Socialist and Peoples' History

১৯১৭ সালের কৃষক বিপ্লব

 

 

 

সারা ব্যাডকক


১৯১৭ সালে, রাশিয়াতে সাধারণ গ্রামীণ মানুষ নিজেদের দুনিয়া পাল্টে নেবেন বলে

প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পথ ধরেছিলেন।

প্রাক বিপ্লব রুশ কৃষক

 

১৯১৭ সালে রাজনৈতিক খেলাটা পাল্টে গেল শেষমেষ কৃষকদের জন্য।সশস্ত্র, ঊর্দী পরা কৃষকরা সৈনিকের কাজ করতেন, ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতা গড়া ও ভাঙ্গার কাজ তাঁরা করতেন। নগর রাশিয়ার বাসিন্দাদের বড় অংশ হিসেবে তাঁরা শহরগুলিতে অভ্যুত্থানেও বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন।  কিন্তু আমরা যখন কৃষকের বিপ্লবের কথা বলি, তখন সাধারণত আমরা উল্লেখ করি জমি ব্যবহার ও মালিকানার লড়াইয়ের কথার।  আর, যদিও রাশিয়ার মানুষের ৮০ শতাংশের বেশী ১৯১৭ সালে শহর না, এমন জায়গাতেই বাস করতেন, তবু, বহু সময়ে গবেষকরা রুশ বিপ্লবে কৃষকদের অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতাকে প্রান্তিক স্তরে রেখে জোর দেন নিছক শহুরে শ্রমিক এবং বুদ্ধিজীবীদের উপর।

গ্রামাঞ্চলের অভ্যুথানগুলির বহুত্ব, তাদের জটিলতা, কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে আমাদের সরলীকৃত ধারণাদের দূর করে দেবে। তারা আরও দেখায়, বিপ্লবের অনন্যসাধারণ সৃজনশীলতা এবং রূপান্তরের ক্ষমতা।

কৃষক অভ্যুত্থানের কোনো সহজ সংজ্ঞা হয় না। ১৯১৭ সালে তারা কাল এবং ভৌগোলিক দিক থেকে যত ছড়িয়ে পড়েছিল, ততই রুশ সাম্রাজ্যের বিশাল আয়তনে ছড়িয়ে থাকা বৈচিত্রের অনুসরণে বিচিত্র রূপ ধারণ করেছিল। অনেক সময়ে, জমির ধরণ এবং স্থানীয় সংস্কৃতি অভ্যুত্থানগুলির চেহারা ঠিক করে দিয়েছিল। অধিকাংশ লোক মনে করে কৃষি বিপ্লব মানেই জমির মালিকদের উপর হিংস্র আক্রমণ এবং গায়ের জোরে তাদের এস্টেট দখল করা। কিন্তু বহু গ্রামীণ সংগ্রাম শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়েছিল। হিংসাত্মক ও মুখোমুখি লড়াই সবচেয়ে বেশী নজর কাড়ে, কিন্তু তাতে যাঁরা অংশ নেন তাঁদের ঝুঁকি থাকে বিপুল। রাশিয়ার কৃষকদের অধিকাংশ নীরবে, কিন্তু মেপে পা ফেলেছিলেন, যদিও যারা সম্পত্তি হারাল তারা হয়তো তেমন বোধ করে নি।  

 কিছু কৃষক চুপিসাড়ে বিদ্রোহ শুরু করেন শুধু একটা গেট খুলে দিয়ে গ্রামের গরু-ছাগলকে জমিদারের মাঠে ঘাস খেতে পাঠিয়ে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় সমাজের পক্ষ থেকে বেশ সরকারী দেখতে দলিল তৈরী করা হল, যাতে বলা হল যে তারা স্থানীয় সম্পদকে চিরকাল ব্যবহার করতে পারবে। আরো সাহসী অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে দেখা গেল যে কৃষকরা হাত মিলিয়ে নিকটবর্তী বন থেকে গাছ কেটেছেন। গ্রামীণ শ্রমজীবীরা ঐ বিপ্লবী বছরে যতরকমভাবে বিদ্রোহ করেছিলেন আমাদের কাছে তার পূর্ণ বিবরণ নেই।  আমরা যতটুকু জানি, তা দেখায় রণকৌশল, সক্রিয় ব্যক্তিত্ব, লক্ষ্য, এ সবের কত প্রশস্ত একটা ক্ষেত্র ছিল, যেটা বিপ্লব-পরবর্তী রাশিয়ার রাষ্ট্রে একটা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।   

আধুনিকতার আগমন

কৃষক বলতে বোঝায় সেই সব মানুষ যারা গ্রামাঞ্চলে থেকেন ও কাজ করেন তাদের। কিন্তু রাশিয়াতে কৃষক ছিল এর উপর একটা আইনী গোষ্ঠী বা সোস্লভি, যা এমনকি একজনের পাসপোর্টেও লেখা থাকত।[1] অর্থাৎ রাশিয়াতে কৃষক অনেক ক্ষেত্রে শহরে বাস করতেন, শ্রমিক বা ব্যবসায়ী হিসেবে জীবন ধারণ করতেন, বা সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন।     

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আধুনিকতা হাজির হল রাশিয়াতে, কিন্তু সে সহবাস করল ও ধীরে রূপান্তর ঘটাল কৃষক জীবনের পরম্পরাগত উপাদানগুলির, যেগুলির সংজ্ঞার্থ নির্মিত হয়েছিল পিতৃতন্ত্র, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সংঘবদ্ধ গ্রামজীবন দিয়ে। পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাবিন্যাস নিশ্চিত করত যে বয়স্করা পরিবারে ও গ্রামসমাজে, দু’জায়গাতেই প্রাধান্য রাখবে। রুশ অর্থোডক্স ধর্ম বহু বাসিন্দার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আত্মিক জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বহু এলাকাতে জমি তদারকী হত যৌথভাবে, ফলে সম্পদের যৌথ ব্যবহার করা সম্ভব হত, এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো মজবুত হত। এই সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ফলে রুশ গ্রামাঞ্চলে একরকম সংকীর্ণতা ছিল, এবং রাজনীতিতে জাতীয় প্রসঙ্গের তুলনায় অগ্রাধিকার পেত স্থানীয় প্রসঙ্গ। 

আধুনিকতা এই পরম্পরাগত ধাঁচগুলিকে নানা ভাবে আক্রমণের মুখে ফেলল। ১৮৬১ সালে ভূমিদাসদের মুক্তির পর, গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষাবিস্তার ত্বরান্বিত হল,  এবং নবীন প্রজন্মের কাছে সাক্ষরতা নিয়ে এল। ইতিমধ্যে, লাখে লাখে মানুষ বছরের এক একটা সময়ে শহরাঞ্চলে যেতে থাকে, এবং গ্রামে ফিরে আসে শহুরে ধারণা ও আদব-কায়দা নিয়ে, যার মধ্যে আবার পড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভোগকেন্দ্রীক সংস্কৃতি। নির্বাচিত স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসন সংস্থা ও স্থানীয় আদালত গ্রামের মানুষকে রাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলার নতুন পন্থা দিল, যেটা তারা সানন্দে জড়িয়ে ধরলেন। ১৯০৫এর বিপ্লবের পর কৃষকরা জাতীয় স্তরে নির্বাচনের জন্যও দলে দলে এগিয়ে আসেন ও তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছে সরবে দাবী পেশ করতে থাকেন।

সবশেষে, ১৯১৪ সালে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির ফলে, গ্রামের পুরুষদের যারা অস্ত্র হাতে নিলেন তাদের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হল – কারো মনে দেখা দিল দেশপ্রেমিক বোধ, কেউ বা গভীর আপত্তি অনুভব করলেন। কিন্তু সকলকেই বিশাল সাম্রাজ্যের মধ্যে অনেক দূরে দূরে যেতে হল।  নিজেদের ছোট্ট গ্রামের বাইরের জগতের সঙ্গে এই সংযোগের ফলে ১৯১৭-র মধ্যে কৃষকরা আর প্রাক-আধুনিকতা পর্বের নিঃসঙ্গতায় থাকছিলেন না। তাঁরা রাষ্ট্র ও জাতির সঙ্গে বহুবিধভাবে সম্পর্কিত হচ্ছিলেন। সাক্ষরতার হার বাড়ার ফলে কৃষকরা জাতীয় এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রসঙ্গে জড়িয়ে পতে পারছিলেন, আর শহরের অভিজ্ঞতার ফলে নবীনরা প্রবীণ পুরুষদের পিতৃতান্ত্রিক প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারছিলেন।

বিপ্লবী আঙ্গিক

“জল আপনাদের, আলো আপনাদের, জমি আপনাদের, বন আপনাদের”।

এই কথাগুলি বলেছিলেন ১৯১৭র জুন মাসে, কাজানের এক সভাতে একজন নাবিক। এই কথাগুলি বিপ্লবী কৃষক আকাংখ্যার সবচেয়ে মৌলিক উপাদানগুলিকে ধরে রেখেছে। এই স্পষ্ট কথা, যে বাতাস ও জলের মতই, জমি ও বনাঞ্চল তাদের হবে, যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী, এটা বিপ্লবের বছর জুড়ে ও তার পরে বারে বারে উচ্চারিত হয়েছে।

যে সব জায়গাতে একদা ভূমিদাসপ্রথার প্রাধান্য ছিল, সেখানের প্রাক্তন ভূমিদাসদের বুকে মুক্তির শর্তাবলীর অসাম্য সম্পর্কে গভীর ক্ষোভ জমে ছিল। যেসব জায়গাতে কৃষকদের সঙ্গে স্থানীয় জমিদারদের বৈর সম্পর্ক ছিল, সেখানেই জমি দখল সবচেয়ে হিংস্র রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আমরা গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবের চরিত্র ও তীব্রতা সম্পর্কে যা জানি তার তথ্য এসেছে প্রধানত জমিদারদের অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরী তথাকথিত গন্ডগোলের রিপোর্ট থেকে। এই রিপোর্টগুলি আমাদের বলে যে রাশিয়ের যে সব অঞ্চলে সবচেয়ে ঊর্বর জমি ছিল সেখানেই সবচেয়ে বেশী গোলযোগ হয়েছে। এগুলি আরও জানায় যে ভূমিদাস যে সব অঞ্চলে বেশী ছিল, সেই সব অঞ্চলেই বেশী অস্থিরতা, ব্যক্তি জমিদারদের উপর তীব্র আক্রমণ বঙ্গ জমিদারী জোর করে দখলের ঘটনা বেশী ঘটেছিল। এই পরিসংখ্যান থেকে গ্রামাঞ্চলের অভ্যুত্থানের সার্বিক ছবি পাওয়া যায় না, কারণ এগুলি কেবল এক ধরণের লড়াইকেই লিপিবদ্ধ করেছে।  

যদিও হিংসাশ্রয়ী আক্রমণ এবং জোর করে জমি বন্টনকেই কৃষিবিপ্লবের নজীর হিসেবে তুলে ধরা হয়, বাস্তবে সেগুলি সব জায়গাতে ঘটে নি। বস্তুত, ১৯১৭র মধ্যে, জমিদারদের হাতে কৃষিযোগ্য জমির একটা ছোট অংশই ছিল। কোনো কোনো জায়গাতে, যেমন ভায়াটকাতে, অভিজাত জমিদার এবং জমির ক্ষুধা, দুটোই ছিল প্রায় অনুপস্থিত। ফেব্রুয়ারী বিপ্লব কৃষকদের চাহিদা এবং লড়াইয়ের পতাকা দুটোই ক্রমান্বয়ে মেলে ধরল, কিন্তু গ্রমাঞ্চলের বিপ্লবীরা কীভাবে সমতার জন্য লড়াই করেছিলেন তা নির্ভর করেছিল তাঁদের এলাকাতে জমির মালিকানা ও ব্যবহারের উপরে। অধিকাংশ লড়াই হিংসাশ্রয়ী বা বলপূর্বক জমি দখলের ধারা দেখায় নি। বরং গ্রামসমাজ ব্যক্তি মালিকানার আইন লঙ্ঘন করল, কিন্তু সম্ভাব্য দমনপীড়ন থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।   

যেমন, আরিষ্কাদঝা গ্রামের কৃষকরা ঘোষণা করলেন, তাঁরা শীতের ফসলের জন্য স্থানীয় জমিদারের জমি চাষ করএন, এবং তার ভাড়া করা লোকেদের একদিন দেওয়া হল জমি ছেড়ে চলে যেতে। মজুরেরা চলে যায়, এবং গ্রামবাসিরা চাষ করেন।

উপরন্তু, আমাদের এই গ্রামীণ বিপ্লবকে শ্রেণীভিত্তিক ঘটনা বলে মনে করা ঠিক হবে না, কারণ কৃষক কোনো একটা শ্রেণী না। তবে কৃষকরা প্রশস্ত অর্থে নিজেদের গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ বলে দেখতেন, এবং এটাই তাদের বিশ্বদিশা এবং তাদের কাজের ভিত্তি ছিল। কিছু কৃষক বিপ্লবে দেখা গেল গ্রামীণ সম্প্রদায় ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে যৌথভাবে লড়াই করছে, যেন শ্রেণীভিত্তিক অভ্যুত্থানের মত, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের লড়াইয়ের মত। কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্রে লড়াইটা দেখায় যেন জমি ব্যবহার নিয়ে দুই প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মধ্যে, বা দুই ব্যক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বের মত।

যেমন, গ্রামবাসীরা অনেক সময়ে সেইসব কৃষকদের উপর আক্রমণ করেন, যারা মীর বা যৌথ জমিতে কাজ না করে নিজস্ব জমিতে চাষ করতেন, এবং জোর করে তাদের যৌথ চাষে ফিরিয়ে আনেন। এই ধরণের আক্রমণ করত গোটা গ্রাম, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী কৃষককে এবং তার জমিকে সামাজিক জমিতে মিলিয়ে নতে চাইত। গ্রামবাসীদের নানা স্তরের সম্পদ ও প্রভাব ছিল, কিন্তু সেটা স্থায়ী হত না। লোকে উপরেও উঠত, নীচেও নামত।

ইতিমধ্যে, কেন্দ্রীয় সরকার জমিদারদের অভিযোগকে সমর্থন করে,এবং গ্রামীণ সম্প্রদায়দের নির্দেশ দেয় ব্যক্তি মালিকানার প্রতি সম্মান জানাতে। কিন্তু এই নির্দেশ বলবৎ করার মত ক্ষমতা তাদের ছিল না, ফলে ১৯১৭ সালে দেখা গেল ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ।

গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবের নেতৃত্ব কে দিয়েছিল?

কৃষক বিপ্লবের নেতৃত্বদায়ীব্যক্তি ও গোষ্ঠীদের সম্পর্কে আমাদের হাতে আছে খুবই খন্ডিত তথ্য। বহু গ্রামে কমিটি, কৃষক সোভিয়েত, এবং ইউনিয়নরা নেতৃত্বে আসে। তারা জমি ব্যবহার এবং পরিচালন সম্পর্কে নির্দেশ জারি করে। এই সংগঠনগুলি কৃষকদের রাজনৈতিক কাজের একটা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছিল।  

এদের কেউ কেউ, যেমন কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত, আঞ্চলিক এবং জাতীয় জোটের মধ্যে পড়েছিল, এবং অস্থায়ী সরকার জমি ও রদ কমিটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল কেবল নির্বাচকদের দাবী মেনে চললে। সটনুর্স্ক গ্রাম কমিটি যেমন আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষকে সাফ মনে করিয়ে দিয়েছিল – “আমরা তোমাদের নির্বাচিত করেছি! তোমাদের কাজ আমাদের কথা শোনা!”

নানা ধরণের সাক্ষ্য-প্রমাণ দেখায় যে ক্ষমতা নিয়েছিলেন কেবল কৃষক সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত মানুষরাই । তথাকথিত গ্রামীণ বুদ্ধিজীবীবর্গ – শিক্ষক, ডাক্তার, কৃষিবিশারদ, এবং যাজকদের – নির্বাচিত পদ থেকে একেবারে নিয়মমাফিক বাদ দেওয়া হয়েছিল। গ্রামীণ বিপ্লবের বিবরণে সাধারণভাবে এদের নামও আসে না। নির্বাআচনের রেকর্ড দেখায় গ্রামবাসীরা পছন্দ করতেন এমন সব শিক্ষিত, ঠান্ডা মাথা, এবং বিশ্বস্ত প্রার্থীদের, যারা কৃষক সমাজের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু কৃষক বিপ্লবের বৈচিত্রের ফলে, আমাদের পক্ষে তাদের নেতাদের চরিত্র এক ছাঁচে ফেলা সম্ভব নয়। কোনো গ্রামীণ বিপ্লব গোটা গ্রামকেই টেনে নিয়েছিল, কোথাও মেয়েরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, অন্যত্র অল্পসংখ্যক বিত্তবান কৃষক বাকিদের উপর নেতৃত্ব কায়েম করেছিলেন।   

ফেরুয়ারী বিপ্লব সাধারণ সৈনিকদের মর্যাদা ও ক্ষমতার রূপান্তর ঘটিয়েছিল। তাঁরা পরিণত হলেন আন্দোলনের সশস্ত্র রক্ষাকর্তায়। সেনাবাহিনী ছেড়ে পলাতকরা, ছুটিতে দেশে আসা সৈনিকরা, এবং ছাউনীর সৈনিকরা, সকলেই গ্রামের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। যদি এদের বহিরাগত বলা যায় তবে এরাই একমাত্র বহিরাগত যারা কৃষক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়ার কাছে আসতে পেরেছিলেন।  সৈন্যরা যেহেতু হিংসার জন্য তালিম পায় এবং তার জন্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়, তাই সৈনিকরা অংশ নিলে বিপ্লবী লড়াই অনেক বেশী হিংস্র হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। অনেক সময়ে গোটা সম্প্রদায় এই আক্রমণে অংশ নিত। যেমন, ১৯১৭র মে মাসে একদল সৈনিকের সঙ্গে গ্রামের মেয়েরা ও তাদের বাচ্চারা গিয়ে নাতালিয়া নেরাতোভাকে তার জমি থেকে উচ্ছেদ করেছিল।

বিপ্লবের গোড়ায় দলীয় রাজনীতি কৃষকদের কাজে খুবই প্রান্তিক ভূমিকা পালন করেছিল। ভিক্টর চের্নভের সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী দল গ্রামাঞ্চলে একটা শক্তিশালী সমর্থনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল, বিশেষ করে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে, যেটা দেখা গেল নভেম্বর মাসের সংবিধান সভা নির্বাচনে। জাতীয় স্তরে এই দল পেয়েছিল ৩৭ শতাংশ ভোট, যেখানে বলশেভিকরা পায় ২৩ শতাংশ। কিন্তু উত্তরাঞ্চলে তারা পেয়েছিল ৭৬ শতাংশ, আর কেন্দ্রীয় কৃষ্ণ মৃত্তিকা অঞ্চলে ৭৫ শতাংশ। কৃষকের দল বলে তাদের যে পরিচিতি, সেটার উপরে তারা ভর করেছিল। তাতে তারা নির্বাচনী সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু তারা গ্রামের বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয় নি। গ্রামে পার্টির কর্মীরা নেতৃত্ব তখনই দিয়েছিলেন, যখন তাঁরা গ্রামসমাজের চাহিদা ও আকাংখ্যাকে আপন করে নিয়েছিলেন।

গ্রাম-শহর বিভাজন

গ্রামের বিপ্লব জাতীয় এবং আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাহীনতা তুলে ধরেছিল। না পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত না অস্থায়ী সরকার কৃষকের সমস্যা বা দাবীদাওয়া নিয়ে কথা বলেছিল। তাঁরা গ্রামের মানুষকে শুধু ধৈর্য্য ধরতে বলেছিল, সংবিধান সভা এসে ভূমি বন্টনের আইন পাশ করবে বলে। কৃষকরা মোটামুটিভাবে এই আবেদন অগ্রাহ্য করেছিলেন। আর কেন্দ্রীয় সরকার তাদের বাধা দিতে পারে নি।  আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষরা ১৯১৭ সালে শুরু করেছিলেন এই বিশ্বাস নিয়ে যে গ্রামের বিপ্লবের কারণ ভুল বোঝাবুঝি, এবং মনে করেছিলেন যে সমঝোতা এবং শিক্ষা গন্ডগোল বন্ধ করে দেবে। গ্রীষ্মকালের মধ্যে, গ্রাম সমাজের সচেতন সক্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা না মেনে নিজেদের বিপ্লব করার প্রবণতা এই বিশ্বাসে ক্ষয় ধরিয়েছিল।

আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষরা উত্তরোত্তর সশস্ত্র ফৌজ নির্ভর হয়ে পড়লেন, গ্রামাঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। অল্প কিছু নেতা, যারা বেশী দূরদর্শী ছিলেন, তাঁরা ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি স্থানীয় কমিটিদের হাতে তুলে দিয়ে কৃষকদের বাগে আনতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক শক্তি কোনো স্থির নীতি লাগু করতে না পারায়, অভ্যুত্থানগুলি চলতেই থাকে।

অক্টোবর ১৯১৭ তে বলশেভিকরা ক্ষমতা দখলের পর, লেনিন দ্রুত জমি সংক্রাং দিক্রী প্রস্তাব করলেন, যা সব ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিকে কৃষকদের ব্যবহারের জন্য হস্তান্তরিত করল। বস্তুত, এই ডিক্রী কেন্দ্রীয় সরকারের অক্ষমতা দেখাল, কারণ অক্টোবরের মধ্যে কৃষকরা প্রায় সব ব্যক্তি মালিকান্ধীন জমি দখল করে নিয়েছিলেন। গ্রামীণ রাশিয়ার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের যে লড়াই আসন্ন গৃহযুদ্ধের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল, লেনিনের ডিক্রী তার পূর্বনির্দেশ করেছিল।

রাশিয়ার গ্রামীণ বিপ্লবের ইতিহাস এখনও আবিষ্কৃত হচ্ছে, এবং আমরা যতটুকু জানি তা ১৯১৭র ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ করছে।



রুশ জারতন্ত্র প্রজাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইত। এই কারণে প্রতিটি মানুষ নিজের গ্রাম ও জেলার বাইরে যেতে গেলেই তাঁকে একরকম দেশের ভিতরে ব্যবহারের পাসপোর্ট নিতে হত।