Statements of Radical Socialist

সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা বাতিল প্রসঙ্গে র‍্যাডিক্যাল সোশ্যালিস্টের অবস্থান

 

র‍্যাডিক্যাল সোশ্যালিস্ট দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ও দৃঢ়তার সঙ্গে সংবিধানের ৩৭০ ধারার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কার্যত বাতিল করা এবং ৩৫এ ধারা রদ করার বিরোধিতা করে নিন্দা জানাচ্ছে। একটি অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক আইনি মারপ্যাঁচের মাধ্যমে এবং একইসাথে কাশ্মীরের মানুষকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সশস্ত্র ভীতিপ্রদর্শনের মাধ্যমে এই কাজটি করা হয়েছে। যা ঘটেছে তাকে বলা চলে অসৎ, এবং সংবিধানের উক্ত ধারাগুলির মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যগুলির প্রতি প্রতারণা ও জালিয়াতি ।

৩৭০ ধারা বাতিল করার একমাত্র উপায় হল জম্মু-কাশ্মীরের সংবিধান সভার পুনর্গঠন এবং সেখানে এই প্রস্তাব নেওয়া। কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৫৭ সালে ভেঙ্গে দেওয়া হয়। কোনরকম সাংবিধানিক সংশোধন ছাড়া অবৈধভাবে একটি রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করে সংবিধানের ৩৬৭ ধারা বদল করে এর মাধ্যমে নির্লজ্জভাবে জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভার ক্ষমতা ঐ সংবিধান-সভার সমতুল্য বলে দেখানো হয়। এই শেষোক্ত প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি সার্বভৌমিক ক্ষমতার অধিকারী। যেহেতু জম্মু-কাশ্মীরে এখন রাষ্ট্রপতির শাসন চলছে সেহেতু রাজ্যপালের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারার বিলোপ ঘটায়। তাছাড়া স্বাধীন ভারতে এই প্রথম সংসদের দুই কক্ষে একটি রাজ্য পুনর্গঠন বিল পেশ করা ও গৃহীত হয় যার মাধ্যমে একটি রাজ্যের মর্যাদা হ্রাস করে তা অবলুপ্তি ঘটিয়ে দুটি কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলে ভেঙ্গে দেওয়া হয়। এই কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলগুলির একটির – জম্মু-কাশ্মীরের - পন্ডিচেরি ও দিল্লির মতো আইনসভা থাকবে আর লাদাখ দেশের আরও পাঁচটি কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলের মতো এই অধিকার ভোগ করবে না। চাপের মুখে নতিস্বীকার করে বিরোধী দলগুলি বিজেপির পক্ষ না নিলে এই রাজ্য পুনর্গঠন বিল পাশ করানো যেত না।

কংগ্রেস দল (যে দল ঐতিহাসিকভাবে জম্মু-কাশ্মীরের স্বশাসনের ধারাবাহিক অবনতি ঘটিয়েছে) সরকারিভাবে বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। যদিও অভিষেক সিংহভি এবং জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার মতো কোন কোন কংগ্রেসের নেতা এই কাজের বিরোধিতা করেন নি, শুধুমাত্র পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন। একমাত্র বামপন্থীরাই এর বিরোধিতায় রাস্তায় নেমেছে এবং সারা ভারতে প্রতিবাদ করেছে।

আমদের কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে বিজেপি সরকার ও সঙ্ঘ পরিবারের এই নির্লজ্জ রাজনৈতিক ও সামরিক দখলদারির মূল কারণ হল ক) প্রথমত মুসলমানের প্রতি ঘৃণা, এবং যেখানে জম্মু-কাশ্মীর কার্যত দেশের একমাত্র মুসলমান প্রধান রাজ্য ছিল। খ) দ্বিতীয়ত উপত্যকার মানুষের ওপর আরও বেশি আঘাত নামানো। সেই কারণেই ৬,৫০,০০০ ফৌজির উপস্থিতি সত্ত্বেও আরও ৩৫,০০০ সৈন্য পাঠানো হয়। কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দী করে রাখা হয়, কারফিউ জারি করা হয় এবং উপত্যকার সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিন্ন করে দেওয়া হয়। গ) তৃতীয়ত হিন্দু রাষ্ট্র নির্মাণের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ঘ) চতুর্থত এর মাধ্যমে পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্যদের রাজনৈতিক বার্তা পাঠানো যে পাকিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিকভাবে মীমাংসা করার মতো কোন "আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব" নেই। রাষ্ট্রপুঞ্জ বা আন্তর্জাতিক স্তরে মীমাংসার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কোনরকমের মানবিক বিবেচনার বিষয় নেই এখানে।

অদূর ও সুদূর ভবিষ্যতে কী হতে পারে

 

  • বিষটি সুপ্রীম কোর্টে যাবে এবং একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করা হবে। এই মুহুর্তে সুপ্রীম কোর্ট শাসকের ইচ্ছা ও ক্ষমতার যে পরিমাণ অধস্তন তাতে এই বেঞ্চ এই বিষয়ে চূড়ান্ত রায়প্রদানের আগে স্থগিতাদেশ জারি করে সাময়িকভাবে একে রদ করার কোন সাহস বা সততা প্রদর্শন করতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। এই ধারাগুলি সম্পর্কিত নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান নিয়ে তারা কতটা সৎ ও বিশ্বস্ত থাকতে পারবে একথা বলা দুষ্কর। সর্বসম্মতিতে না হলেও এই বেঞ্চ যে সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে ৩৭০ ও ৩৫এ ধারার বাতিলের ওপর আইনী সীলমোহর দেবে সেই সম্ভাবনা প্রবল। রাজ্যের -- জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখের মর্যাদা হ্রাসের বিপক্ষে আদালত রায় দিতে পারে, যদিও তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
  • আগামী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের নির্বাচনের আগে একটি আসন পুনর্গঠন কমিশন গঠন করে বিধানসভা ও লোকসভা কেন্দ্রগুলির পুনর্বিন্যাস করা হবে। চেষ্টা করা হবে জম্মু অঞ্চলে যত বেশি সম্ভব আসন রাখা যায় যাতে বিজেপি ও তার সঙ্গীরা সহজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।
  • জম্মু-কাশ্মীরের এবং বিশেষ করে উপত্যকার জন অনুপাত বদলে দেওয়ার পদ্ধতি শুরু করার জন্য ৩৫এ ধারার বিলোপ জরুরী ছিল। চেষ্টা চলবে যাতে উপত্যকায় মুসলমানদের সংখ্যালঘু করা যায়।
  • কাশ্মীর উপত্যকায় এর বিরুদ্ধে মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজ, ক্ষোভ-বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। তারা আরও বেশি করে ভারতের থেকে দূরে সরে যাবে। আরও বেশি করে জঙ্গি তৈরি হবে এবং তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন আরও বাড়বে। সীমান্তের দুই পারের জঙ্গিদের সহযোগিতা বেড়ে যাবে এবং পাকিস্তান সরকার তাতে মদত যোগাবে। এই ধরণের পরিস্থিতি এবং এমন কি মানুষের অহিংস আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে ভারত সরকার ও সেনাবাহিনী আরও বেশি নৃশংসতা ও দমন-নিপীড়ন নামিয়ে আনবে মানুষের ওপর। ‘সন্ত্রাসবাদ’ দমনের নয়া সংশোধিত আইন এবং ‘বেআইনি কার্যকলাপ দমন আইন ২০১৯’ বা ইউএপিএ প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বিচারে এবং সন্দেহের বশে যে কোন ব্যক্তিকে আটক, হয়রানি এবং নির্যাতন করা হবে।
  • এই অঞ্চলের উন্নয়ন কতটা আটকে ছিল এবং তা কীভাবে শুরু করা যায় – এই আলোচনার পেছনে রয়েছে সঙ্ঘ পরিবারের মূল লক্ষ্য উপত্যকার আরও বেশি ‘ভারতভুক্তির’ মাধ্যমে ওখানকার সমস্ত প্রতিরোধ পাশবিক শক্তি ও সামরিক দখলদারির মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া
  • পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সঙ্ঘর্ষের সম্ভাবনা ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। এগুলি কোন কোন মাত্রায় প্রথাগত যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। এর ফলে ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
  • বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপের বিরোধিতার পরিবর্তে দেশজোড়া বিপুল সমর্থন প্রমাণ করে যে উদ্ধত, আক্রমণাত্মক পেশী-প্রদর্শনকারী হিন্দুত্বের বিষদাঁত আজ সমাজের কত গভীরে প্রবেশ করেছে এবং তা কি পরিমাণে ব্যপ্ত। কোন বিরোধী দল এমন কি মূলধারার সংসদীয় বাম দলগুলিও ধারাবাহিকভাবে এবং গুরুত্বের সাথে এই ‘শক্তিশালী’ ভারতবর্ষ নির্মাণের সাম্প্রদায়িক ও অগণতান্ত্রিক পদ্ধতির বিরোধিতা করে নি। এই আধিপত্যবাদী ভাবনার মোকাবিলা করতে এক দীর্ঘকালীন লড়াইয়ের মাধ্যমে যার জন্য প্রয়োজন এক নতুন আপসহীন বামপন্থা।

আমাদের সতর্ক করার কারণ এই যে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার ক্ষয় আসলে হিন্দুত্ব প্রকল্পেরই একটি অংশ। যে আঞ্চলিক দলগুলি কেন্দ্রের বিজেপির সাথে অঘোষিত, অবাঞ্ছনীয় আপোষের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির আশা করছে, বাস্তবে তারা আসলে আরো বড় বিপদের সম্ভাবনা বহন করছে।

হিন্দুত্ব প্রকল্পের বিপদের কথা মাথায় রেখে যারা এর বিরোধিতা করছেন, সেইসব প্রগতিশীল মানুষের আছে আমাদের আহ্বান, আপনারা সকলে কাশ্মীরের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহমর্মিতা পোষণ করুন। কাশ্মীরীদের প্রতি ন্যায়বিচার ও সম্মান তাদের স্বাধীন চলাফেরা ও দ্রুত অসামরিকীকরণ দাবি করে। ইচ্ছানুসারে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভের প্রকাশ ও সংগঠিত প্রতিবাদ তাদের অধিকার।

আমরা এই বেড়ে ওঠা প্রান্তিকীকরণ, জাতিগত বর্ণবৈষম্যবাদ, সামরিক জাতীয়তাবাদের তীব্র প্রতিবাদ করছি । আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি কাশ্মীরের নিপীড়িত মানুষের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের সম্পুর্ণ অধিকার আছে।