনিন বারংবার জোর দিচ্ছেন শক্তি দিয়ে ক্ষমতা দখলের ওপর, তখন শাহুমিয়ান কৌশলের সঙ্গে বাকু সোভিয়েতে নির্বাচন সংঘটিত করলেন, যেখানে বলশেভিকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ল। যদিও তাঁর পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না, সোভিয়েত IKOO-কে উচ্ছেদ করে নিজেদের সার্বভৌম বলে ঘোষণা করতে রাজি হল।

এসআর সংখ্যাধিক্য বিশিষ্ট বাকু সোভিয়েত লেনিনের সরকারকে সমর্থন করতে অস্বীকার করল। অক্টোবরে বলশেভিকরা অগ্রণী ছিল, যদিও বাকুর আধিপত্যকামী পার্টি ছিল না, কিন্তু অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন যে, ক্ষমতা দখলের চেষ্টা নাগরিক বা জাতিগত দাঙ্গার দিকে মোড় নেবে।

শহরে সোভিয়েত একচ্ছত্র ক্ষমতাধিকারী ছিল না। শহরের ডুমার বিরোধিতা ছিল তাদের বিরুদ্ধে, এবং নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা সর্বশ্রেণির সহাবস্থানকারী মিলিজুলি সরকারে ফিরতে চাইছিল।

শহরে যেহেতু কোনও একটা মাত্র দল ক্ষমতাধিকারী ছিল না এবং দেশের সরকারেরও টালমাটাল পরিস্থিতি, তাই একটা আতঙ্কাবহ শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। সৈন্যরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়ে ককেশিয়ান ফ্রন্টের দিকে চলে গেছিলেন, যার ফলে অটোমান আক্রমণের পথ খুলে গেছিল।

 

স্তেপান শাহুমিয়ান                     প্রোকোফি ঝাপারিৎঝে                         মেশাদি আজিজবেকভ

সোভিয়েতকে শক্তিশালী করা

১৯১৭-র শেষদিকে জাতীয় নির্বাচনে জাতিকেন্দ্রিক পরিচিতি মূল শক্তিলাভ করছিল। জর্জিয়ান মেনশেভিকরা জর্জিয়া প্রদেশে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হলেন, আর একই সময় বাকুতে অগ্রণী মুসলিম দল মুসাভাত এবং দাশনাকরা বাকুর সংলগ্ন অঞ্চলে সহজেই জয়ী হল। দক্ষিণ ককেশাসের বিপ্লব শ্রেণিসংগ্রাম থেকে জাতি ও ধর্মগত বিরোধে রূপান্তরিত হচ্ছিল।

কোনও রুশ সৈন্যপ্রাচীর তাদের আর অটোমান সৈন্যের মধ্যে নেই দেখে, বাকুর আর্মেনীয়, জর্জিয়ান ও মুসলিম সম্প্রদায় নিজেদের সেনাদল প্রস্তুত করে নিলেন। সোভিয়েত অনেক দেরীতে নিজস্ব বহুজাতিক লালরক্ষী সেনাদল গঠন করেছিল।

মুসলিমরা সেনাবাহিনী থেকে পলাতক সৈনিকদের নিরস্ত্র করতে থাকে, এবং ১৯১৮-র জানুয়ারিতে শামখোরে একটা বিয়োগান্ত সংঘর্ষে হাজার হাজার রুশকে হত্যা করল। এই ঘটনা থেকেই প্রমাণিত হল যে ওই অঞ্চলে মুসলিমরাই সবচেয়ে সুদক্ষ সামরিক দল ছিল, এবং তাদের সম্ভাব্য অটোমান মিত্ররা যুদ্ধপূর্ব সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। শাহুমিয়ানের শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, শীঘ্রই সশস্ত্র মানুষেরাই স্থির করবে, কারা বাকুর শাসক হবে।

শহরের অভ্যন্তরে আর্মেনীয় ফৌজ ও মুসলিম বাহিনীগুলি রেড গার্ডদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল। সোভিয়েত শক্তি দাশনাকদের সঙ্গে কৌশলগত জোট করল মুসলিমদের বিরুদ্ধে, কারণ অনেকেরই মনে হচ্ছিল, এরা এক বড় প্রতিবিপ্লবী শক্তি হয়ে উঠেছিল।

শাহুমিয়ান এবার তিনদিক থেকে সামরিক আক্রমণের সামনে পড়লেনঃ  বাকুতে সোভিয়েত-বিরোধীদের কাছ থেকে; তিফলিসে, যেখানে মেনশেভিকরা বলশেভিক রাশিয়া থেকে দক্ষিণ ককেশিয়াকে স্বাধীন ঘোষণা করে দিয়েছে; এবং প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত শহর এলিজাভেটপোল থেকে,  যেখানের লড়াইয়ের ফলে বাকুতে খাদ্য সরবরাহ আসছিল না

মার্চ মাসের শেষে যখন মুসলিম স্যাভেজ ডিভিশনের সেনাদের নিয়ে একটি জাহাজ এসে পৌঁছাল, তখন ভীষণ যুদ্ধ লাগল। সোভিয়েত ও আর্মেনীয় শক্তি শহরের মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়তে শুরু করল। আর, তারপর রেড গার্ড তাদের কামান তাক করল মুসলিম মহল্লার দিকে। মুসলিম ফৌজ বনাম সোভিয়েতের দ্বন্দ্ব হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা কর্কটরোগের মতো ছড়িয়ে পড়ল সঙ্ঘবদ্ধ মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গাতে।

যুদ্ধের ফলে মুসলিমরা শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করল এবং আর্মেনীয়রা প্রতিবাদ শুরু করল এই অভিযোগে যে, সোভিয়েত মুসলিমদের সঙ্গে বড় মোলায়েম ব্যবহার করেছে। বলশেভিকরা গোটা পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত ছিলেন, কিন্তু নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, শহরের দখল তাদের হাতে। শাহুমিয়ান মস্কোকে জানালেন যে, “আমাদের, অর্থাৎ বলশেভিকদের প্রভাব আগেও ভালই ছিল, কিন্তু এখন আমরা প্রকৃত অর্থেই পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রক।”

যদিও সোভিয়েত শক্তি সশস্ত্র দাশনাকদের ওপরে নির্ভরশীল ছিল কিন্তু বাকুর বলশেভিকরা এক নতুন সরকার গঠন করল নিজস্ব সদস্যবৃন্দ এবং বামপন্থী এসআর-দের নিয়ে, যা থেকে বাদ পড়ল দক্ষিণপন্থী এসআর, মেনশেভিক ও দাশনাকরা। বাকু কমিউন এবার তার নিজস্ব গণ কমিশারবৃন্দ (সভনারকম) এবং বৈদেশিক বিষয়ের কমিসারিয়েট নিয়ে বাকুর জনজীবনের বৈপ্লবিক রূপান্তর করতে প্রস্তুত হল।

 

বাকু কমিউন

এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ১৯১৮-র এপ্রিল থেকে জুলাই মাত্র সাতানব্বই দিন স্থায়ী হল। বলশেভিকরা সোভিয়েত ও তার সভনারকমকে মার্ক্সের ১৮৭১ সালের প্যারী কমিউনের দৃষ্টিভঙ্গির অনুসরণ  করে দেখতে চেয়েছিলেন একাধারে কার্যনির্বাহী ও বিধান পরিষদ হিসেবে।

কমিউন তৈলশিল্পকে জাতীয়করণ করল এবং শিক্ষা ও আইন ব্যবস্থায় সংস্কারের চেষ্টা করল- পেশাদারি শ্রেণির বহু বাধা সত্ত্বেও -- এবং তারা বিশ্বাস করত যে সরকারি সন্ত্রাস ছাড়াই শহর শাসন করা যায়, যদিও তারা বিরোধীদের সংবাদপত্র বন্ধ করে দিল।

জুন মাসে এলিজাভেটপোল থেকে মুসলিমদের আক্রমণ বন্ধ করতে শাহুমিয়ান আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন। শহরের নেতৃবৃন্দ আলোচনায় তিফলিসের দিকে আরও এগোনো নিয়েও আলোচনা করেন, কিন্তু বাকুর ফৌজ কুরা নদীর কাছে পৌছলেই মুসলিম, জর্জিয়ান ও অটোমান যোদ্ধারা তাঁদের ফিরিয়ে দিলেন। শহর তখন প্রাণপণে চাইছিল যাতে অটোমান দখলদারি ঠেকানো যায়। শাহুমিয়ান কসাক ও ব্রিটিশদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন, পোষে এলেন, কিন্তু মস্কো তাঁকে জেনারেল ডানস্টারভিলের বাহিনীকে শহরে ঢুকতে দিতে বাস্রণ করে।

খাদ্যের যোগান বাড়াতে না পেরে এবং বাকুর শ্রমিকদের ও শহরের বাইরের কৃষকদের অপর্যাপ্ত সমর্থনের জন্যে বলশেভিকদের গণভিত্তি সঙ্গকুচিত হতে থাকল।  ২৫শে জুলাই সোভিয়েতে ২৫৯-র মধ্যে ২৩৬ ভোট পড়ল ব্রিটিশ সাহায্য চাওয়ার সমর্থনে।

শাহুমিয়ান ঘোষণা করলেন, “আপনারা এখনও ব্রিটিশ সরকারকে পাননি কিন্তু কেন্দ্রীয় রুশ সরকারকে হারিয়ে ফেলেছেন। আপনারা ব্রিটিশ সরকারকে পাননি, কিন্তু আমাদের হারিয়ে ফেললেন।” তাঁর সরকার পদত্যাগ করল, একটা অ-বলশেভিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হল এবং ব্রিটিশরা পদার্পণ করল।

মধ্য-সেপ্টেম্বরে যখন অটোমানরা প্রায় শহর দখল করেই ফেলেছে, তখন বাকু কমিউনের নেতারা পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু, তাঁদের জাহাজ আস্ত্রাখানের নিরাপদ বন্দর থেকে পথ বদলাল ক্রাস্নোভদস্ক-এ, যেখানে তুর্কমেন  এসআর-রা প্রাক্তন কমিশারদের গ্রেফতার করল।

বাকুর ২৬ জন বিপ্লবী, যাঁদের অধিকাংশই বলশেভিক, তাঁদের মরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হল। ১৯২০ সালে তাঁদের দেহাবশেষ পুনরুদ্ধার করে সোভিয়েত শহীদ হিসেবে পুনঃসমাধি দেওয়া হল বাকুর সেন্ট্রাল স্কোয়ারে। সেই সমাধিতেই তাঁরা পরবর্তী ৭০ বছর সমাহিত ছিলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত সোভিয়েত-পরবর্তী আজেরবাইজানি শাসক সোভিয়েত কমিশারদের স্মৃতিসৌধ ধ্বংস করে দিল।

 

বৈপ্লবিক পরাজয়

বাকুর বিপ্লবের কাহিনী ১৯১৭-র ঘটনাবলী ঘিরে বহু কাল্পনিক বা অতিকথার অবসান ঘটায়।  বাকুর বলশেভিকরা ক্ষমতালোলুপ ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন দীর্ঘদিনের সমাজতন্ত্রী সক্রিয় কর্মী যাঁদের শিকড় ছড়িয়ে ছিল শহরের শ্রমিক আন্দোলনের ভিতরে। তাঁদের আচরণ ছিল গণতান্ত্রিক, তারা ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে, এবং যখন তাঁরা সোভিয়েতের গুরুত্বপূর্ণ ভোটে পরাজিত হলেন, তখন সরকারি সব পদ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে পদত্যাগ করেছিলেন। যদিও তাঁরা শহরে ক্ষমতা হাতে পেয়েছিলেন রক্তাক্ত মার্চের দিনগুলোর জন্যে, কিন্তু বাকু বলশেভিকরা ক্ষমতায় থাকাকালীন শত্রুদের বিরুদ্ধে কোনওরকম সন্ত্রাসের শাসন প্রয়োগ করেননি।

শেষপর্যন্ত তাঁরা শ্রমিকদের জাতিগত ও সামাজিক স্তরভাগগুলিকে জয় করতে পারেন নি, খাদ্যসমস্যার সমাধান করতে পারেননি, এবং শত্রদের বিরুদ্ধে সফল লড়ায়ের মত যথেষ্ট সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

শাহুমিয়ান বাকুকে রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে গোটা ককেশিয়া জুড়ে প্রতিবিপ্লবকে ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি নরমপন্থী সমাজতান্ত্রিক দলগুলিকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকার করেছিলেন যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা মস্কোর সোভিয়েত সরকারকে স্বীকার করে। তাঁর ভিত্তি সত্যিই খুব সংকীর্ণ ছিল, তাই বলশেভিকরা শ্রমিকদের দাবিপূরণে ব্যর্থ হতেই শ্রমিকরা আস্থা হারালেন ও কমিউন ভেঙে পড়ল।

বাকুর ২৬ জন কমিশারের ভাগ্য চরম পরিহাসেরঃ মোলায়েম, গণতান্ত্রিক এবং মোটামুটিভাবে অহিংস। তাই শাহুমিয়ান, ঝাপারিৎঝে এবং অন্যরা গৃহযুদ্ধের সময় প্রচণ্ড নিষ্ঠুর শত্রুপক্ষের শিকার হলেন।

আর, ঠিক এর বিপরীতে, ১৯১৮-র গ্রীষ্মশেষে রুশ বলশেভিকরা ও তাঁদের শ্বেতারক্ষী বিরোধীপক্ষ যুদ্ধের যুক্তি অবলম্বন করেছিল, বলশেভিকরা গণতান্ত্রিক সরকারের মতাদর্শ সরিয়ে রেখে শত্রুদমনে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জারি করেছিলেন। গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতদের জয় হবে -- এই আশার পরিসমাপ্তি ঘটল সেই ভয়ানক হিংস্র সংঘর্ষে

 

প্রাথমিক লড়াইয়ে জয় এসেছে। সংগ্রামীদের অভিনন্দন। সামনে আরো বড় যুদ্ধ। (৩৭৭ ধারা রদ সম্পর্কে র‍্যাডিক্যাল সোশ্যালিস্টের বিবৃতি)

ভারতীয় দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়কে স্বাগত। এই রায় ভারতের এলজিবিটিআইকিউএইচ (LGBTIQH) সমাজের কাছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিজয়। এই বিজয় আদালতের কাছ থেকে পাওয়া কোন উপহার নয়। বরং এটি বহু দশকের লড়াইয়ের ফসল। এই লড়াই রাস্তায় হয়েছে, তৃণমূল স্তরে সংগঠনের মাধ্যমে হয়েছে, এবং অবশ্যই আইন-আদালতে গিয়েও হয়েছে। অধিকার আদায়ের এই মুহূর্তে আমরা অভিনন্দন জানাই সেই সব মানুষকে যাদের নিরন্তর সংগ্রাম এই দিনকে সম্ভব করেছে। লড়াই দৃশ্যমান হয়েছে কয়েক জন এলিট চরিত্রের জন্য নয়। কয়েকজন মূলস্রোতের উদারপন্থীর জন্যও নয়।এবং অবশ্যই বড় রাজনৈতিক দলগুলির জন্য নয়। বহু মানুষ নিজেদের সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে পুলিশী সন্ত্রাসের মোকাবিলা করেছেন বলেই লড়াই গড়ে উঠেছে। তাঁরা পুলিশের টাকা আদায়ের জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। জঙ্গী এলজিবিটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন এবং প্রাইড-ওয়াক সহ বিভিন্ন প্রকাশ্য কর্মসূচীতে ঝুঁকি সত্ত্বেও অংশ নিয়েছেন।

 

সমকামীদের প্রতি ঘৃণা এবং বাধ্যতামূলক বিষমকামিতা আসলে পুরুষ প্রাধান্যবাদ, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানকে মহিমান্বিত করা ও মেয়েদের জন্য লিঙ্গায়িত ভূমিকারই নামান্তর। ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং অন্য ধর্মীয় গোঁড়ামি এগুলিকে মদত দেয়। সর্বোপরি এগুলি সবই পুঁজির শোষণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। এই কারণেই বহু এলজিবিটি কর্মী ৩৭৭ ধারার পতনে উল্লাস প্রকাশ করার সাথে সাথে ইউএপিএ(UAPA) র বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছেন। মানবাধিকার কর্মীদের মুক্তির দাবিও করেছেন।

 

৩৭৭ ধারা রদ করলেই লড়াই শেষ হবে না। ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদে সমতার অধিকারের কথা বলা থাকলেও বাস্তবতা হল সমাজে এখনো দলিতদের কোণঠাসা করে রাখা হয়,মানবেতর সম্প্রদায় হিসাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। তাঁরা যথেচ্ছ হিংসার শিকার হন। চাকরি, শিক্ষা ও বহু পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর রায়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে পারস্পরিক সম্মতি থাকলে প্রাপ্তবয়স্করা ৩৭৭ ধারার আওতায় পড়বেন না। তার অর্থ এই নয় যে এলজিবিটিরা এখনই সামাজিক এবং অন্যান্য আইনি সমতা পেয়ে যাবেন। বিশেষত, বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন, সন্তান দত্তক নেওয়া, উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তিপ্রাপ্ত হওয়া ইত্যাদি।

 

এই লড়াই তখনই প্রশস্ত হবেযখন আরও বেশি সংখ্যায় মানুষ সাহস করে বেরিয়ে এসে নিজেদের পরিচিতি জানাবেন। কিন্তু সমস্যা হল একদিকে অল্পসংখ্যক এলিট এলজিবিটিদের প্রাধান্য দিয়ে লড়াইকে আত্মসাৎ করার চেষ্টা চলছে। আর অন্যদিকে বহুসংখ্যক সাধারণ এলজিবিটিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মকহিংস্র প্রচার করাও হচ্ছে ও তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের সামাজিক বঞ্চনা ও বৈষম্য আজও আছে। শুধুমাত্র আইনি সংস্কার সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা সংখ্যালঘুদের বঞ্চনার সমাধান করতে পারে না। অন্যদিকে আমরা দেখছি য্বে, প্রস্তাবিত ট্রান্সজেন্ডার আইন - The Transgender Persons (Protection of Rights) Bill, 2016 - যথেষ্ট একপেশে। সরকারি চাকরিক্ষেত্রে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণের দাবি এখনও মানা হয় নি।

 

এলজিবিটি হিসাবে স্বীকৃতির জন্য, নিজেদের শর্তে বাঁচার অধিকারের জন্য এবং খাদ্য-বাসস্থান-স্বাস্থ্য-শিক্ষাক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাওয়ার জন্য লড়াই এখনও অনেক বাকি। একই সঙ্গে এই লড়াইগুলিতে আংশিক বিভাজন কাটিয়ে সমস্ত শোষিতের ঐক্য দরকার।

 

এই সার্বিক ঐক্যের আহবানকে যেন গুলিয়ে ফেলা না হয় সেই সব মেকী-শ্রেণীগত যুক্তির সাথে যা অনেকক্ষেত্রেই সংকীর্ণ শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে প্রান্তিক যৌনতার লড়াইকে অবহেলা করে। একে প্রত্যাখ্যান করা হয় পেটি বুর্জোয়া/বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল শৌখীনতা বলে। বাস্তব শ্রেণী ঐক্য তখনই আসতে পারে যখন বিশেষ-ধরণের নিপীড়নকে স্বীকার করা হবে এবং তার প্রসঙ্গগুলিকে সার্বিক শ্রেণী আন্দোলনের মধ্যে যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে। তাই আমাদের একই সঙ্গে দু'ধরণের কাজ করতে হবে। এলজিবিটিআইকিউএইচ সমাজের কাছে এবং শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণী-সংগঠন ও বাম দলগুলির কাছে একথা বার বার নিয়ে যেতে হবে যে এলজিবিটি-দের বড় অংশই শ্রমজীবী মানুষ। অন্যদিকে আমাদের একথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই - যেসব বামপন্থীরা এই লড়াইকে অবজ্ঞা করেছেন বা এই লড়াইকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে দাবি করেছেন -তাঁদের প্রচার নামে বামপন্থী হলেও বাস্তবে শ্রেণী রাজনীতির মোড়কে স্রেফ পেটি বুর্জোয়া নৈতিকতা।

 

র‍্যাডিক্যাল সোশ্যালিস্ট তার সাধ্যমত ক্ষমতা অনুযায়ী ভারতের এলজিবিটিআইকিউএইচ সমাজের লড়াইতে সমর্থনকারী শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই অংশ নিয়েছে। আমরা একথা বলে এসেছি যে সামনে যাওয়ার রাস্তা হল গণ-আন্দোলন এবং সমস্ত শোষিতের ব্যাপকতম ঐক্য যেখানে থাকবে বিশেষ-ধরণের নিপীড়নের স্বীকৃতি ও তার জন্য সংগ্রাম। র‍্যাডিক্যাল সোশ্যালিস্ট এই আন্দোলনের সহযোদ্ধা থাকবে যেখানে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের দাবিগুলি নিয়ে লড়াই করব।