Statements of Radical Socialist

আফগানিস্তানঃএক দ্বিবিধ ট্রাজেডি

 

আমরা আফগান জনগণের সঙ্গে তাঁদের দ্বিবিধ ট্রাজেডির জন্য শোকপ্রকাশ করছি। প্রথম ট্রাজেডি হল  কুড়ি বছর আগে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের বে-আইনী এবং সর্বৈব অন্যায্য সামরিক আগ্রাসন। সেটাই জমি তৈরী করেছে আজকের ট্রাজেডিকে, যা হল ইসলামী-ধর্মোন্মাদ তালিবানের ক্ষমতা দখল। তালিবানের নিন্দা করতে গিয়ে যেন কোনোভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং অন্য পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনাকে একবিন্দুও হাল্কা করা না হয় বা তারা যে আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে তার জন্য চোখের জল ফেলতে না বলে। সমগ্র বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে সবচেয়ে বড় যে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি হয়েছিল, তা হল বিদেশী ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অবসান, এমনকি সেই সব দুর্ভাগ্যজনক ক্ষেত্রেও, যেখানে দেশজ একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল। যে বিশ্বে মানুষ স্বতন্ত্র এবং অঙ্কগুলি ভিন্ন রাষ্ট্রের অন্তর্গত বলে ধরা হয়, সেখানে বিরলতম কোনো ক্ষেত্র ছাড়া সবচেয়ে মৌলিক যে নৈতিক-রাজনৈতিক নীতিকে ঊর্ধে তুলে ধরতে হয়, তা হল, একটি জনগণের স্বাধীন অধিকার থাকতে হবে, যে তাঁরাই নিজেদের অত্যাচারী শাসকদের উচ্ছেদ করবার দায়িত্ব রাখবেনএই কারণেই, ভারতীয়দেরই দায়িত্ব ছিল ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করার, ইন্দোনেশিয়ার মানুষেরই ওলন্দাজ শাসন উচ্ছেদ করার, দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষেরই বর্ণবিদ্বেষবাদ  বিরোধী লড়াই করার, ইত্যাদি। যে কোনো রকম বাইরের সাহায্য চাওয়া, এমন কি বাইরের থেকে সামরিক সাহায্য চাওয়া, একটা কথা, কিন্তু বাইরের ফৌজ দিয়ে একটা দেশের সামরিক মুক্তি? না!

   ১৯৭৮ সালের ‘সাউর বিপ্লব’-এ ধর্মনিরপেক্ষ, সংস্কারপন্থী সোভিয়েত-ঘেঁষা ‘কমিউনিস্ট’ দল, পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান ক্ষমতায় এলো। কিন্তু তাদের মধ্যে সশস্ত্র অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল এবং কাবুলের বাইরে তাদের খুব গণভিত্তি ছিল না। এই সরকারকে সমর্থন করতে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসন ছিল নৈতিকভাবে অন্যায়, নিন্দনীয় এবং রাজনৈতিকভাবে সর্বনাশা, কারণ এর ফলে ‘জনপ্রিয় জাতীয় আন্দোলনের’ পতাকা চলে গেল আল-কায়েদা, তালিবান সহ একগুচ্ছ ধর্মীয় ও ভাষিক/সামাজিক গোষ্ঠীদের হাতে।প্রাথমিকভাবে সামরিক সাহায্য এল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাদের ইঙ্গ-ফরাসী মিত্ররা এবং পাকিস্তান থেকেসোভিয়েত ইউনিয়ন শেষ অবধি পিছু হঠল ১৯৮৯ সালে এবং তাদের বসানো সরকারের পতন হল তিন বছর পরে এক গৃহযুদ্ধের মাঝে। বিভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠির মধ্যে গৃহযুদ্ধের পর ১৯৯৬ সালে দেশের ৯০% এলাকা দখল করে নিজেদের প্রাধান্য আনল তালিবান।      

২০০১ সালে যুগল টাওয়ার এবং পেন্টাগণের উপরে আক্রমণকে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র সচেতনভাবে মানবতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ বলে চিহ্নিত করতে রাজি হল না। কারণ তা হলে তাদের কেবলমাত্র অপরাধীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হত। তার বদলে, তারা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ’ ঘোষণা করল। তারা দাবী করল, অপরাধ করেছে যারা আর আমেরিকা যে সব দেশকে ‘সন্ত্রাসবাদীদের বাস করতে দিয়েছে’ বলে ঘোষণা করবে, তাদের মধ্যে কোনো পৃথকীকরণ করবে না। এইভাবে পথ প্রশস্ত হল একটা অ-রাষ্ট্রিক সংস্থার সঙ্গে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বকে আমেরিকার ব্যাপকতর ভূ-রাজনৈতিক দিশা, অর্থাৎ বিশ্ব দমনের খোয়াব, মাথায় রেখে পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ার যে কোনো দেশের সঙ্গে সংঘাতে রূপান্তরিত করার। নতুন সহস্রাব্দে এমন বহু দেশের মধ্যে আফগানিস্তানই হল প্রথম দেশ, যাকে এই সামরিক আগ্রাসন সহ্য করতে হল। মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি নির্মাণ করেন যারা, তারা ইতিমধ্যেই চিন, ইরান এবং রাশিয়াকে প্রধান বিপদ হিসেবে সনাক্ত করেছিল, এবং তারা সচেতন ছিল যে পাকিস্তান ছাড়া আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলি হল ইরান, চিন, এবং রুশ-ঘেঁষা মধ্য এশিয়ার সাধারণতন্ত্রগুলি। আর ঐ এলাকাতে আছে খনিজ তেল ও গ্যাসের এক এতদিন ধরা হয়নি এমন বড় সম্ভার।      

বিগত কুড়ি বছরে মার্কিণ সামরিক বাহিনী এবং তাদের পুতুল সরকারগুলি (যারা নিজেরা দুর্নীতিগ্রস্থ এবং নানা উপদলে বিভক্ত)তারা ব্যাপকভাবে বোমা ফেলেছে (‘ডেইজি কাটার’, ক্লাস্টার বোমা), পাকিস্তান অবধি ড্রোন আক্রমণ করেছে, অজানা বিদ্রোহী ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে ‘খোঁজ করে ধংস করা’র নামে নৃশংস ও বাছবিচারহীন আক্রমণ করেছে। মার্কিনীদের (ফৌজ এবং কন্ট্র্যাক্টার মিলিয়ে) মৃত্যুর সংখ্যা ৬৫০০ মত। এর বিপরীতে সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসেবে, ২০১৯ অবধি মোট আফগান মৃত্যু সংখ্যা (সরকারী সৈন্য/পুলিশ, সরকার বিরোধী যোদ্ধা, অসামরিক নাগরিক মিলিয়ে) ছিল ১,৬০,০০০। অন্য অনেকে, যারা সরকারীভাবে স্বীকৃত না এমন সব অসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু্র হিসেব করতে চেষ্টা করেছে, তারা কয়েক লাখ থেকে দশ লাখের বেশী, নানা সংখ্যা দেখাতে চায়, যেখানে গোটা দেশটার জনসংখ্যা ৩.৫ কোটি থেকে ৪ কোটি। ৪০ লাখ আফগান দেশের মধ্যেই ঘরছাড়া এবং আরো ২৭ লাখ দেশের বাইরে শরণার্থী। এই মুহূর্তে দেশের ৪৮% জাতীয় দারিদ্র সীমার নীচে বাস করছে। কিছু কিছু প্রগতিশীল আইন ও সংস্কার হয়েছে, কিন্তু সে সব মার্কিন উপস্থিতি ও শাসনকে ন্যায্যতা দেয় না, ঠিক যেমন ব্রিটিশরা হাসপাতাল, স্কুল বানিয়েছিল বা কিছু আইনসভা, নির্বাচন ও সীমিত ভোটাধিকার দিয়েছিল বলে ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন চালু রাখার কোনো ন্যায্যতা আসে না।         

৩০০,০০০-র চেয়ে বেশী সংখ্যক আফগান বাহিনী (সৈন্য, পুলিশ, বিশেষ মিলিশিয়া), যা সংখ্যার দিক থেকে তালিবানের চেয়ে ৫ থেকে ৬ গুণ বড়, যার হাতে ছিল সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রসম্ভার, আর আকাশপথের সম্পূর্ণ যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, তা যদি এমন নাটকীয়ভাবে ধ্বসে যায়, সেটা দেখায় যে তালিবানের সত্যিই জমিতে বেশ কিছুটা সমর্থন এবং জনতার সম্মতি (নিঃসন্দেহে অনেকটা ভয়ের ফলে) আছে, যেটা শুধু তাদের মূলত পুশতুভাষী ভিত্তির বাইরেও যায়। তবে তারা ফারসিভাষী তাজিকদের প্রতি ভীষণই বৈরিতাপূর্ণপুশতুভাষীরা দেশের ৪২%, আর তাজিকরা ২৭%। অর্থাৎ, প্রবল আভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন বা এমনকি ভবিষ্যতে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি হবে, এই ভয় থেকে যায়। তালিবানরা তাদের অতীতের আন্তর্জাতিক নিঃসংগতা থেকে কিছু শিখে থাকতে পারে, নাও পারে। হয়তো তারা নির্দিষ্ট কিছু ধরণের সামাজিক ও নাগরিক দমনপীড়ন এড়িয়ে যাবে। কিন্তু তাদের ইতিহাস, তাদের ধর্মীয় সংকীর্ণতাবাদী, গণতন্ত্রবিরোধী, নারীবিদ্বেষী সামাজিক/নাগরিক কর্মসূচীর আলোকে, যেখানে তারা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে তারা     শারিয়াভিত্তিক আইন চালু করবে, সেখানে তাদের কোনোরকম ইতস্তত না করেই খোলাখুলি বিরোধিতা করার যথেষ্ট কারণ আছে।

ভারতে সহ, সর্বত্র সরকাররা আফগান জনগণের জন্য মড়াকান্না গাইবে, কিন্তু বাস্তবে তারা আর তাদের দলে দলে রণনৈতিক বিশেষজ্ঞরা কেবল লাভ-ক্ষতির রাজনীতির স্থূল, নীতিহীন চেতনা থেকে কাজ করবে। ‘ জাতীয় স্বার্থ’ দেখার দাবী করে তাঁরা সেই বাঁধাগতের অজুহাত দিয়ে আসলে এই প্রত্যেকটা রাষ্ট্র যে সব ভিন্ন ভিন্ন শাসক শ্রেণীর স্বার্থ দেখে, তার ভিত্তিতে স্থির করবে, তাঁরা নতুন তালিবান সরকারের সঙ্গে কোনোরকম কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না করবে না, কিরকম করবে, নাকি তাঁরা হাত মেলাবে অন্য স্বার্থন্বেষী রাষ্ট্রদের সঙ্গে, সে পাশ্চাত্যের জোট হোক বা রাশিয়া, চিন এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য জোট হোক, যে জোট আফগানিস্তানের নয়া শাসকদের প্রতি বেশি সদয়। কোনো আফগান সরকারই ডুরান্ড লাইন মেনে নেয় নি এবং পুশতু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেশি নিবিড় সম্পর্কযুক্ত তালিবান পাকিস্তানের কাছে মোটেও ততটা কৃতজ্ঞ না, যেমন দেখাতে চাইছে ইসলামবিদ্বেষী মোদী সরকার, দেশের ভিতরে পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব বাড়ানোর জন্য, কারণ তা হলে তাদের লাভ হবে, কাশ্মীরে অত্যাচার আরো বাড়ানোর সময়ে। অথচ, তাদের হিন্দুত্ববাদী নিদানগুলো অনেক সময়ে র‍্যাডিকাল ইসলামের মতই অবক্ষয়প্রাপ্ত।    

আমরা কাকে সমর্থন করব, কার বিরোধিতা করব, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সূচনাবিন্দু হতে হবে আফগান জনগণের স্বার্থ, আমাদের কল্পিত ‘জাতীয় স্বার্থ’ নয়। আফগানিস্তানের উপরে কোনোরকম অর্থনৈতিক অবরোধ চাপানো চলবে না। এগুলি শাসকবর্গকে যতটুকু আঘাত করে, তার চেয়ে অনেক বেশি আঘাত করে জনগণকে। এই দীর্ঘ যুদ্ধপীড়িত দেশটিতে প্রগতিশীল আন্তর্জাতিক ও নাগরিক সংস্থাদের মাধ্যমে মানবিকতাবাদী সাহায্য যথাযথভাবে পাঠানো এক অবশ্য কর্তব্য। তালিবান সরকারকে স্বীকৃতি না, কিন্তু কোনোরকম সামরিক চাপও না। নানা ধরনের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চাপ দিয়ে তাদের মেয়েদের বিরুদ্ধে, আর ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কম দমনপীড়ন পদক্ষেপ ও আইন করার দিকে ঠেলে দেওয়া যায়।  পাশ্চাত্যের ও অন্য নানা দেশেরও, একটা মৌলিক পরীক্ষা এখন আসবে, যা হল আফগানিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের বিষয়ে তাদের অবস্থান। যারা আশ্রয় চায়, তাদের উপরে কোনো নিষেধাজ্ঞা করা চলবে না এবং তাঁরা যেখানে যেতে পারে সেখানে থাকার বা সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মোদির আগমনের আগে থেকেই, ভারত ১৯৫১-র শরণার্থী কনভেনশন এবং তার ১৯৬৭-র প্রোটোকল স্বাক্ষর করে নি। এই আন্তর্জাতিক সনদ অন্যান্য নানা কাজের মধ্যে ‘রিফাউলমেন্ট’ অর্থাৎ শরণার্থীরা যেখান থেকে এসেছেন তাঁদের জোর করে সেখানে ফেরত পাঠানোকে নিষেধ করে। মোদি সরকার ইতিমধ্যেই বেশ কিছু রোহিঙ্গার প্রতি এই আচরণ করেছে, নিছক তাঁরা মুসলিম বলে। মুসলিমদের প্রতি এবং ইসলামের প্রতি, এই যে শত্রুতামূলক আচরণ, সেটা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ )-র ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে, যে আইন আফগানিস্তান সম্পর্কে প্রযোজ্য। আজকের পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লী বাছাই করা কিছু শরণার্থীকে  আসতে দিতে পারে, কিন্তু সেটা আদৌ যথেষ্ট নয়। অবাধে আসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রতিবেশী দেশদের মধ্যে আলোচনা চলতে পারে এই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য। উপরন্তু, যে সব আফগান ছাত্ররা বা অন্যরাও ইতিমধ্যে এদেশে আছেন এবং থাকতে চান, তাঁদের ভিসার সময়সীমা বাড়াতে হবে, যতদিন না তাঁরা নিশ্চিন্তে স্বদেশে ফিরতে পারেন অথবা যথাসময়ে ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন।

                     ------------------------------------------------------

সাম্রাজ্যবাদ নয়! তালিবান নয়!

র‍্যাডিক্যাল সোশ্যালিস্ট – ১৮ অগাস্ট ২০২১