World Politics

সিরিজার আত্মসমর্পণ : সাম্রাজ্যবাদ, শ্রেণী সংগ্রাম ও বামপন্থী সংস্কারবাদ

সিরিজার আত্মসমর্পণ : সাম্রাজ্যবাদ, শ্রেণী সংগ্রাম ও বামপন্থী সংস্কারবাদ

সোমা মারিক

২০১৫-র জ্যানুয়ারিতে গ্রিসের সাধারণ নির্বাচনে প্রধান বামপন্থী দল সিরিজা পেয়েছিল ৩৬.৩৪ শতাংশ ভোট। সব বামপন্থীদের ভোট মিলিয়ে হয়েছিল ৪৩ শতাংশ।  ছ’মাস পরে, জুলাইয়ের গণভোটে সিরিজার প্রস্তাবের পক্ষে, অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চশ্রেণীদের প্রস্তাবিত ব্যয় সংকোচ বৃদ্ধি খারিজ করার পক্ষে, ভোট পড়েছে ৬১ শতাংশের সামান্য বেশী। ফ্যাসিবাদী গোল্ডেন ডন দলের ৬.২৪ শতাংশ বাদ দিলেও, বামপন্থী ভোট যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, তা বোঝা যায়। কিন্তু দেখা গেল, গণভোটের এক সপ্তাহ পরে, গ্রিসের শ্রমিক শ্রেনী ও অন্যান্য সাধারণ মানুষের জোট যে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাঁর চেয়ে অনেক কুৎসিত শর্ত মেনে নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাস।

গ্রিক বামপন্থার ধারাগুলিঃ

গ্রিসে গত কয়েক বছরে প্রধান বামপন্থী দল হিসেবে দেখা দিয়েছে সিরিজা। এ ছাড়া একদা বামপন্থী বলে পরিচিত ছিল প্যাসক দল – একেবারে আকণ্ঠ দুর্নীতিগ্রস্থ, এবং বুর্জোয়া ব্যবস্থায় পুরোদমে মিশে যাওয়া, যার ফলে গ্রিসে এখন কেউ এই দলকে আর বামপন্থী মনে করে না। এরপর বলতে হয় এক চূড়ান্ত সংকীর্ণতাবাদী দল, যারা নীতিগত ভাবে সিরিজার সঙ্গে কোনো যুক্ত ফ্রন্ট করবে না, এবং যাদের নেতৃত্ব গণভোটে “না’ ভোট দিতে অস্বীকার করেছিল, সেই গ্রিক কমিউনিস্ট পার্টির (কে কে ই) কথা। অঞ্চলভিত্তিক ভোট বিশ্লেষণ অবশ্য দেখায়, কে কে ইর সমর্থকরা ৮০ শতাংশই ‘না” ভোট দিয়েছেন। র্যা ডিকাল বামপন্থীদের বৃহদাংশ আন্তারসিয়া জোটের সদস্য, তবে এর বাইরেও আছে  কয়েকটি দল। এই র্যাতডিকাল বামপন্থীদের নির্বাচনী শক্তি সীমিত হলেও, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে বা সামাজিক লড়াইগুলিতে এঁরা  শক্তিশালী। তাই গণভোটে এঁরা “না”-এর জন্য যে জঙ্গী প্রচার করেছিলেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।   

ভোট হওয়ার আগেই ভারুফাকিস ঘোষণা করেছিলেন, “না” হেরে গেলে তিনি ইস্তফা দেবেন। এ থেকে অনুমান করা যায়, সিরিজা নেতৃত্ব গণভোটকে নিছক নিজেদের মুখরক্ষার রাস্তা বলে মনে করেছিলেন। সেই কারণে, গণভোটের ফল একদিকে যেমন ইউরোপীয় বুর্জোয়া শ্রেণীকে সজোর চপেটাঘাত, অন্যদিকে তেমনি গ্রিসে সিরিজাকে সাবধান করে দেওয়া, যে শ্রমিক শ্রেণী ক্রমাগত রফা মানতে প্রস্তুত না।

এখানে তাই আমাদের বুঝতে হবে, সিরিজা কেমন দল। সিরিজাকে “অতি বামপন্থী” বলাটা একরকম রাজনৈতিক কৌশল। মোটামুটি গৌতম দেবের চেয়ে সামান্য র্যা ডিকাল যে কোনো দল বা ব্যক্তিকে অতিবাম বলে গণপ্রচার মাধ্যমে চিহ্নিত করার কৌশল দেশে দেশে দেখা যায়। এর ফলে, বুর্জোয়া রাজনীতির গৃহীত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই যেন উগ্র, হঠকারি রাজনীতি। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, পুঁজিবাদী সঙ্কটের সময়ে বামপন্থী সংস্কারবাদ অনেক ক্ষেত্রেই জন্ম নেয়। ১৯৩৪-এ ভিয়েনার পথে অস্ট্রো-ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বন্দুক হাতে লড়াইয়ের নেতৃত্ব কমিউনিস্টরা দেন নি, দিয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক দল। সিরিজা তৈরী হয়েছিল ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কোয়ালিশন অফ দ্য লেফট এন্ড প্রোগ্রেস (সাইনাসপিসমোস) দল গ্রিক নির্বাচনী আইন মেনে ন্যূনতম যে ভোট পেলে সংসদে প্রবেশ করা যায়, তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গণ সংগঠন ও কিছু বিপ্লবী গোষ্ঠীর সংগে জোট তৈরী করে। সাইনাসপিসমোস এযুগের গড়পড়তা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দলের চেয়ে অনেক প্রগতিশীল এবং বামপন্থী অবস্থান নিয়েছিল। তাই তাকে দেখে গ্রিসের এবং ইউরোপের আরো বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীরাও মনে করেছিলেন, এই দলের পক্ষে অনেকদূর যাওয়া সম্ভব। কিন্তু ক্রমে, সিরিজা যত নির্বাচনী শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে, তত দলকে ঐক্যবদ্ধ করার কথা ওঠে। ফলে কালক্রমে জোট পরিণত হয় অনেক কেন্দ্রীভূত দলে। আলেক্সিস সিপ্রাসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সিরিজা হল সংস্কারবাদী এবং বিপ্লবীদের একটি দল, যাতে বিপ্লবীরা সংখ্যালঘু । ‘বামপন্থী প্ল্যাটফর্ম’ দলীয় ভোটে ৪০ শতাংশ পেলেও, সরকার সিপ্রাসের হাতে। দলীয় পতাকার লাল, সবুজ ও বেগুনী রঙ শ্রমিক, পরিবেশবাদী এবং নারীবাদী আন্দোলনের প্রতীক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পরিবেশ বা নারী আন্দোলনের স্বার্থে সিপ্রাসের সরকার কি পদক্ষেপ নিয়েছে? অর্থনৈতিক সঙ্কট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যৌনকর্মীর সংখ্যা ১৫০ শতাংশ বেড়েছে। অথচ এইচ আই ভি বৃদ্ধির জন্য পুলিশ দায়ী করেছে এই মেয়েদের, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়াকে নয়।

গ্রিক জনগণের উপর আক্রমণঃ

গ্রিসের সংকট প্রসঙ্গে বারে বারে বলা হয়েছে, গ্রিকরা অন্যায়ভাবে, দেনা করে খরচ করেছে, এখন দেনা শোধ করতে চাইছে না। বলা হচ্ছে, ইউরো চালু করার জন্য গ্রিসের যে শর্তাবলী মানার দরকার ছিল, গ্রিক সরকার তা না মেনে হিসেবের ক্ষেত্রে জুয়াচুরি করেছিল। সঙ্গে যে কথাটা বলা দরকার কিন্তু প্রায়ই বলা হচ্ছে না, তা হল, এই কাজে তাদের প্রভূত সাহায্য করেছিল গোল্ডম্যান স্যাকস (এক বড় মার্কিন বহুজাতিক, যারা বিনিয়োগ ব্যাঙ্কিং-এর কারবার করে থাকে)। আর, গ্রিক শাসকরা স্থির করেছিল, বেশী শক্তিশালী জার্মান প্রভৃতি অর্থনীতির সঙ্গে তাল রাখার জন্য গ্রিসের উপর যে চাপ পড়বে, সেটা পুরো চালিয়ে দেওয়া হবে খেটে খাওয়া মানুষের মূল্যে। 

দ্বিতীয়ত, গ্রিক এবং ইউরোপীয় ও মার্কিণ ব্যাঙ্করা ২০০৮ সালের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং বিপর্যয়ের পর বহু দেশে দাবী তুলল, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ব্যাঙ্কদের বাঁচাতে হবে। এতদিন নয়া-উদারপন্থীদের দাবী ছিল, অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ যেন না হয়। তারাই এবার ঘুরে সম্পূর্ণভাবে অপরিশোধযোগ্য ব্যাঙ্কদের বেসরকারি ঋণগুলিকে সরকারি দেনাতে পরিণত করারও জন্য লড়ে গেল। শুধু গ্রিস নয়, আয়ার্ল্যান্ড, পর্তুগাল স্পেন সহ বিভিন্ন দেশের উপর এর কোপ পড়েছিল। যে সব দেশের অর্থনীতি সবল, সে সব দেশেও, ব্যাঙ্কদের বাঁচাতে সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হলেন। গ্রিসের ক্ষেত্রে, ব্যাঙ্করা পেল ৩০ বিলিয়ন মার্কিণ ডলার। দেনায় ডুবল রাষ্ট্র।

এবার আসরে নামল মুডিস, স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর, প্রভৃতি আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো। এরা এতদিন ব্যাঙ্কদের জুয়াচুরিকে লুকিয়ে রাখার জন্য সাব প্রাইম ঋণ-জাত বাণিজ্যেরও উঁচু রেটিং দিয়েছিল। এবার, রাষ্ট্রদের রেটিং খারাপ দেখানো হল। তা হলে সুদের হার বাড়ে, লাভ হয় ব্যাঙ্কদের। ২০১১-র মধ্যে গ্রিসের অর্থনীতি এবং রাজনীতি এতটাই ব্যাঙ্কদের হাতে চলে যায়, যে তাদের শর্ত মানা নিয়ে টালবাহানা করায় ইস্তফা দিতে হয় প্রধানমন্ত্রী পাপান্দ্রুকে, যিনি আদৌ প্রগতিশীল ছিলেন না, কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে ব্যাঙ্কদের হুকুম মানতে টালবাহানা করেছিলেন। তাঁর জায়গায় আসেন প্রাক্তন ব্যাঙ্কার লুকাস পাপাডেমস। ২০১২ সালে যে চুক্তি হল, তা অনুযায়ী গ্রিস তার অর্থনীতির উপর ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক আর্থভান্ডার এবং ইউরোপীয় কমিশনের (“ত্রোইকা”) ছড়ি ঘোরানো মেনে নিল। 
 
ঠিক কী কী দাবি করেছিল, “ত্রোইকা”?গ্রিসের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তারা বিস্তারিত হুকুম জারী করে। তাদের নির্দেশ ছিল – দেশের লাভজনক সম্পদের বেসরকারিকরণ চাই; শস্তায় সে সব ধনীদের কাছে বিক্রী করতে হবে। মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে এবং সে জন্য ব্যয়সংকোচের বোঝাটা চাপাতে হবে শ্রমজীবী মানুষের উপর। সামাজিক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা খাতে ব্যয় কমাতেই হবে সামরিক খাতে ব্যয়কে অটুট রেখে; ধনীদের উপর প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো চলবে না। বোঝাই যায়, কেন গ্রিসের উপর তলার প্রায় ৩৯ শতাংশ “ত্রোইকার” প্রস্তাব মেনে নেওয়ার পক্ষে গণভোটে মতদান করেছে।  

২০০৯-এ, গ্রিক ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাতকারের ফলে, আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়, যে গ্রিসে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার অনেক দেশের চেয়ে সুরক্ষিত। গ্রিসের নাগরিকদের ন্যূনতম মজুরী ছিল বাঁচার মতো মজুরী। ২০১২-১৩-র মধ্যে ছবিটা পালটে যায়। কিন্তু গণপ্রচার মাধ্যমের উপরেও মালিকদের নিয়ন্ত্রনের ফলে, বারে বারে ব্যাঙ্কারদের এবং “ত্রোইকা”কেই দেখানো হয়েছে সাধারণ মানুষের “ত্রাতা” হিসেবে, আর ইউনিয়নদের খলনায়ক হিসেবে।  

২০০৯ থেকে ২০১৫-র মধ্যে, উপরে বর্ণিত পদক্ষেপগুলির ফল কী হল? গ্রিসের  অর্থনীতি ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। “সংস্কারের” তোড়ে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, এই সব খাতে ব্যয় বিপুলভাবে কমেছে। সরকারী পরিষেবার বেসরকারীকরণ ঘটেছে। শ্রমজীবী মানুষের উপর কর বেড়েছে। গ্রিসের পেনশনভোগীদের ৪৫ শতাংশ এখনই দারিদ্র সীমার নীচে বাস করছেন। গ্রিসে যে আদৌ সামাজিক নিরাপত্তা রয়েছে, সেটাই যেন অন্যায়। অন্যান্য দেশের শ্রমজীবী মানুষের কাছেও এই প্রচার  করা হয়েছে, যে গ্রিসের অলস লোকেরা অন্য দেশের খেটে খাওয়া মানুষের টাকায় বাস করতে চায়। বাস্তবে, ২০১৫ সালে জুবিলী ডেট ক্যাম্পেন-এর গবেষণা থেকে দেখা গেছে, গ্রিসকে সঙ্গকটমোচনের নামে যে টাকা দেওয়া হয়েছে, তার ৯০% বা তার বেশী চলে গেছে ঋণদাতাদের পকেটে। অথচ, গ্রিসের দেনার ভার বেড়েছে, ২০১০-এ জি ডি পি-র ১৩৪% থেকে, ২০১৫-র গোড়ায় জি ডি পি-র  ১৭৪%-এ।

বামপন্থী সংস্কারবাদ ও শ্রেণী সংগ্রাম:

সিরিজার বাইরে বিপ্লবী শক্তিদের যে জোট, সেই আন্তারসিয়ার এক নেতা, যিনি চতুর্থ আন্তর্জাতিকের গ্রিক শাখারও নেতা, তিনি গণভোটের পরও একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দলীয় শৃংখলার কথা ভেবে  ‘বামপন্থী প্ল্যাটফর্ম’ অনেক সময়েই আন্তারসিয়ার সঙ্গে যৌথ লড়াইয়ে যেতে ইতস্তত বোধ করে। আর সিপ্রাস তো স্পষ্ট দেখিয়েছিলেন, তাঁর মতে ‘ত্রোইকার’ সঙ্গে আলোচনা করে “যুক্তির” পথে হাঁটাই প্রকৃত পথ। এজন্য তিনি প্রথমে সিরিজার নিজের অর্থনৈতিক কর্মসূচীকে স্থগিত রাখেন। তারপর ফেব্রুয়ারী মাসে অতীতের ব্যয়সংকোচ কিছুদিনের জন্য চালু রাখতে রাজী হন। এপ্রিলে এবং মে মাসে আইএমএফ-কে যথাক্রমে ৪৯.৫ কোটি এবং ৮২.৬ কোটি ডলার ‘দেনা’  শোধ করা হয়।

সুতরাং, ভারুফাকিস কতটা ঝগড়াটে ধরণের লোক, এ সব গল্প নয়, গ্রিক সরকারকে ফেলে দিতে ইউরোপীয় পুঁজি কেন উদগ্রীব ছিল, সেই প্রশ্ন থেকে এগোতে হবে। ফ্রান্সের সোসিয়েতে জেনারাল ব্যাঙ্কের চেয়ার, এবং ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কার্যনির্বাহক বোর্ডের ভূতপূর্ব সদস্য, লোরেঞ্জো বিনি স্মাঘি, স্পষ্ট বলেছেন, গ্রিসের ৩৫৫ বিলিয়ন ডলার ঋণকে নতুন, দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে, এবং সুদের হার কমিয়ে, নিয়ন্ত্রনে আনা কিছু কঠিন নয়। তা হলে, ঋণ শোধ না করে যে টাকা থেকে যাবে, তা দিয়ে মাইনে, পেনশন, সামাজিক সুরক্ষা, এ সবের ব্যয়বরাদ্দ বাড়ানো যাবে। কিন্তু স্মাঘি লিখেছেন, ওটাই যে আপত্তির জায়গা। নয়া উদারপন্থা ব্যাঙ্কদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় খরচ মানবে, শ্রমজীবীর স্বার্থে না। অর্থাৎ, ইউরোপীয় বুর্জোয়া শ্রেণী, বিশেষত জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণী, ভালই জানে, তারা কড়াভাবে শ্রেণী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্কারবাদ সবসময়ে “মালিকের দালাল” না-ই হতে পারে। কিন্তু যে কোনো সংস্কারবাদ-ই মনে করে, পুঁজিবাদের মধ্যেই, যুক্তি ব্যবহার করে, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ দেখা সম্ভব। এই হল সবচেয়ে বামপন্থী সংস্কারবাদ-এরও মোহ। ফলে, গ্রিক শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্বর চেয়ে ইউরোপীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্ব অনেকটাই খোলা চোখে কাজ করেছিল। 


সিরিজা বামপন্থী সংস্কারবাদী বলেই, সিপ্রাস গণভোটের মতো পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলেন। এটা গ্রিসের প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাস হল গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রন থেকে যথা সম্ভব সরে থাকার ইতিহাস। আজকের পরিস্থিতিতে গণভোটের সিদ্ধান্ত ছিল প্রকারান্তরে স্বীকার করা যে গত ক’মাসে অনুসৃত নীতি ক্ষতিকর এবং ভ্রান্ত, এবং শ্রমিক শ্রেণীর শক্তির উপর নির্ভর করতে চাওয়া। কিন্তু সিপ্রাসের কাছে গণভোট ছিল শুধু একবার একটু “ফোঁস” করা – বাস্তব লড়াইয়ের সূচনা নয়। স্ট্যাথিস কুভেলাইটিসের সঙ্গে সেবাস্টিয়ান বাজেনের “জ্যাকোবিন” পত্রিকায় সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, দলের দক্ষিণপন্থীরা গণভোটকে বিপজ্জনক মনে করে তার বিরোধী ছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, এর ফলে পাওনাদারদের সঙ্গে তিক্ততা বাড়বে, আর অন্য দিকে তলা থেকে লড়াই তীব্র হবে, যার কোনোটাই তাঁরা চান না। সিপ্রাসের ধারণা ছিল   গণভোটকে ব্যবহার করে উন্নত শর্ত পাওয়া যাবে। আর বামপন্থী প্ল্যাটফর্মের নেতা এবং মন্ত্রীসভার সদস্য পানাজিওটিস লাফাযানিস বলেন, গণভোটের সিদ্ধান্ত সঠিক, কিন্তু বড় দেরীতে নেওয়া সিদ্ধান্ত। তিনি সাবধান করে দেন, এর অর্থ হবে যুদ্ধ ঘোষণা, এবং শত্রুপক্ষ অচিরে টাকার সরবরাহ বন্ধ করে গ্রিসের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ে ফেলতে চাইবে। কয়েক দিনের মধ্যে, সেটাই ঘটল, এবং দেখা গেল, জনগণ তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত হলেও, সিপ্রাসের হাঁটু কাঁপতে শুরু করেছিল।

জার্মাণ পুঁজির পুনরুত্থান:

যে সংযুক্ত ইউরোপ গড়ে উঠেছে, ১৯৬০-এর দশকের থেকে আজ তার অনেক পার্থক্য আছে। গোড়ার দিকের ইউরোপীয় জোটের পিছনে ছিল সোশ্যাল ডেমোক্রেসীর একটা বড় ভুমিকা। একদিকে সোভিয়েত ব্লকের অবক্ষয়, আর অন্যদিকে রেগন-থ্যাচার যুগ থেকে শ্রমিক অধিকারের উপর তীব্র আক্রমণ, ঐ  সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক ইউরোপকে বহুদূরে ঠেলে দিয়েছে।

সেই সঙ্গে ঘটেছে জার্মান পুঁজির পুনরুত্থান। “ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরী”-র রচয়িতা, টমাস পিকেটি, জার্মান সংবাদপত্র ডি জাইটকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে বলেছেনঃ “জার্মানী হল সেরা নজীর, কীভাবে একটা দেশ তার ইতিহাসে কখনো বিদেশী ঋণ পুরোমাত্রায় শোধ করে নি।“ তিনি বলেন, ঋণের বোঝা জমলে ঋণ মকুব করা কেবল মানবিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুক্তিসঙ্গত। ঋণের বোঝা কমলে একটা দেশের অর্থনীতি অনেক দ্রুত উন্নত হতে পারে। ১৯৫০-এর দশকে যখন জার্মানীর ঋণ মকুব করা হয়েছিল, তখন তাঁর পিছনে ছিল সোভিয়েত ব্লকের সম্পর্কে ভীতি, এবং ঐ ব্লকের অগ্রগতি রোধের জন্য মজবুত জার্মানি গড়ে তোলার বিষয়ে মার্কিন আগ্রহ।
আজকের পরিস্থিতি আলাদা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে ২৫ বছর। জার্মানির একীকরণের পর সে  দেশের পুঁজিবাদ পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী পুঁজিবাদ। সামরিক দিক থেকে জার্মানী অবশ্যই মার্কিণ  যুক্তরাষ্ট্র কেন, আজকের রাশিয়ারও হয়ত সমকক্ষ না। কিন্তু অর্থনৈতিক বিকাশের কথা স্বতন্ত্র। ১৯৯১ থেকে ২০১৩-র মধ্যে, জার্মানীর রপ্তানির হার ২২.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ অবধি উঠেছে। ১৯৯১-এ জার্মান পুঁজি বিদেশে লগ্নী হয়েছিল ১৩৪ বিলিয়ন ইউরো। ২০১২-তে তা বেড়ে হয় ১.২ ট্রিলিয়ন ইউরো। ২০১৪-তে জার্মানীর মোট পণ্য, পরিষেবা এবং আর্থ ক্ষেত্রে উদবৃত্ত (কারেন্ট একাউন্ট সারপ্লাস) ছিল ৭.৪  শতাংশ, যা চীনের চেয়েও বেশী। অর্থাৎ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আপাতঃ বিবর্ণ আমলাতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে জার্মান সাম্রাজ্যবাদের ঈগল।

গণভোটের পর সিপ্রাসের আত্মসমর্পণ:

গ্রিক শ্রমিক শ্রেণী নিজেদের জীবন নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন। ২০১২ সালে একজন গ্রিক সরকারী মুখপাত্র স্বীকার করেন, অন্তত ৮০,০০০ ধনী গ্রিক বিদেশী ব্যাঙ্কে মাথা পিছু কমপক্ষে ২,০০,০০০ ইউরো কালো টাকা পুরে রেখেছে। এই যে কমপক্ষে ১৬০০ কোটি ইউরো, এ সম্পদের মালিকদের উপর জরিমানা সহ কর ধার্য করা, উচ্চবিত্তের উপর প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো, প্রয়জনে দ্রাখমাতে ফিরে গিয়ে বড় পুজিপতিদের স্বার্থের পরিবর্তে শিক্ষা, চিকিৎসা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় বাড়ানো – গণভোটে বিপুল “না”-এর অর্থ এই পদক্ষেপগুলির দাবী। 

কিন্তু গ্রিক সহ ইউরোপীয় উচ্চশ্রেণীরা নীরবে বসে থাকে নি। তারা গণভোটের জবাবে সোজা জানায়, তাদের শর্ত আরো কড়া হবে। ৬১ শতাংশকে সক্রিয় করে তুলে শাসকদের উপর কি আক্রমণ শুরু হবে? সিপ্রাসের সোজা উত্তর ছিল, তিনি রফার দিকেই যাবেন। এবার এক বহু পুরোনো খেলা আরেকবার দেখানো হল। জার্মানী সাজল বেশী উগ্র। আর মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্স হল “নরম”। তাদের সাহায্যেই নাকি গ্রিস রক্ষা পাবে। কিন্তু তার একটা মূল্য দিতে হবে। পেনশন আরো কমাতে হবে। ভ্যাট বাড়াতে হবে। আর, গ্রিসকে ৫০ বিলিয়ন ইউরো সম্পত্তি ইনস্টিটিউশন ফর গ্রিসের হাতে তুলে দিতে হবে। তারা ঐ সম্পত্তি নিলামে তুলবে। ইনস্টিটিউশন ফর গ্রিসের মালিক হল জার্মান কে এফ ডব্লিউ ব্যাঙ্ক গোষ্ঠী, যাদের তত্বাবধায়ক ডিরেক্টরদের চেয়ারম্যান হলেন – অবাক হলেন নাকি? – জার্মান অর্থমন্ত্রী উলফগ্যাং শাউএব্ল।

সিপ্রাস যে দ্রুততার সঙ্গে পাল্টেছেন, সেটা দেখায়, সংস্কারবাদ সি পি এমের চেয়ে বহু ডিগ্রী বায়ে  থাকলেও পুঁজির আক্রমণ তীব্র হলে সে দিশাহারা হয়ে পড়ে। সংস্কারবাদীরা “জানে”, শ্রমজীবীরা অবোধ। উপর থেকে সাহায় না থাকলে তাঁরা কখনোই দেশ চালাতে পারেন না। তাই ছোটোখাটো ব্যাপারে একজন মানুষ, একটি ভোট, এই নীতি মানা যেতে পারে। কিন্তু, বড় প্রসংগ এলে ইউরো যার,হুকুমও তার ।

সিরিজার ভিতরের ও বাইরের বিপ্লবীরা কি বিকল্প নেতৃত্ব গড়তে পারবেন? পার্লামেন্টে প্রথম দফা ভোটে ১৭ জন নানা ভাবে বিরোধী মত প্রকাশ করেছেন। বুধবার, ১৫ই জুলাই, ইউরোপীয় বৃহৎ পুঁজির সব দাবী মেনে দ্বিতীয়বার পার্লামেন্টে ভোট চাইতে গেলে, দেখা যায়, ৩০০ সদস্যের মধ্যে, ২২৯ জন সিপ্রাসের প্রস্তাবের পক্ষে। কিন্তু সিরিজার ৩৮ জন সাংসদ প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন না। লেফট প্ল্যাটফর্মের সকলে, (মূলত ট্রটস্কীপন্থী), কে ও ই ধারা (মাওবাদী) এবং সম্ভবত সিপ্রাসের ধারার ৬ জন এই বিরোধী ভোটদাতা।  সিপ্রাসের অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। তাকে হয় “জাতীয় ঐক্যের” সরকার গড়তে হবে, না হলে নির্বাচন ডাকতে হবে, এবং একদিকে অর্থনৈতিক সঙ্কট আর অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী গোল্ডেন ডনের অজুহাতে সেই “জাতীয় ঐক্যের” আহবানই করতে হবে। যে কোনো সরকার, বিশেষত যে কোনো বাম-সংস্কারপন্থী সরকার, যখন শ্রমিকদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে, তারা তখন তাদের র্যােডিকাল বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের মুখ এইভাবেই বন্ধ করতে চায়। সিরিজার বামপন্থী প্ল্যাটফর্ম দাবী করেছেন, ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ, ব্যয়সঙ্কোচ নীতি পূর্ণমাত্রায় বর্জন, ইউরোজোন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করা; ইত্যাদি। ট্রেড ইউনিয়নরা বুধবারে সাধারণ ধর্মঘট ডেকেছিলো। এতে আন্তারসিয়ার সঙ্গে কে কে ই, এবং সিরিজার ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্ট একত্রে কথা বলছে। গোপন আলোচনা সম্পর্কে যে সব তথ্য বেরচ্ছে, তা থেকে মনে হয়, ট্রেড ইউনিয়নদের উপর নানা নিষেধাজ্ঞা জারী হতে চলেছে। ফলে মন্ত্রী-দলনেতা বা বুদ্ধিজীবিরা যা-ই বলুন, নিচের তলার কর্মীদের মধ্যে লড়াইয়ের দাবী জোরদার হচ্ছে। সিরিজার ২০১ সদস্যএর কেন্দ্রীয় কমিটির ১০৭ জন এক যৌথ বিবৃতিতে সিপ্রাসের নিতির সমালোচনা করেছেন। আন্তারসিয়ার কর্মীরা বিকল্পের জন্য লড়াইয়ের আহবান করেছেন। স্পষ্টতই, লড়াই এখনো চালু আছে। যা হেরে গেছে, তা হল বামপন্থী সংস্কারবাদের মোহ, যে জনগণের নির্বাচনী সমর্থন থাকলে বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যেই যুক্তি ও জনমতের ঐক্যের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ দেখা যায়।