Updates

Articles

Articles posted by Radical Socialist on various issues.

দুনিয়া কাঁপানো সেই দিন

দুনিয়া কাঁপানো সেই দিন

৭ই নভেম্বর ১৯১৭-র কাহিনী --যেদিন বলশেভিকরা এই পৃথিবীর ইতিহাস পরিবর্তন করেছিল

মূলরচনাঃ চায়না মিয়েভিল

ভাষান্তরঃ কৌশিক চট্টোপাধ্যায়

সম্পাদনাঃ কুণাল চট্টোপাধ্যায়

 

               

 

হ্যাঁ, সেই দিন।– ১৯১৭র ৭ নভেম্বর।

২৫-এর ভোর হল। মরিয়া কেরেনস্কি কসাকদের উদ্দেশ্যে আবেদন করেন, “স্বাধীনতার নামে, আমাদের দেশের মাটির সম্মান ও মর্যাদার স্বার্থে, সোভিয়েত কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহক কমিটি, বিপ্লবী গণতন্ত্র এবং অস্থায়ী সরকারকে সাহায্য করতে, যাতে রাশিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থা ধংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।”

কিন্তু কসাকরা জানতে চায়, পদাতিক বাহিনী বেরিয়ে আসবে কি না। সরকারের জবাবে ইতস্তত ভাব দেখে একটি ছোটো অতি-অনুগত দল ছাড়া বাকিরা উত্তর দেয়, তারা একা  কাজ করতে এবং “জীবন্ত লক্ষ্য হতে চায় না”।    

বারে বারের, সহজেই, শহরের বিভিন্ন এলাকাতে, সামরিক বিপ্লবী কমিটি অনুগত রক্ষীদের নিরস্ত্র করে তাদের বাড়ি চলে যেতে বলে। অধিকাংশ সময়ে, তাঁরা সেই কাজই করে। বিদ্রোহীরা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাসাদ দখল করেন নিছক হেঁটে সেখানে ঢুকে পড়ে। একটি স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, “ওরা ঢুকে নিজেদের আসন নিল, আর যারা বসেছিল তারা উঠে চলে গেল”।  সকাল ছটায় চল্লিশজন বিপ্লবী নাবিক পেত্রোগ্রাদ স্টেট ব্যাঙ্কের কাছে উপস্থিত হন। এর রক্ষীরা ছিল সেমেনভস্কি রেজিমেন্টের, এবং তাঁরা অগ্রিম নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাঁরা লুটেরা ও অপরাধীদের হাত থেকে ব্যাঙ্ককে রক্ষা করবেন, কিন্তু বিপ্লব আর প্রতিবিপ্লবের মধ্যে পক্ষ নেবেন না। তাঁরা হস্তক্ষেপও করবেন না। অতএব তাঁরা সরে দাড়ালেন এবং সামরিক বিপ্লবী কমিটিকে দখল নিতে দিলেন।   

ঘন্টাখানেকের মধ্যে, যখন এক জোলো শীতের আলো শহরকে ধুয়ে দিচ্ছিল, তখন ঝাখারভ নামে এক অনন্যসাধারণ সামরিক স্কুলের ছাত্র, যিনি বিপ্লবের পক্ষে চলে এসেছিলেন, কেক্সগোলমস্কি রেজিমেন্টের একটি অংশকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে গেলেন প্রধান টেলিফোন  এক্সচেঞ্জের দখল নিতেএই টেলিফোন এক্সচেঞ্জে কাজ করার দরুণ জাকারভ নিরাপত্তার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানতেন।তার নেতৃত্বে সেনাদল যখন বিপ্লবীদের পক্ষ নিয়ে এক্সচেঞ্জটিতে প্রবেশ করে, তখন তিনি খুব সহজেই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ক্ষুব্ধ, কিন্তু ক্ষমতাহীন শিক্ষানবিশদের নিরস্ত্র ও বিচ্ছিন্ন করেন। বিনারক্তপাতে বিপ্লবীরা সরকারী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সমর্থ ও সফল হন।

তাঁরা কিন্তু দুটি লাইন খুঁজে পেলেন না। এই দুটির সাহায্যে, উইনটার প্যালেসের ম্যালাকাইট রুম বলে পরিচিত সাদার ওপর সোনালী বর্ডার দেওয়া মখমলের পর্দায় কারুকার্য শোভিত ঘরটিতে বসা মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা তাঁদের যৎসামান্য ফৌজী শক্তিদের সাথে সংযোগ রক্ষা করেন। বিচলিত চাপা স্বরে ফোনে তারা তাদের অবশিষ্ট সামরিক শক্তিকে উদ্ভ্রান্তের মতো নির্দেশ দিয়ে চলছিলেন। এই গোলমালের মধ্যে চুপচাপ, উদাসীন ভঙ্গিতে বসেছিলেন কেরেনস্কি।

 

তখন মাঝ-সকাল। ক্রোনস্টাডের নাবিকরা আগের মতই অস্ত্র হাতে যে যেমন পারেন সমুদ্রযাত্রা করা যায় এমন যানে চেপে বসেন। হেলসিংফোর্স থেকে তাঁরা রওনা হলেন পাচটা ডেস্ট্রয়ার আর একটা পেট্রল বোটে চেপে, সবকটাতেই বিপ্লবের লাল নিশান উড়িয়ে। গোটা পেত্রোগ্রাদ জুড়ে বিপ্লবীরা তখন আরো একবার জেলখানাগুলো খালি করে দিচ্ছিলেন।

স্মোলনিতে বলশেভিক কর্মকাণ্ড-পরিচালন কক্ষে একটা উসকোখুসকো চেহারার লোক ঢুকে পড়েছিল। উপস্থিত কর্মীরা নবাগতের দিকে বিস্মিত ও বিব্রতভাবে তাকান। শেষ পর্যন্ত ভ্লাদিমির বঞ্চ-ব্রুয়েভিচ্ চীৎকার করে হাত বাড়িয়ে দৌড়ে যানঃ “ ভ্লাদিমির ইলিচ , আমাদের প্রিয় নেতা! আমি আপনাকে চিনতেই পারিনি!

লেনিন একটা ঘোষণাপত্রেরর খসড়া লিখতে বসলেন।  তিনি সময়ের ব্যাপারে উদ্বেগে কাপছিলেন, কারণ তিনি ব্যাকুলভাবে চাইছিলেন যে দ্বিতীয় সোভিয়েত কংগ্রেস যখন শুরু হবে, তাঁর আগেই যেন সরকারের উচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়ে যায়। তিনি ভালই জানতেন ঘটে যাওয়া ঘটনার একটা ক্ষমতা আছে।

রাশিয়ার সব নাগরিকদের প্রতিঃ

অস্থায়ী সরকারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গেছে পেত্রোগ্রাদ শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতিনিধিদের সংস্থা সামরিক বিপ্লবী কমিটির হাতে। এই কমিটি দাঁড়িয়ে আছে পেত্রোগ্রাদের ছাউনী এবং প্রলেতারিয়েতের শীর্ষে। 

যে দাবীগুলির জন্য জনগণ লড়াই করেছেন, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক শান্তির আশু প্রস্তাব, জমিদারদের জমি দখল, উৎপাদনের উপর শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ, একটি সোভিয়েত সরকার – সেই দাবীগুলির বিজয় আজ নিশ্চিত হয়েছে।

শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষকদের বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক!

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সামরিক বিপ্লবী কমিটির উপযোগিতা সম্বন্ধে ইতিমধ্যে লেনিন নিঃসন্দেহ, তাই তিনি ঘোষণাপত্রটি বলশেভিকদের নামে স্বাক্ষর করেন নি, বরং করেছিলেন ঐ অ-পার্টি সংস্থার নামে। ঘোষণাপত্রটি দ্রুত মুদ্রিত হল  সিরিলিক হরফের বড়, বলিষ্ঠ ব্লকে। মুদ্রিত বিজ্ঞপ্তি দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার হিসেবে লটকে দেওয়া হয়।

তার-যন্ত্রের সাহায্যে বিজ্ঞপ্তির মূল বার্তা সঞ্চালকগণ রাশিয়ার নানা প্রান্তরে ছড়িয়ে দেন।

বাস্তবটা তত সহজ ছিল না, কিন্তু সেটা ছিল একটা ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।

 

 

 

উইন্টার প্যালেসে ঘেরাও হয়ে থাকলেও তার-যোগে কেরেনস্কি রাজধানীর জন্য সেনা পাঠানোর বার্তা দিতে তখনও সক্ষম ছিলেন। কিন্তু সেই সেনাদের বাস্তবে কেরেনস্কীর কাছে পৌঁছানো সহজ ছিল নাতিনি পালাতে পারলেও, সামরিক বিপ্লবী কমিটি রেল স্টেশনগুলি নিয়ন্ত্রণ করছিল।  

কেরেনস্কির সাহায্যের দরকার ছিলসেনাপ্রধানদের দপ্তর দীর্ঘ এবং ক্রমেই উন্মত্ত অন্বেষণে অবশেষে একটা নির্ভরযোগ্য মোটর গাড়ি পাঅনুরোধ করে তারা আমেরিকার দূতাবাস থেকে আরো একটি গাড়ি যোগাকরে,যেটার সামনে কূটনৈতিক পরিচয়বাহী প্লেট থাকায় তা কেরেনস্কির জন্য সুবিধাজনক ছিল

২৫ তারিখ। বেলা ১১টার কাছাকাছি হবেলেনিনের ঘোষণাপত্র, যেটা আগাম ইচ্ছাকে বাস্তব বলে জানাচ্ছিল, চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছেএই রকম সময়ে গাড়িদুটো সামরিক বিপ্লবী কমিটি -যত না সক্ষম তার চেয়ে বেশী উৎসাহী রাস্তা-রোখো পেরিয়ে চলে গেল।

ভগ্ন-বিধ্বস্ত কেরেনস্কি গুটিকয় সাঙ্গোপাঙ্গকে সঙ্গে নিয়ে অনুগত সৈন্যদের খোঁজে শহর ছেড়েছেন

অনেক নাগরিকেরই মনে হচ্ছিল যে এই আলোড়ন সত্ত্বেও পেত্রগ্রাদে দিনটা যেন আর একটা স্বাভাবিক দিনেরই মতো। অবশ্যই, কিছুটা ছোটখাটো সংঘর্ষ, হৈ চৈ ও গন্ডগোলকে অস্বীকার করা অসম্ভব হয়ে উঠছিল, কিন্তু অপেক্ষাকৃত অল্পসংখ্যাক মানুষ বাস্তবে লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আর সেও আবার বাছাই করা কেন্দ্রগুলিতে। এই অল্প সঙ্গখ্যক মানুষ যখন তাঁদের বিপ্লবী বা প্রতিবিপ্লবী কাজ করে চলেছিলেন, পৃথিবী  পুনর্বিন্যাস করতে চেয়ে, তখন রোজকার মতো ট্রাম রাস্তায় সচল ছিল, আর অধিকাংশ দোকান-পাট ছিল খোলা।

দুপুর নাগাদ সশস্ত্র বিপ্লবী সৈনিক ও নাবিকরা মারিনস্কি প্রাসাদে পৌঁছায়। প্রাক্-পার্লামেন্টের সদস্যরা যারা সেখানে অধীর আগ্রহে নিজেদের মধ্যে এই নাটকীয় মুহূর্ত সম্পর্কে আলোচনা করছিল, তারা অচিরে এইঘটনাবলীর সক্রিয় কুশীলবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চলেছিল

এম আর সি-র একজন কমিশার ঝড়ের গতিতে থিয়েটার হলটায় ঢুকলেন। তিনি প্রাক্-পার্লামেন্টের সভাপতির আসনে বসা আভক্সেনতিয়েভের উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিলেন প্রাসাদ ত্যাগ করতে। সশস্ত্র সেনা এবং নাবিকরা তাদের অস্ত্রের ঝঙ্কার তুললোতুমুল হৈ-হট্টগোলের পরিস্থিতি সৃষ্টি হল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আভক্সেনতিয়েভ দ্রুত স্ট্যারিং কমিটির যতজন সম্ভব সদস্যকে একত্রিত করলেন তারা জানেন প্রতিরোধ মূল্যহীন,কিন্তু তারা চলে যাওয়ার আগে যতটা সম্ভব আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করে গেলেন, এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন যে  যথাশীঘ্র সম্ভব তাঁরা আবার জমায়েত হবেন।

 

হুল ফোটানো কনকনে শীতের মধ্যেই তারা বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেননতুন দ্বাররক্ষীরা তাদের কাগজ পত্র পরীক্ষা করলেও, বেশীক্ষণ আটকালো না। করুণ এই প্রাক্-পার্লামেন্ট নয়, আসল যে লক্ষ্য হাতে না পাওয়াতে লেনিন ক্ষেপে যাচ্ছিলেন, সেটা তখনও বিপ্লবীদের এড়িয়ে গিয়েছিল।

সেই অভিষ্ট লক্ষ্য বা পুরষ্কার তখন উইন্টার প্যালেসে, কেরেনস্কিহীন অবস্থাসেইখানে, তাঁদের জগত যখন ভেঙ্গে পড়ছে, তখনও অন্তর্বর্তী সরকারের আগুনের শেষ আভাটুকু জ্বলছে

দুপুরে ম্যালাকাইট রুম নামে পরিচিত মস্ত ঘরটায় টেক্সটাইল মিল মালিক ও কাডেট নেতা কোনোভালভ ক্যাবিনেটের সভা বসালেন।

নৌবাহিনীর মন্ত্রী, অ্যাডমিরাল ভেরদেরেভস্কি চাপা স্বরে বললেন, “এই অধিবেশন যে কেন ডাকা হল তার কারণটাই আমি বুঝে উঠতে পারছি না।” আক্ষেপের সুরে তিনি বলে চলেন, “আমাদের কাছে সেই সামরিক শক্তি নেই যার সাহায্যে আমরা যথাযত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি।” তিনি প্রস্তাব করলেন, হয়তো প্রাক-পার্লামেন্টের সঙ্গে একত্রে বসা উচিত ছিল – এমন সমেয়ে খবর এল, প্রাক পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে।

তখনও মন্ত্রীরা নানা প্রতিবেদন গ্রহণ করে চলেছেন এবং সেখানে হাজির ক্ষমতাহীন শলাপরামর্শকারীদের উদ্দেশ্যে নানা কাতর আহ্বান জানাচ্ছেন। যারা ভেদেরেভস্কির শোকার্ত বাস্তবতায়কান দিতে চাইছেন না, তাঁরা কল্পনাবিলাসে লিপ্ত হলেনক্ষমতার শেষ সুতোটুকুও যখন উবে যাচ্ছে, তাঁরা তখন নতুন কর্তৃত্বের স্বপ্ন দেখছিলেন।

এই পৃথিবীর সকল ঐকান্তিকতাকে সঙ্গে নিয়ে, রাশিয়ার অস্থায়ী সরকারের ভষ্মতর্ক করতে থাকে, আগামী একনায়ক কাকে করা হবে, যেন নিভন্ত দেশলাইকাঠিরা গল্প শোনাচ্ছে, তারা অচিরে যে বিধ্বংসী অগ্নিকান্ডের শুরু করবে সেটার।

এই সময় ক্রোনস্টাডের বাহিনী জলপথে পেত্রোগ্রাদ  পৌঁছালো। তাদের কাছে একটা সাবেকী প্রমোদ তরী – ইয়ট্, দুটো মাইনলেয়ার, প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত একটা জাহাজ, একটা পুরনো যুদ্ধ-জাহাজ, এবং একগুচ্ছ ছোটো ছোটো বার্জ। এ আর এক উন্মত্ত নৈবহর।

 

মন্ত্রীসভা যেখানে বসে স্বৈরতন্ত্রের কল্পনায় বুঁদ হয়েছিল, তার খুব কাছেই বিপ্লবী নাবিকরা অ্যাডমিরাল্টি দখল করে নৌবাহিনীর উপরমহলকে গ্রেপ্তার করছিল। পাভলভস্কি রেজিমেন্টসেতুগুলোর ওপর পিকেট বসাচ্ছিল। মইকা নদীর উত্তরের অংশ নিয়ন্ত্রণ করছিল কেক্সগোল্মস্কি রেজিমেন্ট।      

উইন্টার প্যালেস দখল করার সময় যা নির্ধারিত হয়েছিল সেই দুপুর বারোটা এসে চলে গেছে। সময়কাল তিন ঘন্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়, অর্থাৎ সরকারকে গ্রেপ্তার করার সময় ঠিক হল দুপুর দুটোয় সোভিয়েত কংগ্রেস সূচনা হওয়ার পরে। লেনিন এইটাই এড়াতে চেয়েছিলেন। সুতরাং কংগ্রেস সূচনাটা পিছিয়ে দেওয়া হল।

কিন্তু স্মোলনির হল তখন পেত্রোগ্রাদ আর প্রাদেশিক সোভিয়েতগুলি থেকে আসা প্রতিনিধি ঠাসা। তাঁরা খবর চাইছিলেন। তাঁদের অনন্তকাল ঠেকিয়ে রাখা যায় না।

সুতরাং দুপুর দুটো পঁয়ত্রিশে ট্রটস্কী পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের এক জরুরী অধিবেশন শুরু করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, “সামরিক বিপ্লবী কমিটির পক্ষে আমি ঘোষণা করছি, যে অস্থায়ী সরকারের আর কোনো অস্তিত্ব নেই”।

তাঁর কথা ঝোড়ো উল্লাসের জন্ম দিল। উত্তেজনার উপরে গলা তুলে ট্রটস্কী বলে চললেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানরা সামরিক বিপ্লবী কমিটির হাতে। উইন্টার প্যালেস ক্ষণিকের মধ্যে পড়ে যাবে। আরেকটা বিরাট জয়ধ্বনি শোনা গেল। লেনিন সভাকক্ষে প্রবেশ করছেন।

 ট্রটস্কী বলে উঠলেন, “কমরেড লেনিন আমাদের মধ্যে ফিরে এসেছেন। কমরেড লেনিন দীর্ঘজীবি হোন!”

জুলাইয়ের পর এই প্রথম লেনিন প্রকাশ্যে বেরিয়েছেন। তাঁর আগমন ছিল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু উল্লাসপূর্ণ। তিনি বিশদে কিছু বললেন না, কিন্তু ঘোষণা করলেন, “নতুন পর্ব শুরু হয়েছে”, এবং উদ্বুদ্ধ করলেনঃ “দুনিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।”

যারা উপস্থিত তাঁদের অধিকাংশ হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হলেন। কিন্তু বিরোধী মত ছিল। কেউ একজন চীৎকার করে বলে, “তোমরা সোভিয়েত কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত আগাম স্থির করছ”।

ট্রটস্কী পাল্টা ডেকে বললেনঃ  “সোভিয়েদের দ্বিতীয় কংগ্রেসের ইচ্ছা নির্ধারিত হয়েছে শ্রমিক ও সৈনিকদের অভ্যুত্থানের বাস্তবতা দিয়ে। এখন আমাদের বাকি শুধু এই বিজয়কে বিকশিত করা”।

 কিন্তু ভোলোদারস্কি, জিনোভিয়েভ এবং লুনাচারস্কির ঘোষণাদের মাঝে, ছোট একদল নরমপন্থী, অধিকাংশ মেনশেভিক, সোভিয়েতের কার্যনির্বাহী প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে সরে গেলেন। তাঁরা সতর্ক করলেন, এই চক্রান্তের ফল হবে ভয়াবহ।

প্রায় আট ঘণ্টা দেরী করার পর সোভিয়েত প্রতিনিধিদের আর ঠেকানো যাচ্ছিল না। ঐ প্রথম কামান দাগার ঘন্টাখানেক পর স্মোলনির সুবিশাল এসেম্বলি হল ঘরে সোভিয়েত দ্বিতীয় কংগ্রেস আরম্ভ হয়। 

 

সিগারেটের ঝাপসা নীল ধোঁয়ায় ঘরটার মধ্যে বারবার শোনা যাচ্ছে যে ধূমপান নিষিদ্ধ, যদিও ধূমপায়ীরাও সহর্ষে ধূমপায়ীরা সেই নিষেধজ্ঞার পুনরুচ্চারণ করছিলেন। সুখানভ শিহরণের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করে গেছেন যে প্রতিনিধিদের অধিকাংশের ছিল “বলশেভিক প্রদেশগুলির ধূসরতা”। তাঁর সূক্ষ্ম এবং বৌদ্ধিক চোখে তাঁদের লাগছিল “গোমড়া’,  এবং “আদিম” এবং “ঘোর কালো” “অভদ্র এবং অজ্ঞ” ।  

 

৬৭০ প্রতিনিধির মধ্যে ৩০০ জন ছিলেন বলশেভিক। ১৯৩ জন সোশ্যালিস্ট-রেভল্যুশনারি, যাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশী তখন পার্টির বামপন্থী অংশে; ৬৮ জন মেনশেভিক এবং ১৪ জন মেনশেভিক-আন্তর্জাতিকতাবাদী। বাকীরা কোনো দলের অনুমোদিত নন, অথবা ক্ষুদ্র কোনো গোষ্ঠীর সদস্যবলশেভিকদের উপস্থিতির আয়তন দেখিয়ে দেয়, যারা ভোট দিয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বলশেভিকদের প্রতি সমর্থন বাড়ছিল, এবং ঢিলেঢালা নির্বাচন পদ্ধতির ফলে তাঁরা আনুপাতিক হারের চেয়ে বেশীই প্রতিনিধি পেয়েছেন।  তা হলেও, বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের সমর্থন ছাড়া সংখ্যাধিক্যের কোনো সম্ভাবনা ছিল না

 

তবেসভা সূচনারঘণ্টা যিনি বাজালেন, তিনি কিন্তু বলশেভিক নন, একজন মেনশেভিকবলশেভিকরা দানের আত্মম্ভরিতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে এই ভূমিকা পালনের প্রাস্তাব দিলেনকিন্তু তিনি ততক্ষণাৎ আন্তঃপার্টি সহযোগিতার আশায় ঠান্ডা জল ঢেলে দিলেন।  

দান ঘোষণা করলেন, “কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি আমাদের প্রথাসিদ্ধ প্রারম্ভিক রাজনৈতিক সম্ভাষণকে অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা করেএমনকি এখনও, আমাদের যে সব কমরেডদের আমরা দায়িত্ব দিয়েছিলাম, তাঁরা নিঃস্বার্থভাবে তা পালন করতে উইন্টার প্যালেসে গোলাগুলির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন”।

দান এবং অন্যান্য নরমপন্থীরা, যারা মার্চ মাস থেকে সোভিয়েত পরিচালনা করছিলে, তারা আসন ছেড়ে দিলেন এক নতুন, আনুপাতিক হারে নির্বাচিত সভাপতি মন্ডলীকে। তুমুল সমর্থনের মধ্যে নির্বাচিত হলেন চোদ্দজন বলশেভিক, যাদের মধ্যে ছিলেন কোলোন্তাই, লুনাচারস্কি, ট্রটস্কি এবং জিনোভিয়েভ, ও সাতজন বামপন্থী এস আর, যাদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত মারিয়া স্পিরিদোনোভা। মেনশেভিকরা প্রবল অসন্তোষে তাদের তিনটে আসন পরিত্যাগ করলেনমেনশেভিক-আন্তর্জাতিকতাবাদীদের জন্য একটা আসন বরাদ্দ ছিলঃ একই সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ এবং করুণ পদক্ষেপে মার্তভেরগোষ্ঠী আসন তখন নিল না, কিন্তু পরে নেওয়ার অধিকার জানিয়ে রাখল।

নতুন বিপ্লবী নেতৃত্ব যখন তাদের পরবর্তী কর্মসূচী নির্ধারণের কাজে বসেছেন, ঠিক তখনই কামানের একটা গোলা বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনিতে গোটা ঘরটা কেঁপে উঠলো

সকলে যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

এবারের কামান গর্জন এসেছিল পিটার ও পল দূর্গ থেকে। অরোরা যুদ্ধজাহাজ যেখানে ফাঁকা আওয়াজ করছিল, এক্ষেত্রে কিন্তু তা নয়।

 

বোমা বিস্ফোরণের তৈলাক্ত চমক নেভা নদীর উপর দেখা দিল। গোলা বাঁকা পথে উপরে উঠছিল, আর রাতের আঁধারে সশব্দে নামছিল তাদের লক্ষ্যর দিকে।  অনেকগুলো, হয় দয়াবশত, অথবা অযোগ্যতার দরুণ,  দৃশ্যমানভাবে ফাটলো আকাশে,ফাঁকা আওয়াজ করলোঅন্য অনেকগুলি আবার গভীর জলে পড়ল, চারিদিকে জল ছিটিয়ে দিল।

লালরক্ষী বাহিনীও তাদের অবস্থান জানান দিয়ে গুলি-গোলা ছুঁড়ছিলতাদের বুলেটগুলি উইন্টার প্যালেসের দেওয়ালে দাগ ফেলছিল।সরকারের অবশেষটুকু তখন ভয়ে গুটিসুটি মেরে টেবিলের তলায়, তাঁদের চারদিকে কাচের টুকরো বর্ষিত হচ্ছিল।

স্মোলনিতে সেই গোলাবর্ষণেরর করাল ধ্বনির মধ্যে মার্তভ তাঁর কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠেবলতে উঠলেনতিনি একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজছিলেনভাঙ্গা গলায়তিনি যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানানতিনি একটা সমাজতান্ত্রিক জোট সরকার চাইছিলেন যেটা রাজনৈতিক দলগুলির সমবেত বোঝাপড়ায় গঠিত হবে

সহস্র শ্রোতার মিলিত কলরোলে বক্তাদের আহ্বান মাঝে মাঝেই থেমে যাচ্ছিলসভাপতিমণ্ডলীর থেকেইবাম এসআর নেতা মস্তিস্লাভস্কি মার্তভকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। চীৎকার উঠলোঃ খুব হয়েছে! থামুন! মুর্দাবাদ। একেবারে নীচের স্তরের বলশেভিক সদস্যরা এটা করছিল।

পার্টির নেতৃত্বের পক্ষে লুনাচারস্কি বলতে উঠলেন। ব্যাপক উত্তেজনায় তিনি ঘোষণা করলেন, “আমরা বলশেভিকরা মার্তভ উত্থাপিত এই প্রস্তাবের ওপর ভোটে যাবো না।”

উপস্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যে মার্তভ-এর প্রস্তাবের ওপর ভোট শুরু হয়। সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব পাস হয়।

সান ফ্রান্সিস্কো বুলেটিন পত্রিকার সাংবাদিক বেসি বেট্টি ঘরটায় ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে তিনি যা দেখছেন তার ঝুঁকি কোথায়। তিনি লিখছেন, “রাশিয়ান বিপ্লবের ইতিহাসে এটা ছিল একটা জটিল মুহূর্ত।” দেখে মনে হল যেন একটা গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক জোটের জন্ম হতে চলেছে।

        কিন্তু সময় যত বয়ে চললো, নেভার উপরে তোপের ধ্বনি বাড়তে লাগলো। আর তার প্রতিধ্বনি ঘরটাকে কাঁপিয়ে তুলছিল – এবং পার্টিদের মধ্যে ফাটলটা ক্রমে  আবার স্পষ্ট হতে লাগলো।

এক মেনশেভিক সামরিক অফিসার, খারাশ ঘোষণা করলেন, “সারা রুশ কংগ্রেসের নেপথ্যে একটা অপরাধমূলক রাজনৈতিক অভিসন্দি কাজ করছে।” আরও স্পষ্ট করে তিনি বললেন, “মেনশেভিক এবং এসআররা তার সর্বশক্তি দিয়ে এখানে যা চলছে তা প্রত্যাখান করছে এবং অঙ্গীকার করছে যে তারা সরকারকে ক্ষমতাহীন করার সকল প্রচেষ্টাকে দৃঢ় ভাবে রুখে দেওয়ার চেষ্টা করবে।”

এক ক্রুদ্ধ সৈনিক চীৎকার করে বলেঃ “ও দ্বাদশ আর্মির প্রতিনিধিত্ব করছে না! সেনাবাহিনী দাবী করছে সোভিয়েতদের হাতে সব ক্ষমতা!  

এক গুচ্ছ আক্রমণাত্মক মন্তব্য। দক্ষিণপন্থী মেনশেভিক এবং এস আররা, পালা করে বলশেভিকদের প্রতি নিন্দাসূচক মন্তব্য চীৎকার করে বলতে থাকেন। তাঁরা সাবধান করে দেন, তাঁরা কার্যপ্রণালী থেকে সরে যাবেন। বামপন্থীরা চীৎকার করে তাঁদের থামিয়ে দেন।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে লাগলো। মস্কো সোভিয়েতের খিঞ্চুক বলতে ওঠেন। তিনি বলেনঃ“বর্তমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের একমাত্র পথ হল অস্থায়ী সরকারের সঙ্গে আপোস আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।”

 

হট্টমেলা। খিঞ্চুক-এর হস্তক্ষেপ ছিল হয় কেরেনস্কীর প্রতি মানুষের ঘৃণা যে কতখানি তা সর্বতোভাবে বুঝতে না পারা, অথবা এক সচেতন উস্কানীএতে সাড়া দিয়ে তীব্রভাবে আক্রোশ প্রকাশ করলেন এক বিশাল স্তরের মানুষ, শুধু বলশেভিকরা না। অবশেষে, এই তুমুল শব্দের মধ্যে খিঞ্চুক চীৎকার করে জানালেন, “আমরা বর্তমান কংগ্রেস ত্যাগ করছি।”

সভাকক্ষে এমন ছিছিক্কার, অবজ্ঞাসূচক ধ্বনি, শিষ দেওয়ার আওয়াজ প্যাঁক, টিটকিরি সত্ত্বেও মেনশেভিক এবং এসআররা ইতস্তত করছিলেন। তারা জানতেন যে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি হল শেষ তুরুপের তাস  

পেত্রগ্রাদের অন্য প্রান্তে, দুমা আলোচনা করছিল ম্যাসলভের মৃত্যু-বার্তা-বাহক টেলিফোন কলটিএসআর দলের নাউম বাখভস্কি বলেনি-- “আমাদের কমরেডদের জানিয়ে দেওয়া হোক যে আমরা তাদের ত্যাগ করিনি, তাদের জানতে হবে যে আমরা তাদের সঙ্গেই মরবো।”  নরমপন্থী এবং রক্ষণশীলরা উঠে দাঁড়িয়ে ভট দিলেন, তাঁরা উইন্টার প্যালেসে যারা বাঙ্কারে আটক, তাঁদের সঙ্গে যোগ দেবেন। বর্তমান সরকারের জন্য প্রাণ দিতে তারা প্রস্তুত। ক্যাডেট দলের কাউন্টেসসোফিয়া পানিনা ঘোষণা করেন, তিনিকামানের সামনে বুক পেতে দাঁড়াবেন।”  

বলশেভিক প্রতিনিধিরা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিলেন। তারা জানালেন যে তারাও যাএন – কিন্তু উইন্টার প্যালেসে না, সোভিয়েতের দিকে।

নাম ডাকার কাজ শেষ হল। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শোভাযাত্রা হাঁটা দিল অন্ধকারের মধ্যে।

স্মোলনিতে ইহুদী সোশ্যাল-ডেমোক্রাটদের সংস্থা বুন্দের পক্ষে এরলিশসভার কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়ে নগর দুমা প্রতিনিধিদের শোভাযাত্রার খবর দিলেন। তিনি বললেন,  “যারা চান না যে রক্তস্নান ঘটুক” তারা যেন মন্ত্রীসভার প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করে প্রাসাদের দিকে শোভাযাত্রায় যোগ দেনআবারও বামপন্থীদের নিন্দাসূচক ধ্বনির মধ্যে মেনশেভিকরা, বুন্দ সদস্যরা, এস আর রা, এবং অল্প সংখ্যক অন্যরা উঠে, অবশেষে বেরিয়ে গেলেন। থেকে গেলেন পড়ে রইলো বলশেভিকরা, বাম এসআর-রা এবং উত্তেজিত মেনশেভিক-আন্তর্জাতিকতাবাদীরা।

ধীর পদক্ষেপে বৃষ্টিস্নাত শীতের রাতে হেঁটে স্মোলনি থেকে  স্বেচ্ছা-নির্বাসিত  নরমপন্থীরা পৌঁছলেন নেভস্কি প্রসপেক্টে এবং দুমাতে । সেখানে তারা যোগ দিলেন দুমা ডেপুটিদের সঙ্গে, কৃষক সোভিয়েতের কার্যনির্বাহী কমিটির মেনশেভিকবং এসআর সদস্যদের সঙ্গে, এবং ঐক্যবদ্ধভাব তাঁরা সকলে রওনা দিলেন  মন্ত্রীসভার সঙ্গে সংহতি জানাতেচারজন করে এক সঙ্গে হাঁটতে থাকলেন যোগান মন্ত্রী সেরগেই প্রকোপোভিচ্ এবং মেয়র শ্রাইদারের পিছনে।তিনশ জনের এই দলটি অস্থায়ী সরকারের জন্য প্রাণ দিতে বেরিয়ে পড়ল, হাতে তাদের মন্ত্রীদের উদরপূর্তির জন্য রুটি আর সসেজ, গলায় কাঁপা কাঁপা স্বরে [ফরাসী বিপ্লবের গান] লা মার্সেয়াস।

 

তারা এক ব্লকের বেশী যেতে ব্যর্থ হয়েছিল। ক্যানেলের কোনার দিকটায় তাদের যাওয়ার পথেই বরং বিপ্লবীরা তাঁদের পথ আটকে দেয়

“আমাদের পথ ছেড়ে দেওয়ার দাবি করছি!” – শ্রাদার এবং প্রোকোপোভিচ্ চীৎকার করে বলে। “আমরা উইন্টার প্যালেসে যেতে চাই।”

একজন নাবিক হতবুদ্ধি হয়ে গেল। যদিও সে তাদের যেতে দিতে অস্বীকার করলো।

মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা বলল, “তুমি চাইলে আমাদের গুলি করে মারতে পারো!আমরা মরতে রাজী, যদি তুমি রাশিয়ানদের এবং কমরেডদের মারতে চাও...আমরা তোমার বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিচ্ছি।”

সেই অদ্ভুত পরিস্থিতি চলতেই থাকলো। বামপন্থীরা গুলি চালাতে অস্বীকার করে, আর দক্ষিণপন্থীরা দাবী করে হয় তাঁদের যেতে দিতে হবে না হলে গুলি করতে হবে।

“তুমি কি করতে চাও?” চীকার করে প্রশ্ন করা হল সেই নাবিকটির প্রতি, যে তাঁদের হত্যা করতে অরাজী ছিল।  

এরপর কি ঘটলো তা জন রীডের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণে বিখ্যাত হয়ে আছে

অন্য একজন নাবিক একমুখ বিরক্তি নিয়ে দ্রুত এগিয়ে এলো। “আমরা তোমায় একটা থাবড়া মারবো!” সে সর্বশক্তি দিয়ে চীৎকার করে উত্তর দিল। “এবং যদি প্রয়োজন পড়ে আমরা তোমায় গুলি করেও মারতে পারি। বাড়ি যাও, আমাদের শান্তিতে থাকতে দাও।’’

 

তন্ত্রেরযোদ্ধাদের জন্য এটা কেমন বেমানান ভবিতব্য ঠেকছিল। একটা বাক্সের ওপর দাঁড়িয়ে প্রোকোপোভিচ্ তাঁর ছাতাটা নেড়ে অনুগামীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেন যে তাঁরা এই নাবিকদের তাঁদের নিজেদের হাত থেকে বাচাবেনঃ “এই অজ্ঞ লোকগুলির হাতে আমাদের নির্দোষ রক্ত থাকবে, এ আমরা হতে দিতে পারি না...। এখানে রেলের কর্মচারীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মরা [এবং অবশ্যই থাপ্পড় খাওয়া] আমাদের মর্যাদার নীচে পড়ে।  বরং দুমায় ফিরে গিয়ে দেশ ও বিপ্লব বাঁচাবার সর্বোত্তম উপায় নিয়ে আলোচনা করা ভালো।”

অতঃপর নীরব মর্যাদায় উদারনৈতিক গণতন্ত্রের স্ব-ঘোষিত মরণযাত্রা পিছন ফিরল, তার অতীব লজ্জাকর হ্রষ প্রত্যাবর্তন পথে পা বাড়াল, আর তাদের সসেজ নিতে ভুললো না।

 

মার্তভ তখনও এ্যসেম্বলি হলে জনগণের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত। তিনি তখনও রফার জন্য ব্যাকুল। এবার তিনি প্রস্তাব আনলেন, বলশেভিকদের সমালোচনা করে, যে বলশেভিকরা সোভিয়েত কংগ্রেসের ইচ্ছা আগাম ভেবে নিয়েছেন, এবং আবারও বলতে চাইলেন যেন প্রশস্ত, সকলকে নেওয়া সমাজতান্ত্রিক সরকার গড়ে তোলা যায়। এই প্রস্তাব দু’ঘণ্টা আগে দেওয়া তাঁর প্রস্তাবের অনুরূপ। তখন, লেনিনের নরমপন্থীদের সঙ্গে ভাঙ্গন চাইলেও, বলশেভিকরা ঐ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন নি।  

কিন্তু দু’ঘণ্টা ছিল অনেকটা সময়।

যেই মার্তভ বসলেন, তখনই একটা আলোড়ন দেখা গেল। দুমার বলশেভিক অংশ হলটাতে প্রবেশ করলো। প্রতিনিধিরা কিছুটা বিস্মিত এবং কিছুটা উজ্জীবিত হল। তাঁরা বললেন, তাঁরা এসেছেন, “সারা রুশ সোভিয়েত কংগ্রেসের সঙ্গে মৃত্যু অথবা গৌরবময় সাফল্য অর্জন করতে।”

 উল্লাস ও হর্ষধ্বনী যখন কিছুটা স্তিমিত হল, ট্রটস্কি স্বয়ং উঠলেন মার্তভের কথার উত্তর দিতে। তিনি বললেনঃ একটা গণ অভ্যুত্থানের কোনো যৌক্তিকতা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যা ঘটেছে তা একটা অভ্যুত্থান, কোনো ষড়যন্ত্র নয়। আমরা পেত্রোগ্রাদের শ্রমিক ও সৈনিকদের বিপ্লবী শক্তিকে শান দিয়েছি,; আমরা প্রকাশ্যেই জনগণের চেতনাকে গড়ে তুলেছি, কোনো ষড়যন্ত্র করিনি।  জনগণ আমাদের নিশানকে অনুসরণ করেছে এবং আমাদের অভ্যুত্থান সাফল্য পেয়েছে। এবং এখন আমাদের বলা হচ্ছেঃ তোমাদের জয় তোমরা পরিহার করো,  ছাড় দাও, আপোসে এসো। কিন্তু কার সঙ্গে আপোস? আমি প্রশ্ন করিঃ কাদের সঙ্গে আমরা আপোস-আলোচনা করবো? সেই সব ঘৃণ্য, নোংরা গোষ্ঠীর সঙ্গে যারা আমাদের এক সময় দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, অথবা যারা এই অসাম্যের প্রস্তাবনা গঠন করেছে? কিন্তু আমরা তাদের পুরোপুরিভাবে চিনি। রাশিয়ার কেউই প্রায় এখন আর এদের সঙ্গে নেই।আমাদের নাকি সমানে সমানে একটা বোঝাপড়ায় আসতে হবে, যার একদিকে কয়েক লক্ষ শ্রমিক এবং কৃষক যাদের এই কংগ্রেস প্রতিনিধিত্ব করছে, আর একদিকে তারা, যারা তৈরি, এটা প্রথম নয় আবার শেষও নয়, বুর্জোয়ারা যেমন চায় তেমন ভাবে [ঐ শ্রমিক-কৃষকদের] বিকিয়ে দিতে। না, আপোস করা সম্ভব নয়। যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, অথবা যারা আমাদের এটা করতে বলছে, তাদেরকে বলবোঃ তোমরা দুর্দশাগ্রস্ত দেউলিয়া, তোমাদের খেলা শেষ। তোমরা যাও যেখানে তোমাদের খাঁটি জায়গা, সেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে!”

উল্লাসে, হর্ষধ্বনিতে ঘরটা ফেটে পড়লদীর্ঘ হাততালির মধ্যেই মার্তভ উঠে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বললেনঃ “তাহলে আমরা এখান থেকে বেরিয়ে যাবো!”

তিনি ঘুরে দাঁড়াতেই একজন প্রতিনিধি তাঁর পথ আগলে দাঁড়ালো। লোকটা তাঁর দিকে তাকালো যেভাবে তাতে দুঃখ এবং অভিযোগ - দুয়েরই মিশ্রণ ছিল। সে বলে উঠলো, “আমাদের ভাবনা ছিল যে মার্তভ অন্তত আমাদের সঙ্গে থাকবেন।”

 মার্তভ বললেন, “একদিন তোমরা বুঝবে,” তার কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ হল, “কোন্ অপরাধমূলক কাজে তোমরা অংশ নিয়েছো।”

তিনি দ্রুত ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

মার্তভ সহ অন্যান্যদের এই চলে যাওয়া প্রসঙ্গে কংগ্রেস দ্রুত এক আক্রোশসূচক প্রকাশ্য নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করলো। এই ধরনের জ্বালা-ধরানো মন্তব্য ঘরে তখনও উপস্থিত বাম এসআর এবং মেনশেভিক আন্তর্জাতিকতাবাদীদের চোখে ছিল অনাকাঙ্খিত এবং অপ্রয়োজনীয়। এমন কি, কিছু বলশেভিকও তেমনই মনে করেছিলেন।

বরিস ক্যামকভকে করতালি দিয়ে রক্তিম অভিনন্দন জানানো হল যখন তিনি ঘোষণা করলেন যে তার দল, বাম এসআর এই সভায় অংশ নেবে। তিনি মার্তভ-এর প্রস্তাবনাকে আবার নতুন করে তুলতে চাইলেন, এবং মৃদুভাবে বলশেভিক সংখ্যাগরিষ্ঠকে সমালোচনা করলেন তিনি শ্রোতাদের মনে করিয়ে দিতে চাইলেন যে বলশেভিকরা কৃষকদের, এবং সামরিক বাহিনীর বড় অংশকে, সঙ্গে টেনে নিতে পারেন নি । আপোস-আলোচনার প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরায়নি।

এবার উত্তর ট্রটস্কি দিলেন না, দিলেন জনপ্রিয় লুনাচারস্কি – যিনি আগে মার্তভ-এর প্রস্তাবের সমর্থক ছিলেন। সামনের দিনগুলি যে দুঃসহ, তাতে তিনি সহমত হয়েই বললেন, “কিন্তু আমাদের সম্পর্কে ক্যামকভের সমালোচনা ভিত্তিহীন।”

লুনাচারস্কি বলে চলেছেন, “ক্যামকভকে সঠিক বলা যেত, যদি এই অধিবেশন সূচনার শুরুতে আমরা অন্য পক্ষদেরপ্রত্যাখ্যান করতে বা বাতিল করে দিতে কোনো পদক্ষেপ নিতাম। কিন্তু আমরা তো সকলেই সর্বসম্মতিক্রমে সংকট সমাধানের শান্তিপূর্ণ পথ প্রসঙ্গে মার্তভ-এর প্রস্তাবনা মেনে নিয়েছিলাম। এবং তার পর থেকে শুরু হল ঘোষণার পর ঘোষণা মহাপ্লাবন চলতেই থাকলো।... আমাদের কথা শোনা হয়নি, এমনকি তারা (মেনশেভিক এবং এসআর) তাদের নিজেদের প্রস্তাবনার ওপর আলোচনা করার প্রয়োজন বোধটাও করেনি। আমাদেরকে তারা এড়িয়ে চলছিল।”

এর জবাবে কেউ লুনাচারস্কিকে বলতে পারতেন যে সপ্তাহ কয়েক আগে থেকেই লেনিন জোর দিচ্ছিলেন যে তাঁর দলকে একাই ক্ষমতা দখল করতে হবেকিন্তু সেই সেই শুভনাস্তিক্য থাকলেও,  লুনাচারস্কি ঠিক ছিলেন।

 

মার্তভ যখন প্রথম সহযোগিতার, অর্থাৎ একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজতন্ত্রী সরকারের প্রস্তাব করেছিলেন, তখন উল্লসিত সংহতিতে, বা অতীব আপত্তির সঙ্গে, বা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায়, বা যে কারণেই হোক না কেন, আর সব দলের অন্য সকলের মতই, হলে উপস্থিত বলশেভিকরা সকলেই সেটা সমর্থন করেছিলেন।

বেসি বিট্টির মতে, প্রথম প্রস্তাবের জবাবে ট্রটস্কী যে যত দ্রুত সক্রিয় হওয়া যায় ততটা হন নি, তার কারণ হয়তো “তিনি এই সব অন্য নেতাদের হাতে অতীতে যে সব অপমান সহ্য করেছিলেন তার তিক্ত স্মৃতির দরুণ”। এটা নিয়ে তর্ক করা যায়, এবং যদি বাঁ এই কথা সত্যি হয়, মেনশেভিকরা, দক্ষিণপন্থী এস আর-রা, এবং অন্যরা ঐ ভোট বলশেভিকদের মুখে ছুঁড়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা ঐখান থেকে সোজা বিরোধিতার জায়গায় চলে গিয়েছিলেন, এবং যারা তাঁদের চেয়ে বামপন্থী, তাঁদের নিন্দা করেছিলেন।   

লুনাচারস্কির প্রশ্নটা যথার্থ ছিলঃ তুমি তাদের সঙ্গেকীভাবে সহযোগিতার পথে অগ্রসর হবে যারা সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করছে?  

 

যেন তাঁর এই উক্তির যাথার্থ্য প্রমাণ করার জন্যই, সেই মুহূর্তে হল ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসা নরমপন্থীরা সোভিয়েত কংগ্রেসকে “বলশেভিক প্রতিনিধিদের একটা ব্যক্তিগত সমাবেশ” তকমা দিচ্ছিলেনতাঁরা ঘোষণা করলেন, “কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি মনে করে দ্বিতীয় কংগ্রেসঅনুষ্ঠিত হয়নি”।  

 

লের মধ্যে জোট সংক্রান্ত বিতর্ক চলতে থাকে গভীরতম রাত অবধি। কিন্তু ইতিমধ্যে জনম ঘুরে গেছে লুনাচারস্কি এবং ট্রটস্কীর দিকে।

উইন্টার প্যালেসে তখন শেষ খেলা।

চূর্ণ বিচূর্ণ ভাঙা কাঁচের মধ্যে দিয়ে কনকনে ঝোড়ো হাওয়া অনাহুতের মত ঢুকছে। বিশাল ঘরগুলি ঠান্ডা। আশাহত সৈনিকরা লক্ষ্যহীন হয়ে সিংহাসন ঘরের দু-মাথা ঈগলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আক্রমণকারীরা সম্রাটের ব্যক্তিগত কক্ষে পৌছল। ঘরটা ছিল ফাঁকা। তারা সময় নিয়ে সম্রাটের প্রতিকৃতিগুলিকেই আক্রমণ শুরু করল। দেওয়াল থেকে তাকিয়ে থাকা সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসের আড়ষ্ট, শান্ত ছবিটাকে তারা বেয়নেট দিয়ে আঘাত করতে থাকল। বড় বড় নখওয়ালা পশুর আঘাতের মত করে তাঁরা ছবিটাকে শতছিন্ন করলো -- ভূতপূর্ব সম্রাটের মাথা থেকে পা অবধি।

কিছু ছায়ামূর্তি চোখের গোচরে-অগোচরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু কে যে কি তা বোঝা তখন দুষ্কর ছিল।

লেফটেন্যান্ট সিনেগুব নামে একজন তখনও সরকার রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।তিনি এলোমেলো ঘন্ট ধরে বারান্দাগুলোতে পায়চারি করে চলেন। তিন অপেক্ষা করছিলেন আক্রমণের, এবং ভেসে চলেছিলেন একরকম প্রাশান্ত ত্রাসে, এক অতীব নারকোটিক অবসাদে। তিনি পেরিয়ে যাচ্ছিলেন বহু দৃশ্য, যেন আধ-শোনা গল্পের এক একটা দৃশ্য --নৌসেনাধ্যক্ষের পোশাকে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক, যিনি একটি নিশ্চল আরাম কেদারায় বসে আছেন;  একটা পরিত্যক্ত সুইচবোর্ড, একটা গ্যালারির তৈলচিত্রের নীচে সৈন্যরা হাঁটু মুড়ে বসে থাকা

 

সিঁড়িগুলোতে খন্ডযুদ্ধ বাধে। মেঝের পাটাতনগুলোতে তে যে কোনো ধরনের ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ হয়ত বিপ্লবের আগমনের শব্দ। এই দৌড়ে এল এক যুঙ্কার, যাচ্ছে কোনো দিকে একটা দায়িত্ব নিয়ে।  সে অলংকারবহুল শান্ত কণ্ঠে সাবধান করে দিল, সিনেগুব সদ্য যে লোকটাকে পেরিয়ে এসেছেন – হ্যাঁ, তিনি এইমাত্র একজনকে পেরিয়ে এসেছেন বটে --  সম্ভবত সে ছিল একজন শত্রু। “ভালো, খুব ভালো”, সিনেগুব বললেন।এই দেখো! আমি এখনই নিশ্চিকরছি।” তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে নিশ্চল করলেন, খেলার মাঠের মারপিটে বাচ্চারা যেভাবে করে, সেইভাবে তার কোটটা টেনে নামিয়ে, যাতে হাতদুটো নাড়াতে না পারে—দেখলেন, অন্য লোকটা সত্যিই বিদ্রোহীদের দলের একজন ছিল

 

রাত দুটো নাগাদ সামরিক বিপ্লবী কমিটির ফৌজ বেশ শক্তি নিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করলো।

উদভ্রান্তের মত কোনোভালভ টেলিফোনে শ্রেইদারকে জানিয়েছেঃ “আমাদের সঙ্গে আছে শুধু ছোটো একদল শিক্ষানবীশ অফিসার। আমাদের গ্রেপ্তার আগতপ্রায়।” সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

হলঘরটা থেকে মন্ত্রীরা বিফল গোলাবর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। এটা তাদের আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা। পদধ্বনি। একজন ফ্যাকাশে চেহারার কাদেত নির্দেশের জন্য ছুটে এলো। সে জানতে চাইলঃ “শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়ে যাব?

“আর রক্তক্ষয় নয়!” তারা চিৎকার করে উঠলো। “আমরা আত্মসমর্পণ করবো।”

তারা অপেক্ষা করেছিল। এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। সবচেয়ে ভালোভাবে কীভাবে দেখা দেওয়া যায়?নিশ্চয়ই ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত একদল ব্যবসায়ীরমত হাতে ওভারকোট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় না।

ডিক্টেটর বলে ঘোষিত কিসকিন অবস্থা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিলেন। তিনি তাঁর শাসনপর্বের শেষ দুটি নির্দেশ জারী করলেন 

“তোমাদের ওভারকোট ত্যাগ করো এবং এসো আমরা আলোচনায় বসি”, সে বলল।

তারা এই নির্দেশকে মান্যতা দিল । তারা সেই মন্ত্রীসভা মিটিঙেমূর্তিবৎ স্থানু মূকনাট্য করে বসে রইল, যখন আন্তনোভ  নাটকীয়ভাবে ঢুকে এলেন,  তাঁর উতকেন্রদীক শিল্পীর টুপি তাঁর লাল চুলের উপর দিয়ে পিছনে ঠেলা। তার পিছনে সৈন্য, নাবিক ও লাল রক্ষীরা হাজির।

 

কোনোভালোভ মর্যাদাপূর্ণ শোভনীয়তায় বললেন, “সাময়িক সরকার এখানে উপস্থিত।” তিনি যেন বোঝাতে চাইলেন তিনি দরজায় টোকা মারার জবাব দিচ্ছেন, অভ্যুত্থানের জবাব নয়।

“তোমরা কি চাও?”

আন্তোনভ দৃঢ়ভাবে বললেনঃ“আমি তোমাদের সকলকে জানাতে চাই যে তোমরা, সাময়িক সরকারের প্রতিনিধিরা গ্রেপ্তার হলে।”

বিপ্লবের আগে, একটা গোটা রাজনৈতিক জীবন আগে, অন্যতম উপস্থিত মন্ত্রী মালিয়ান্তোভিচ তার বাড়িতে আন্তোনভকে একবার আশ্রয় দিয়েছিলেন। দুজন মানুষ নিজেদের মধ্যে চাওয়াচায়ি করলো, কিন্তু কিছু বললো না।  

লাল রক্ষীরা ক্ষোভে ফেটে পড়লো যখন তারা জানতে পারলো যে কেরেনস্কী অনেক আগেই প্রাসাদ থেকে পালিয়ে গেছে। রক্তপিপাসুদের মতো চিৎকার করে একজন বললো, “কুত্তার বাচ্চাগুলোকে সঙিন দিয়ে কোতল কর।”

“আমিএদের বিরুদ্ধে কোনো হিংসা অনুমোদন করব না।” আন্তনোভ খুব ধীর এবং শান্ত গলায় জানালেন। এরপরেই মন্ত্রীদের নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। তারা ফেলে রেখে গেলেন কিছু ঘোষণার খসড়া, যার বেশীরভাগটাই কেটে দেওয়া হয়েছে, এই কাটাকুটিগুলো এঁকেবেকে চলে গেছে যেন স্বৈরতন্ত্র কায়েমের স্বপ্নের নকশায় পরিণত হয়ে। একটা টেলিফোন বেজে উঠলো।

করিডোর থেকে সিনেগুব গোটা ঘটনাটার উপর নজর রাখছিলেন। যখন এটা শেষ হল, তার সরকারও গেল, তাঁর দায়িত্বও শেষ হল। তিনি তখন শান্তভাবে হেঁটে সার্চলাইটের আলোয় বেরিয়ে গেলেন

লুঠেরারা ঘরগুলোকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখতে থাকে।  তারা শিল্পকলার নিদর্শনগুলি অবহেলা করে নিতে থাকল কাপড়চোপড়, নানা টুকিটাকি। সারা মেঝে জুড়ে তারা কাগজপত্র ছড়ালো, ছেটালো। সেই ঘর থেকে তারা বেরোলে বিপ্লবী সৈনিকরা তাদের তল্লাসি করে এবং তাদের কাছ থেকে লুঠের জিনিস বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করলো। “এটা জনগণের প্রাসাদ”, একজন বলশেভিক লেফটেনান্ট ভর্ৎসনার সুরে বলে উঠলেন। “এটা আমাদের প্রাসাদ। জনগণের সম্পত্তি চুরি করবেন না।”

একটা ভাঙা তরবারির হাতল, একটা মোমবাতি। লুঠেরাদের দল তাদের সেইসব লুঠের মাল জমা দিচ্ছিল। তাতে ছিল একটা কম্বল, একটা সোফার তাকিয়া এবং আরও অনেক কিছু।

 

প্রাক্তন মন্ত্রীদের আন্তোনভ প্রাসাদের বাইরে নিয়ে এলেন। বাইরে এসে তারা একটা উদ্ধত, ভয়ানক ক্রুদ্ধ জনতার মুখোমুখি হলেন। তিনি তার পিছনে বন্দীদের কিছুটা আড়াল করে চলছিলেন। “এদেরকে আঘাত কোরো না।” তিনি এবং অন্যান্য অভিজ্ঞ, গর্বিত বলশেভিকরা বলছিলেন। “এটা আমাদের সংস্কৃতি বিরোধী”-

কিন্তু রাস্তায় ক্ষোভের আগুন এতো সহজে নেভার ছিল না। উৎকণ্ঠার সেই মুহূর্ত পরে, কাকতালীয়ভাবে কাছেই কোথাও মেশিনগানের গুলির শব্দে সতর্কঘন্টাও ক্রমশঃ স্পষ্ট হতে লাগলে জনতা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগা আন্তোনভ। তিনি তার বন্দীদের নিয়ে দৌড়ে ব্রিজটা অতিক্রম করে যান। ভিড় ঠেলে বন্দীদের পিটার-পল কারাদূর্গে নিয়ে আসেন।

জেলের দরজা যখন প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখনই মেনশেভিক অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী নিকিতিন তার পকেট থেকে টেলিগ্রামটি খুঁজে পান। টেলিগ্রামটি এসেছিল ইউক্রেনের পার্লামেন্ট ভারখোভনা ‘রাডা’ থেকে।

“আমি এটা গতকাল পেয়েছি”, সে বললো। আন্তোনভকে সেটি দিয়ে নিকিতিন আরও বললেন, “এবার এটা তোমার বিষয়।”

 

স্মোলনিতে আগত প্রতিনিধিদের এই খবরটি দিলেন সেই একগুঁয়ে হতাশাবাদী কামেনেভঃ “উইন্টার প্যালেসে গেঁড়ে বসা প্রতিবিপ্লবের নেতাদের বিপ্লবী গ্যারিসন বন্দী করেছে।” তিনি আনন্দপ্রকাশে তুমুল উচ্ছাসের উদ্রেক ঘটালেন

 

সময় তখন রাত তিনটে অতিক্রম করে গিয়েছে, অথচ কাজ আরো বাকি। দু’ঘণ্টারও বেশী সময় ধরে কংগ্রেসে রিপোর্ট শোনার কাজ চলতে থাকে- বিভিন্ন ইউনিট তাঁদের পক্ষে চলে আসার রিপোর্ট, সেনাধ্যক্ষরা সামরিক বিপ্লবী কমিটির কর্তৃত্ব। মতবিরোধ ছিল না যে তা নয়। কেউ একজন বন্দী এস আর মন্ত্রীদের ছেড়ে দেওয়ার দাবী তোলেন। ট্রটস্ক তাঁদের মেকী কমরেড বলে কষাঘাত করেন।

 

ভোর চারটের সময় মার্তভের বহির্গমনের পুনশ্চ হিসেবে তাঁর গোষ্ঠীর একদল প্রতিনিধি মেনিমুখো হয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো, এবং আবার তারা একটা সমাজতান্ত্রিক জোট সরকার গঠনের পক্ষে তাঁর প্রস্তাব নতুন করে পেশ করতে গেল। কামেনেভ সভাকে মনে করিয়ে দিলেন যে মার্তভ যাদের সঙ্গে সহযোগিতা প্রস্তাব করেছিলেন তাঁরা পিঠ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তবু, অনন্ত নরমপন্থী, তিনি প্রস্তাব করলেন  সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারি এবং মেনশেভিকদের নিন্দা করে ট্রটস্কীর আনা প্রস্তাব পদ্ধতিগত কারণে সরিয়ে রাখা হোক, যাতে পরে আলোচনা আবার শুরু হলে কেউ বিব্রত না হয়।

লেনিন সেই রাতে আর সভায় ফিরবেন না। সম্ভবত সেই মিটিঙে ফিরে আসেননি। তিনি পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু তিনি একটি দলিল লিখেছিলেন, যেটি পেশ করার দায়িত্ব পড়ে লুনাচারস্কির উপর।

শ্রমিক, সৈনিক এবং কৃষকদের প্রতি ঘোষণায় লেনিন সোভিয়েত ক্ষমতা ঘোষণা করলেন, এবং অঙ্গীকার করলেন দ্রুত একটি গণতান্ত্রিক শান্তি প্রস্তাব করবার। জমি হস্তান্তর করা হবে কৃষকদের মধ্যে। শহরগুলিতে পর্যাপ্ত রুটির যোগান জারি থাকবেসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত জাতিদের জন্য এল  আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতিশ্রুতিকিন্তু সেই সঙ্গে লেনিন সাবধান করে দিলেন যে বিপ্লব তখনও ভিতরের ও বাইরের বিপদে্র সম্মুখীন।

“কর্নিলভপন্থীরা... পেত্রোগ্রাদের বিরুদ্ধে সৈন্যদের আনতে চেষ্টা করছে। ... সৈনিকরা! কর্নিলভবাদী কেরেনস্কির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান!... রেলশ্রমিকরা! পেত্রোগ্রাদের বিরুদ্ধে কেরেনস্কির পাঠানো সৈন্যবাহী ট্রেনগুলি থামিয়ে দিন! সৈনিক, শ্রমিক ও কর্মচারীগণ! বিপ্লব এবং গণতান্ত্রিক শান্তির ভবিষ্যৎ আপনাদের হাতে!”

নথির সবটা পড়ে শোনাতে অনেকটা সময় লাগল, কারণ পড়ে শোনানোটা বারে বারে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল অনুমোদনের জয়ধ্বনিতেএক জায়গায় ছোট্টো একটা কথা পাল্টে বাম এসআর-দের সম্মতি নিশ্চিত করা গেল।একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মেনশেভিক উপদল ভোটদানে বিরত থাকলো, এবং এইভাবে বাম-মার্তভপন্থার সঙ্গে বলশেভিকদের কাছাকাছি আসার পথ তৈরী করল। সে যাই হোক। অবশেষে ২৬শে অক্টোবর ভোর পাঁচটায় লেনিনের ইস্তেহার বিপুল ভোটে পাস হল।

  একটা হুংকার। তার প্রতিধ্বনি হাল্কা হতে থাকে, যখন চীৎকার করে গৃহীত প্রস্তাবের গুরুত্ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। সমবেত মানুষজন একে অপরের দিকে তাকায়। এইটা পাশ করা গেছে। ওইটা করা হয়েছে।  

বিপ্লবী সরকারকে ঘোষণা করা হয়েছে

বিপ্লবী সরকার ঘোষিত হইয়েছিল, এবং সেটা একরাত্রের পক্ষে যথেষ্ট। প্রথম মিটিঙের জন্য তা অনেক বেশী।

নিশ্চিতভাবেই।

রণক্লান্ত, ইতিহাসে বুঁদ, তবু লৌহশলাকার মতো টানটান স্নায়ুতে সোভিয়েতের দ্বিতীয় কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা অনিশ্চিত পা ফেলে স্মোলনি ছাড়লেন। তাঁরা মেয়েদের উঁচু ক্লাসের স্কুলবাড়িটা থেকে বেরিয়ে এলেন ইতিহাসের এক নতুন মুহূর্তে - এক নতুন ধরনের প্রথম দিন যা ছিল শ্রমিকের সরকারের, যা ছিল এক নতুন শহরের সকাল এবং শ্রমিক রাষ্ট্রের রাজধানীর।

তারা শীতের মধ্যে হেঁটে চললো সেই আলো আঁধারিতে যখন পূবের লাল আকাশটা ক্রমে উজ্জ্বল হচ্ছে।

 

 

On Syria

On Syria

By Achin Vanaik

The Syrian upheaval reflected the democratic upsurge that took place throughout the Middle East in 2011 and after. These upheavals were for the restoration or establishment of democracy and not for a movement towards socialism despite the fact that economic distress was very much at the heart of these upheavals. Of course this democratic upsurge is to be supported by all progressives and socialists. Regarding Syria, the Assad dynasty (father and son) have been ruling Syria since 1971 and belong to the minority Shia sect of Alawites but remained in power because of support from substantial sections of Sunnis especially in the army. Indeed, until the US invasion of Iraq throughout much of the Middle East (barring the Iran-Saudi Arabia interface), the Shia and Sunni communities were neither sharply divided nor hostile but interacted and intermingled normally and peacefully as many sects within Islam do.

The eruption of a non-violent democratic opposition to Bashar al-Assad (who succeeded his father in 2000) was a very positive development deserving of support from progressives everywhere. It was led by civil society organizations between January and July 2011 but brutal assault by the Assad government forced a small section of the hitherto nonviolent movement to take up armed resistance while defectors from the Syrian army set up the Free Syrian Army (FSA) whose main purpose was not securing democracy but to remove the Assad regime from power. From this time on till the present, a civil war situation emerged with on one hand the decline of the original democratic opposition whose place was basically taken up by all sorts of new actors having different motives and purposes going in for armed conflict against the Assad regime.

In this civil war with multiple actors both within and outside Syria, over 400,000 people have been killed and over 5 million displaced. This conflict no longer has a force or side that one can support because it aims to establish an independent and democratic Syria. Rather, the struggle is now all about regime change or not. At one time various radical Islamist forces (e.g., al-Nusra and ISIL) out to establish their versions of an Islamic state were fighting against Assad and against each other and were gaining ground and backed by outside powers and forces while other external forces and powers were supporting the Assad regime for their own geopolitical purposes.

Today the situation is roughly as follows. The Islamist forces have been basically defeated by on one hand Assad, and on the other by the Kurds of Syria who are connected to the Kurdistan Workers Party which outside of Syria is seen as an enemy by Turkey which rejects Kurdish self-determination. The Assad regime has been supported by Iran and Russia as also by Hezbollah of Lebanon and this back-up has helped Assad to gain control of a little more than half of the country.  The FSA and the Kurds were supported by the US (Turkey supported some of the radical Islamists against Assad) which along with Israel sees Iran and Syria under Assad as its main obstacles to greater control over the region. They are also backed by Saudi Arabia which is opposed to Iran. The US also for a time (till they were defeated) prioritized the fight against radical Islamists, e.g., ISIL, and therefore temporarily eased off on the struggle against Assad. France and Britain have been faithful backers of whatever the US does.

Once the Islamist threat receded and the Kurds became much stronger, Turkey which was held back earlier by both Russia and the US, has now entered the fray to successfully push back the Kurds which has had to concede a large part of the ground they had earlier secured but are still holding on to parts of Syria largely populated by them. Both Russia and the US who value their ties more with Turkey than with the Kurds allowed the former to attack the latter. But the US would not like the Kurds to be totally decimated. As for the recent claim that Assad has used chemical agents in Douma, this was the excuse made for the joint French, British and US air attack on supposed storage and airport facilities – an act that is illegal under international law and must be condemned as such. Where the West says there was the use of chemical weapons, Russia says this was a ‘false flag’ staged affair by opponents of Assad (who may well have their own stocks of chlorine and used it) which gave an excuse to the Western powers to carry out their aerial assault a day before inspectors from the UN’s Organisation for the Prohibition of Chemical Weapons (OPCW) were to enter Douma. On the face of it, when Assad is advancing territorially (although a very large part of Syrian territory remains out of his control) it would make little political sense for him to carry out such an attack. Also in 2013 Russia persuaded him to allow his stockpile of chemical agents to be destroyed under international supervision. These inspectors have now visited Douma and their report is awaited.

Given this highly complicated situation what should the position of Socialists and progressives be on what is happening in Syria? 1) This civil war was initiated by a brutal and undemocratic Assad regime and there is no question of giving him support earlier, now or later. 2) At the same time once the truly democratic forces were defeated there can be no question of supporting any of the other internal forces opposed to Assad whether radical Islamists or FSA which have nothing to do with seeking or promoting the advance of democracy in Syria. 3) It is one thing to support Kurdish self-determination which is another matter altogether and therefore to oppose the Turkish assault on them; but we cannot support their alliance with the US and the larger Western aim to use them as one pawn among others to unseat the Assad government not because of their concern for the ordinary Syrian people but for their own cynical and imperialist geo-political purposes. 4) Nor should one forget or endorse the Russian role in Syria. 5) In fact the only appropriate position or stand to take is to call for ending the civil war as soon as possible for which there should be a complete arms embargo by all external powers and forces. Instead international pressure should be put for ending the war and for the holding of free and fair elections apart from providing all humanitarian support and aid to the suffering people of Syria and to displaced refugees.

Of course given the way things are, this position is not going to materialise but it is still the only correct position to take. When the US attacked Saddam Hussein in 1991when he invaded Kuwait, socialists opposed this invasion and also the invasion by the US of Iraq but without thereby supporting Hussein against the US either. Even when we are too weak to change things on the ground we must nevertheless uphold the banner of political integrity and try and generate a wider consciousness of what is the right and democratic path that should be taken. Ours is the long run effort to build a stronger and wider radical and progressive awareness.

There is also a broader question that the earlier invasions of Iraq, what is happening in Syria and what many other struggles in which external forces intervene raises – under what circumstances if any should progressives and socialists defend or oppose external military interventions? What follows below is a general theoretico-political discussion on this crucial issue of what is called “Humanitarian Intervention”

Three Positions

There is non-forcible humanitarian intervention and forcible (military) intervention in the name of protecting human rights. About non-forcible humanitarian intervention, usually (but not always) by non-state actors there is generally not much of a problem although it can certainly be opposed by target state in the name of national sovereignty and external non-interference. The main problem is how to deal with the issue of forcible (military) humanitarian intervention which is qualitatively different from even supplying arms to a favoured side (e.g. progressive revolutionaries in a civil war situation) in a country. Of course if one is a practitioner of realpolitik (your standard so-called strategic or foreign affairs ‘expert’) then one can simply say that whatever is in the interest of the state (that favourite phrase that covers a multitude of sins, namely “national interest”) should be done and to hell with normative, legal or moral considerations. However, even these realpolitikers invariably try to cover up their actions and claims in legal and moral disguises.

A.    Such a form of intervention is a breach of the principle of state sovereignty and national self-determination as the supreme legal principle embodied in Article 2(7) of the UN Charter makes clear. [It should be noted here that the single greatest global democratic advance of at least the second half of the 20th century if not of the whole of that century was de-colonization even when a local dictator replaced external colonial-dictatorial rule!]. The only exceptions allowed to this are (i) the “right to self-defence” in Article 2(4) of the same UN Charter where there is an attack by the official armed forces of another state and not just by unofficial ‘insurgents’. (ii) When the Security Council (SC) as a ‘last resort’ (when all other efforts have failed) sanctions armed action in the case of a “breach of international peace”. Apart from this there is no dispute that any forcible intervention would be a violation of international law. The issue is whether this would be justified or not.

The five main objections to any such external armed action are the following: (i) There is issue of motives -- states don’t intervene for humanitarian reasons. (ii) Sovereignty is supreme and therefore there can be no such intervention. Citizens are the exclusive responsibility of their state and their state i.e., entirely their business. (iii) Don’t promote further possibility and likelihood of abuse by adding another ‘exception’ in the name of human rights to what already exists by way of exceptions. (iv) There will always be selective applications of the principle of forcible humanitarian intervention and thus there will always be inconsistency in this policy promoting its abuse. (v) There is no agreed consensus among the states of the world n what should be the principles on which forcible humanitarian intervention would be justified. It is better for the world that the order currently provided by upholding the principle of non-intervention that already legally exists is far better than allowing international disorder that would result from accepting periodic violations of this principle in the name of human rights.

B.     Those who argue for forcible humanitarian intervention insists (i) that promotion of human rights is at least a important, if not more so, than international peace and security. Articles 1(3), 55 and 56 of the UN Charter are put forward as being as, or more important than Article 2(40 though legally such a view is untenable. (ii) Whatever the legal position, this is not the same as the moral position. Morality may require in certain cases forcible humanitarian intervention to end slaughter. The existence of a legal right enables action but does not determine it. (iii) It is outcomes not motives that are most important. Also outcomes are shorter/immediate and longer-term. The short-term considerations are met by intervention to stop the human suffering but some decision-makers and decision–shapers including liberal scholars, insist on meeting what they call “justice in endings”. So even if it was wrong for the US to invade Iraq in 2003 once having done so they must now stay on to ensure proper economic, social, political reconstruction. How long they should stay and what constitutes adequate reconstruction will of course be decided by the intervener!

C.     There is also a ‘qualified intervention position’ which states that for the most part humanitarian intervention is not justified because one must respect the right of a people [where peoples are constituted as separate nations] to overthrow their own tyrant. That is to say, the suffering people must themselves be seen as the primary agency of their own future. Their agency cannot be substituted for by an external agency. This is why the overthrow of British colonial rule must be by the colonized people themselves and not by an external invasion from another country. Similarly the struggle against apartheid must be fought above all by the victims of apartheid. Or the overthrow of the Shah of Iran or any another domestic tyrant must be by the people of that state themselves. Of course there can be external help in this effort but not military invasion to overthrow the domestic oppressor.

      The only qualifications to this are (i) when the situation is so grave that the very existence of the ‘people’ in question is threatened. After all, to respect a people’s right to overthrow their own tyrant must presume that the people’s existence is not threatened. Expulsion of a people (one form of ethnic cleansing) or even killings on a very large scale but which do not threaten the very existence of the affected population in whole or substantial part, do not qualify as justifications for external military intervention. Unfortunately the UN definition of ‘genocide’ is so loose and vague that it does not help because it allows for the killing of hundreds or a few thousands to be considered or called a ‘genocide’ as well as being applied to a much larger scale of massacres that should be seen as threatening the existence of a people. The question of proportionately of killings in relation to the total population does come in. When this is being threatened then outcomes do matter more than motives and there should be intervention from the outside to stop this. In the case of East Timor in 1975 when the Indonesian government got a green light from the US to invade it did so and killed more than one-third of the total population of 800,000 East Timorese. Similarly in Rwanda in 1994 there was the wholesale massacre of Tutsis and even when the UN peace-keeping force headed by Romeo Dalliare called for a massive influx of UN troops to prevent this, it was prevented because the Western powers led by the US were not strategically interested in the region but wanted UN sanction for military action against Serbian presence in Bosnia.  One region where an external military action did take place which was justified was the Vietnamese invasion of Kampuchea to finally defeat the Pol Pot regime (backed by both the US and China) in 1978. The motive may have been to end the cross-border conflict between the two countries but the outcome was an end to a regime that had killed between a third and a half of the Kampuchean population. This invasion was decried by the West and its allies when it should have been applauded.

(ii) The second qualification where an external military intervention is justified is when in a civil war situation another country first invades directly to support a regressive rebel side against the legitimate ruling government. This happened in Angola (1975) and in Mozambique (1987) when the Apartheid regime of South Africa sent in its troops to help local rebel groups to overthrow respectively the MPLA (Movement for the Liberation of Angola) government which had come to power by throwing out the Portuguese colonialists in Angola; and then again there was the South African Apartheid government’s troop support to a rebel force seeking to overthrow FRELIMO (Front for the Liberation of Mozambique) which had also come to power by throwing out Portuguese colonial rule. In both cases -- in an example still unparalleled of genuine proletarian internationalism -- Cuba sent in its troops to defeat those of Apartheid South Africa.

      This third position is the best political guideline we have and one I believe revolutionary Marxists should uphold.

      There are those like Noam Chomsky who say that only if there is a genuine international force and not one suborned like the UN forces to manipulation by the great powers can we talk of and justify external humanitarian intervention. But even if such a force did exit (which is not the case) here too, the principle of respecting the agency of a people to overthrow their own tyrant holds.

Mobilise On the Streets first, to Resist Normalization of Communal Murders

Statement of Radical Socialist

 

Mohammad Afrazul, from Malda’s Sayadpur village, worked as a labour contractor and lived with twenty-four other labourers in a four roomed, single storey house in Rajsamand’s Dhoinda, some 300 kilometres from Jaipur. He was first attacked with an axe, then burnt to death, and the entire process recorded on video and uploaded with pride with the assertion that as a Hindu, the perpetrator was preventing a love jihad. This episode in Rajasthan on 7th December shows exactly the distance travelled in a quarter century in India, by the forces of Hindutva.

When in 1992 Advani and the others of his criminal gang led the attack and destroyed the Babri Masjid, the action was widely treated as a crime. A quarter century later, not only are they proclaiming 6th December as a Day of Valour, but have been able to push their agenda a great deal.

Much of the debate over how to resist these forces have focused on exactly how fascistic they are, but the real issue today is more on recognizing that regardless of whether we see them as fascists or as aggressive communalists, it is essential to understand that this is a political force that maintains an autonomous agenda and constantly strives to push it forward. It is necessary, as always, to stress that the RSS and its whole network is not a simple instrument that the ruling class creates, to keep in readiness for bringing out whenever rulers feel the need. Historically, the relationship between fascism as a political movement and the bourgeoisie is more complex, and varies from country to country.  In the case of India, the Sangh combine has spent nine decades building an ultra-nationalism through the valorization of a chauvinist Hindutva, presenting other religions as enemies, especially presenting Muslims as sub-human beasts and eternal enemies of Indian culture and tradition. There is nothing in a purely capitalist rationality that would push this outlook. But the terms that the RSS and its various branches collectively have set out is, in return for their delivering certain highly needed profitable steps for the ruling class and international capital, they will be given freedom to pursue their politics of hatred. The murder of rationalist secular activists like Dabholkar, Pansare, Kalburgi and Lankesh; the murders of ordinary Muslims for no crime other than being Muslim, with allegations of cow slaughter, “love jihad”, being agents of the Isis , etc., in cases ranging from Mohammad Akhlaq, Pehlu Khan, Junaid Khan to Mohammad Afrazul, present this politics of hatred in its open form.

The accusation behind attacking and murdering Mohammad Afrazul was a by now routine one, of being a participant in a “love jihad”. It is significant that the man was a Muslim labourer from West Bengal. Bengali speaking Muslims have been repeatedly targeted and accused of being Bangladeshi infiltrators. Each of these points must be noted. That immigration, which happens all over the world primarily due to economic hardships, are now being declared terroristic plots. Secondly, that unless they can prove their Indian-ness, Bengali speakers, especially if Muslims, are being accused of being foreigners.  This too is part of the larger fight to impose the Hindi-Hindu-Hindustan design all over India.  And any Muslim, anywhere in India, is seen as fair game.

From mid November, a pamphlet on the so-called love jihad was distributed in Jaipur. Instead of immediately halting it, the police merely carried out an inquiry. Love Jihad is a lie, but one that has a long pedigree. It asserts that Muslims pretend to love Hindu women in order to make them convert to Islam. In the recent notorious case of Hadiya, the Kerala High Court had set aside her marriage, despite all evidence that she had converted of her own, and had only then met her future husband and married him, and above all that she is an adult. Even the Supreme Court has been far from clear, so far, in her Case, with the NIA having been asked to investigate if it was indeed a case of love jihad at one stage.

In the case of Afrazul, who has a family, the entire horrifying episode shows how murdering Muslims has become a near normalized event, with the Hindu upper caste communities ignoring it, or taking to the social media to drag in killings in Bangladesh, Syria and elsewhere to dilute the gravity of the situation in India. Resistance by all democratic forces, by all those who seek to retain all the colours of the rainbow in a pluralist India, is essential. And we must be aware that such resistance has to be completely free of all rightwing parties, not just the RSS-BJP. Even as protests erupted, in Kolkata, about twenty-five protesters were arrested by the police for demonstrating close to the Keshav Bhavan, the RSS Headquarters in the City. The government of West Bengal, under Trinamul Congress leader Mamata Banerjee, is showing that its verbal fencing against the BJP is not serious, and that it is keen to break up any independent protest.

It is only by as combined struggle on the streets, in courts, and in the electoral space, that responses to these can be made. There is certainly a need to fight electorally. But those who make that the principal terrain can only end up as fifth wheels to a Congress led alliance where social issues will take a back seat. It is important to note that with the Gujarat election campaign in full swing, the Congress is keen to prove that Rahul Gandhi is a good Hindu, and hence it has not gone out for a forthright condemnation of the murder of Afrazul, with the stress on how the official Hindutva campaigns are empowering such individual murders as well. And as the Supreme Court has repeatedly shown, any tactics of court battles without social struggles are fraught with uncertainty as the court may take poor stances. Mass mobilisations, public resistance, thus remain the starting point.

 

Radical Socialist, 8th December 2017 

পথে নেমে গণ-জমায়েত করুন, সাম্প্রদায়িক হত্যাকান্ডের স্বাভাবিকীকরণ রুখতে লড়াই করুন

র‍্যাডিকাল সোশ্যালিস্টের বিবৃতি

মালদার সইয়দপুর গ্রামের মহম্মদ আফ্রাজুল জয়পুর থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে রাজসামান্দের ধোইন্দাতে লেবার কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করতেন এবং আরো চব্বিশজন শ্রমিকের সঙ্গে একটি চার ঘরের ভাড়া একতলা বাড়িতে থাকতেন। তাঁকে প্রথমে কুঠার দিয়ে আক্রমণ করা হয় ও তার পর পুড়িয়ে মারা হয়। গোটা প্রক্রিয়াটা ভিডিও করে ইন্টারনেটে তোলা হয়, গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করে যে হত্যাকারী হিন্দু হিসেবে একটি লাভ জিহাদ বন্ধ করছে। ৭ই ডিসেম্বর রাজস্থানে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, গত ২৫ বছরে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ভারতে ঠিক কতদূর এগিয়েছে।

যখন ১৯৯২ সালে আদবানী আর তার অপরাধীবৃন্দ আক্রমণ করে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছিল, তখন সেই কাজকে বহু দিক থেকেই অপরাধ বলে দেখা হয়েছিল। ২৫ বছর পরে, তাঁরা ঐ দিনটিকেই শুধু সৌর্য দিবস বলে ঘোষণা করছে না, বরং অন্য বহু ক্ষেত্রে তাদের কর্মসুচী এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে।

এই শক্তিদের কিভাবে প্রতিহত করতে হবে, সেই বিতর্কের অনেকটাই কেটেছে তাঁরা ঠিক কতটা ফ্যাসিবাদী তা নিয়ে, কিন্তু আজ যা দরকার তা হল বোঝা, যে আমরা তাদের ফ্যাসিবাদী বলি আর আগ্রাসী সাম্প্রদায়িকতাবাদী বলি, মূল কথা হল, এ এমন এক রাজনৈতিক শক্তি, যারা তাদের স্বতন্ত্র কর্মসূচী বজায় রাখে, এবং ক্রমান্বয়ে সেটা সামনে ঠেলে। সব স্ময়ে জোর দিয়ে বলা দরকার যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ ও তার গোটা শাখা প্রশাখা শাসক শ্রেণীর তৈরি করা একটা হাতিয়ার নয়, যেটা তারা প্রয়োজন মত বার করে। ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিবাদ ও বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে সম্পর্ক অনেক বেশী জটিল, এবং দেশ থেকে দেশে তার অদলবদল হয়েছে।  ভারতের ক্ষেত্রে, সঙ্ঘ-জোট নয় দশক ধরে উগ্র হিন্দুত্বভিত্তিক জাতীয়তাবাদ গঠনে জোর দিয়েছে। তারা অন্য সব ধর্মের মানুষকে শত্রু হিসেবে দেখিয়েছে, বিশেষত মুসলিমদের মনুষ্যেতর পশু হিসেবে এবং তথাকথিত ভারতীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের চিরন্তন শত্রু হিসেবে দেখিয়েছে। নৈর্ব্যক্তিক পুঁজিবাদী যুক্তিতে এমন কিছু নেই যা এই দৃষ্টিভঙ্গীকে মদত দেবে। কিন্তু আর এস এস –সঙ্ঘ পরিবার যে শর্ত আরোপ করেছে, তা হল, তারা শাসক শ্রেণীর এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির জন্য খুবই লাভজনক কিছু পদক্ষেপ নেবে, যার বিনিময়ে তাদের থাকবে নিজেদের হিংসার রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা। দাভোলকার, পানসারে, কালবুর্গি এবং লঙ্কেশদের মত যুক্তিবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীদের হত্যা, নিছক মুসলিম হওয়ার অপরাধে সাধারণ মুসলিমদের হত্যা করা, যেখানে মহম্মদ আখলাক, পেহলু খান থেকে মহম্মদ আফ্রাজুল পর্যন্ত অভিযোগের চরিত্র হল গো-হত্যা, লাভ জিহাদ, আইসিসের চর হওয়া ইত্যাদি,  এই হিঙ্গসার রাজনীতিকে নগ্নরূপে তুলে ধরে।

মহম্মদ আফ্রাজুলকে আক্রমণ করা ও হত্যা করার পিছনে অভিযোগটা ইতিমধ্যে মামুলী হয়ে যাওয়া অভিযোগ – সে নাকি লাভ জিহাদের অংশীদার।  ব্যক্তিটি যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা মুসলিম শ্রমিক, সেটা তাৎপর্যপূর্ণ । বাংলাভাষী মুসলিমদের  বারে বারে আক্রমণ করা হয়েছে, অভিযোগ করা হয়েছে তাঁরা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী। এর প্রতিটি কথা বুঝে নিতে হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে মানুষ প্রধানত অর্থনৈতিক সংকটের ফলে এক দেশ থেকে আর এক দেশে যায়। সেটাকে এখন বলা হচ্ছে সন্তত্রাসবাদী চক্রান্ত। দ্বতীয়ত, নিজেদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণ করতে না পারলে বাংলাভাষীদের, বিশেষত মুসলিমদের বিদেশী বলা হচ্ছে। এটাও হল সারা ভারতে “হিন্দী-হিন্দু-হিন্দুস্তান” চাপিয়ে দেওয়ার  বৃহত্তর পরিকল্পনার অঙ্গ। আর অবশ্যই, যে কোনো মুসলিম, ভারতের যে কোনো প্রান্তে, আক্রমণের শিকার।

নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জয়পুরে তথাকথিত লাভ জিহাদ নিয়ে একটি পুস্তিকা প্রচার করা হচ্ছিল। সেটা তখনই বন্ধ করার বদলে পুলিশ কেবল তদন্ত করেছিল। লাভ জিহাদ একটা মিথ্যা, কিন্তু এমন এক মিথ্যা যার এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এতে দাবী করা হয় যে মুসলিমরা হিন্দুদের  ভালবাসার ভান করে, তাঁদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে। সাম্প্রতিক কালের কুখ্যাত ঘটনা, হাদিয়ার মামলাতে, কেরালা হাই কোর্ট তার বিয়ে নাকচ বলে ঘোষণা করেছিল, যদিও সে সব প্রমাণ দাখিল করেছিল যে সে নিজের ইচ্ছায় প্রথমে ধর্মান্তরিত হয়েছিল, এবং তার পর তার ভবিষ্যত স্বামীর সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল এবং তারা বিয়ে করেছিল; এবং স্ররবোপরি, সে একজন প্রাপ্তবয়স্কা। এমন কি সুপ্রীম কোর্টের ভূমিকাও এ পর্যন্ত এই ঘটনাতে পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়, কারণ সুপ্রীম কোর্ট এন আই এ কে এক সময়ে তদন্ত করতে বলেছে, এটা বাস্তবিক “লাভ জিহাদ” কি না।

আফরাজুলের ক্ষেত্রে, সে  মাঝ বয়সী, তার পরিবার আছে, যাদের খাওয়া পরার জন্যই সে কাজের খোঁজে গিয়েছিল। গোটা ভয়ংকর ঘটনাটা দেখায়, মুসলিমদের খুন করা প্রায় একটা স্বাভাবিক ঘটনাতে পরিণত হয়েছে, এবং হিন্দু উচ্চজাতির লোকেরা সেটা হয় অবহেলা করে, অথবা সোশ্যাল মিডিয়াতে গিয়ে বাংলাদেশ, সিরিয়া বা অন্যান্য দেশের ঘটনা টেনে   এনে ভারতে পরিস্থিতি কতটা বীভৎস সেটা লঘু করতে চায়। সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তিদের, যারা বহুত্ববাদী ভারতের রামধনুর সবকটা রঙ রক্ষা করতে চান তাঁদের দ্বারা প্রতিরোধ আবশ্যক। আর আমাদের সচেতন হতে হবে যে তেমন প্রতিরোধ সমস্ত দক্ষিণপন্থী দলমুক্ত হতে হবে, কেবল আর এস এস – বিজেপি মুক্ত নয়। প্রতিবাদ যখন ফেটে পড়ে, সেই সময়েই, কলকাতার আর এস এস সদর দপ্তর কেশব ভবনের কাছে কলকাতা পুলিশ প্রায় পঁচিশজন  প্রতিবাদীকে গ্রেপ্তার করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার  দেখাচ্ছে, মুখে বি জে পি-র সঙ্গে তাঁদের যে যুদ্ধ, সেটা আসল নয়, এবং তার যে কোনো স্বাধীন প্রতিবাদ ভেঙ্গে দিতে উৎসাহী।

এই আক্রমণগুলির জবাব দেওয়া সম্ভব রাস্তার লড়াই, আদালতের লড়াই এবং নির্বাচনী ক্ষেত্রের যৌথ সংগ্রামের মাধ্যমে। নির্বাচনী ক্ষেত্রে লড়াই নিশ্চয়ই করা দরকার। কিন্তু যারা সেটাকে প্রধান ক্ষেত্রে পরিণত করবেন, তাঁরা শেষ অবধি কংগ্রেস পরিচালিত জোটের বাড়তি চাকা হয়ে থাকবেন।সেখানে সামাজিক প্রসঙ্গ সব পিছনে চলে যাবে। এটা লক্ষ্যণীয় যে গুজরাটে নির্বাচনী প্রচার পুরোদমে চলছে, কংগ্রেসের সেখানে হঠাৎ উৎসাহ জন্মেছে রাহুল গান্ধীকে ভাল হিন্দু বলে প্রমাণ করার, এবং এই কারণে কংগ্রেস আফরাজুল হত্যার সরাসরি ও সুস্পষ্ট নিন্দা করে নি, যেখানে জোরটা পড়ার দরকার ছিল, সরকারী হিন্দুত্ববাদী প্রচার কীভাবে এইরকম ব্যক্তিগত খুনকেও ক্ষমতা দিচ্ছে। আর, সুপ্রীম কোর্ট বারংবার দেখিয়েছে, সামাজিক লড়াই বাদ দিয়ে নিছক আদালতের লড়াইয়ের কৌশল অনিশ্চয়তা পূর্ণ, কারণ আদালত খারাপ অবস্থান নিতেই পারে।  গণ জমায়েত, রাস্তায় প্রতিরোধ, এদেরই থাকতের হবে সূচনাবিন্দু।

র‍্যাডিকাল সোশ্যালিস্ট , ৮ ডিসেম্বর ২০১৭

 

 

জুলাইয়ের দিনগুলি --দানিয়েল গাইডো

জুলাইয়ের দিনগুলি

দানিয়েল গাইডো

বলশেভিকরা পারী কমুনের ভাগ্য এড়াতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁরা ১৯১৭-র জুলাইতে ক্ষমতা নেন নি।



১৮ই জুন , ১৯১৭ : পেত্রোগ্রাদে রাজনৈতিক শোভাযাত্রা। বাঁ দিকের ব্যানারে লেখা আছেঃ “সারা দুনিয়ার জন্য শান্তি – জনগণের হাতে সব ক্ষমতা – জনগণের হাতে সব জমি”। ডানদিকের ব্যানারে আছেঃ “পুঁজিবাদী মন্ত্রীরা নিপাত যাক”এগুলি ছিল বলশেভিক স্লোগান। 

১৯১৭ সালে রাশিয়াতে ছিলেন ১৬.৫ কোটির বেশী নাগরিক, যাদের মধ্যে মাত্র ২৭ লাখ থাকতেন পেত্রোগ্রাদে। রাজধানীতে থাকতেন ৩৯০,০০০ জন ফ্যাক্টরী শ্রমিক – এক তৃতীয়াংশ নারী –২১৫,০০০ থেকে ৩,০০,০০০ জন সৈনিক যারা ছাউনীতে থাকতেন, আর মোটামুটি ৩০,০০০ নাবিক ও সৈনিক যারা থাকতেন নিকটবর্তী ক্রোনস্টাড নৌ ঘাঁটিতে।

ফেব্রুয়ারী বিপ্লব এবং জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পদত্যাগের পর, মেনশেভিক এবং সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের নেতৃত্ত্বাধীন সোভিয়েতরা ক্ষমতা হাতে তুলে দিল এক অ-নির্বাচিত অস্থায়ী সরকারের হাতে, যারা বদ্ধপরিকর ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ  চালিয়ে যেতে, সংবিধান সভার নির্বাচন পর্যন্ত কৃষি সংস্কারের বিলম্ব ঘটাতে, আর সংবিধান সভার নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবী রাখতে।

ঐ সোভিয়েতগুলিই সৈনিকদের কমিটি গড়ার ডাক দিয়েছিল, এবং তাঁদের বলেছিল শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতিনিধিদের সোভিয়েতের নির্দেশ ও ডিক্রীর পরিপন্থী যে কোনো সরকারী নির্দেশ অমান্য করতে।  

এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তগুলি তৈরী করল একটি নড়বড়ে দ্বৈতক্ষমতা, যাতে দেখা দিল বারে বারে সরকারের সংকট। এই রকমের প্রথম সংকট দেখা দিল এপ্রিল মাসে, যার কারণ ছিল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, এবং যা শেষ হল যখন দুই প্রধান বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতা – সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক দল বা ক্যাডেট দলের পাভেল মিলিউকভ এবং অক্টোব্রিস্ট দলের আলেক্সান্দর গুচকভ বহিস্কৃত হলে তবে। উপরন্তু, এই সংকট দেখিয়ে দিল, পেত্রোগ্রাদ ছাউনীর উপর সরকারের অক্ষমতা। সৈন্যরা তৎকালীন সেনা প্রধান জেনারাল লাভর কর্নিলভের নয়, বরং পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের কার্যনির্বাহী কমিটির ডাকে সাড়া দিল।

পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের ১নং নির্দেশ, যা প্রকাশিত হয় পাশ্চাত্য ক্যালেন্ডারের ১৪ই মার্চ।

এই দলিলে সমস্ত সামরিক ইউনিটদের আহবান করা হয়, সৈনিকদের কমিটি নির্বাচন করার, সোভিয়েতে প্রতিনিধি পাঠাবার, এবং অফিসারদের ও অস্থায়ী সরকারকে মানার কেবল যদি তাঁদের নির্দেশ পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের নির্দেশ ও ডিক্রির পরিপন্থী না হয়।  সমস্ত অস্ত্র এই কমিটিদের হাতে তুলে দিতে বলা হয়, “এবং কোনো অবস্থাতেই যেন, এমনকি দাবী করলেও যেন, অফিসারদের দেওয়া না হয়”।

এই সংকট থেকে যে জোট সরকার বেরিয়ে এল, তাতে ছিলেন বুর্জোয়া ফলগুলি থেকে ন’জন মন্ত্রী আর তথাকথিত সমাজতন্ত্রী দলগুলি থেকে ছ’জন। প্রিন্স ল’ভভ প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রী থেকে গেলেন, কিন্তু যুদ্ধমন্ত্রী ও নৌবহরের মন্ত্রী হলেন সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী দলের আলেক্সান্দার কেরেনস্কী, এবং তিনি দ্রুত পরিণত হলেন সরকারের উঠতি তারকা।ক্যাবিনেটে আরো রইলেন মেনশেভিক দলের ইরাকলি সেরেতেলি – ডাক ও তাঁর বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে, এবং মাতভেই স্কোবেলেভ – শ্রম দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে। কৃষি মন্ত্রী এবং বিচার বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে জোটে যোগদান করলেন সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী ভিক্টর চের্নভ এবং পাভেল পেরেভেরঝেভ।

১৯১৭র গ্রীষ্মকালে বলশেভিক দল

১৯১৭র প্রথমার্ধে বলশেভিকদের কষ্ট করে লড়তে হয়েছিল। তাঁরা প্রথমে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মিছিলের বিরোধিতা করেছিলেন, যে মিছিল থেকে ফেব্রুয়ারী বিপ্লব ঘটে। তারপর মার্চের মাঝামাঝি থেকে বলশেভিক দল ভালরকম ডাইনে মোড় নেয়, যখন লেভ কামেনেভ, যোসেফ স্তালিন এবং এম কে মুরানভ সাইবেরিয়া থেকে ফিরে পার্টির মুখপত্র প্রাভদার উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন। তাঁদের নিয়ন্ত্রণে পত্রিকাটি অস্থায়ী সরকারের প্রতি সমালোচনামূলক সমর্থন প্রস্তাব করে, “যুদ্ধ নিপাত যাক” স্লোগানের বিরোধিতা করে, এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর মধ্যে ভাঙ্গন আনার কাজ বন্ধ করতে আহবান করে।

লেনিনের ‘দূর থেকে চিঠি’ গুলিতে ব্যক্ত মতের সঙ্গে এই মত তীব্র বৈপরীত্য দেখায়। সুতরাং এটা খুব বিস্ময়কর না, যে প্রাভদা সেগুলির কেবল প্রথমটাকে প্রকাশ করেছিল, এবং তাও আবার অনেক ছেঁটেকেটে । আলেক্সান্দার শ্লিয়াপনিকভের সাক্ষ্য অনুযায়ীঃ

“সংস্কারপ্রাপ্ত প্রাভদা”র প্রথম সংখ্যা প্রকাশনার দিন, অর্থাৎ ১৫ই মার্চ, ছিল “দেশরক্ষাবাদীদের” বিজয়োল্লাসের যুগ। গোটা টাউরিডে প্রাসাদ জুড়ে একটাই খবর উপচে পড়ছিল, ডুমা কমিটির সদস্যদের থেকে বিপ্লবী গণতন্ত্রের হৃদয়স্থল [সোভিয়েতের] কার্যনির্বাহী কমিটি পর্যন্ত – অতিবামদের উপর  নরমপন্থী, যুক্তিবাদী বলশেভিকদের জয়ের খবর। খোদ কার্যনির্বাহী কমিটিতে আমাদের দেখানো হয় বিষাক্ত হাসি।

যখন ৩রা এপ্রিল লেনিন ফিনল্যান্ড স্টেশনে উপস্থিত হন, তখন এই মতামতই বলশেভিক নেতাদের মধ্যে প্রধান ছিল। পরদিন, তিনি সারা রাশিয়া শ্রমিক ও সৈনিক সোভিয়েতদের সম্মেলনের জন্য আগত বলশেভিক প্রতিনিধির সামনে তাঁর এপ্রিল থিসিস (April Theses) পেশ করেন। কামেনেভ ও স্তালিনের বিপরীতে, লেনিন “বিপ্লবী প্রতিরক্ষাবাদকে” সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করলেন, এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বমূলক আচরণের প্রস্তাব রাখেন। উপরন্তু তিনি লিওন ট্রটস্কীর দিশা গ্রহণ করে বলেন “বিদ্যমান মূহুর্ত” হল বিপ্লবের প্রথম “বুর্জোয়া-উদারনৈতিক” পর্ব থেকে দ্বিতীয় “সমাজতন্ত্রী” পর্বে উত্তরণের সময়, যখন ক্ষমতা চলে যাবে শ্রমিক শ্রেণীর হাতে।

লেনিন বিরোধিতা করলেন স্তালিন ও কামেনেভের অস্থায়ী সরকারের প্রতি “সীমাবদ্ধ সমর্থনের” নীতির, তার বদলে ঐ সরকারকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করার ডাক দিলেন, এবং বলশেভিকরা কম জঙ্গী মেনশেভিকদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবেন এই ধারণাকে কাটিয়ে দিলেন। তখন থেকে, বলশেভিকরা সোভিয়েতদের হাতে সব ক্ষমতা হস্তান্তরের ডাক দিতে থাকেন, যে সোভিয়েতরা জনগণকে সশস্ত্র করবে, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের বিলুপ্তিসাধন করবে,  সমস্ত জমিদারী বাজেয়াপ্ত করবে, এবং উৎপাদন ও বন্টনের নিয়ন্ত্রণ শ্রমিকদের হাতে হস্তান্তর করবে।

বলশেভিক দলের সপ্তম (এপ্রিল) সারা রাশিয়া সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পেত্রোগ্রাদে, ২৪ থেকে ২৯ এপ্রিলে। এই সম্মেলনে যুদ্ধ এবং অস্থায়ী সরকার প্রসঙ্গে লেনিনের অবস্থান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন লাভ করে।

লেনিনের “এপ্রিল থিসিস”-এর প্রথম পৃষ্ঠা, প্রাভদায় প্রকাশিত

 

১৯১৭-র গোড়ায় বলশেভিক পার্টি ছিল ছোটো, পেত্রোগ্রাদে তাঁদের সদস্য ছিলেন মোটামুটি দু’হাজার, যা হল শহরের শিল্প শ্রমিকদের মাত্র ০.৫ শতাংশ। এপ্রিল সম্মেলনের মধ্যে পার্টির সদস্য সংখ্যা কেবল রাজধানীতেই বেড়ে হয়েছিল ষোল হাজার। জুনের শেষদিকে তা আবার দ্বিগুণ হয়। সেনা ছাউনীর দু’হাজার সৈন্য বলশেভিক সামরিক সংগঠনে যোগ দিয়েছিলেন, এবং আরো চার হাজার জন ক্লাব প্রাভদা নামে বলশেভিক সামরিক সংগঠন পরিচালিত সৈনিকদের জন্য একটি অপার্টি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। সদস্য সংখ্যার এই বিশাল বৃদ্ধি সংগঠনের রূপান্তর ঘটালো। তাতে এলেন দলে দলে নতুন সদস্য, যারা আবেগ প্রবণ, মার্ক্সসীয় তত্ত্ব কম জানেন কিন্তু বিপ্লবী লড়াইয়ের জন্য আকুল।  

ইতিমধ্যে বলশেভিকরা অন্যান্য সংগঠনদের নিজেদের দলে টেনে নিতে শুরু করলেন। ৪ঠা মে, জোট সরকার গঠনের আগের দিন, নির্বাসন থেকে ফিরলেন ট্রটস্কী। তিনি এবং লেনিন এখন একি জমিতে দাঁড়িয়ে দেখে ট্রটস্কী তাঁর সংগঠন, মেঝরায়ন্তসি বা পেত্রোগ্রাদের আন্ত:-জেলা সংগঠনকে লেনিনের দলের সঙ্গে যুক্ত করতে আরম্ভ করলেন।   

এই দ্রুত বিকাশ সত্ত্বেও বলশেভিকরা তখনও সংখ্যালঘু ছিলেন। ৩ রা জুন, শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতিনিধিদের সোভিয়েতদের প্রথম সারা রাশিয়া কংগ্রেস যখন শুরু হল, তখন তাঁরা ছিলেন মোট প্রতিনিধিদের দশ শতাংশেরও কম। জাতীয় স্তরের এই সভাতে ছিলেন ১০৯০ জন প্রতিনিধি, যাদের মধ্যে ৮২২ জনের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল। ছিলেন তিন শতাধিক শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষক সোভিয়েতের এবং ৫৩টি আঞ্চলিক, প্রাদেশিক ও জেলা সোভিয়েতের প্রতিনিধি। ১০৫ জন প্রতিনিধি নিয়ে বলশেভিকরা ছিল তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি, সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের (২৮৫) এবং মেনশেভিকদের ( ২৪৮ জন প্রতিনিধি) পিছনে।

এই সময়ে পেত্রোগ্রাদে বলশেভিক পার্টির তিনটি স্বতন্ত্র পার্টি নেতৃত্ব ছিল – নয় সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি, সারা রাশিয়া সামরিক কমিটি, এবং পিটার্সবুর্গ কমিটি। প্রত্যেকের নিজস্ব দায়িত্ব ছিল, যার ফলে তাঁরা স্বতন্ত্র, এবং কখনও কখনও পরস্পর-বিরোধী চাপের মুখে পড়তেন। কেন্দ্রীয় কমিটিকে গোটা দেশের কথা মাথায় রাখতে হত। ফলে তাঁরা অনেক সময়ে বেশী জঙ্গী গোষ্ঠীদের রাশ টেনে ধরতে বাধ্য হতেন।

জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট

বলশেভিক সামরিক সংগঠন স্থির করে, তারা ১০ই জুন অস্থায়ী সরকা্রের প্রস্তাবিত সামরিক আক্রমণের বিরুদ্ধে, সেনা ছাউনীতে শৃংখলার নামে কেরেনস্কী যেভাবে অফিসারদের কর্তৃত্ব ফেরাতে চাইছে তার বিরুদ্ধে, এবং রণক্ষেত্রে সেনা পাঠানোর হুমকীর বিরুদ্ধে গণ অসন্তোষ জানানোর জন্য প্রকাশ করতে একটি সশস্ত্র মিছিল ডাকবে। শেষ মূহুর্তে সোভিয়েত কংগ্রেসের বিরোধিতার কাছে নতি স্বীকার করে তারা মিছিল রদ করে।

বলশেভিক পার্টির কিছু কিছু সদস্য, বিশেষ করে পিটার্সবুর্গ কমিটিতে এবং সামরিক সংগঠনে, মনে করেছিলেন যে প্রস্তাবিত মিছিলটি হবে সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থান। বস্তুত, একটি জরুরী সভাতে লেনিনকে হাজির হতে হয়েছিল, প্রস্তাবিত মিছিলটি রদ করার পক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তের পক্ষে বলার জন্য। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে কেন্দ্রীয় কমিটি বাধ্য হয়েছিল, সোভিয়েত কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ মানতে, এবং বলেন যে প্রতিবিপ্লবীরা ঐ মিছিলকে নিজেদের কাজে লাগাবার চক্রান্ত করেছিল।

 

 বলশেভিক সামরিক সংগঠন

 

লেনিন যোগ করেনঃ

সাধারণ যুদ্ধেও এরকম ঘটে, যে রণনীতিগত কারণে পরিকল্পিত আক্রমণ রদ করতে হয়েছে , এবং আমাদের শ্রেণীযুদ্ধে সেটা ঘটার সম্ভাবনা আরো বেশী ... পরিস্থিতি বুঝে সাহসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

সোভিয়েত কংগ্রেস স্থির করল, এক সপ্তাহ পরে, ১৮ই জুনে, তার নিজের মিছিল হবে। সেনা ছাউনীর সবকটি ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হল, তারা যেন নিরস্ত্রভাবে মিছিলে আসে। বলশেভিকরা চার লাখের বেশীর এই মিছিলকে অস্থায়ী সরকার বিরোধী এক বিশাল বিক্ষোভে রূপান্তরিত করলেন। নিকোলাই সুখানভের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে আমরা পড়িঃ (https://archive.org/stream/russianrevolutio011007mbp/russianrevolutio011007mbp_djvu.txt

পিটার্সবুর্গের সমগ্র শ্রমিক ও সৈনিক সমাজ এতে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এই মিছিলের রাজনৈতিক চরিত্র কী ছিল? “আবার বলশেভিক”, আমি মন্তব্য করি, স্লোগানগুলো দেখে, “আর তাঁর পিছনে আরো একটি বলশেভিক মিছিল” ... “সভিয়েতের হাতে সব ক্ষমতা!” “দশজন পুজিপতি মন্ত্রী নিপাত যাক!’, “কুঁড়ে ঘরের জন্য শান্তি, প্রাসাদের উপরে যুদ্ধ!” এই শক্তিশালী ভাষায় শ্রমিক – কৃষকের পিটার্সবুর্গ, রুশ ও বিশ্ব বিপ্লবের অগ্রণী শক্তি, নিজের মত জানাল।

১০ইয়ের মিছিলে বলশেভিকদের অন্যতম মিত্র ছিল পেত্রোগ্রাদ ফেডারেশন অফ অ্যানার্কো-কমিউনিস্টস। অ্যানার্কিস্ট প্রভিশনাল রেভল্যুশনারী কমিটি তাঁদের মিত্রদের থেকে আরো একধাপ এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাইবর্গ জেল ভেঙ্গে বন্দী বলশেভিক সামরিক সংগঠনের পত্রিকা সম্পাদক খাউস্তভকে বার করে আনে।

এর জবাবে সরকার নৈরাষ্ট্রবাদীদের সদর দপ্তর হানা দেয়, এবং আস্নিন নামে তাঁদের একজন নেতাকে হত্যা করে। একদিকে কেরেনস্কীর জুলাই সামরিক আক্রমণ, আরেকদিকে নতুন অস্ত্র ও ফৌজে নতুন লোক আনার নির্দেশ, এবং তার সঙ্গে আস্নিনের হত্যা, সেনাবাহিনীর মধ্যে, বিশেষ করে প্রথম মেশিন গান রেজিমেন্টে, চাঞ্চল্য বাড়িয়ে তুলল। এই সৈনিকেরা অ্যানার্কো-কমিউনিস্টদের মদতে ১লা জুলাই থেকে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করতে থাকেন।

বলশেভিক সামরিক সংগঠনদের সারা রাশিয়া সম্মেলনে প্রতিনিধিদের সাবধান করা হল, তাঁরা যেন সরকারের ফাঁদে না পড়েন, অসময়ে, অসংগঠিত অভ্যুত্থান না ঘটান। ২০ জুন লেনিনের বক্তৃতায় আগাম এই কথাটাই বলা হয়ঃ

আমাদের বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে, সাবধান থাকতে হবে, যাতে আমরা ফাঁদে পা না দিই ... । আমরা একটা ভুল পদক্ষেপ নিলে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে ... । আমরা যদি এখন ক্ষমতা দখল করতেও পারি, আমরা তা ধরে রাখতে পারব মনে করা হবে ছেলেমানুষী।

আমরা একাধিকবার বলেছি যে বিপ্লবী সরকারের একমাত্র সম্ভাব্য রূপ হল শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষকদের প্রতিনিধি পরিষদ।

সোভিয়েতে আমাদের ফ্র্যাকশনের নির্দিষ্ট ভর কী? এমন কি দুই রাজধানীর সোভিয়েতেও আমরা নিতান্ত সংখ্যালঘু, অন্যান্য জায়গার কথা তো বলাই বাহুল্য। এই তথ্য কী দেখায়? এটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটা দেখায় যে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ দোদুল্যমান, কিন্তু এখনও এস আর এবং মেনশেভিকদের উপর আস্থা রাখছেন।

প্রাভদায় একটি সম্পাদকীয়তে লেনিন এই ধারণাতে ফিরে এলেন।

সেনাবাহিনী কুচকাওয়াজ করে মরতে গেল, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল, তারা স্বাধীনতা, বিপ্লব এবং দ্রুত শান্তির জন্য ত্যাগ স্বীকার করছে।

কিন্তু সেনাবাহিনী সেই কাজ করেছে কারণ তারা জনগণেরই একটি অংশ, যারা বিপ্লবের বর্তমান স্তরে সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী এবং মেনশেভিক দলদের অনুসরণ করছে। এই সাধারণ ও মৌলিক সত্য, যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেনশেভিক এবং সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের পেটি বুর্জোয়া নীতিতে আস্থা রাখছেন, যে নীতি ধনিকদের উপর নির্ভরশীল, আমাদের পার্টির অবস্থান ও আচরণকে নির্ধারণ করছে।

কিন্তু, ট্রটস্কীর কথায় (https://www.marxists.org/archive/trotsky/1930/hrr/ch24.htm ) শ্রমিক ও সৈনিকদেরঃ

মনে ছিল যে ফেব্রুয়ারীতে তাঁদের নেতারা বিজয়ের পূর্বাহ্নে পিছু হঠতে প্রস্তুত ছিলেন; যে মার্চে আট ঘন্টার শ্রম দিবস আদায় হয়েছিল নিচের তলা থেকে লড়াই করে; যে এপ্রিলে মিলিউকভকে রেজিমেন্টরা নিজস্ব উদ্যোগে রাস্তায় নেমে ছুঁড়ে ফেলেছিল। এই তথ্যগুলি স্মরণে আসায় জনতার উত্তেজিত এবং অস্থির মানসিকতা তীব্রতর হয়েছিল।

পেত্রোগ্রাদের সামরিক সংগঠনের নিচের দিকের নেতারা অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার মতের মোটামুটি সমর্থক ছিলেন, এবং বহু সাধারণ বলশেভিক দ্রুত অভ্যুত্থানকে অনিবার্য এবং কাম্য বলেই মনে করছিলেন।

কিন্তু ঠিক যখন কেরেনস্কীর আক্রমণ ধ্বসে পড়ার মুখে, তখনই সরকার আবার এক সংকটে পড়ল। ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় রাডার সঙ্গে কেরেনস্কির রফার প্রতিবাদে চারজন ক্যাডেট মন্ত্রী জোট সরকার ছেড়ে গেলেন। এই আচমকা পদক্ষেপের ফলে সরকারে এখন থাকল ছ’জন সমাজতন্ত্রী ও কেবল পাঁচজন বুর্জোয়া মন্ত্রী, এবং সরকার অসংগঠিত ও বিপন্ন হয়ে পড়ল। জুলাইয়ের দিনগুলি যখন শুরু হয়, ঠিক তখনই পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের শ্রমিক শাখাতে বলশেভিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেন, যা প্রমাণ করল, জনগণের মধ্যে তাঁদের প্রভাব বাড়ছিল।

সশস্ত্রমিছিল

জুলাইয়ের দিন নামে পরিচিত ঘটনাবলীর সূচনা হয় ৩রা জুলাই, যখন প্রথম মেশিন গান রেজিমেন্ট, অন্য কিছু সামরিক ইউনিটের সমর্থনে বিদ্রোহ শুরু করে। এই বিদ্রোহ শুরু হয় বলশেভিকদের দ্বিতীয় পেত্রোগ্রাদ নগর সম্মেলন চলছে এমন সময়ে (এই সম্মেলন শুরু হয় ১ জুলাই)।

যখন স্পষ্ট বোঝা গেল যে বেশ কয়েকটি রেজিমেন্ট পথে নেমেছে, তাঁদের সমর্থন করছে ব্যাপক শ্রমিক, এবং সাধারণ বলশেভিকরাও অংশ নিয়েছেন, তখনই  কেন্দ্রীয় কমিটি লড়াইয়ের অংশীদার হল, এবং পরামর্শ দিল যে পরদিন মিছিল সংগঠিত হোক বলশেভিকদের পতাকায়। যদিও কেন্দ্রীয় কমিটি বুঝেছিল যে প্রতিবাদীরা অস্ত্র নিয়ে বেরোবেন, কেন্দ্রীয় কমিটির পরামর্শে সশস্ত্র অভ্যুত্থান বা সরকারী প্রতিষ্ঠানদের দখলের কোনো কথা বলা হল না। বরং পার্টির প্রস্তাবে শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষকদের সোভিয়েতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বলশেভিক আহবানেরই পুনরাবৃত্তি করা হল। এইভাবে বলশেভিক সামরিক সংগঠন একটি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করল, যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে। এই অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণ পার্টিকে বিশৃংখলায় ঠেলে দিল। যারা কেন্দ্রীয় কমিটির কথা মেনে বিপ্লবকে পিছিয়ে দেওয়ার কথা বললেন, দেখা গেল তাঁদের সঙ্গে অন্যদের দ্বন্দ্ব হচ্ছে, বিশেষ করে সামরিক সংগঠনের এবং পিটার্সবুর্গ কমিটির সদস্যদের।

একটি বিপ্লবী দলের অবশ্যই বিপ্লবের সময়ে অসাধারণ বৃদ্ধি হয়। আমরা দেখেছি, পেত্রোগ্রাদে পাঁচ মাসের কম সময়ে বলশেভিক পার্টি বেড়েছিল ১৬০০ শতাংশ।  এই ঘটনা পার্টিকে অভূতপূর্ব চাপের মুখে ফেলেছিল। সেটা পার্টির বিভিন্ন সংগঠনে বিভিন্ন মাত্রায় দেখা দিয়েছিল, এবং সংগঠনকে ছিঁড়ে ফেলার বিপদ দেখা দিয়েছিল। কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা এটা ঠেকাতে পারে না। বিপ্লবী ঘটনাবলী কীভাবে এগোবে, তা নির্ভর করে অনেক রকম পরিস্থিতির উপর, যার মধ্যে একটি হল পার্টি নেতৃত্ব কতটা আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। এই কারণেই দল গড়ার কাজটা বিপ্লবের আঁচ লাগার পরও শুরু করা যায় না, যেটা প্রমাণ করেছিল জার্মান বিপ্লব।

৩রা জুলাই সশস্ত্র বিক্ষোভকারীরা কেরেনস্কীকে গ্রেপ্তার করার ব্যর্থ চেষ্টার পর টাউরিডে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। এই প্রাসাদে ছিল সোভিয়েত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির আসন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এই সংস্থাকে বাধ্য করা, যেন তারা অস্থায়ী সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়।

আনুমানিক ষাট থেকে সত্তর হাজারের এই জনতা প্রাসাদের প্রতিরক্ষা হঠিয়ে দিয়ে নিজেদের দাবী পেশ করেন। কার্যনির্বাহী কমিটি তা প্রত্যাখ্যান করল। ট্রটস্কী ঐ মূহুর্তের বিদ্রূপাত্মক চেহারাটা তুলে ধরে মন্তব্য করেছেন, যখন লাখ লাখ প্রতিবাদী চাইছিলেন যেন সোভিয়েত নেতারা ক্ষমতা হাতে তুলে নেন, তখন নেতারা এই বিক্ষোভ মিছিলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায় এমন সামরিক শক্তি খুঁজছিলেন।

ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের পর শ্রমিক ও সৈনিকরা মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের ক্ষমতা দিয়েছিলেন, কিন্তু এই দলগুলি চেষ্টা করল সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়াদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে, নিজেদের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের চেয়ে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে কাম্য মনে করে।  যখন জুলাইয়ের বিক্ষোভকারীরা বুঝলেন যে সোভিয়েতের  নেতারা তদের পুঁজিবাদী মিত্রদের ছাড়বেন না – যদিও তাঁদের অনেকে সরকার ছেড়ে দিয়েছিল – তখন পরিস্থিতি একটা বদ্ধ জায়গাতে আটকে পড়ল।

“কুত্তার বাচ্চা, যখন তোমাদের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে সেটা নিয়ে নাও!"

পরের দিন লেনিন ফিরে এলেন ফিনল্যান্ড থেকে, এবং তিনি সোজা চলে গেলেন ক্সেসিন্সকায়ার প্রাসাদে বলশেভিকদের সদর দপ্তরে। অল্প পরে, ক্রোনস্টাডের নৌঘাঁটি থেকে নাবিকরাও সেখানে উপস্থিত হলেন। অক্টোবর বিপ্লব পর্যন্ত লেনিনের এই ছিল শেষ প্রকাশ্য বক্তৃতা, এবং তিনি যা বললেন সেটা নাবিকদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। তিনি শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর জোর দিলেন এবং নিশ্চয়তা প্রকাশ করলেন যে “সোভিয়েতদের হাতে সব ক্ষমতা” স্লোগান জয়যুক্ত হবেই। তিনি বক্তৃতা শেষ করলেন নাবিকদের আত্মসংযম দেখাতে, দৃঢ়তা দেখাতে, এবং সজাগ থাকতে আহবান করে।

জুলাইয়ের দিনগুলি বলশেভিক কেন্দ্রীয় কমিটিকে, এবং লেনিনকে, এক ভিন্ন আলোকে দেখালো। তাঁরা রাজধানীতে একটি অকালীন অভ্যুত্থানঠেকালেন। যদি সেটা ঘটে যেত, তাহলে বলশ্রেভিকরা নিঃসঙ্গ হতে পারতেন, এবং বিপ্লবকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যেতে পারত, যেমন হয়েছিল পারী কমিউনে ১৮৭১ সালে এবং বার্লিনের স্পার্টাকাস অভ্যুত্থানে ১৯১৯ সালে।   

সেদিনও আনুমানিক ষাট হাজারের একটি মিছিল টাউরিডে প্রাসাদের দিকে রওনা হয়, কিন্তু তাঁদের দিকে গুলি চালানো হয় নেভস্কি এবং লিটেইনি স্ট্রীটের মোড়ে, এবং আবার লিটেইনি ও প্যান্টেলেমোনোভ স্ট্রীটের মোড়ে। তবে সবচেয়ে বেশী হতাহত হয় দুটি কসাক স্কোয়াড্রনের সঙ্গে সংঘর্ষে। তারা বিক্ষভকারীদের বিরুদ্ধে এমনকি গোলন্দাজদের ব্যবহার করে। রাস্তার উপরে এইমসরাসরি যুদ্ধের পর ক্রোনস্টাডের নাবিকরা ফিওদোর রাসকোলনিকভের নেতৃত্বে টাউরিডে প্রাসাদে পৌঁছে প্রথম মেশিন গান রেজিমেন্টের সঙ্গে যোগ দিলেন। 

তারপর ঘটে সেদিনের অন্যতম নাটকীয় ঘটনা, যা ছিল একাধারে ট্রাজিক ও হাস্যকর। সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের তাত্ত্বিক বলে পরিচিত নেতা ভিক্তর চের্নভকে পাঠানো হল প্রতিবাদীদের ঠান্ডা করতে। জনতা তাঁকে বন্দী করে, এবং একজন শ্রমিক ঘুষি পাকিয়ে তাঁকে বলে, “কুত্তার বাচ্চা, যখন তোমাদের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে সেটা নিয়ে নাও!"

চের্নভকে গ্রেপ্তার করার ঘোষণা করে তাঁকে কাছে একটি গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। ট্রটস্কির হস্তক্ষেপে মন্ত্রী বেচে গেলেন। সুখানভ সেই দৃশ্যের বিবরণ দিয়েছেনঃ

যতদূর দেখা যাচ্ছিল, জনতা ছিল উত্তেজিত ... গোটা ক্রোনস্টাড ট্রটস্কীকে চিনত, এবং মনে করা যায়, বিশ্বাস করত। কিন্তু তিনি বলতে শুরু করলেও জনতা ঠান্ডা হল না। যদি সেই মূহুর্তে উস্কানীমূলকভাবে কেউ একটা গুলি চালাত, তাহলে এক ভয়ানক হত্যাকান্ড ঘটে যেত, এবং আমাদের সকলকে, হয়তো ট্রটস্কীকেও, ছিড়ে ফেলা হত। ট্রটস্কী এত উত্তেজিত ছিলেন যে এই হিংস্র আবহাওয়াতে ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি অতি কষ্টে একেবারে সামনের সারির লোকেদের তাঁর কথা শোনাতে পারছিলেন... । তিনি যখন চের্নভের কাছে যেতে চেষ্টা করেন, গাড়ির কাছের সৈন্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে। ট্রটস্কী বলেনঃ “আপনারা এসেছেন আপনাদের মত জানাতে, এবং সোভিয়েতকে দেখাতে যে শ্রমিক শ্রেণী আর বুর্জোয়া শ্রেণীকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না । কিন্তু আপনারা কেন নগণ্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক কাজের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষতি করবেন? ... আপনারা প্রত্যেকে বিপ্লবের প্রতি তাঁর আনুগত্য দেখিয়েছেন। আপনারা প্রত্যেকে বিপ্লবের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। আমি সে কথা জানি। আপনার হাতটা দিন, কমরেড। ভাই, আপনার হাত দিন!” ট্রটস্কী হাত বাড়িয়ে দিলেন বিশেষভাবে হিংস্রতা দেখিয়ে প্রতিবাদ করছিল এমন এক নাবিকের দিকে। ... আমার মনে হল যে ঐ নাবিক, যে নিশ্চয়ই ক্রোনস্টাডে ট্রটস্কীকে একাধিকবার শুনেছে, তার এখন মনে হচ্ছিল যে ট্রটস্কী বেইমান হয়ে গেছে; তাঁর মনে পড়ছিল পুরোনো বক্তৃতাগুলি, এবং তাঁর সব গুলিয়ে যাচ্ছিল...। কী করতে হবে বুঝতে না পেরে ক্রোনস্টাদের নাবিকরা চের্নভকে ছেড়ে দিল।

পেত্রোগ্রাদ, ৪ জুলাই ১৯১৭। সৈন্যরা গুলি চালানো শুরু করলে নেভস্কি প্রসপেক্টে বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ জায়গা খুঁজছেন।

চের্নভ টাউরিডে প্রাসাদে ফিরে গেলেন এবং বলশেভিকদের নিন্দা করে আটটা সম্পাদকীয় লিখলেন। সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের পত্রিকা দিয়েলো নারোদা শেষ অবধি তাঁর চারটি প্রকাশ করেছিল।

কিন্তু অস্থায়ী সরকার সার্বিকভাবে এর চেয়ে অনেক জঘন্যভাবে বদলা নিল -- পরদিন, তারা এক মিথ্যা প্রচার শুরু করল, যে লেনিন (যিনি বন্ধ ট্রেনে করে জার্মানীর মধ্য দিয়ে রাশিয়াতে এসেছিলেন) জার্মান সেনাপতিদের চর।

প্রতিক্রিয়ার সাময়িক বিজয়

৫ই জুলাই সোভিয়েত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি এবং পেত্রোগ্রাদ সামরিক জেলা কর্তৃপক্ষ শহর দখল নিতে সামরিক অভিযান শুরু করল। সরকারের অনুগত ফৌজ ক্সেসিন্সকায়ার প্রাসাদ দখল করে এবং প্রাভদার ছাপাখানা ভেঙ্গে দেয়। লেনিন কোনোক্রমে পালিয়ে যেতে পারেন। তিনি ধরা পড়লে তাঁর পরিণতি স্পার্টাকাস অভ্যুত্থানের পরে রোজা লুক্সেমবুর্গ ও কার্ল লিবকনেশটের মত হত কি না তা নিয়ে ভেবে হয়তো লাভ নেই। কিন্তু দুদিন পরে পেত্রগ্রাদস্কায়া গাজেতা নামে দক্ষিণপন্থী সংবাদপত্রে এই ছবিটা ছাপা হয়েছিল। এ থেকে একটা সূত্র বেরোতে পারেঃ

লেনিন একটা উঁচু পদ চায়?... বটে? তার জন্য একটা পদ তৈরী আছে

সরকারের অনুগত সৈন্যরা পিটার ও পল দূর্গ দখল করল, যেটা বলশেভিক সামরিক সংগঠনের কথা অনুযায়ী প্রথম মেশিন গান রেজিমেন্ট তাঁদের কাছে সমর্পন করল। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির অনুগামীদের কাছে নির্দেশ পাঠাল, তাঁরা যেন পথে মিছিল করা বন্ধ করেন; শ্রমিকদের কাজে ফিরে যেতে এবং সৈনিকদের ছাউনীতে ফিরতে আহবান করা হল।

ইতিমধ্যে সরকার নির্দেশ দিল যে লেনিন, কামেনেভ ও গ্রিগরী জিনোভিয়েভ সহ নেতৃস্থানীয় বলশেভিকদের এবং ট্রটস্কী এবং আনাতোলি লুনাচারস্কি সহ আন্তঃ জেলা সংগঠনের নেতাদের যেন গ্রেপ্তার করা হয়। ট্রটস্কী সহ এই রাজবন্দীদের কয়েকজন, কর্নিলভের অভ্যুত্থানের সময়ে শ্রমিকদের প্রতিরোধ গড়তে জেল থেকে বেরোন, কিন্তু অন্যরা অক্টোবর বিপ্লব পর্যন্ত জেলেই থাকেন।

এইভাবে শেষ হল জুলাইয়ের দিনগুলি -- লেনিনের ভাষায় “মিছিলের চেয়ে অনেকটা বেশী আর বিপ্লবের চেয়ে কম”। বলশেভিক পার্টির কিছু নেতাকে আত্মগোপন করতে হয়। পার্টির সংবাদপত্রগুলি বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু এই পিছু হঠা ছিল সাময়িক। দক্ষিণপশ্চিম ফ্রন্টে একাদশ আর্মির আক্রমণ ব্যর্থ হল, জার্মান এবং অস্ট্রিয় ফৌজ বিপুল প্রত্যাক্রমণ করল, আর সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকল। ফলে বলশেভিকদের স্লোগান যে ন্যায্য, তা আবার বোঝা গেল।

বলশেভিক পত্রিকারা শীঘ্রই সামান্য নাম পরিবর্তন করে প্রকাশিত হল। পার্টি কমিটিরা নতুন করে পায়ের তলায় জমি খুঁজে পেল। আর বিদ্রোহী সামরিক বাহিনীগুলির অস্ত্র কেড়ে নেওয়া, যেমন চেয়েছিল সরকার, তা হুকুম দেওয়া যত সহজ ছিল, বাস্তবে করা অত সহজ ছিল না। অগাস্ট ১৯১৭তে কর্ণিলভের ষড়যন্ত্র পরাস্ত হলে চাকা আবার ঘুরে গেল। বলশেভিকদের ক্ষমতা দখলের সফল প্রয়াসের পূর্বশর্ত তৈরী হল।

 

 

 অনুবাদঃ কুণাল চট্টোপাধ্যায়

STATEMENT BY ANTICAPITALISTAS on Catalonia

CATALONIA/SPANISH STATE

Anticapitalistas statement on the situation in Catalonia.

 

Monday 30 October 2017, by Anticapitalistas

 

This statement was issued by Anticapitalistas, section of the Fourth International in the Spanish state, on 29 October 2017.

1- On 27 October, following the mandate of the referendum of 1 October in which more than 2 million people participated despite police repression, the Catalan Parliament proclaimed the Catalan Republic. In a Spain with a monarchy that is a direct successor of the dictator Franco, a Republic that opens up a constituent process is undoubtedly a proposal that breaks with the 1978 regime, with its political consensuses and with a constitutional order at the service of the elites. This proclamation tok place in a context of constant threats to apply Article 155 and give an authoritarian resolution to a conflict that has to have an eminently political and democratic solution. In fact, in recent days it had started to threaten the application of 155 whatever happened. We call to reject the application of article 155 and to the democratic, peaceful and disobedient defence of the will of the Catalan people and their right to decide.

2- It is important, in these times of exacerbation of patriotic passions, to correctly identify those responsible for what has happened. The Partido Popular, spurred on by Ciudadanos, with the support of the PSOE and the pressure of state apparatus, had decided to apply article 155 of the Constitution. The goal of this measure was to prevent a dialogue between Catalonia and the rest of the State, criminalizing the Catalan people, refusing to open the solution of a negotiated referendum and justifying the use of force to solve a political problem. An irresponsible measure, which seeks to reorganize the unity of the state based on authoritarian relations.

3- We are aware that many unknowns and uncertainties are open. To drug the people with easy slogans is characteristic of a conception of politics that shies away from democratic debate and which considers itself the protagonist of a story that actually the common people are leading. The new Catalan Republic faces internal challenges that it cannot ignore, in a country where a significant section of the population does not feel represented by independence. The first challenge of the process is to work to heal this division, integrating the non-pro-independence popular sectors into their country’s project, avoiding social divisions that only benefit the reactionary forces, while organizing a movement capable of resisting repression of the State. The constituent process must be used to go in that direction, integrating demands of the popular classes that go beyond the national question, putting social issues in the centre and radically democratizing Catalonia.

4- In the Spanish State, we are living through a complex wave of reaction. Many people, including people of the left, feel hurt and torn by what is happening in Catalonia. While it is true that much of this feeling is channeled through a Catalanphobic reaction, heir to the worst sentiments of the Franco regime, and into the violent expression of the extreme right in the streets, there is a large section of the population that is honestly worried by what is happening in Catalonia and is putting its trust in dialogue and negotiation, on the return of politics.

From our point of view, what is fundamentally at stake is the ability of people to decide their future. If the Catalan people suffer defeat and are crushed by the PP and its allies, when a territory, a town council, a community, or a social sector decides to decide freely on any matter, it will be crushed with the same logic with which today the PP and the state seek to crush Catalonia. This is the central issue, which goes beyond the national issue and puts the question of popular sovereignty at the centre: it is the people who have the right to decide, that is the basis of democracy, and the law must be at the service of democracy and not vice versa.

On the other hand, there are other solutions and forms of relationship between peoples that surpass those traditionally imposed in the Spanish State. The strategy of opening constituent processes has as a central idea that the working and popular classes, women, migrants, all the people who do not have the political and economic power but who are the indispensable ones elaborate a project of society. But it can also be a method of solving the historical problems of the Spanish State at the national level, a way of re-organizing the relations between the peoples in equality, where starting from respect for the right to decide and its results, builds bridges of union that the current imposed and authoritarian relationship of the central state breaks up; building forms of cooperation and dialogue among the people below to build an alternative society to that of political and economic elites. An opportunity to build a new framework of living together that allows us to aspire not only to win back but also to conquer new social and democratic rights for the popular classes.

5. We know that ours is a difficult position in a context like this. That is why it seems to us fundamental to debate, to dialogue between different democratic positions, but also to oppose the authoritarian intervention that the State plans with the excuse (it could have been any other) of the Catalan question. Defending the Catalan people who will suffer the brutal application of 155 is not only to defend the independentistas, but also to be with that 80% of the population in Catalonia that has been demanding a referendum and a democratic answer to their demands and the other 20% who will lose their self-government. It is to defend the possibility of a democratic exit from the impositions of the State. It is time to (re) start the patient construction of a project that goes beyond the 1978 regime, that is capable of building brotherly and sisterly relations between the different peoples of the Spanish State. The elites have proved incapable of solving the problems of the Spanish State; today more than ever, it is urgent to recover the leading role in politics for those from below.

On the Anticapitalistas site.

১৯১৭: বিপ্লবের মেয়েরা

১৯১৭: বিপ্লবের মেয়েরা

-মেগান ট্রুডেল

নারীরা শুধুমাত্র রুশ বিপ্লবের স্ফূলিঙ্গ ছিলেন না বরং বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যান ছিলেন

২৩ ফেব্রুয়ারী, ১৯১৭, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের পরও নেভস্কি প্রসপেক্টে মিছিল করে মেয়েরা রেশন বৃদ্ধির দাবী করছেন।সেন্ট পিটার্সবুর্গএর কিনো-ফোটো-ফোনো দলিল কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় আর্কাইভের সৌজন্যে

১৯১৭ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পেট্রোগ্রাদের ভাইবর্গ জেলার মহিলা বস্ত্র শ্রমিকেরা ধর্মঘট করেন। কারখানার কাজ বন্ধ রেখে শত শত মহিলা কারখানা থেকে কারখানা ঘুরে অন্য শ্রমিকদের ধর্মঘটে যোগ দিতে আহ্বান করছিলেন; ফলে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়েন।

দিনের পর দিন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিনে ১২-১৩ ঘণ্টা কাজ করেও অত্যন্ত কম মাইনে পেতেন নারী-শ্রমিকেরা। সেইজন্যেই তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন এবং পুরুষ শ্রমিকদের সক্রিয় সমর্থন চাইছিলেন; বিশেষতঃ কারিগরি ও ধাতব কারখানায় শ্রমরত দক্ষ শ্রমিকদের সক্রিয়তা আশা করছিলেন বেশি করে কারণ, তাঁরাই ছিলেন শহরের সবচেয়ে রাজনীতি-সচেতন অংশ। মহিলারা কারখানার দরজায় লাঠি, পাথর ও বরফবল ছুঁড়ে জোর ক’রে কারখানায় ঢুকে পড়তে চেষ্টা করেন। তাঁদের সমস্বর স্লোগান ছিল যাতে যুদ্ধ শেষ হয় এবং নিকটাত্মীয়েরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঘরে ফেরেন।

তৎকালীন বহু ইতিহাস-বিশেষজ্ঞের মতে যে নারীরা রুটির জন্যে লড়ছিলেন, তাঁরা বহু সময় ধরে প্রাচীন পন্থায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন পুরোপুরি অর্থনৈতিক দাবিতে। তাঁদের সংগ্রামে হৃদয়াবেগ যত ছিল, তাত্ত্বিক ভিত্ত তত ছিল না। তাঁরাই ছিলেন জারের বিরুদ্ধে ঝড়ের পূর্বাভাস কিন্তু অচিরেই তাঁরা বিপ্লবী পুরুষ-শ্রমিকদের ভিড়ে এবং পুরুষশাসিত রাজনৈতিক দলগুলির প্রাধান্যে হারিয়ে গেলেন।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের প্রাক্‌-সময় থেকেই যুদ্ধবিরোধী স্লোগানই ছিল প্রতিবাদের মূল নির্যাস। নারীদের ঔদ্ধত্য, একাগ্রতা এবং পদ্ধতি কয়েকটা জিনিস পরিস্কার করে দিয়েছিল যে, তাঁরা নিজেদের সমস্যার শিকড় বুঝেছে, শ্রমিক-ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা বুঝেছে এবং জারের পক্ষ থেকে বিপ্লবের পক্ষে সৈন্যদের টেনে আনার প্রয়োজনীতা উপলব্ধি করেছেন। পরবর্তী কালে ট্রটস্কি লিখেছিলেন-

“শ্রমিক ও সৈন্যদের মধ্যে সম্পর্করক্ষায় নারীদের ভূমিকা অতুলনীয়। যে কোনো কর্ডন ভাঙ্গতে পুরুষদের থেকে বেশি উৎসাহী ছিলেন তাঁরা। রাইফেল ধরতেও বেশি দক্ষ ছিলেন; আর, তাঁদেরই দৃঢ়চেতা স্বর ছিল, ‘বেয়নেট ফেলে দাও। আমাদের সঙ্গে যোগ দাও।’ সৈন্যরা উত্তেজিত হত, লজ্জিত হত, উদ্বিগ্ন দৃষ্টিবিনিময় করত এবং হাত নাড়ত তাঁদের উদ্দেশে। কোনও একজন প্রথমে মন শক্ত ক’রে আগ্রণী জনতার কাঁধের ওপরে বন্দুক রেখেছিল অপরাধবোধ নিয়েই।”

২৩শে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই যে সমস্ত সৈন্য ট্রাম ডিপোর রক্ষী ছিলেন, তাঁরা নারী-শ্রমিক ও আন্দোলনকারীদের কথায় সরকারের বিরুদ্ধে চলে যান সৈন্যদের বিপক্ষ থেকে পক্ষে নিয়ে আসার এই কাজটা শুধুমাত্র যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির বোঝা বেড়ে যাওয়া কিংবা আন্দোলনের ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ প্রভাবের ফলেই সম্ভবপর হয়নি। ১৯১৪ সাল থেকেই পেট্রোগ্রাডের বিদ্রোহী কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন মহিলা বস্ত্র শ্রমিকেরা। ব্যারাকের সৈন্যরা এবং কারখানার মহিলারা যাঁরা একই অঞ্চল থেকে শহরে এসেছিলেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, ফলে শ্রমিক ও সৈন্যের ভেদাভেদ ঘুচে গিয়েছিল। আর, নারী শ্রমিকরাও প্রয়োজনের মুহূর্তে সশস্ত্র সাহায্যের পূর্ণ আশ্বাস পেয়েছিলেন।

নারী শ্রমিকরা ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সামনের সারিতে ছিলেন, যে বিপ্লব জার সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করেছিল। বহু পুরুষ শ্রমিক ও বিপ্লবীর প্রারম্ভিক সংশয় সত্ত্বেও তাঁরা শুধুমাত্র ‘স্ফূলিঙ্গ’ ছিলেন না, বরং নিঃসন্দেহে আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিলেন!

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবকে সাধারণতঃ অভিহিত করা হয় ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ বিদ্রোহ বলে। হয়তো কিয়দংশে তা সত্যি, কারণ, বিপ্লবীদের পরিকল্পনামাফিক এই বিপ্লব নির্মিত বা পরিচালিত হয়নি। কিন্তু, স্বতঃস্ফূর্ততা মানেই যে রাজনীতির অভাব তা ক্ষেত্রে ঘটেনি। যে মেয়েরা পেট্রোগ্রাডের কল-কারখানায় কাজ করতেন এবং তাঁদের বাড়ির দায়িত্ব সামলাতে দীর্ঘক্ষণ খাবারের লাইনে দাঁড়াতেন, তাঁদের অভিজ্ঞতায় ‘খাদ্যের’ অর্থনৈতিক দাবি এবং বিপ্লবের রাজনৈতিক দাবির কোনও ফারাক ছিল না। ক্ষধা এবং দারিদ্র্য থেকে উদ্ভূত বস্তুগত পরিস্থিতি সঠিক দিশাতেই পরিচালিত হয়েছিল- যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরিচালক রাজনৈতিকদের বিরুদ্ধে। সেই সব দাবি কখনোই পূরণ হত না এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ছাড়া।

এছাড়া, বলশেভিক নারীরা বহুবছর অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন অদক্ষ, অসংগঠিত নারী শ্রমিকদের সংগঠিত করতে, তাঁরাই ছিলেন ধর্মঘটের মধ্যমণি। যদিও তাঁদের নিজেদের পার্টির পুরুষদের বক্তব্য ছিল যে, নারীদের সংগঠিত করার অর্থ জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে বিচ্যুতি এবং উচ্চশ্রেণির নারীবাদীদের ক্রীড়নক হয়ে শ্রেণি সংগ্রাম থেকে বিযুক্তি।

বিপ্লবী আন্দোলনের বহু পুরুষের ধারণা ছিল যে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিবাদ মিছিল অপরিণত পদক্ষেপ এবং দক্ষ শ্রমিকরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নারী শ্রমিকদের অপেক্ষা করা উচিত। পার্টির ভেতরে সংখ্যালঘু নারী সদস্যরা ভাইবর্গ জেলায় একটি সমাবেশ করার পক্ষে যুক্তি দেন যেখানে যুদ্ধ ও মূল্যবৃদ্ধি বিষয়ে আলোচনা হবে এবং সক্রিয় নারী সদস্যরা আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যুদ্ধবিরোধী প্রদর্শন সমাবেশ করবেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতমা হলেন আনাস্তাসিয়া দেভিয়াৎকিনা যিনি একাধারে বলশেভিক, শ্রমিক; ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরে তিনি সৈন্যদের স্ত্রী-দের নিয়ে একটি ইউনিয়ন গঠন করেন।

ফেব্রুয়ারির পর থেকে অক্টোবর বিপ্লবের দিকে যাওয়ার পথে নারী সদস্যরা ক্রমেই অন্তর্হিত হচ্ছিলেন। কয়েকজন মাত্র মহিলা বিপ্লবী টিঁকে ছিলেন যেমন আলেকজান্দ্রা কোলনতাই, নাদেঝদা ক্রুপস্কায়া ও ইনেসসা আরমান্দ; ব্যক্তিগত জীবন, স্ত্রী বা প্রেমিকা হিসেবে ভূমিকার বাইরে মাঝেমাঝেই যাঁদের সক্রিয়তা ও তাত্ত্বিক অবদানের ব্যাপারে পর্যালোচনা হয়।

জারতন্ত্রের অবশেষ থেকে উদ্ভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মেয়েরা প্রধানত অনুপস্থিৎ ছিলেন। গ্রামীণ পরিষদগুলিতে, সংবিধান সভার প্রতিনিধি হিসেবে, অথবা সোভিয়েতের প্রতিনিধি হিসেবে, উপস্থিত ছিলেন খুব নগন্য সংখ্যক মেয়ে। কারখানা কমিটির নির্বাচনগুলোও পুরুষ-দমিত ছিল, যারা এমনকি সেই সব কারখানাতেও প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন, যেখানে মহিলা শ্রমিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। এর কারণ দ্বিবিধ, যদিও পরস্পর সম্পর্কিতঃ অভাবের সংসারে মহিলাদেরই মূল দায়িত্ব ছিল পরিবার প্রতিপালনের এবং উচ্চতর সক্রিয় রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁদের আত্মবিশ্বাস, পড়াশুনা সর্বোপরি সময়ের খুবই অভাব ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী যে শোষণমূলক বাস্তবতার মধ্যে রাশিয়ার শ্রমজীবী নারীদের বেঁচে থাকতে হত, তাঁদের শোষণের যে বস্তুগত বাস্তবতা, সেটার ফলে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল তাঁদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার ক্ষমতা, যদিও তাঁদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ছিল।

১৯১৭ সালের আগের রাশিয়া ছিল প্রধানত একটি কৃষক সমাজ।  জারের সর্বময় কর্তৃত্বকে কায়েম করা ও  মজবুত করার কারজটা করত চার্চ। সেই কর্তৃত্ব প্রতিফলিত হত পরিবারের মধ্যেও। বিবাহ ও বিবাহ-বিচ্ছেদ ছিল চার্চ ও ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; আইনমতে নারীরা হীনতর অবস্থানে ছিল, এবং তাঁদের মনুষ্বেতর প্রাণী এবং সম্পত্তি বলে ভাবা হত। সাধারণ রুশ প্রবাদে এই মতাদর্শের ভাবাবেগই প্রকাশিত হত, যেমন- “মনে হল যেন দু’জন মানুষ দেখলুম। কিন্তু আসলে একজন পুরুষমানুষ আর তার বউ।”

পরিবার ছিল প্রত্যক্ষ পুরুষতান্ত্রিক এবং প্রত্যাশা করা হত যে প্রবল পাশবিক পরিবেশেও মেয়েরা নীরব, নিস্ক্রিয় থাকবে। মনে করা হত তাঁরা নীরবে হাতফেরত হবে পিতার অধীনতা থেকে স্বামীর অধীনতায়, প্রায়শই প্রথাসিদ্ধ হিংসার শিকার হবে। কৃষক ও শ্রমিক নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবল খাটনি খাটতে বাধ্য হতেন। শাস্তিমূলক কাজ করতে বাধ্য হতেন। গোদের ওপরে বিষফোঁড়ার মতো ছিল সন্তানদের দেখাশোনা করা ও গৃহকর্মের দায়িত্ব, এবং এমন এক যুগে যখন সন্তানের জন্ম দেওয়া ছিল কঠিন ও বিপজ্জনক,  যখন গর্ভনিরোধক ছিল না এবং শিশুমৃত্যুর হার ছিল চড়া।

এতদ্‌সত্ত্বেও ১৯১৭-র বিপ্লবে নারীদের ভূমিকা শূণ্য থেকে পড়ে নি। রাশিয়ায় একটা দ্বান্দ্বিকতা ছিলঃ সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত জনগণের অবর্ণনীয় দারিদ্র্য ও তাঁদের উপর মুষ্টিমেয়র অত্যাচার থাকলেও ১৯০৫ সালের আগের দশকগুলিতে রাশিয়ার অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠেছিল। প্রচুর আধুনিক কলকারখানায় উৎপাদিত হচ্ছিল বস্ত্র ও অস্ত্র। রেলপথ দ্রুত বাড়তে থাকা নগরগুলোর মধ্যে যোগাযোগ তৈরী করছিল; আন্তঃরেলপথের বাড়বাড়ন্ত এবং ইউরোপ থেকে আশা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ফলে লোহা ও তেল উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল।

অর্থনীতির এই নাটকীয় পরিবর্তন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রাশিয়ার সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটিয়েছিলঃ বৃহৎ সংখ্যায় কৃষক নারীরা কারখানার শ্রমিক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। এর একটা কারণ যেমন ছিল ক্রমবর্দ্ধমান দারিদ্র্য তেমনই যান্ত্রিক চাহিদার যুগে কারখানার মালিকদের প্রয়োজন ছিল প্রচুর পরিমাণে অদক্ষ শ্রমিক যারা সমস্ত শর্ত মানতে ‘বাধ্য’ থাকবে। আর, তাই লিনেন, কটন্‌, রেশম, পশম, সেরামিক ও কাগজশিল্প সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের হার বৃদ্ধি পেয়েছিল।

মেয়েরা ধর্মঘটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ১৮৯৬ সালে বস্ত্রকলে ধর্মঘটে, রুশ-জাপান যুদ্ধ শুরুর আগে বাধ্যতামূলক ভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের প্রতিবাদে, এবং বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বিপ্লবে, যখন বস্ত্র, তামাক, মিষ্টি শিল্পের অদক্ষ নারী শ্রমিকরা এবং গৃহ-পরিচারিকা ও ধোপানিরা ধর্মঘট করেছিলেন এবং সার্বিক, ব্যাপক আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইউনিয়ন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব নারী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে নির্নায়ক হয়েছিল। যুদ্ধ পরিবারদের ধ্বংস করে, ও নারীদের চরম দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে ফেলেছিল। লাখ লাখ পুরুষ যুদ্ধে গিয়ে হয় আহত হচ্ছিল নয়তো মারা যাচ্ছিল, তার ফলে কৃষিকাজ সামলানো, গৃহস্থকাজ সামলানো এবং শহরের কারখানায় শ্রমিক হয়ে দিনযাপনে বাধ্য হচ্ছিলেন নারীরা। ১৯১৪ সালে নারীশ্রমিক ছিলেন মোট শ্রমিকের ২৬.৬%, যেটা ১৯১৭ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৩.৪% তে। এমনকি দক্ষ, সংগঠিত ক্ষেত্রেও এই বৃদ্ধির হার ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯১৪ সালে ধাতব শিল্পে নারী শ্রমিক ছিলেন মাত্র ৩%, যা ১৯১৭ সালে বেড়ে হয়েছিল প্রায় ১৮%!

ফেব্রুয়ারি বিপ্লব পরবর্তী দ্বৈত ক্ষমতার পরিস্থিতিতে নারীদের প্রতিবাদ অন্তর্হিত হয়নি বরং তা প্রকট হয়ে উঠেছিল। এই প্রতিবাদ একটা প্রক্রিয়া অংগ হয়ে পড়ল, যার মাধ্যমে শ্রমিকদের সমর্থন প্রবাহিত হতে থাকে বেশী করে সরকার থেকে সোভিয়েতের পক্ষে, এবং সেপ্টেমবরের মধ্যে সোভিয়েতের অন্দরে  নরমপন্থী সমাজতন্ত্রী মেনশেভিক- সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীদের থেকে বলশেভিক বিপ্লবীদের পক্ষে।

নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা আশা করেছিলেন যে, জারতন্ত্রের পতনের পরে তাঁদের শোচনীয় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে; কিন্তু অচিরেই সে আশায় জল ঢেলে দেয় তৎকালীন সরকার ও সোভিয়েত নেতৃত্ব যখন তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদের মুখে মে মাসের মধ্যেই প্রথম অস্থায়ী সরকারের পতন ঘটল। মেনশেভিক ও সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীরা উদারনৈতিকদের সাথে মিলে জোট সরকার গঠন করল- কিন্তু সেটাও যুদ্ধের পক্ষেই ছিল। শ্রমিকদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা পরিণত হল একের পর এক ধর্মঘটে, যেখানে আবার নেতৃত্ব দিলেন নারী শ্রমিকরা। বলশেভিক সোফিয়া গনচারেস্কায়ার নেতৃত্বআধীন একটি ইউনিয়নের উদ্যোগে প্রায় ৪০ হাজার রজক-শ্রমিক ধর্মঘট করেন, বেতনবৃদ্ধি,  দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি, কর্মক্ষেত্রের আবহ উন্নতি- যেমন, স্বাস্থ্যসম্মত কর্মক্ষেত্র, মাতৃত্বকালীন সুযোগসুবিধা (কারখানার মাটিতে বাচ্চার জন্ম না দেওয়া অবধি গর্ভবতী শ্রমিক নারী অনেক সময়েই গর্ভাবস্থা লুকিয়ে রাখতেন, এটা অস্বাভাবিক ছিল না) এবং যৌনহেনস্থা বন্ধের দাবি। ইতিহাসবিদ্‌ জেন ম্যাকডারমিড এবং অ্যানা হিলিয়ার লিখছেনঃ

ইউনিয়নের অন্যান্য সদস্যাদের সঙ্গে গনচারস্কায়া এক লন্ড্রী থেকে অন্য লন্ড্রীতে গিয়ে মেয়েদের ধর্মঘটে সামিল হতে উদবুদ্ধ করেছিলেন। চুল্লী নেভানোর জন্যে তাঁরা বালতিতে করে ঠাণ্ডা জল ঢালতেন। একটি লন্ড্রীতে মালিক একটি ক্রো-বার নিয়ে মারতে এসেছিলেন গনচারেস্কায়াকে। তখন অন্যান্য শ্রমিকরা পেছন থেকে টেনে ধরে তাঁকে বাঁচান।

অগাস্ট মাসে জেনারেল কর্নিলভ যখন বিপ্লবকে টুঁটি টিপে মারতে চাইছিলেন, তখন পেত্রোগ্রাদ রক্ষায় এগিয়ে এলেন নারী শ্রমিকেরা। তাঁরা ব্যারিকেড তৈরি করে ও প্রাথমিক চিকিৎসা করে সহায়তা করতে লাগলেন। অক্টোবরে, বলশেভিক নারীরা প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি স্থানীয় অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতে লাগলেন। কয়েকজনের দায়িত্ব ছিল পেত্রোগ্রাদের কিছু অঞ্চলে বিদ্রোহ সংগঠিত করা; আর, রেড গার্ডের নারীরাও এই ব্যাপারে সাহায্য করছিলেন। ম্যাকডারমিড ও হিলিয়ার অপর এক বলশেভিক নারীর ব্যাপারে লিখছেনঃ

জুলাইয়ের দিনগুলির পর অস্থায়ী সরকার যখন শ্রমিকদের অস্ত্র কেড়ে নিতে চেষ্টা করেছিল, তখন ট্রাম কন্ডাক্টার রোডিওনোভা নিজের ডিপোতে ৪২টি রাইফেল এবং অন্য অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন। অক্টোবরে তাঁর দায়িত্ব ছিল মেশিন গান ভর্তি দুটো ট্রাম যেন ডিপো থেকে উইন্টার প্যালেস দখলের জন্য ছেড়ে যায়। তাঁকে নিশ্চিত করতে হয়েছিল যেন ২৫ অক্টোবর-২৬ অক্টোবর রাতে ট্রাম চলাচল চালু থাকে, যাতে ক্ষমতা দখলে সহায়তা করা হয়, এবং সারা শহর জুড়ে লাল রক্ষী বাহিনী যারা বিভিন্ন জায়গায় নিয়োজিত, তাঁদের কাজের তদারকী করা।

বিপ্লব যে পথ ধরে এগোতে থাকল, তার ফলে ব্যবধান বাড়ছিল একদিকে শ্রমজীবী মহিলাদের সঙ্গে অন্যদিকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সমর্থক নারীবাদীদের, কারণ শ্রমজীবী মেয়েদের জীবনযন্ত্রণা বেড়েছিল যুদ্ধের জন্য, তাই তাঁদের শান্তির আবেদন চীৎকারে পরিণত হয়েছিল বছরটা যত গড়িয়েছিল। যেসমস্ত উচ্চশ্রেণিভুক্ত নারীবাদীরা আইন ও শিক্ষাক্ষেত্রে সমতাবিধান ও সামাজিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোনরত ছিলেন, তাঁরা ভেবেছিলেন যে যুদ্ধের সপক্ষে নবনিযুক্ত সরকারের তোষামোদী করলেই সেইসব দাবি পূরণ হবে। ভোজসভায় আসনের মূল্য হল দেশপ্রেমের প্রমাণ দেওয়া!

 

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরে নারীবাদীরা নতুন উদ্যমে সর্বজনীন ভোটাধিকারের আন্দোলন শুরু করলে, তা মান্যতা পায় জুলাই মাসে, যা ছিল এক উল্লেখযোগ্য বিজয় । কিন্তু, অধিকাংশ মেয়েদের জীবনে সামান্যই পার্থক্য আনল, কারণ তাঁদের জীবন তখনও দুরবস্থায় ছিল, দৈনন্দিন ঘাটতি, দীর্ঘক্ষণের পরিশ্রম এবং পরিবারের শ্রমের যাঁতাকলে পড়ে। কোলোনতাই ১৯০৮ সালে লিখেছিলেনঃ

নারীবাদীদের দাবি আপাতভাবে যতই বিপ্লবাত্মক হোক না কেন, তাঁদের শ্রেণিগত অবস্থানের কথা মাথায় রেখে এটাও ভাবা দরকার যে, তাঁরা সমকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আমূল বদলের জন্যে সংগ্রাম করবেন না, যেটা ব্যতিরেকে নারীদের মুক্তি সম্পূর্ণ হওয়া অসম্ভব।

 

অধিকাংশ শ্রমিক-কৃষক মহিলার জন্যে শোষণমুক্তি ও সমতাবিধান শুধুমাত্র বিমূর্ত কথার কথা ছিল না বরং তাঁদের নিজেদের ও শিশুদের তথা পরিবারের অবস্থা উন্নতির লড়াইয়ের থেকে বেরিয়ে এসেছিল। যাঁরা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক এবং বেশী দ্বিধাহীন হয়ে উঠলেন, অনেক সময়ে বলশেভিক পার্টির সদস্যা হিসেবে, তাঁরা সেটা হলেন যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ের ফলে – যার কেন্দ্রে ছিল ক্ষুধা ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং জমির মালিকানার পক্ষে সংগ্রাম। রবার্ট সার্ভিস বলছেনঃ

বলশেভিকদের রাজনৈতিক কর্মসূচী শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের কাছে দারুণ গ্রহণযোগ্য হয়েছিল কারণ, শরতের শেষ দিকে সামাজিক অস্থিরতা এবং আর্থিক সংকট চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু, সেটাই অক্টোবর বিল্পবের জন্যে যথেষ্ট ছিল না।

এটা নারী কৃষক, শ্রমিক এবং সৈনিকদের স্ত্রীরা ততটাই অনুভব করেছিলেন, যতটা করেছিলেন তাঁদের পুরুষ সমগোত্রীয়রা। পেত্রোগ্রাদের অদক্ষ শ্রমিকদের ব্যাপক অংশের সমর্থন ছাড়া, যাদের একটা বড় অংশ মহিলা, তাঁদের জন্যেই অক্টোবর অভ্যুত্থান সফল হত না। বলশেভিকদের প্রতি সমর্থন কোনও অন্ধ অনুসরণ নয় বরং ট্রটস্কির ভাষায়, লক্ষ লক্ষ নারী ও পুরুষ শ্রমিকের “চেতনার সযত্ন ও কষ্টার্জিত বিকাশ”। অক্টোবরের মধ্যে সবরকম প্রচেষ্টাই করা হয়েছিল- অস্থায়ী সরকার ও মেনশেভিকরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, মিছিলের জবাবে এসেছিল হয় দমনপীড়ন না হলে সামান্য অগ্রগতি যা আর তাঁদের উন্নত জীবনের আশাপূরণ করছিল না। সর্বোপরি, কর্নিলভের সামরিক উত্থান ব্যাপারটা পরিস্কার করে দিয়েছিল যে- লক্ষ্যপূরণে এগোও নয়তো ধ্বংস হও! একজন শ্রমিকের কথায়, “বলশেভিকরা সবসময় বলত যে, ‘আমরা নয়, জীবন তোমাদের লক্ষ্যপূরণে উদ্যমী করে তুলবে।’ আর, এখন তাদের কথাই সত্যি হল কারণ জীবন তাঁদের রণকৌশলকে সঠিক বলে প্রমাণ করেছে।”

বলশেভিকরা নারী প্রসঙ্গকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, সেটা তাঁদের কৃতিত্বের কথা। যদিও, এখনকার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে নারীরা ভীষণভাবেই কম গুরুত্ব পেত; তবু, তাঁদের সংগঠিত করা ও উন্নতির জন্য গভীরভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল। বলশেভিকরা যে অন্যান্য সমাজতন্ত্রী দলগুলোর থেকে নারী শ্রমিকদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য বেশী কাজ করেছিলেন, সেটা সবসময়ে নারী অধিকারের প্রতি অধিক মাত্রায় অঙ্গীকয়ারের জন্য নয়।

মেনশেভিক ও বলশেভিক দুই পার্টিই মনে করেছিল নারীদের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর অঙ্গ  হিসেবে আদানপ্রদান চালাতে। কিন্তু, বলশেভিকরা নারী-পুরুষ সমানাধিকারের লড়াইকে সরকার ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের শ্রেণীগত রণনীতির ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে যেসমস্ত দল যুদ্ধের পক্ষে ছিল ও উচ্চশ্রেণির বা মালিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখত, তারা শুধুমাত্র নারী শ্রমিকদের ধর্মঘটের রিপোর্ট করতে পারত আর রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আলোচনা চালাত; কিন্তু নারীদের দুঃসহ বাস্তবতার কোনও নিশ্চিত সমাধান ছিল না তাদের কাছে।

 

বলশেভিকরা দ্রুত মহিলাদের রাজনীতিকরণ ও সঙ্ঘবদ্ধ করার চেষ্টা শুরু করেছিলেন- তাঁরা কিছুটা শিক্ষা পেয়েছিলেন ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের বারুদ থেকে আর কিছুটা পেয়েছিলেন তাঁদের নারী সদস্যাদের জেদের ফলে।

 

কোলোনতাই, ক্রুপ্সকায়া, আর্মান্দ, কনকর্দিয়া স্যামোইলোভা ও ভেরা স্লুৎস্কায়ার মতো অগ্রণী বলশেভিক নারীরা বহুদিন যাবৎ পার্টিকে বলছিলেন যাতে পার্টি নারীদের সংগঠিত ও রাজনীতিকরণের ব্যাপারে বিশেষ প্রচেষ্টা করে। পুরুষ কমরেডদের যুক্তির বিরুদ্ধে তাঁদের দীর্ঘদিনের লড়াই ছিল এই প্রতিযুক্তিতে যে, অদক্ষ অসংগঠিত নারী শ্রমিকদের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে এবং কোনওমতেই তাঁরা নিষ্ক্রিয়, সংস্কারাচ্ছন্ন ও বিপ্লবের পথে ‘অন্তরায়’ নন! ১৯১৪ সালে প্রথম প্রকাশিত ও ১৯১৭ সালে পুনঃপ্রকাশিত রাবোৎনিৎসা (নারী শ্রমিক) পত্রিকায় বারবার ক্রেশ্‌, নার্সারি ও নারীদের জন্যে সুরক্ষিত কর্মক্ষেত্রের বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হত। বিশেষ করে গুরুত্ব দেওয়া হত যাতে সমতাবিধান ও ‘নারীদের দাবি’ বিষয়ে সমস্ত শ্রমিক সচেতন হন।

 

ফেব্রুয়ারিতে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা এবং পেত্রোগ্রাদের শ্রমিকদের মধ্যে তাঁদের গুরুত্বের ফলে বলশেভিক পুরুষদের অনেকের মধ্যেও [পুরোনো] দৃষ্টিভঙ্গির বদল ঘটাতে সাহায্য করেছিল, যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, নারী সমস্যার ব্যাপারে বেশি মাথা ঘামানো মানে নারীবাদকে উৎসাহ দেওয়া এবং বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে সবথেকে দক্ষ, সংগঠিত ও রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ অগ্রণী (পুরুষ) শ্রমিকরাই কেবল। বলাবাহুল্য, এই লড়াই ছিল কষ্টকর।  যখন কোলনতাই পার্টিতে স্বতন্ত্র মহিলা শাখার কথা বললেন, তখন তাঁকে একঘরে ক’রে দেওয়া হল। যদিও লেনিনের সমর্থন পেয়েছিলেন তিনি। লেনিনের এপ্রিল থিসিসও অবশ্য সেই বলশেভিক নেতৃত্ব ভালভাবে মেনে নেয়নি- একইভাবে, কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোলনতাই ছিলেন লেনিনের একমাত্র সমর্থক।[1]

 

পরবর্তী কয়েকমাসে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছিল যে, সোভিয়েতরা ক্ষমতা দখল করার দিকে বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লেনিনীয় তত্ত্ব এবং কোলনতাইয়ের বারংবার নারী শ্রমিকদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের তত্ত্ব- দুইই এসেছিল বিপ্লবের গতি থেকে, এবং বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত। রাবোৎনিৎসা-র বাইরে অন্যান্য বলশেভিক পত্রিকাগুলোও এই যুক্তি দিতে লাগল যে, প্রবল লিঙ্গবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি শ্রেনী ঐক্যের ক্ষতি করছে। এরপর পার্টির চেষ্টায় বিভিন্ন কারখানায় মহিলারাও শ্রমিক প্রতিনিধি হলেন পুরুষ শ্রমিকদের চিন্তাভাবনার বিরোধিতা করে, যাঁরা মহিলা শ্রমিকদের বিপদ বলে মনে করতেন। পার্টি তাঁদের যুক্তি দিল যে কেন মহিলা প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করা প্রয়োজন- বিশেষতঃ কারখানায় যেখানে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর, নারী শ্রমিকদের যেন সহকর্মী, প্রতিনিধি ও কমরেডের মর্যাদা দেওয়া হয়।  

 

অক্টোবর বিপ্লবের ৬ সপ্তাহের মাথায় ধর্মীয় বিবাহের জায়গায় এলো নাগরিক নিবন্ধীকরণ এবং স্বামী বা স্ত্রী যেকোনও একজনের আবেদনে বিবাহবিচ্ছেদ্দের আইন। এক বছরের মধ্যে আনা পরিবার আইনে এই বিষয়গুলিকে আরো বিস্তারিতভাবে দেখা হল। নারী পুরুষ আইনের চোখে সমানাধিকার পেল। ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি ঘটল, এক আইনে মুছে গেল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ। যেকোনও একজন কারণ প্রদর্শন না করেই বিবাহবিচ্ছেদ দাবি করতে পারত। নারীদের নিজেদের আর্থিক মালিকানা স্বীকৃত হল এবং একজনের অপরজনের সম্পত্তির ওপর অধিকার থাকল না। কোনও মহিলা যদি সন্তানের পিতৃত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত না হতেন, তা’লে তাঁর সমস্ত যৌনসঙ্গীকে সেই সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে হত। রাশিয়ায় ১৯২০ সালে বিশ্বের প্রথম আবেদনের ভিত্তিতে গর্ভপাত আইনসিদ্ধ হল।

 

১৯১৭-র বিপ্লব নারীদের দ্বারাই শুরু হয়েছিল এবং দিশা পেয়েছিল; বছরভর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় নারীদের সম্পর্কে বহু প্রাচীন ধ্যানধারণা বদলে গিয়েছিল। নারীরা দুর্বল, তাঁরা পুরুষের সম্পত্তি, তাঁরা নিষ্ক্রিয়, পিছিয়ে পড়া, রক্ষণশীল, তাঁরা স্বনির্ভর নয়, কমজোরি- এইসব বস্তাপচা ধারণা একেবারে মুছে না গেলেও নারীরা সক্রিয়তা ও রাজনৈতিক দক্ষতা দিয়ে এই ধারণাগুলোর বিরুদ্ধতা করেছিলেন।

 

কিন্তু, রুশ বিপ্লব পুরুষ কর্তৃত্বকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেনি বা নারীদের সর্বাত্মক মুক্তি দিতে পারেনি। রুশ বিপ্লব পরবর্তী গৃহযুদ্ধের বীভৎসতা ও সোভিয়েত সরকারের কিছু বিকৃতি ও বিচ্যুতির জন্যেই তা সম্ভব হয়নি। বৈষম্য রয়েই গেছিল। কিছু মহিলা কর্তৃত্বকারী অবস্থানে পৌঁছেছিলেন, কয়েকজন প্রশাসনিক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং অক্টোবর পরবর্তী প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লিঙ্গবিদ্বেষী মনোভাব পুরো শেষ হয়ে যায়নি।

 

বিপ্লবের দিনগুলোতে নারীরা হয়তো পুরুষদের মতো অত বেশি সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেননি কিংবা উচ্চতর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অতটা তাৎপর্যমূলক অবদান রাখতে পারেননি কিন্তু জীবনের দৈনন্দিন সীমাবদ্ধতাকে জয় ক’রে তাঁরা প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গেছিলেন এবং বিপ্লবের রূপরেখা গড়তে পেরেছিলেন। ম্যাকডারমিড এবং হিলিয়ার যেমন বলছেনঃ

এটা সত্যি যে, পুরুষ ও নারীর মধ্যে শ্রম বিভাজন থেকে গিয়েছিল। কিন্তু, মেয়েরা পুরুষ প্রাধান্যকে প্রশ্ন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, একথা মনে না করে আমরা বরং ভাবতে পারি, মেয়েরা তাঁদের পরম্পরাগত ক্ষেত্রের মধ্যে  কীভাবে কৌশল করেছিলেন; এবং সেটা বিপ্লবী প্রক্রিয়ার কাছে কি অর্থ এনেছিল, তা বুঝতে হবে।

 

নারীরা ১৯১৭-র বিপ্লবে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ছিলেন, পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই ইতিহাস রচনা করেছিলেন। নীরব দর্শকের ভূমিকায় বা নিষ্ক্রিয় অরাজনৈতিক হিসেবে নয়, তাঁদের সাহসী প্রত্যক্ষ ভূমিকা আরও উজ্জ্বল ছিল, কারণ এতদিনের শোষণের প্রতিস্পর্ধী ছিলেন তাঁরা। নারীদের চোখে বিপ্লব পর্যালোচনা করলে তবেই নারীদের জীবনের সবচেয়ে প্রগতিশীল ঐতিহাসিক বিদ্রোহকে অনুধাবন ক’রে সমৃদ্ধ হওয়া যায়।

 

অনুবাদ-

প্রবুদ্ধ ঘোষ

অনুবাদ সম্পাদনা – কুণাল চট্টোপাধ্যায়

 

 



[1] লেখিকা এখানে দুটি সময়ের মধ্যে মিশিয়ে ফেলেছেন। এপ্রিল থিসিস যে সভাতে লেনিন পেশ করেন, সেখানে কোলোনতাই ছিলেন লেনিনের একমাত্র সমর্থক। কিন্তু তিনি বলশেভিক কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত অন ষষ্ঠ পার্টি কংগ্রেসে, জুলাই মাসে, যখন তিনি কেরেনস্কীর জেলে। -- সম্পাদক

Subcategories