Statements of Radical Socialist

অযোধ্যা নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের রায় প্রসঙ্গে র‍্যাডিক্যাল সোশ্যালিস্টের বিবৃতি

Published on Wednesday, 13 November 2019 02:12
Written by Radical Socialist




বাবরি মসজিদের স্বত্বাধিকার নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের রায় কলঙ্কজনক। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের কন্ঠে উচ্চারিত হলেও এই রায়ে আসলে উগ্র-দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্বের কণ্ঠস্বর। বাবরি মসজিদের গোটা জমি রাম লালাকে দেওয়ার সুপ্রীম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত আমরা প্রত্যাখ্যান করি। এই রায়ের আরো বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা দরকার, কিন্তু প্রাথমিকভাবে এ কথা স্পষ্ট যে এই রায় হল গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরাজয়। একই সাথে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নয়, ভারতের শ্রমিক, কৃষক তথা সাধারণ মানুষের জন্যও এ এক বিরাট বিপদ।


হিন্দুত্ববাদী সরকারের কড়া নজরে প্রকাশিত এই রায় গত কয়েক দশকের এক রাজনৈতিক কর্মসূচীর বিজয়। স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে ধারাবাহিক সাংগঠনিক উদ্যোগ এবং তাৎপর্যপূর্ণ গণআন্দোলনের মাধ্যমে এটা কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এই রায়ের সঙ্গে বার্লিনের দেওয়াল ভেঙ্গে পড়ার তুলনা করেছেন। আটের ও নয়ের দশকের হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের স্থপতি লালকৃষ্ণ আদবাণী ঘোষণা করেছেন যে আজ তাঁর ভূমিকা সম্পূর্ণ ন্যায্য বলে প্রমাণিত। সঙ্ঘ পরিবারের গণজমায়েতের ক্ষমতা, যার সুবাদেই বিজেপির এই শক্তিবৃদ্ধি এবং আরএসএস-এর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া, তাকে মোকাবিলা করার সহজ কোন চাবিকাঠি নেই। তারা দেশের প্রচলিত ধ্যানধারণা, মূল্যবোধ, যুক্তি ও বিচারধারা পাল্টে দিতে সফল হয়েছে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরবিচ্ছিন্নভাবে একঘরে করে তুলেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের (বিচারব্যবস্থা সহ) ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িকীকরণে সাফল্যই এই রায়ের ভিত্তি।


সুপ্রীম কোর্টের রায় কিন্তু কতগুলো ঘটনাকে বেআইনী স্বীকৃতি দিয়েছে, যেমন, ) ২২/২৩ ডিসেম্বর ১৯৪৯ অবধি বিতর্কিত জায়গায় একটি মসজিদ চালু ছিল, যা বেআইনিভাবে বন্ধ করা হয় এবং চুপিসাড়ে হিন্দু মূর্তি ঢুকিয়ে মসজিদকে অপবিত্র’ করা হয়, ) ১৯৯২ সালে মসজিদটি বেআইনিভাবে এবং অন্যায়ভাবে ধ্বংস করা হয়। এই অপরাধমূলক কাজের বিহিতে ন্যায়-প্রতিষ্ঠার যুক্তিসঙ্গত পথ ছিল মসজিদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের রায় উপরোক্ত অপকর্মের অপরাধমূলক চরিত্র স্বীকার করেও অপরাধীদের ও তাদের সমর্থকদের পুরস্কৃত করেছে। এটা ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত তৈরি করল।


এই রায় হিন্দুত্ববাদী শক্তির পক্ষে আরও অনেক বিস্তৃত ক্ষেত্র উন্মুক্ত করল। তারা এখন অযোধ্যায় মন্দির নির্মাণের নামে গণজমায়েত করার উদ্যোগ নেবে। একে জাতীয় কর্তব্য হিসেবে দেখিয়ে শ্রমজীবী মানুষকে করসেবার নামে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে বলা হবে। উপরন্তু, এই রায় আরো অন্যান্য বিতর্কিত ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টিতে তাদের উৎসাহিত করবে। নয়ের দশক থেকে আরএসএস-এর অন্যতম স্লোগান ছিল অযোধ্যা তো বাস ঝাঁকি হ্যায়, মথুরা-কাশী বাকি হ্যায় (অযোধ্যা তো সবে শুরু, মথুরা কাশী এখনো বাকি)। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাসূচক মনোভাব আরও উগ্র হবে।


শ্রেণী বিভক্ত সমাজে বিচারব্যবস্থা রাষ্ট্রেরই প্রত্যক্ষ অঙ্গ, শাসক শ্রেণীর স্বার্থের বিপরীতে কোনো নিরপেক্ষ, স্বাধীন বা অলঙ্ঘ্য প্রতিষ্ঠান নয় - মৌলিক মার্ক্সবাদী রাষ্ট্রতত্ত্বের এই সত্যতা এই রায়ের মধ্যে দিয়ে আরেকবার প্রমাণিত হয়। এই রায় থেকে পরিষ্কার যে কোন সংবিধানসম্মত রাজনৈতিক দলগুলির দ্বারা, যার মধ্যে বাম দলগুলিও অন্তর্ভুক্ত, রাষ্ট্র ও সমাজের হিন্দুত্বকরণের প্রচেষ্টাকে উল্টে দেওয়া তো দূরের কথা, আমাদের অন্ধকারে নিমজ্জিত করার এই রাজনীতিকে চ্যলেঞ্জ জানাতেও সক্ষম নয়। এটা ঠিক যে আগামী দিনে রাজনৈতিক রণনীতি সংক্রান্ত অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের, কিন্তু একটা কথা বুঝে নেওয়া দরকার বাবরি মসজিদ রায় নিয়ে কোনোরকম ইতস্তত করলে হিন্দুত্ব ও ধনতান্ত্রিক আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিক ও কৃষকের পাল্টা ক্ষমতা গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী প্রয়াসের সর্বনাশ হবে। কিছু সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়া, অন্যান্য প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তির দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই রায়ের নিন্দা করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থেকেই স্পষ্ট যে দেশের শাসক শ্রেণীর মদতে সঙ্ঘ পরিবারই এখন সমস্ত রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা স্থির করে দিচ্ছে।


এই অ্যাজেন্ডায় আম জনতার বাস্তব জীবনের কোনো প্রসঙ্গ নেই। তাই সময়ের সাথে রাম মন্দির নির্মাণ ও সঙ্ঘ পরিবারের অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আসন্ন পদক্ষেপগুলি হিন্দুরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রকল্পের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলি প্রকাশ্যে আনতে পারে এবং তা সক্রিয় হস্তক্ষেপের জমি তৈরী করতে পারে। হিন্দুরাষ্ট্রের প্রকল্পকে কোণঠাসা করতে ছোট বড় সমস্ত উদ্যোগে, বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন প্রগতিশীল শক্তিকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে, তাদের নীতিনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘমেয়াদী ভাবনা দিয়ে তাকে পুষ্ট করতে হবে।


কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই যে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি এই রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে কতটা ভীত। কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি বলেছে যে তারা রাম মন্দির নির্মাণ সমর্থন করবে কারণ তা নাকি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে আরো মজবুত করবে। বহুজন সমাজ পার্টি এবং সি পি আই-এর বিবৃতি মূল সমস্যা এড়িয়ে সংবিধানের প্রশংসা করতে চেয়েছে এবং শান্তির ডাক দিয়েছে। অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জির নীরবতা এক তীব্র অক্ষমতার ছবি তুলে ধরেছে। সিপিআই(এম)-এর বিবৃতিতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারীদের শাস্তি চাইলেও রায়ের সন্দেহজনক ভিত্তি সম্পর্কে উক্তি ছাড়া আর কিছু বলে নি। অর্থাৎ বুর্জোয়া দলগুলি আত্মসমর্পণ করেছে, এড়িয়ে গেছে বা এই রায়টিকে সাগ্রহে গ্রহণ করেছে। আর মূলস্রোতের সংসদীয় বামদলগুলি দেখিয়েছে যে গত তিন দশক ধরে বলা নিজেদের কথার ভিত্তিতেও তারা নীতিনিষ্ঠ ও অবিচল লড়াই গড়ে তুলতে ও রুখে দাঁড়াতে অক্ষম।


বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিদের এই ঘোলা জলে সাবধানে পা ফেলতে হবে। একদিকে আমাদের নিজেদের নীতিনিষ্ঠ বক্তব্য রাখতে হবে। পাশাপাশি, যেখানেই মুসলমান সম্প্রদায়ের আক্রান্ত মানুষ আছেন সেখানেই তাদের প্রতি সবরকম সাহায্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্ত প্রয়াসে আমাদের হাত মেলাতে হবে, যদি তা দোদুল্যমান বামপন্থীদেরও উদ্যোগ হয়। উস্কানীর জবাব দিতে হবে সংহতির মাধ্যমে, যৌথ ফ্রণ্ট গড়ে, এবং আজকের শক্তির ভারসাম্যের কথা মাথায় রেখে, শান্তি বজায় রাখার চেষ্টার মাধ্যমে। মুসলমানদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের সর্বত্র ও সর্বতোভাবে লড়ে যেতে হবে।


কিন্তু কিছু দীর্ঘমেয়াদী প্রশ্ন থেকেই যায়। গণআন্দোলনের সামনের সারিতে আছেন যে কর্মীরা, তাঁদের দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হবে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য মজবুত করার জন্য এবং সেই সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে, যারা ধর্ম ও জাতিকে সমার্থক করে দিতে চাইছে। শ্রমিক-কৃষককে বুঝতে হবে যে প্রকৃত মুক্তি আসবে শ্রেণীগত ঐক্য ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির রাজনীতি থেকে। এর ফলে অনেক সময়ে আমাদের সাংগঠনিক প্রচেষ্টাগুলিকে দেশদ্রোহী বলে ছাপ মারার চেষ্টা চলবে। কিন্তু সেই ভয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে কোনোরকম ইতস্তত করলে দীর্ঘমেয়াদীভাবে প্রগতিশীল শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন গড়ার কাজের ক্ষতি হবে। একে ভারসাম্য রক্ষা করার রায় বলে ইতিমধ্যেই যে মিথ্যা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে তাকে হাজারবার পরাস্ত করতে হবে। শিক্ষাজগতে, পেশাদারী ক্ষেত্রে ও অন্যত্র, দক্ষতা ও বিশ্লেষণের গভীরতাকে একজোট করতে হবে এই ঐকমত্য গড়ার প্রতিক্রিয়াশীল চেষ্টার বিপরীতে।


লড়াইয়ের ময়দানে আশু জয়ের সম্ভাবনা মলিন। সব ক্ষেত্রেই হিন্দুত্ববাদিরা সুসংগঠিত। মনে হতে পারে অদূর ভবিষ্যতের নিরিখে এ যেন এক হেরে যাওয়ার লড়াই। আমরা এখন সেই সময়ে রয়েছি, যাকে গ্রামশি বলেছিলেন অবস্থানের যুদ্ধ। আমাদের এখন অবিচল থাকতে হবে সকলের জন্য ন্যায্য, মর্যাদাপূর্ণ ও সমতাসম্পন্ন সমাজ - এই মূল লক্ষ্যের প্রতি। যদি দীর্ঘমেয়াদী রণনীতি অনুসরণ করে লক্ষ্যের দিকে এগোন যায়, শুধুমাত্র তাহলেই ভবিষ্যতের জন্য কোনো আশা থাকতে পারে।

                                                               ১০ নভেম্বর, ২০১৯