Socialist and Peoples' History

স্তালিন ও অক্টোবর বিপ্লবঃ একটি দলিল ভিত্তিক আলোচনা

 

কুণাল চট্টোপাধ্যায়   

 

আইজ্যাক ডয়েটশার স্তালিনের জীবনী রচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, অক্টোবর অভ্যুত্থানের সময়ে স্তালিনের অনুপস্থিতি এক অদ্ভূত কিন্তু অনস্বীকার্য তথ্য।[1] কিন্তু স্তালিন যুগে স্তালিনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে লেখা হিস্ট্রি অফ দ্য সি পি এস ইউ বি শর্ট কোর্সে বলা হয়েছে, যে অক্টোবর অভ্যুত্থানের দায়িত্বে ছিল স্তালিনের নেতৃত্বাধীন একটি পার্টি কেন্দ্র।[2] এই মত পুরো না হলেও, এদেশের বামপন্থী মহলে অনেকটাই গৃহীত। তাই দলিলের ভিত্তিতে দেখা হবে, ১৯১৭ সালে, ও বিশেষ করে সেপ্টেম্বর –অক্টোবরে স্তালিনের বাস্তব ভূমিকা কি ছিল?

স্তালিনের সামনে আসা, পিছনে হঠাঃ পার্টি কংগ্রেস থেকে অগাস্টের শেষ

কার্যত গোটা ১৯১৭ সালেই স্তালিনের ভূমিকা ছিল সীমিত। দরবারী ইতিহাসবিদরা ১৯২০-র দশকের শেষদিক থেকে সেটা বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করলেও, দলিল তা দেখায় না। এই প্রবন্ধে সবটা আলোচনার স্থান নেই। শেষ দিকটা নিয়েই বেশী আলোচনা করব। আমাদের কাছে জুলাই থেকে যে তথ্য, তা দেখায় পার্টি কংগ্রেসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও, এর পর স্তালিনের ভূমিকা সংকুচিত হয়।   

জুলাইয়ের দিন বলে পরিচিত ঘটনা বলশেভিক দলকে সাময়িক এক বিপদের দিকে ঠেলে দেয়, যদিও আমরা আজ সেটাকে সাময়িক বললেও, সেই সময়ে বিপদ বেশ বড়মাপের বলেই মনে হয়েছিল। জুলাইয়ের দিনগুলির ফলে স্তালিন একসময়ে একেবারে সামনের সারিতে আসেন। ষষ্ঠ পার্টি কংগ্রেসে স্তালিনের উপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল। কিন্তু আপাতত আমাদের একটাই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দেখতে হবে। শেষের দিকে এক রুদ্ধদ্বার অধিবেশন। কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হলে, প্রশ্ন ওঠে, এই দমনপীড়নের সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটির নাম প্রকাশ করা হবে কি না। প্রতিনিধিরা স্থির করেন প্রকাশ্যে নামগুলি ঘোষণা করা ঠিক হবে না। কিন্তু তাঁরা একথাও মনে করেন যে কোনো কথা না বলা ঠিক না। তাই অর্ঝনিকিজে প্রস্তাব করেন যে চারজন সর্বোচ্চ ভোট পাবেন তাদের নাম প্রকাশ করা হবে।[3] এই নামগুলি হল লেনিন (১৩৪ জন ভোট সহ প্রতিনিধির মধ্যে ১৩৩ ভোট পেয়েছিলেন), জিনোভিয়েভ (১৩২), কামেনেভ এবং ট্রটস্কী (দুজনেই ১৩১)। কংগ্রেসের কার্যবিবরণীর ১৯৫৮র সংস্করণ অনেকগুলি নাম বাদ দিয়েছিল, কারণ সম্ভবত তাঁরা পরে স্তালিনের বিরোধী ছিলেন এবং অনেককেই পরে হত্যা করা হয়েছিল।[4]১৯১৭ সালে এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে লেনিনের ঘোষিত বিরোধী কামেনেভ, এবং দলে নবাগত ট্রটস্কী, কংগ্রেসে এত ভোট পেলেন। এটা দেখায়, দল ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে স্তালিনের চিন্তা দলের চিন্তা ছিল না, এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে জনপ্রিয়তার ভিত্তি অন্যরকম ছিল।  

দমনপীড়ন চালু থাকা, ট্রটস্কী কারারুদ্ধ থাকা, লেনিন ও জিনোভিয়েভ কবে প্রকাশ্যে ফিরবেন তা অনিশ্চিত থাকা, এই সবের ফলে এবং কামেনেভের বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করার অভিযোগ ওঠায় ( তিনি জেল থেকে ছাড়া পেলেও, অগাস্টের শেষ অবধি তদন্ত চলায় তিনি নেতৃত্বে ছিলেন না), অগাস্ট মাসে স্তালিন গুরু দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি গোটা অগাস্ট জুড়ে কি কি কাজ করেছিলেন সেটা অনিশ্চিত। ধীরে ধীরে গণ আন্দোলন আবার মাথা তোলে। কিন্তু ১৯২৪ সালে ইস্টপার্ট (পার্টির ইতিহাসের দপ্তর) চার খন্ড একটি ঘটনা ও তার প্রতিবেদনের সংকলন প্রকাশ করেছিল। সেটির উল্লেখ করে ট্রটস্কী পরে লেখেন, অগাষ্ট-সেপ্টেম্বরের জন্য যে নির্ঘন্ট, তাতে প্রায় ৫০০ নামের মধ্যেও স্তালিনের নাম পাওয়া যায় না। সেই দুমাসের নানা লড়াইয়ে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারাও স্তালিনের নাম উল্লেখ করেন নি।[5] 

১৯১৭-র অগাস্ট দলিলের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য, কারণ ৪ঠা অগাস্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সভা থেকে ১৯১৮র গোড়ার দিকের মাসগুলি অবধি, কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যবিবরণী মোটামুটি যত্ন করে নেওয়া হয়েছিল, এবং সেগুলি প্রকাশিতও হয়েছিল। এছাড়া আছে স্তালিনের লেখা। কিন্তু প্রাভদা (এই সময়ে নানা নামে প্রকাশিত) তে তাঁর সব লেখাতে নিজের নাম নেই। ৬ সেপ্টেম্বর প্রথম K. St.  সইয়ে লেখা বেরোয়। ৯ সেপ্টেম্বর K. Stalin, ১২ সেপ্টেম্বর K। কেন্দ্রীয় পার্টি মুখপত্রের সম্পাদক, অথচ তিনি কোনো প্রবন্ধ লিখলেন না, যা নতুন পরিস্থিতিতে কাজ কি তার দিশা দেখাবে, নতুন প্রশ্ন তুলবে, ব্যাপক বিপ্লবী শ্রমিকের মধ্যে নতুন স্লোগান তুলে দেবে।   

কেন্দ্রীয় কমিটির ৪ঠা অগাস্টের সভায় স্থির হয়, ১১জন সদস্যের ছোটো একটি কমিটি প্রতিদিনের কাজ চালাবে।[6] ৫ই অগাস্ট ঐ কমিটির সদস্যদের নাম স্থির করা হয়। এতে স্তালিন এবং সভের্দলভের নাম ছিল। আর ছিল সোকোলনিকভ, ঝারঝিনস্কি, মিলিউটিন, উরিতস্কি, ইয়ফ, মুরানভ, বুবনভ, স্তাসোভা, এবং শাউমিয়ানের নাম (এর মধ্যে শাউমিয়ান রাজধানীতে আসার আগে অবধি স্মিলগার নাম করা হয়)। উলামের মতে এই কমিটি ছিল পলিটবুরো।[7]কথাটা সম্ভবত ভ্রান্ত। মানা যায় না একাধিক কারণে। পরবর্তীকালে পলিটবুরোতে থাকতেন সবচেয়ে প্রামান্য নেতারা। এই কমিটি তাৎক্ষণিক কাজ চালাবার জন্য তৈরি। একদিকে এতে লেনিন বা জিনোভিয়েভ পর্যন্ত ছিলেন না, ছিলেন না ট্রটস্কী। অন্যদিকে বলা হচ্ছে, শাউমিয়ান রাজধানীতে আসা অবধি এই কমিটিতে থাকবেন না, তার জায়গায় থাকবেন স্মিলগা। আর, এই ছোটো কমিটি কার্যত ২৩শে অগাস্টের পর ার কাজ করেছিল এমন নথীই নেই।  

৬ অগাস্টের কেন্দ্রীয় কমিটি সভায় একটি সেক্রেটারিয়েট গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।[8]এতে ছিলেন পাঁচজন সদস্য – সভের্দলভ, ঝারঝিনস্কি, ইয়ফ, মুরানভ, স্তাসোভা। স্পষ্টত, স্তালিনের চেয়ে সভের্দলভ এই সময়ে অনেক গুরু দায়িত্বে ছিলেন।

৪ঠা অগাস্ট একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পার্টির প্রকাশনাদের সম্পর্কে। সরকারী আক্রমণের ফলে প্রাভদা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পার্টির সামরিক কমিটির পত্রিকা সোলদাত প্রকাশিত হচ্ছিল। আর পেত্রোগ্রাদ কমিটি নিজস্ব পত্রিকার দাবী তুলছিল। স্থির হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে শহরে একটিই পত্রিকা থাকবে, এবং সোলদাত-কে কেন্দ্রীয় কমিটির পত্রিকা করা হবে। সম্পাদকমন্ডলী হবেন স্তালিন, সোকোলনিকভ এবং মিলিউটিন। ট্রটস্কীকে সদস্য করার প্রস্তাব আসে, কিন্তু ১১-১০ ভোটে তা নাকচ হয়। কিন্তু ৪ঠা সেপ্টেম্বর জামিনে  মুক্ত হলে ট্রটস্কী কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় আসেন এবং তাঁকে সেই সভা থেকে সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য করা হয়, যদিও কার্যত সোভিয়েতে ও জনসভাতেই তাঁর সময় কাটত। পার্টির তাত্ত্বিক পত্রিকা প্রসভেশ্চেনিয়ের সম্পাদকমন্ডলীতেও থাকে স্তালিনের নাম। কিন্তু ৬ই সেপ্টেম্বর স্তালিন এবং রিয়াজানভের পরিবর্তে আনা হয় ট্রটস্কী ও কামেনেভকে। অর্থাৎ, জেলে আটক সদস্যরা বেরোনোর পরে স্তালিনের ভূমিকা কমতে থাকে।

ইতিমধ্যে সামরিক কমিটির সঙ্গে সংঘাত বাধে। ১৩ই অগাস্ট কেন্দ্রীয় কমিটি স্তালিনকে দায়িত্ব দেয়, সোলদাত যে কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে নিচ্ছে, সে কথা সামরিক কমিটিকে জানাতে।[9]ঐ দিনই সামরিক কমিটির সঙ্গে স্তালিনের বৈঠক হয়। সামরিক কমিটি ১৫ই একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে স্তালিনের তীব্র সমালোচনা করে ও বলে, কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবর্তনের পর থেকে একধরণের অদ্ভুত দমনপীড়ন চলছে। “সামরিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় বুরো কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে দাবী করছে, দুই সংস্থার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার...।[10]

বলা যায়, ১৯১৭ সালেই, পরবর্তী যুগের ছায়া দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এটা ১৯১৭ ছিল। তাই দেখা গেল, কেন্দ্রীয় কমিটি সমস্যা মেটানোর জন্য সভের্দলভ ও ঝারঝিনস্কিকে দায়িত্ব দিল। পরে যখন অক্টোবরে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা হয়, তখন সামরিক কমিটির সঙ্গে স্তালিনের কোনো যোগসূত্র ছিল না।  

কর্নিলভের বিদ্রোহ ও স্তালিনের মত ও ভূমিকাঃ

১২ অগাস্ট থেকে মস্কোতে রাষ্ট্রীয় সম্মেলন শুরু হল। ১৫ই স্তালিন লিখলেন, “ঘটনা এগোচ্ছে একটি সামরিক একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও আইনীকরণের দিকে”।[11] কিন্তু মস্কোতে ঐ সম্মেলনের সময় থেকেই জেনারাল কর্নিলভ এবং প্রধানমন্ত্রী কেরেনস্কীর মধ্যে পার্থক্য এবং দুজনের সমর্থনের ভিত্তির পার্থক্য দেখা যাচ্ছিল। স্তালিনের কাছে এই পার্থক্য ছিল গৌণ, এবং এই পার্থক্য প্রকাশ্যে এলে বিপ্লবী দল ও শ্রেণী কি করতে পারবে তা নিয়ে তিনি বিশেষ ভাবেন নি। ২৮শে অগাস্ট নাম না লেখা একটি সম্পাদকীয়তে তিনি এই দ্বন্দ্ব সম্পর্কে লিখলেনঃ

“এখন জোট সরকার এবং কর্নিলভের দলের মধ্যে যে লড়াই চলছে সেটা বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ভিন্ন ভিন্ন ধরণের প্রতিবিপ্লবী নীতির দ্বন্দ্ব”।[12] অর্থাৎ, একদিকে দ্বন্দ্বটা কতদূর এগিয়েছিল, সেটার পুরো তাৎপর্য ধরতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। অন্যদিকে, এই সংকটে শ্রমিক শ্রেণী ও বলশেভিক দল কি করতে পারে তা নিয়েও কোনো ভাবনা ছিল না। এর বিপরীতে আমরা দেখতে পাই লেনিন বা ট্রটস্কীর মত, যারা পার্টির নেতৃত্বে প্রলেতারীয় বিপ্লবের সূচনার কথা ভাবতে থাকেন।[13]

কর্নিলভের সঙ্গে কেরেনস্কীর সংঘাত সামনে এলে লেনিন কেন্দ্রীয় কমিটিকে পাঠানো একটি চিঠিতে প্রস্তাব করেন, নতুন অবস্থায় রণকৌশল পাল্টাতে হবে। কর্নিলভের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, কিন্তু কেরেনস্কীকে সমর্থন না করে। এটা একটা সূক্ষ্ম তফাৎ, কিন্তু জরুরী। লেনিনের মতে, পার্টির দায়িত্ব হল কেরেনস্কীর দুর্বলতাকে প্রচারের মাধ্যমে সামনে এনে দেখানো, যাতে কর্নিলভের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে কেরেনস্কীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জনগণকে টানা যায়। এর জন্য দরকার আশু এবং নিঃশর্ত শান্তির আওয়াজ তোলা।[14]

ইতিমধ্যে পার্টির তদন্তে খালাস হয়ে কামেনেভ পুরোদমে রাজনৈতিক সক্রিয়তায় ফেরেন। ৩১ অগাস্ট সারা রাশিয়া সোভিয়েতদের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় তিনি “ক্ষমতা প্রসঙ্গে” শীর্ষক একটি প্রস্তাব আনেন।[15] ৩১শে অগাস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বলশেভিক প্রতিনিধিরা, এবং পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের বলশেভিক প্রতিনিধিরা মিলে একটি সভা করেন।[16]

কামেনেভের প্রস্তাব লেনিনের বক্তব্যের চেয়ে মোলায়েম হলেও, মেনশেভিক বা সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের মূলস্রোতের তুলনায় প্রবল বামপন্থী ছিল। তিনি প্রস্তাব করেন, উচ্চশ্রেণীর প্রতিনিধিদের, বিশেষ করে ক্যাডেট দলের প্রতিনিধিদের, ক্ষমতা থেকে হঠানো হোক, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র ঘোষিত হোক, জমিদারদের জমিতে ব্যক্তি মালিকানার অবসান করে বিনা ক্ষতিপূরণে সেই জমি কৃষক কমিটিদের হাতে দেওয়া হোক, দেশ জুড়ে উৎপাদন ও বন্টনে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ আনা হোক, সব গোপন চুক্তি অবৈধ ঘোষিত হোক ও গণতান্ত্রিক শান্তির জন্য আহবান করা হোক। এ ছাড়া ছিল একগুচ্ছ আশু দাবী। বলশেভিক কেন্দ্রীয় কমিটি কামেনেভের প্রস্তাব বিনা সংশোধনীতে গ্রহণ করে। সেই অধিবেশনে স্তালিন ছিলেন। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় পরের অধিবেশনে তিনি ছিলেন না, যেমন তিনি ছিলেন না ৩রা সেপ্টেম্বরের অধিবেশনে।  

৩১শে অগাস্ট রাতে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত কামেনেভের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করে এবং ১লা সেপ্টেম্বর ভোরে প্রথমবার বলশেভিক প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ২৮ শে অগাস্ট রাবোচি পুত-এ অস্বাক্ষরিত একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল, যা পরে স্তালিন রচনাবলীতে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে কামেনেভের প্রস্তাবের অনেকটাই মিল আছে। তফাৎ হল তীক্ষ্ণতার অভাবে।  আর কামেনেভ সম্ভবত সরকারী ব্যবস্থা সম্পর্কে বেশী পরিচিত ছিলেন বলে আশু দাবীতে এমন কতকগুলি দাবী রেখেছিলেন যা স্তালিনের লেখায় ছিল না। কিন্তু মূল তফাৎ হল, লেখাটা নিয়ে কি করা হল। স্তালিনের সম্পাদকীয়তে লেখকের নামও ছিল না। আর সেটা পত্রিকায় মুদ্রণ ছাড়া কিছু করা হল না। কামেনেভ লড়াইটা নিয়ে গেলেন প্রতিপক্ষ শিবিরে। কিন্তু দুটো দলিলে এত মিল কীভাবে? কামেনেভ কি স্তালিনের সম্পাদকীয় থেকেই ধারণাটা পেয়েছিলেন? না কি স্তালিন কামেনেভের একটা খসড়া আগে পেয়ে সেটাকে প্রকাশ করেছিলেন? এর উত্তর আমাদের জানা নেই। কিন্তু যা জানা আছে তা হল, স্তালিন খোলাখুলি কামেনেভকে সমর্থন করেন নি। তাই যদি প্রাথমিক খসড়া স্তালিনের হয়েও থাকে, তিনি সামনে এসে তার দায়িত্ব নিলেন না।

ফলে সেপ্টেম্বর থেকে ক্রমেই স্তালিনের ভূমিকা সংকুচিত হতে থাকে।  স্তালিন ২৮শে অগাস্ট লিখেছিলেন, কর্নিলভের বর্তমান আক্রমণ সেনাবাহিনীর উপরমহলের চক্রান্তের ধারাবাহিকতা। কয়েকদিন পর তিনি আহবান করলেন, বুর্জোয়া ও জমিদারদের থেকে সরে এসে শ্রমিক ও কৃষকের সরকার গড়ার জন্য।[17] পার্টি যে বিপ্লবী প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে এসে বলশেভিক রণনীতির ভিত্তিতে প্রলেতারীয় ক্ষমতা দখলের পথে এগোতে পারে, তার কোনো  স্পষ্ট স্বীকৃতি ছিল না।

১৫ই সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়। ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে লেনিন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে পরিস্থিতি আবার পাল্টে গেছে, এবং পার্টিকে এবার ক্ষমতা দখলের দিকে এগোতে হবে। এই মর্মে তিনি কেন্দ্রীয় কমি্টি এবং পেত্রোগ্রাদ এবং মস্কো কমিটিকে একটি চিঠি লেখেন। এর পরেই শুধু কেন্দ্রীয় কমি্টিকে আর একটি চিঠি লেখেন।[18] কেন্দ্রীয় কমিটির মিনিটস থেকে দেখা যায়, কামেনেভ সরাসরি লেনিনের প্রস্তাবকে বিপজ্জনক মনে করেছিলেন। আর স্তালিন লেনিনকে সরাসরি সমর্থন করেননি। তিনি প্রস্তাব করেন যে ঐ চিঠি পার্টির সব গুরুত্বপূর্ণ কমিটিদের কাছে তাদের মতামতের জন্য পাঠানো হোক। [19]

পরে এমেলিয়ান ইয়ারোস্লাভস্কি দাবী করেছিলেন, স্তালিন এই চিঠিগুলি পার্টির দিশা হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।[20] কিন্তু মিনিটস দেখায়, ইয়ারোস্লাভস্কি যেখানে guidance এর কথা বলেছেন, মিনিটস তা বলে নি, বলেছে নিছক আলোচনার কথা। উপরন্তু, পার্টির মুখপত্রের সম্পাদক হিসেবে স্তালিনের ভূমিকা প্রসঙ্গে রয় মেডভেডেভ দেখাচ্ছেন, পার্টির মুখপত্রে লেনিনের কোনো কোনো লেখা আদৌ মুদ্রিত হল না, কোনোটা কেটেছেঁটে প্রকাশিত হল। মেডভেডেভ লিখেছেন, ঃ “প্রাভদার পক্ষ থেকে এই ব্যবহার, এবং পার্টির উপর মহলে নির্দিষ্ট এক ধরণের “নরমপন্থা” তাঁর [লেনিনের] দিক থেকে গভীর প্রতিবাদের জন্ম দিল; তিনি এমনকি কেন্দ্রীয় কমিটিকে টপকে পার্টির বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কথা চালাচালি শুরু করলেন”।[21]

প্রাক পার্লামেন্টঃ

২১শে সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল গণতান্ত্রিক সম্মেলন এবং প্রাক পার্লামেন্টে (যা ছিল আধা মনোনীত একটি সংস্থা) বলশেভিকরা থাকবেন কি না। লেনিন বয়কটের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি এবং গণতান্ত্রিক সম্মেলনে উপস্থিত বলশেভিক প্রতিনিধিদের সভায় কামেনেভ ও রাইকভের প্রস্তাব মেনে ৭৭-৫০ ভোটে প্রাক-পার্লামেন্টে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দৃঢ়ভাবে বয়কটের পক্ষে বক্তব্য রেখে লেনিনের প্রকাশ্য সমর্থ পেলেন ট্রটস্কী।[22]

এই সময় থেকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে ট্রটস্কীর প্রভাব বৃদ্ধি দেখা যায়। ২৩শে সেপ্টেম্বরের সভায় গণতান্ত্রিক সম্মেলন সম্পর্কে ট্রটস্কীর রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়। ট্রটস্কী ও সোকোলনিকভকে গণতান্ত্রিক সম্মেলনের একটি কমিশনে বলশেভিক প্রতিনিধি মনোনীত করা হয়। প্রাক-পার্লামেন্টের সভাপতিমন্ডলীতে বলশেভিক সদস্য হিসেবে নাম দেওয়া হয় ট্রটস্কী, কামেনেভ ও রাইকভের। আরো দুটি ক্ষেত্রে তাঁকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়।[23] এই দ্রুত উত্থানের এক প্রধান কারণ অবশ্যই ছিল লেখক এবং বক্তা হিসেবে তার দক্ষতা। ২৪ তারিখ কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় স্থির হয়, পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের নেতৃত্ব নির্বাচনে ট্রটস্কীকে সভাপতি এবং রাইকভকে সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হিসেবে রাখা হবে।[24] আর প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সোভিয়েত কংগ্রেসের কাজে সমন্বয়ের দায়িত্ব পড়ল সভের্দলভের উপরে।[25]

৭ই অক্টোবরের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় স্থির হয়, ট্রটস্কী, সভের্দলভ ও বুবনভ কেন্দ্রীয় কমিটির একটি তথ্য বুরোতে থাকবেন এবং তাঁকে সংগঠিত করবেন, এবং এই বুরোর কাজ হবে প্রতিবিপ্লবের বিরুদ্ধে লড়াই করা।[26]ট্রটস্কী লিখেছেন, বুরোতে স্তালিনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু স্তালিন থাকতে চান নি, এবং তিনিই বুবনভের নাম প্রস্তাব করেন।[27]

এই “প্রতিবিপ্লবের বিরুদ্ধে লড়াই” ছিল অভ্যুত্থানের প্রস্তুতির প্রকাশ্য নাম। ট্রটস্কী এবং সভের্দলভের জোট ছিল খুবই ক্ষমতশালী, কারণ একজন ছিলেন পার্টির সবচেয়ে দক্ষ বক্তা ও অন্যতম সংগঠক আর অন্যজন নিঃসন্দেহে পার্টির সবচেয়ে দক্ষ সংগঠক। কমিটির বাইরে থেকে স্তালিন কার্যত ঘটনাপরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। তবে রাবিনোউইচ প্রশ্ন তুলেছেন, এই কমিটি কতটা কার্যকর ছিল।[28]

১০ই অক্টোবর ও ১৬ই অক্টোবরের কেন্দ্রীয় কমিটি সভাঃ

১০ই অক্টোবর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ১২ জন সদস্য ছিলেন। এই প্রথম আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় লেনিন সভায় এলেন। লেনিন, ট্রটস্কী, সভের্দলভ, কামেনেভ, জিনোভিয়েভ, স্তালিন, উরিতস্কি, ঝারঝিনস্কি, কোলোন্তাই, বুবনভ, সোকোলনিকভ, এবং লোমোভ(ওপোকভ) উপস্থিত ছিলেন। লেনিন সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। ১০-২ ভোটে যে প্রস্তাব গৃহীত হল, তাতে বলা হল “সশস্ত্র অভ্যুত্থান অনিবার্য স্বীকার করে এবং তার সময় এসেছে স্বীকার করে, কেন্দ্রীয় কমিটি প্রস্তাব করছে যে পার্টির সব সংগঠনকে এই স্বীকৃতি থেকে পরিচালিত হতে হবে, এবং সমস্ত প্রয়োগগত প্রশ্নের সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে...।[29]

এই সভাতে একটি পলিটবুরো নির্বাচিত হয়, যাতে ছিলেন লেনিন, জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, ট্রটস্কী, স্তালিন, সোকোলনিকভ ও বুবনভ।  এই পলিটবুরোর সদস্যপদের ভিত্তিতেই পরে স্তালিনের সমর্থকরা দাবী করবেন, স্তালিন অভ্যুত্থানের এক কেন্দ্রীয় নায়ক, বা এমনকি একমাত্র কেন্দ্রীয় নায়ক ছিলেন। কিন্তু এই পলিটবুরো কি আদৌ কাজ করেছিল? কেন্দ্রীয় কমিটির মিনিটসে তার কোনো প্রমাণ নেই। বরং আমরা দেখি, লেনিন আবার আত্মগোপন করলেন। জিনোভিয়েভ এবং কামেনেভ অভ্যুত্থানের বিরোধী ছিলেন। জিনোভিয়েভও আত্মগোপন করেন। পলিটবুরো যে একবারও সভা করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার কোনো প্রমাণ নেই।

১০ই এর সভা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও সেদিন উপস্থিত ছিলেন খুব কম সদস্য। আসেন নি এমন বেশ কয়েকজন সম্ভবত অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে থাকতেন – রাইকভ, নগিন, মিলিউটিন। ১৬ই যে সভা হল, তাতে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরা ছাড়াও ছিলেন পিটার্সবুর্গ কমিটির নেতারা, সামরিক সংগঠনের সদস্যরা, পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত, ট্রেড ইউনিয়ন, ফ্যাকটরী কমিটি, পেত্রোগ্রাদ আঞ্চলিক কমিটি, এবং রেল শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা। লেনিন প্রথম রিপোর্ট দেন, এবং সভার শেষে তার প্রস্তাব গ্রহণের জন্য প্রবলভাবে লড়াই করেন। তিনি দেখাতে চান, কেবল রাশিয়া নয়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে অভ্যুত্থানের পক্ষে। সেক্রেটারিয়েটের পক্ষে সভের্দলভ বলেন, পার্টির সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪,০০,০০০ বা তার বেশী। তিনি প্রতিবিপ্লবী উদ্যোগের কথাও বলেন। স্তালিন লেনিনের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন। ১৯-২ ভোটে, ৪ জন মতদানে বিরত থেকে, অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত আবার উচ্চারিত হল। পাঁচ সদস্যের একটি সামরিক কেন্দ্র তৈরী হয়। এতে ছিলেন সভের্দলভ, স্তালিন, বুবনভ, উরিতস্কি ও ঝারঝিনস্কি।[30] কিন্তু এই কমিটি কাজ করবে সোভিয়েতের সামরিক বিপ্লবী কমিটির সঙ্গে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্তালিনের নাম এই কমিটিতে থাকায় এটি নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই কমিটি কোনো কাজ করেছিল তার দলিল, কারো সমসাময়িক স্মৃতিচারণ, কিছুই নেই। পরে, স্তালিনের সদস্যপদ দেখিয়ে দাবী করা হয়, এই কমিটিই অভ্যুত্থানের আসল কাজ করেছিল। কমিটি সোভিয়েতের সামরিক-বিপ্লবী কমিতির সঙ্গে কাজ করবে, এই কথা বলার অর্থ, সোভিয়েতের সভাপতি হিসেবে ট্রটস্কী ইতিমধ্যেই ঐ কাজের সঙ্গে যুক্ত। সোভিয়েত ইতিহাসবিদ আইজ্যাক মিন্টস দাবী করেছিলেন, পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদরা ভুল বুঝেছেন, এবং এই কমিটিগুলিতে সদস্যপদ হল কে কে কোন কাজে রিপোর্ট করবেন তার একটা তালিকা।[31] কিন্তু মিন্টসের যুক্তি মানলেও, বাস্তব ঘটনা হল, এই দুই কমিটিতে থেকে স্তালিন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তার প্রমাণ মেলে না।

সামরিক বিপ্লবী কমিটি ও স্তালিনঃ

৯ই অক্টোবর পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতে ট্রটস্কির প্রস্তাবে প্রতিবিপ্লব ঠেকাতে একটি সামরিক-বিপ্লবী কমিটি গঠিত হয়। স্তালিনের এই সময়ের লেখাগুলিতে যে রণনীতি প্রস্তাবিত ছিল, তা হল দেশজুড়ে অভ্যুত্থান। সামরিক-বিপ্লবী কমিটির মাধ্যমে ট্রটস্কী এবং সভের্দলভ যেভাবে রাজধানীতে ক্ষমতা দখলের রণনীতি অনুসরণ করছিলেন, সেটা স্তালিনের কাছে স্পষ্ট ছিল, এমন কোনো প্রমাণ নেই।

ইতিমধ্যে, ১৮ অক্টোবর জিনোভিয়েভ ও কামেনেভ ম্যাক্সিম গোর্কির পত্রিকা নোভায়া ঝিঝন-এ একটি বিবৃতি দিয়ে অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেন। ক্রুদ্ধ লেনিন ১৯শে কেন্দ্রীয় কমিটিকে লেখা চিঠিতে বলেন এঁরা দুজন হলেন ধর্মঘট-ভাঙ্গা দালাল, যাদের পার্টি থেকে বহিষ্কার করা উচিত।[32]একই দিনে জিনোভিয়েভ রাবোচি পুত-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান, যাতে তিনি দাবী করেন লেনিন মতভেদকে বাড়িয়ে দেখছেন। তিনি লেখেন, তিনি পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতে ট্রটস্কীর বক্তব্যকে সমর্থন করেন।[33] পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতে ট্রটস্কী জিনোভিয়েভ ও কামেনেভের চিঠির ফলে প্রশ্নের সামনে পড়েছিলেন, যে তিনি কোনো অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করছেন কি না। তিনি বলেন, সোভিয়েতের সিদ্ধান্ত সোভিয়েতের মাধ্যমে স্থির হবে। অর্থাৎ, তিনি পার্টি সম্পর্কে কোনো কথা না বলে এড়িয়ে গেলেন। সোভিয়েতের সভাতেই কামেনেভ, এবং চিঠির মাধ্যমে জিনোভিয়েভ, বিষয়টা গুলিয়ে দিতে চাইলেন, যেন পার্টিও কোনো পরিকল্পনা করে নি।

প্রধান সম্পাদক হিসেবে স্তালিনের দায়িত্ব ছিল, জিনোভিয়েভের বিবৃতি ছাপা হবে কি না সেটা ঠিক করা। তিনি সেটা শুধু ছাপলেন না, অস্বাক্ষরিত সম্পাদকীয় মন্তব্য দিলেন যে জিনোভিয়েভের বিবৃতি এবং সোভিয়েতে কামেনেভের উক্তির ফলে বোঝা যাচ্ছে, মূলগতভাবে সকলে এক মত। [34]  

২০ অক্টোবরের কেন্দ্রীয় কমিটি সভা ছিল উত্তপ্ত। লেনিন তখনও লুকিয়ে। স্তালিনকে প্রকাশ্য সমালোচনা করেন ট্রটস্কী। তিনি বলেন জিনোভিয়েভের চিঠি ছাপা এবং সম্পাদকীয় নোটটি একেবারে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরো বলেন, কামেনেভ যে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ইস্তফা দিতে চাইছেন সেটা নেওয়া হোক।  স্তালিন এর উত্তরে বলেন, কামেনেভ ও জিনোভিয়েভ কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে চলবেন। এই সময়ে সম্পাদকমন্ডলীর অন্য সদস্য সোকোলনিকভ বলেন, জিনোভিয়েভের চিঠি নিয়ে সম্পাদকীয় মন্তব্যে তাঁর হাত ছিল না এবং তিনি মনে করেন মন্তব্যটা ভ্রান্ত। বোঝা গেল, একা স্তালিন ঐ মন্তব্যের জন্য দায়ী। স্তালিন এর ফলে পত্রিকার সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিতে চাইলেন। কেন্দ্রীয় কমিটি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।[35] 

কেন্দ্রীয় কমিটির মিনিটস থেকে অন্য একটা কথা বোঝা যায়। তা হল, সামরিক-বিপ্লবী কমিটির কাজের প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরা সব সময়ে নজর রাখছিলেন না। ফলে সেটার কাজ পুরোটাই ছিল পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতে সক্রিয় পার্টি সদস্যদের হাতেতে। সামরিক বিপ্লবী কমিটির অন্যতম সদস্য লোমোভ পরে স্মৃতিচারণে লেখেন, ২৪শে অক্টোবর সকালে টেলিফোনের শব্দে তার ঘুম ভাঙ্গে। ট্রটস্কী তাঁকে জানান, কেরেনস্কী আক্রমণ শুরু করেছে... আমাদের সকলকে স্মোলনিতে চাই।[36]

২৪শে সকালে কেরেনস্কী ফৌজ পাঠিয়ে বলশেভিকদের দুটি পত্রিকা সোলদাতরাবোচি পুত বন্ধ করে দিতে চায়। হয়ত এই কারণে, স্তালিন, সম্পাদক হিসেবে, নিজের দপ্তরে ছিলেন, স্মোলনিতে যান নি। কিন্তু তার ফলে, এদিন যে দায়িত্বভাগ করা হল তা থেকে তিনি বাদ। কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্যরা ছাড়াও, ল্যাশেভিচ, ও ব্ল্যাগোনরাভভকে পিটার ও পল দুর্গের দায়িত্ব দেওয়া হল। বিপ্লব জয়ী হওয়ার জন্য এই দুর্গ দখল খুবই জরুরী ছিল। বিস্ময়ের কথা, কামেনেভ তাঁর সব সংশয় সত্ত্বেও, সেদিন আসেন, এবং বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীদের টেনে আনার দায়িত্ব তাঁর উপরে পড়ে।[37]  

২৪শে অক্টোবরের রাবচি পুতে স্তালিনের লেখা সম্পাদকীয় দেখায়, তিনি তখনও ভাবছিলেন ভবিষ্যতে, সোভিয়েত কংগ্রেস বসার পরে কোনো অভ্যুত্থানের কথা। ঐ দিনই তিনি এবং ট্রটস্কী সোভিয়েত কংগ্রেসে বলশেভিক প্রতিনিধিদের একটি সভায় বক্তৃতা দেন। ঝ্যাকভ নামে এক প্রতিনিধির রেকর্ড, যা পরে প্রলেতারস্কায়া রেভল্যুতসিয়া-তে প্রকাশিত হয়, তা থেকে বোঝা যায়, স্তালিন যে সব খবর পাচ্ছিলেন, তা প্রধানত কেন্দ্রীয় কমিটি সূত্রে, কিন্তু সামরিক-বিপ্লবী কমিটি সূত্রে না।[38] সুতরাং স্তালিন অক্টোবর অভ্যুত্থানের এক মূল নায়ক, এটা কোনো তথ্যের উপরে দাঁড়িয়ে নেই।   

উপসংহারঃ

স্পষ্টতই, স্তালিন বলশেভিক দলের অন্যতম নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। কিন্তু তাহলে তিনি কেন অক্টোবর অভ্যুত্থানে গৌণ ভূমিকা পালন করলেন? এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়েছে তাঁর নিজের ও তার অনুগামীদের ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা দাবির ফলে। স্তালিনই কেন্দ্রীয় ছিলেন, এই গল্প তৈরী করার ফলে নথীগুলি সমস্যা হিসেবে দেখা দিল। স্তালিন যুগের অবসানের পরেও, সোভিয়েত ইতিহাসবিদরা যেহেতু ট্রটস্কীর সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক কথা বলতে পারতেন না, তাই অবাস্তব এবং অনৈতিহাসিক কথাই বলে যেতে হত – হয় স্তালিনের, নয় লেনিনের ভূমিকা নিয়ে। বাস্তবে সভের্দলভ-ট্রটস্কী সমন্বয়ে যে রণকৌশল অবলম্বন করা হয়, তা লেনিন প্রস্তাবিত দেশজোড়া অভ্যুত্থান নয়, রাজধানীতে সেনাবাহিনী ও শ্রমিকদের সংহত করে ক্ষমতা দখল। এই প্রক্রিয়াতে স্তালিনের অনুপস্থিতির দুটি কারণের কথা বলা যায়। একটি হল কেন্দ্রীয় কমিটিতে গভীর দ্বন্দ্ব এবং লেনিন প্রায় শেষ সময় পর্যন্ত আত্মগোপন করতে বাধ্য হওয়া। কেন্দ্রীয় কমিটির এই ভাঙ্গাচোরা অবস্থার ফলেই সামরিক বিপ্লবী কমিটি ও পার্টির সামরিক সংগঠনের ভূমিকা কেন্দ্রীয় হয়ে পড়েছিল। এইখনে দ্বিতীয় উপাদান আসে -- সামরিক বিপ্লবী কমিটিতে স্তালিনের অনুপস্থিতি, এবং পার্টির সামরিক সংগঠনের সঙ্গে অগাস্ট থেকে তাঁর খারাপ সম্পর্ক, যার ফলে বাস্তব কাজের থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন ছিলেন।



[1]Isaac Deutscher, Stalin: A Political Biography, Oxford University Press, Oxford etc, 1967, p

[2] “On October 16 an enlarged meeting of the Central Committee of the Party was held. This meeting elected a Party Centre, headed by Comrade Stalin, to direct the uprising. This Party Centre was the leading core of the Revolutionary Military Committee of the Petrograd Soviet and had practical direction of the whole uprising”.   Central Committee of the CPSU (B), History of the CPSU(B)-Short Course, International Publishers, New York, 1939, p. 206. http://www.marx2mao.com/Other/HCPSU39ii.html#c7s1

[3] Shestoi s”ezd RSDRP (bol’shevikov) Avgust 1917 goda: protokoly, Moscow, Gospolitizdat, 1958, p.252.

[4]যে নামগুলি বাদ পড়ে তা হল জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, ট্রটস্কী, বুখারিন, ক্রেস্টিনস্কি, মিলিউটিন, রাইকভ, স্মিলগা, সোকোলনিকভ, এবং প্রার্থী সদস্য ইয়ফ, লোমোভ, প্রিয়ব্রাজেনস্কি, ও ইয়াকভলেভার নাম। 

[5]L. Trotsky, Stalin: An Appraisal of the Man and His Influence, Wellred Books, London, pp. 283-84. এই বইটি হার্ভার্ডের ট্রটস্কী আর্কাইভস থেকে ট্রটস্কীর খসড়া দেখে, এবং বার্নার্ড মালামুড অনুবাদ ও “সম্পাদনার” নামে নিজের যে সব মতামত ঢুকিয়েছিলেন সেগুলি বাদ দিয়ে নতুন করে তৈরী এক সংস্করণ।recovered from the Trotsky archives and  put in.

[6]Ann Bone, tr The Bolsheviks and the October Revolution: Minutes of the Central Committee of the Russian Social-Democratic Labour Party (Bolsheviks), August 1917- February 1918, with additional notes by Tony Cliff, Pluto press, 1974, p. 9.

[7] Ann Bone, tr The Bolsheviks and the October Revolution, p. 12;Adam Ulam, Stalin: The Man and His Era, New York, Viking Press, 1973, p.150.

[8] p.19

[9] p.26

[10] p. 30

[11] J. Stalin, Works, vol3,Foreign Languages Publishing House, Moscow, 1953, pp.215-20.

[12]Works, Vol. 3, p. 279.

[13] V.I. Lenin, Collected Works, vol. 25, Moscow, Progress Publishers, pp. 249-50;L. Trotsky, ‘With Blood and Iron’, Proletarii, No.5, https://www.marxists.org/archive/trotsky/1917/08/blood.htm

[14] V.I. Lenin, Collected Works, vol. 25, pp. 286-289.

[15]Ann Bone, tr The Bolsheviks and the October Revolution, pp. 42-43.

[16] p. 42

[17]Works, Vol. 3, p. 278, 288.

[18] V. I. Lenin, ‘The Bolsheviks Must Seize Power’, Ann Bone, tr The Bolsheviks and the October Revolution, pp. 58-60; ‘Marxism and the Insurrection’, pp. 60-65.

[19] Ann Bone, tr The Bolsheviks and the October Revolution, p. 58.

[20] E. Yaroslavsky, Landmarks in the Life of Stalin, Moscow, Foreign Languages Publishing House, 1940, p. 102.

[21] Roy A. Medvedev, Let History Judge, New York, Knopf, 1971, p. 10.

[22] p. 67 এবং লেনিনের বক্তব্যের জন্য p. 278.

[23] pp. 68-69.

[24]p. 71

[25] p. 72

[26]p. 81

[27]L. Trotsky, Stalin: An Appraisal of the Man and His Influence, p. 290.

[28]A Rabinowitch, The Bolsheviks Come to Power: The Revolution of 1917 in Petrograd, New York, Norton, 1976, p. 201

[29]Ann Bone, tr The Bolsheviks and the October Revolution, p. 88

[30]  pp. 96-109.

[31]I.I. Mints, Istoriia Velikogo Oktiabria v trekh tomakh, 3 vols, Moscow, Izdatel’stvo “Nauka”, 1968m vol2, p. 1007.

[32]Ann Bone, tr The Bolsheviks and the October Revolution, pp. 116-120.

[33] p. 120

[34]

[35] pp. 110-113

[36] A Rabinowitch, The Bolsheviks Come to Power:p. 249.

[37] Ann Bone, tr The Bolsheviks and the October Revolution, p.126

[38] উদ্ধৃত, Robert M. Slusser, Stalin in October: The Man Who Missed the Revolution, The Johns Hopkins University Press, Baltimore and London, 1987, pp. 243-4.