Statements of Radical Socialist

লাখবীর সিংয়ের নৃশংস হত্যা সম্পর্কে র‍্যাডিকাল সোশ্যালিস্টের বিবৃতিঃ

 

১৫ই অক্টোবর ভোররাত্রে লাখবীর সিং নামে এক ৩৫ বছর বয়স্ক মাঝাবি শিখ (যারা দলিত থেকে শিখধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে) শ্রমজীবীকে দিল্লীর কাছে সিঙ্ঘু সীমান্তে প্রতিবাদ ক্ষেত্রে নৃশংসভাবে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়। অভিযোগ করা হয়েছে যে লাখবীর সিং শিখ সম্প্রদায়ের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ চুরি করতে চেষ্টা করেছিল। নিহাং শিখ সম্প্রদায়ের সদস্যরা এগিয়ে এসেছে এবং এই বর্বর কাজের দায়িত্ব স্বীকার করেছে। নিহাং সম্প্রদায়ের নেতারা শুধু যে এই কাজের জন্য কোনো অনুতাপ প্রকাশ করেন নি তাই না, উপরন্তু তাঁরা ঘোষণা করেছেন যে তাঁরা এই কাজকে সমর্থন করেন এবং ভবিষ্যতে এরকম ধর্মের প্রতি অবমাননাকর কাজ হলে আবার এই প্রতিক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা (এস কে এম) ইতিমধ্যেই এই হত্যার নিন্দা করেছে এবং নিহাংদের থেকে নিজেদের দূরত্ব সৃষ্টি করেছে।  হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থীরা এই সুযোগে দ্রুত বলতে চেষ্টা করছে যে কিসান আন্দোলন সার্বিকভাবে আইন-শৃংখলা ভেঙ্গে পড়ার জন্য , এমনকি সার্বিক নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য দায়ী। 

 

 

 

প্রথমত, আমরা বামপন্থী হিসেবে, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একজন সাধারণ শ্রমজীবির এই হত্যার নিন্দা করছি। এমনকি যদি সংশয়াতীতভাবেও প্রমাণিত হত, যে লাখবীর সিং ধর্মের প্রতি অবমাননাকর কাজের দোষে দুষ্ট, তবু কোনো ব্যক্তি নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারে না, এবং অবশ্যই এইরকম অবর্ণ্নীয় পাশবিক কাজ করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা স্পষ্ট দেখায় যে সবরকম ধর্মভিত্তিক সংগঠনের মধ্যেই নিহিত থাকে সত্ত্বর প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে দ্রুত অধঃপতিত হওয়ার বিপদ। এই কথা কেবল তাদের জন্য খাটে না, যারা হিন্দুত্ব বা রাজনৈতিক ইসলামের ভিত্তিতে সংগুঠিত হচ্ছে। এই কথা খাটে সমানভাবে ক্রিশ্চান মৌলবাদ, বৌদ্ধ মৌলবাদ, বা বর্তমান ক্ষেত্রে শিখ মৌলবাদ প্রসঙ্গে। যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, সেটা এই না, যে ধর্মকে নিন্দা করা জরুরী, এবং কেবলমাত্র নাস্তিকতা, নিরীশ্বরবাদের মূল্যবোধ ঊর্ধে তুলে ধরতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটা হল, আমরা মানুষের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস থাকার, তা পালন করার অধিকারের মর্যাদা রাখব, কিন্তু বামপন্থী সাংগঠনিক উদ্যোগকে সবসময়েই ধর্মীয় গোষ্ঠীদের বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে।  আমাদের লড়াই হল সবরকমের শোষণ-নীপিড়নের বিরুদ্ধে, উন্নততর পৃথিবীর জন্য লড়াই। এই উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠিত হলে সব বিশ্বাসের, সব ধর্মের মানুষকে  নিতে হবে, কিন্তু সেটা ধর্মভিত্তিক সংগঠনের মাধ্যমে হতে পারে না। তৃতীয়ত, চলমান কিসান আন্দোলনকে এই বর্বর হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী করা ভুল। যে কিসান আন্দোলন চলছে, সেটা ভারতের অন্যতম দীর্ঘ গণ আন্দোলন, এবং এই আন্দোলন চলছে যে সরকারের বিরুদ্ধে, সেটা সম্ভবত স্বাধীন ভারতে দেখা গেছে এমন সবচেয়ে পাশবিক এবং নিপীড়ক কেন্দ্রীয় সরকার। এই আন্দোলন তার বর্তমান আকারেই ১৪ মাসের বেশীদিন ধরে চলছে, এবং তা প্রায় সম্পূর্ণই অহিংস ছিল। আমরা যখন এই নৃশংস হত্যার নিন্দা করি এবং হত্যাকারীদের বিচারের দাবী করি, তখন, তার সঙ্গে সঙ্গেই, আমরা এই আন্দোলনের উপর দক্ষিণপন্থী আক্রমণের বিরোধিতা করি।   

 

সবশেষে আমরা আর একটি, কম উল্লিখিত ঘটনার দিকে ফিরে তাকাতে চাই। পশ্চিমবঙ্গ থেকে একজন ২৬ বছর বয়স্কা মেয়ে কৃষক আন্দোলনের যে কর্মীরা পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে বিজেপি বিরোধী প্রচারে এসেছিলেন তাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং  তাদের সঙ্গে টিকরি সীমান্তে আসেন। অভিযোগ করা হয়েছে যে পথে কিসান সোশ্যাল আর্মি নামের একটি সংগঠনের সদস্যরা তাঁকে আক্রমণ করে এবং আরো অভিযোগ করা হয়েছে যে টিকরিতে থাকার সময়ে তাঁকে ওই হয়রানিকারীরা ধর্ষণ করে। কোভিডের দ্বিতীয় প্রকোপের সময়ে তাঁর কভিডে মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বাবা এফ আই আর করেন।  

 

অবশ্যই, বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের দক্ষিণপন্থী সমর্থকরা উপরের ঘতনাতিকে কখনো কখনো ব্যবহার করেছে, আন্দোলনের দিকে কাদা ছেটাতে। আমাদের আন্দোলনে প্রতি সংহতিতে অবিচল থাকতে হবে, কিন্তু সেটা গণ জমায়েতের প্রগতিশীল ক্ষেত্রের মধ্যেও যে কিছু অত্যাচার বা নিপীড়নের ঘটনা ঘটতে পারে, তাকে ঝাঁট দিয়ে লুকিয়ে রেখে না। এই রকম ঘটনাকে সামনে এনে প্রতিবাদ করলে আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্থ হবে, আমাদের শক্তি কমে যাবে, যদি মেয়েরা, দলিতরা (লাখবীরের মত), এবং অন্যান্য অত্যাচারিত গোষ্ঠীর মানুষরা নির্ভয়ে আমাদের আন্দোলনে যোগ দিতে না পারে। আমরা যেরকম সমাজে বাস করি, তাতে এটা স্বয়ংক্রিয় ভাবে হবে না।  এর জন্য আমাদের সব সময়ে এই রকম ঘটনা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে, এবইং আন্দোলনের নামে কখনো এমন ঘটনাকে লুকিয়ে রাখলে হবে না। এটাই হবে অন্যায় যেখানে, যেভাবে মাথা তোলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের অঙ্গীকার, এবং এটাই আমাদের লড়াইকে মজবুত করবে।

 

১৮/১০/২০২১