Statements of Radical Socialist

৫ই অগাস্টের তাৎপর্য ও ভবিষ্যতের দিশা সম্পর্কে র‍্যাডিকাল সোশ্যালিস্টের অবস্থান

৫ই অগাস্টের তাৎপর্য ও ভবিষ্যতের দিশা সম্পর্কে র‍্যাডিকাল সোশ্যালিস্টের বক্তব্য

ভারতের উত্তরকালের ইতিহাসে ৫ই অগাস্ট তারিখটি আগ্রাসন ও উগ্র জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদী চোখরাঙ্গানির দিন হিসাবে চিহ্নিত থাকবে। সামাজিক তাৎপর্যের নিরিখে একালের অন্যান্য দেশের উগ্র-দক্ষিণপন্থী ফ্যাসীবাদ-ঘেঁষা শক্তিগুলির তুলনায় তা অনেক বেশী অভিঘাতবাহী, যা প্রথম ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের টুঁটি টিপে মারতে সক্ষম হয়েছে।

একথা অনস্বীকার্য, যে স্বাধীন ভারতের সংবিধান, তার রাজনৈতিক অনুশীলন, সবেতেই একটা হিন্দু ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ঝোঁক ছিল। কিন্তু যা অতীতে ছিল বিভিন্ন উপাদানের একটি, আরএসএস ও তার হাতে গড়া রাজনৈতিক ও ‘সামাজিক-সাংস্কৃতিক’ সংগঠনগুলির হাতে তা হল প্রবল ঘাতসম্পন্ন কেন্দ্রীয় উপাদান। এই কারণেই, একদিকে বিজেপি জাতীয়তাবাদের উঁচু জমি দখল করতে পেরেছে, আর অন্যদিকে কংগ্রেস ও অন্যান্য বুর্জোয়া দলগুলি নীতিগত ভিত্তিতে তাদের বিরোধিতা করতে পারে নি, পারবেও না। বরং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি আদর্শ খানিকটা বিসর্জন দিয়েই তারা রামের মালিকানা নিয়ে বিজেপির সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

রাম মন্দিরের ভূমি পূজার দিন ইচ্ছাকৃতভাবেই ৫ই অগাস্ট স্থির করা হয়েছে। ভারতে কাশ্মীর অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গে পুরোপুরি গণতন্ত্র বর্জিত যে পন্থা নেওয়া হয়েছিল, তাকেও অগ্রাহ্য করে, এক বছর আগে, এই ৫ই অগাস্ট তারিখেই রাজ্যটির যেটুকু আত্মনিয়ন্ত্রণের মর্যাদা ছিল তা চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে, বেআইনিভাবে রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করা হয়। রাজ্যটিকে ভারতে একাত্ম করার নামে এ হল ঔপনিবেশিক শাসন কায়েমের শেষ ধাপ। এবার তার জমি ও সম্পদ বাইরে থেকে এসে অবাধে লুঠ করা যাবে। শেখ আবদুল্লার প্রশাসনের প্রথম দিকে যে অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল সংস্কার হয়েছিল, তাকে উলটে দেওয়া যাবে। আর, গত এক বছর ধরে কাশ্মীর আগাগোড়া স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পদানত যা মেনে নিয়েছে সুপ্রীম কোর্ট, কারণ তারা সরকারের সব দাবিকেই শেষ কথা বলে মনে করছে। ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি স্তম্ভের অগণতান্ত্রিক একীকরণের বার্তা এ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ঐ তারিখকে ভূমি পূজার তারিখ করে একগুচ্ছ সাংকেতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এই মন্দির নির্মিত হচ্ছে এমন এক রায়ের ভিত্তিতে, যেখানে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মেনে নিয়েছে যে অপরাধীরা একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ধ্বংস করেছে। তবুও সরকারি অর্থে সেখানে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্য একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করার রায় দেওয়া হয়। এই রায় ছিল ধাপে ধাপে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত। ৫ই অগাস্ট তারিখ বেছে নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার জানান দিচ্ছে যে তার কাজে কোনরকম টানাপড়েন নেই। কাশ্মীরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা বিপন্ন, সেখানে অন্য জায়গা থেকে মানুষ এনে বহু দশকের লড়াইয়ের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছে। একক জাতি নির্মাণের আগ্রাসী হিন্দুত্বের রাজনীতি, ব্রাহ্মণ্যবাদী ও উত্তর ভারতীয় হিন্দু ধর্মের সঙ্গে জাতিকে এক করে দেখানো হচ্ছে।

মানুষ যে শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই আবারও করবে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বিগত দশকগুলির ইতিহাস সাক্ষী, ভারত যদি কাশ্মীরের অধিকারের জন্য লড়াই না করে, তবে ভারতে কোথাও গণতন্ত্র, ন্যায় বা সামাজিক প্রগতির জায়গা থাকবে না। শ্রমজীবী মানুষ, শ্রমিক ও কৃষক, দলিত ও আদিবাসী ও অন্য নিপীড়িত সম্প্রদায়, নারী ও অন্য প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষ, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, বুর্জোয়া রাজনীতি ও ব্রাহ্মণ্যবাদী- হিন্দুত্ব মতাদর্শের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের এমন সব লড়াই গড়ে তুলতে হবে, যা তথাকথিত মূল শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার নামে শোষণ-নিপীড়নের স্তরবিন্যাস করবে না। যা বলবে না মূল শত্রুর সাথে লড়ার জন্য সমস্ত বিশেষ নিপীড়ন, সকল শ্রেণিগত শোষণ ভুলে যেতে। বুর্জোয়া রাজনীতি ও তার লেজুড়বৃত্তি করা সংস্কারবাদী বামপন্থা ১৯৭৫-৭৭ এর জরুরী অবস্থার সময় থেকে আজ অবধি ঐ পথ ধরে আজ আমাদের এই বিধ্বংসী পরিবেশে এনে ফেলেছে। লড়াইয়ের কোনো সোজা রাস্তা নেই। লড়াই হবে দীর্ঘ। কিন্তু ৫ই অগাস্টের হিন্দুত্ববাদী বিজয়ের বিরুদ্ধে লড়ে, দিন বদল সম্ভব কেবল প্রতিটি শোষণ-নিপীড়নের চরিত্র বুঝে, গণ যুক্তফ্রণ্ট গড়ে, এবং সব বুর্জোয়া দলকে প্রত্যাখ্যান করেই। বর্বরতার একমাত্র বিকল্প সমাজতন্ত্র। বুর্জোয়াদের ফেলে দেওয়া পতাকা তুলে ধরে সাচ্চা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের স্বপ্ন নয়, চাই ভারতীয় পরিস্থিতিতে প্রলেতারীয় বিপ্লবের দীর্ঘ প্রস্তুতি, যা হতে পারে কেবল সমস্ত শোষিত ও নিপীড়িতের কণ্ঠ হয়েই।