News

র‍্যাডিকাল পত্রিকার উদ্যোগে আলোচনা সভা

প্রসঙ্গ যৌন নির্যাতন : রিঙ্কু দাসের উপর আক্রমণ ও রাজীব দাস হত্যা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ?


র‍্যাডিকাল  পত্রিকার উদ্যোগে আলোচনা সভা


যে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান একজন নারী, যে দেশের শাসক দলের নেত্রী একজন নারী, যে দেশের লোকসভার স্পীকার একজন নারী, যে রাজ্যের বিরোধী দলের প্রধান তথা পত্রিকাদের প্রচার অনুযায়ী আসন্ন মুখ্যমন্ত্রী একজন নারী, সেখানে আর নারীর ক্ষমতায়নের আর বাকী কতটুকু? অথচ সেই দেশে, সেই রাজ্যে, রাতে চাকরী করে ফিরতে গিয়ে যৌন হেনস্থার শিকার হয় রিঙ্কু দাস, তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হয় ষোল বছরের ভাই রাজীব দাস। তার অল্প দিন পরেই সরকার পক্ষের অন্যতম দলের মুখপত্রে প্রবন্ধ বেরলো যে দিল্লীর পুলিশ প্রধানের মতে কলকাতার চেয়ে দিল্লীর মেয়েরা বেশী আক্রান্ত হয় ও কম প্রতিবাদ করে। অর্থাৎ কালান্তর পত্রিকা মেয়েদের দুনিয়া নামক পৃষ্ঠার মাধ্যমে বলতে চাইল যে পশ্চিমবঙ্গে মেয়েদের উপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা বিরল।


বাস্তব ছবি কি বলে? ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো প্রদত্ত তথ্য জানাচ্ছে, ২০০৯ সালে দেশের জনসংখ্যার ৭.৬ শতাংশ এ রাজ্যে বাস করলেও  মেয়েদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে এ রাজ্যের ভাগ ছিল ১১ শতাংশর বেশী। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার ঘটনা। ভারত অন্য কোনো এক দেশের চেয়ে একটু ভাল, বা পশ্চিমবঙ্গ অন্ধ্রপ্রদেশের চেয়ে ভাল আছে, এরকম তথ্য প্রমাণ করে না যে ভারতের মেয়েদের উপর, বা পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের উপর, নিয়মিত যৌন নির্যাতন হয় না।


কিন্তু তার পর ও প্রশ্ন থাকে। নির্দিষ্টভাবে রিঙ্কু দাসের উপর আক্রমণ প্রশ্ন তোলে, এই ঘটনা কেন ঘটতে পারল? প্রথম উত্তর অবশ্যই, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। আজকাল যে নয়া উদারনৈতিক তাত্ত্বিকরা মনে করে জনকল্যাণকর কাজের ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন করতে হবে, তারাও দাবী করে, রাষ্ট্রের কাজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো আইনের বইয়ে লেখা নেই, রাত দশ থেকে সকাল ছ’টা নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্বের মধ্যে পড়ে না। তাহলে ব্যাপারটা কি? এখানে শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গীর কোনো বিকল্প নেই। মাওবাদী রাজনীতি “খুনের রাজনীতি” বলে নয়, মাওবাদীদের ধরার নামে  আদিবাসীদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে খনিজ সম্পদ দখল করে বেদান্ত সহ বড় বড় পুঁজিবাদী সংস্থাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য অপারেশন গ্রীণ হান্ট চালু হয়েছিল । মনে রাখা ভাল, ২০০৪ পর্যন্ত বেদান্ত কোম্পানীর অন্যতম ডিরেক্টর ছিলেন পি চিদাম্বরম। অর্থাৎ ধন-দৌলতের নিরাপত্তার জন্য কোটি কোটি টাকা – রিঙ্কু-রাজীবদের জন্য কানাকড়িও না। আর, এ ব্যাপারে রাজ্যের “বাম” সরকার আর কেন্দ্রের সরকার, এদের কোনো মতভেদ নেই।


দোষ কেবল রাষ্ট্রের নয়। সমাজের সুশীলবাবুরা, যাঁরা শুধু বামফ্রণ্টকে উচ্ছেদ করতে চান, কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থার ওকালতি করেন, তাঁরাও দায় এড়াতে পারবেন না। কোন সাহসে স্বরাষ্ট্রসচিব হঠাৎ ঘোষণা করেন, রিঙ্কু দাস বিবাহবিচ্ছিন্না? এ হল সুশীলবাবুদের ভাষায় কথা বলা  -- ও তো   পুরোপুরি ভাল মেয়ে না, তাই ওর উপর একটু হামলা তো হবেই।


কেন বাস্তবে রিঙ্কু, এবং তার মত বহু মেয়ে, অনেক রাতে বাড়ি ফেরে? নানা কারণের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য – বিশ্বায়ণের ফলে চাকরীর চরিত্র পাল্টাচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার সময় ধরে কল সেণ্টারে কাজ চলে। বিশ্বায়নের শিকার এই নতুন শ্রমিক শ্রেণী নিরাপত্তা পায় না। তাদের উপর নানা ভাবে চাপ আসে।


আমরা বলেছি এরকম ঘটনা বিরল না। ঘটনা ঘটে অনেকের উপর – বৃদ্ধা, অল্পবয়স্কা, সবার উপর। সঙ্গে আসে পিতৃতান্ত্রিক দাবী – মেয়েটারই নাকি দোষ ছিল। সে কেন আপাদমস্তক ঢাকা ছিল না?  সে কেন “অসময়ে” পথে ছিল? সে কেন একা বেরিয়েছিল?


আর, রাজীব দাস, সার্জেণ্ট বাপী সেনদের হত্যা রোজ না ঘটলেও, বলপ্রয়োগ করে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার ঘটনা অনেক ছিল, আছে। বাধা দিতে যারা আসে তাদের উপর ও হিংসা প্রয়োগ অনেক ঘটেছে।  যৌন নির্যাতন করেছে পুলিশ, আধা-সামরিক বাহিনী; জাতের ইজ্জত রক্ষার নামে তথাকথিত স্থানীয় পঞ্চায়েত। তাই রিঙ্কু দাসের উপর আক্রমণ এক বিশেষ ঘটনা নিশ্চয়ই, কিন্তু এক ধারাবাহিক ইতিহাসের অংশও বটে।  বানতলা থেকে বারাসাত হয়ে সাঁকরাইল দেখাচ্ছে, ভোটসর্বস্ব রাজনৈতিক দলেরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে না, কেবল অপর রাজনৈতিক দলের নামে গর্জন করতে থাকে। তাই তৃণমূল কংগ্রেস রিঙ্কু দাসের ঘটনা নিয়ে ফয়দা তুলতে চায়, কিন্তু তাদেরই পৌরপ্রধান বলে, এই ঘটনা রাজীবের কপালে ছিল।


    রাজীব দাসের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই
    সমস্ত যৌন নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনী পদক্ষেপ নিতে হবে
    যৌন নির্যাতনের অভিযোগ যাঁরা করেছেন তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে
    প্রস্তাবিত যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে অপ্রমাণিত অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারিণীর বিরুদ্ধে শাস্তির প্রস্তাব খারিজ করতে হবে
    প্রস্তাবিত যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের আওতায় গৃহপরিচারিকাদের আনতে হবে
    মেয়েদের যে কোনো সময়ে নির্ভয়ে পথে হাঁটার পরিবেশ গড়তে হবে
    যৌন নির্যাতন রোখার দায় রাষ্ট্রের। তাই যৌন নির্যাতন ঘটলে পুলিশ, প্রশাসন, সর্বস্তরের পদাধিকারীদের শাস্তি দিতে হবে

সভার স্থান : বুদ্ধদেব বসু সভাঘর
তারিখ : ২৮ মার্চ                                                                           সময় : ২-৩০ থেকে
অংশ নেবেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা  । সঞ্চালক  :  সোমা মারিক
___________________________________________________________________________________
র্যা ডিকাল পত্রিকার পক্ষে মিহির ভোসলে কর্তৃক প্রচারিত