Socialist and Peoples' History

পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত ১৯১৭ঃআপোস থেকে ক্ষমতার দিকে

Published on Friday, 09 November 2018 11:44
Written by Radical Socialist

কেভিন মারফি

ভাষান্তর – কুণাল চট্টোপাধ্যায়

১৯১৭ সাল ধরে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত নিজেকে রূপান্তরিত করল পুঁজির সঙ্গে রফা করতে প্রস্তুত এমন একটি সংস্থা থেকে বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত এমন একটি সংগঠনে।  

মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে ফেব্রুয়ারী বিপ্লব রুশ জারতন্ত্রকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছিল। বিদ্রোহের পরে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল এক নির্বাচিত পেত্রোগ্রাদ শ্রমিক এবং সৈনিকদের সোভিয়েত, এবং এক অনির্বাচিত অস্থায়ী সরকার। গোটা ১৯১৭ জুড়ে এই সোভিয়েতের ভূমিকা ছিল একেবারে কেন্দ্রীয়। ১৯০৫-এর সাধারণ ধর্মঘটের সময়ে জঙ্গী শ্রমিকরা প্রথম সোভিয়েতের সূচনা ঘটিয়েছিলেন। সোভিয়েতের ধারণাটা শ্রমিক আন্দোলনে এতটাই ঢুকে গিয়েছিল, যে ১৯১৭-র অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় দিন থেকেই কিছু কিছু ফ্যাক্টরী নতুন সোভিয়েত তৈরী হওয়ার প্রত্যাশায় প্রতিনিধি নির্বাচন শুরু করে দেয়।

কিন্তু মেনশেভিকরা যাখন সোভিয়েত ডাকলেন, ২৭শে ফেব্রুয়ারী, তখন নরমপন্থী সমাজতন্ত্রী আলেক্সান্দর কেরেনস্কী প্রতিশ্রুতি দিলেন, এই সংস্থা কাজ করবে শৃংখলা বজায় রাখার জন্য।  ১৯০৫এর সোভিয়েত ছিল আগাগোড়া লড়াইয়ের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এবারের পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত তার কার্যনির্বাহক কমিটিতে নির্বাচিত করল প্রায় একচ্ছত্রভাবে সেই সব বুদ্ধিজীবীদের, যাঁরা বিপ্লবে অংশ নেন নি।  

মার্চের শেষের মধ্যে, পেত্রোগ্রাদে স্থিত ১৫০,০০০ সৈনিকদের বেশী প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হল ২০০০ প্রতিনিধি মারফৎ, যেখানে ৪০০,০০০ শিল্প শ্রমিকদের প্রতিনিধি হলেন মাত্র ৮০০ জন। ফেব্রুয়ারী বিপ্লবে বস্ত্রশিল্পের নারী শ্রমিকদের নির্ণায়ক ভূমিকা সত্ত্বেও, সোভিয়েতের সদস্যরা ছিলেন প্রায় সকলেই পুরুষ, আর মাত্র কয়েক ডজন নারী প্রতিনিধি। অসংগঠিত, চীৎকার হত, এমন সাধারণ সভার অর্থ হল অধিকাংশ সময়ে জরুরী কাজ চালাত কার্যনির্বাহক কমিটি। এই কমিটির লক্ষ্য ছিল শ্রমিক এবং সৈনিকদের চেয়ে অনেক মোলায়েম। ক্ষমতা হাতে নেওয়ার বদলে এই কমিটি তার অনিচ্ছুক উদারনীতিবিদ মিত্রদের উপর চাপ দিল যে তাঁদের সরকার গঠন করতে হবে। নিকোলাই সুখানভ লিখেছেন, যে মেনশেভিকরা বিশ্বাস করতেন, “জারতন্ত্রের জায়গা নেবে যে সরকার তাকে সম্পূর্ণভাবে বুর্জোয়া হতে হবে”।

২ মার্চ সোভিয়েত যখন অস্থায়ী সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, তারপর সোভিয়েতের সংবাদপত্র ইজভেস্তিয়া ব্যাখ্যা করে, সোভিয়েত নতুন সরকারের উপর গণতন্ত্রের স্বার্থে চাপ দেবে, কিন্তু বেশী জোরে চাপ দেবে না, পাছে প্রতিবিপ্লব ঘটে যায়। কিন্তু কার্যনির্বাহক কমিটি এই সামান্য দিশা পালন করতেও পারে নি। অস্থায়ী সরকারকে খুশী রাখতে সোভিয়েতের নেতারা প্রতিটি প্রধান বিষয়ে পিছু হাঁটলেন। তাঁরা  স্থির করলেন, ভূমি সমস্যার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, যতদিন না সংবিধান সভা নির্বাচিত হয়, আর সেই নির্বাচন বারে বারে পিছিয়ে দেওয়া হল। অবিশ্বাস্য হলেও, তাঁরা এমনকি রাজতন্ত্র চালু রাখতেও রাজি হলেন – কিন্তু তাঁদের হাত থেকে সিদ্ধান্তটা কেড়ে নিলেন নিকোলাসের ভাই মিখাইল, কারণ তিনি একদিনের জন্যও জার হতে অস্বীকার করলেন।  

যুদ্ধের মত বিতর্কিত বিষয়ে, সোভিয়েত ১৪ মার্চ একটা শান্তিবাদী ইস্তাহার প্রকাশ করল, যাকে বলশেভিক প্রাভদা ব্যাখ্যা করেছিল “সোভিয়েতে উপস্থিত সবকটি ধারার মধ্যে সচেতন রফা” বলে। ফলে যে ঐকমত্যটি সৃষ্ট হল, তা এমনই ধোঁয়াটে ছিল, যে যুদ্ধবাজ বিদেশ মন্ত্রী পাভেল মিলিউকভ পর্যন্ত সেটা সমর্থন করতে পেরেছিলেন, যেমন পেরেছিলেন বলশেভিকদের পক্ষে জোশেফ স্তালিন এবং লেভ কামেনেভ।

বস্তুত, ঐ গোড়ার দিকে বলশেভিকদের কাজের সঙ্গে মেনশেভিক আর সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী (এস আর)দের  কাজের ফারাক করা কঠিন। কার্যনির্বাহক কমিটির সভাগুলির কার্যবিবরণী দেখায়, বলশেভিক গোষ্ঠীর নেতারা অধিকাংশ নীতিগত প্রশ্নে নীরব থেকেছিলেন। এটা ট্রটস্কীর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে তিনি লিখেছিলেনঃ

প্রতিবেদনগুলিতে, এবং সংবাদপত্রে একটিও প্রস্তাব, ঘোষণা, বা প্রতিবাদের উল্লেখ নেই, যেখানে মেনশেভিক এবং এস আর-দের স্তাবকতার প্রতিবাদে স্তালিন বলশেভিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছিলেন।

স্তালিন ও কামেনেভের নেতৃত্বে বলশেভিকদের ভূমিকা এমনই জঘন্য ছিল, যে কয়েক বছর পরে, তাঁরা আলেক্সান্দর শ্লিয়াপনিকভের উপরে চাপ দেবেন, তাঁর স্মৃতিচারণ পাল্টে লেখার জন্য।

ঐ প্রথম সপ্তাহগুলিতে সোভিয়েতের একমাত্র উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ১নং নির্দেশ জারী করা। জঙ্গী সৈনিকরা নেতাদের উপরে চাপ দিয়ে সেটা পাশ করিয়েছিলেন। এই বিখ্যাত ডিক্রী সৈনিকদের নিজস্ব কমিটি নির্বাচনের ক্ষমতা দিল, এবং যে সব সরকারী নির্দেশ সোভিয়েতের নির্দেশের পরিপন্থী হবে সেগুলি অমান্য করার ক্ষমতা দিল। ১নং নির্দেশ অস্থায়ী সরকারের যুদ্ধপ্রস্তুতির পথে এক বিশাল বাধাতে পরিণত হল।

লেনিন দ্রুত এই দ্বৈতক্ষমতা ব্যবস্থার  অস্থিতিশীলতা বুঝতে পারলেন। অস্থায়ী সরকার এবং সোভিয়েতের ছিল পরস্পরবিরোধী শ্রেণীস্বার্থ, এবং না কূটনীতি, না আপোষপন্থা, তাদের স্থায়ীভাবে একত্রে আনতে পারত। ট্রটস্কীর, এবং ভাইবর্গের কিছু বামপন্থী বলশেভিকের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে লেনিনের এপ্রিল থিসিস আহবান করল, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রচারের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রয়াসকে নাকচ করা হোক, রাষ্ট্রক্ষমতা সোভিয়েতদের হাতে তুলে দেওয়া হোক, এবং “সামাজিক উৎপাদন ও উৎপন্ন দ্রব্য বন্টন” শ্রমিক পরিষদদের নিয়ন্ত্রণে আনা হোক।

৩রা এপ্রিল তিনি ফিরে আসার পরবর্তী চব্বিশ ঘন্টায় লেনিন অনেকগুলি পথসভায় বক্তৃতা দেন, যেখানে তিনি এক হাজারের বেশী বলশেভিক কর্মীর কাছে তার নতুন, বৈপ্লবিক দিশা ব্যাখ্যা করেন। তিনি “পুঁজিবাদী জলদস্যুদের যুদ্ধের” বিরুদ্ধে প্রচার করেন, কামেনেভ ও স্তালিন যে মেনশেভিকদের সঙ্গে ঐক্যের আলোচনা করছিলেন তাকে নাকচ করেন, এবং গোটা রাজনৈতিক পরিমন্ডল থেকে প্রতিপক্ষদের আক্রোশ বাড়িয়ে তোলেন।

মেনশেভিক সংবাদপত্র চীৎকার জুড়ে দিল যে তার নতুন কর্মসূচী বিপ্লবের প্রতি নিঃসন্দেহে এক বিপদ, আর উগ্র দক্ষিণপন্থী পত্রিকাগুলি লেনিনকে তুলনা করতে শুরু করল খৃষ্টীয় বিশ্বাসের “অ্যান্টিক্রাইস্ট”-এর সঙ্গে।  প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স লভভ অভিযোগ করলেন, সোভিয়েত বলেছিল অকুন্ঠ সমর্থন দেওয়া হবে, তার বদলে সরকারকে এখন সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে, নেভস্কি প্রসপেক্টে “পুঁজিবাদী মন্ত্রীরা নিপাত যাক” লেখা ব্যানার হাতে শ্রমিক আর সৈনিকদের সংঘাত হল “লেনিন নিপাত যাক” লেখা ব্যানার হাতে উদারনীতিবিদ সমর্থকদের সঙ্গে।

যুদ্ধ ও এপ্রিল সংকট

এই যে চাপা উত্তেজনা, সে সব প্রকাশ্যে বেরিয়ে এল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে  রাশিয়ার ভূমিকার ফলে। মেনশেভিক ইরাকলি সেরেতেলির চাপে, অস্থায়ী সরকার ২৭শে মার্চ ঘোষণা করে যে তাঁদের লক্ষ্য নিছক প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ। কিন্তু একমাসের কম সময়ের মধ্যে, উদারনৈতিক সাংবিধানিক গণতন্ত্রী দল, বা ক্যাডেটদের সদস্য মিলিউকভ মিত্রশক্তির কাছে একটি নোট প্রচার করেন, যাতে আগের ঘোষণাটিকে কার্যত অস্বীকার করে।

তিনি বলেন যে রাশিয়া বিশ্বযুদ্ধকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তার ফলে রাশিয়ার দখলে আসবে কনস্ট্যান্টিনোপল এবং দার্দানেলিস। তিনি মনে করেছিলেন, বিপ্লব সাম্রাজ্যের যুদ্ধকালীন দিশাগুলিকে দুর্বল করেনি, বরং যুদ্ধকে চূড়ান্ত বিজয় অবধি এগিয়ে নিয়ে যাওয়াআর সর্বজনীন আকাংখ্যাকে শক্তিশালী করেছে, এবং তিনি দাবী করেন যে ভবিষ্যত যুদ্ধ থামানোর জন্য চাই গ্যারান্টি ও মঞ্জুরী – আসলে দেশ দখল এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবী।

সোভিয়েতের সঙ্গে অস্থায়ী সরকারের ভঙ্গুর শান্তি ভেঙ্গে পড়ল মিলিউকভের এই খোলাখুলি ভাষায় রুশ ও মিত্র সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসী দিশার ব্যাখ্যার ফলে। গভীর রাত পর্যন্ত সোভিয়েতের কার্যনির্বাহক কমিটি সভা করেও কোনো ঐকমত্যে আসতে পারল না।   

২০ এপ্রিল সকালের খবরের কাগজগুলিতে যখন মিলিউকভের নোট প্রকাশিত হল, তখন ফিনল্যান্ড রেজিমেন্টের এক সার্জেন্ট একটি যুদ্ধবিরোধী মিছিল সংগঠিত করেন। সত্ত্বর, অন্য বিভিন্ন রেজিমেন্ট এবং বাল্টিক নৌবহরের নাবিকরা যোগদান করলেন।  শেষে ২৫০০০ সশস্ত্র সৈনিকের এক মিছিল হাজির হল মারিনস্কি প্রাসাদের সামনে। হাতে তাঁদের প্ল্যাকার্ড, যাতে লেখা ছিল – “মিলিউকভ নিপাত যাক!”   

পরদিন, বলশেভিকদের উদ্যোগে বৃহত্তর একটি প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত হয়, আর মেনশেভিক ও এস আর-রা শ্রমিক এবং সৈনিকদের আবেদন করেন, ঐ মিছিলে যোগদান না করতে। মারিনস্কি প্রাসাদের বিশাল সম্মুখভাগের উল্টোদিকে বলশেভিকরা একটা বিরাট লাল ব্যানার টাঙ্গিয়ে দিলেন, যাতে বলিষ্ঠ ভাষায় লেখা ছিলঃ “তৃতীয় আন্তর্জাতিক দীর্ঘজীবী হোক”। ক্যাডেট দল অস্থায়ী সরকারের সমর্থনে পাল্টা মিছিল ডেকেছিল, এবং ফেব্রুয়ারীর পর এই প্রথম নেভস্কিতে খন্ডযুদ্ধ দেখা যায়।

কিছু কিছু বলশেভিক “অস্থায়ী সরকার নিপাত যাক” স্লোগানটা আক্ষরিকভাবে নিয়ে মনে করলেন, প্রাসাদে হানা দিয়ে মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করা যেতে পারে। জেনারাল লাভর কর্ণিলভ প্রস্তাব করলেন, প্রতিবাদীদের কামান দেগে ছত্রভঙ্গ করা হোক। সোভিয়েত যখন এই খবর পায়, তখন তার দিক থেকে সৈনিকদের কাছে নির্দেশ যায়, তাঁরা যেন ছাউনীতেই থাকেন।

ইজভেস্তিয়া অভিযোগ করল, নেতৃত্ব সংকট মেটাতে কাজ করছেন, কিন্তু “অনেক সমর্থক পতাকা সহ এমন স্লোগান নিয়ে মিছিল করছেন, যেগুলি সোভিয়েতের লক্ষ্যের সঙ্গে সাযুজ্য রাখে না”। যেমন, তাঁরা দাবী করছেন “সরকারের উচ্ছেদ এবং সোভিয়েতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর”। সেদিন সন্ধ্যায়, অস্থায়ী সরকার যুদ্ধ প্রসঙ্গে সোভিয়েতের কাছে নতুন করে লেখা একটি নোট পাঠায়, এবং ৩৪-১৯ ভোটে কার্যনির্বাহী কমিটি সেটি গ্রহণ করে। এই নেতারা মনে করলেন যে সংকট শেষ, এবং তাঁরা আর কোনো মিছিল করার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করলেন।  

লেনিন এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কষাঘাত করে লিখলেন, “পুঁজিপতিরা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে”, এবং “প্রথম সংকটের পর আরো সংকট আসবে”। তিনি একই সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করলেন ব্লাংকিপন্থী, তাৎক্ষণিক ক্ষমতা দখলের চেষ্টাকে। তার বদলে ডাক দিলেন দীর্ঘমেয়াদী রণনীতির, যাতে বোঝানো হবে যুদ্ধ থামানোর প্রলেতারীয় পদ্ধতি এবং সোভিয়েতের প্রতিনিধিদের নতুন করে নির্বাচিত করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হবে।

সোভিয়েতের প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে আনার গণতান্ত্রিক রীতি বলশেভিকদের পক্ষে কাজ করবে। এপ্রিলের শেষে, পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতে লেনিনের দলের ছিল প্রায় এক চতুর্থাংশ প্রতিনিধি, আর আরো নীচে, নগর জেলা সোভিয়েতগুলিতে, সংখ্যাটা বেশীই ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে, যে প্রচারকরা জার্মান সৈনিকদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব প্রদর্শনের ডাক দিচ্ছিলেন তাঁদের কথা যেন ক্লান্ত সৈনিকদের মনে দাগ কাটছিল।

৬ই মে, ইজভেস্তিয়া ক্ষুব্ধ ছিল, যে প্রাভদা “সোভিয়েতের আবেদনের সম্পর্কে সৈনিকদের আস্থা ভেঙ্গে দিচ্ছিল ... আপনারা যদি আপনাদের সোভিয়েতের উপর বিশ্বাস রাখেন, তাহলে পবিত্র চিত্তে তার আহবানে সাড়া দিন এবং ‘ভ্রাতৃত্ব’ প্রদর্শন বন্ধ করুন”।

কেরেনস্কীর আক্রমণাত্মক যুদ্ধঃ

লেনিনের ভবিষ্যতবাণী, যে মিলিউকভ নোট নিয়ে সংকট হবে বহু সংকটের প্রথমটি মাত্র, বাস্তবে সত্য বলেই প্রমানিত হল। জুন মাসে কেরেনস্কী প্রস্তাবিত সামরিক আক্রমণ অস্থায়ী সরকার, সোভিয়েত, এবং তার যে জনগণের নাকি প্রতিনিধিত্ব করছিলেন তাঁদের মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে তুলল।

৩রা জুন যখন পেত্রোগ্রাদে সারা রাশিয়া সোভিয়েতদের প্রথম কংগ্রেস আরম্ভ হল, তখন নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছিলেন, এবং তাঁরা দাবী করতে পারতেন যে তাঁরা দু’কোটি শ্রমিক ও সৈনিকদের নামে শাসন করছেন। কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা কেরেনস্কীর আক্রমণের প্রস্তাবকে অনুমোদন করলেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তড়িৎস্পৃষ্ট রাজধানীতে শ্রমিক ও সৈনিকদের বাঁয়ে মোড় ঘোরা বাকি দেশের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল।  

যুদ্ধের নবীকরণের প্রস্তুতিতে কেরেনস্কী সামরিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেন, কিন্তু বিপ্লবী সৈনিকদের কাছ থেকে বাঁধা পান। ২৩ মে পেত্রোগ্রাদের বলশেভিক সামরিক সংগঠনের একটি সভাতে ঘোষণা করা হয় যে “কেন্দ্র থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহীত না হলে [সামরিক সংগঠন] নিজের উদ্যোগে বেরিয়ে আসতে প্রস্তুত”।  

৮ই জুন সামরিক সংগঠন সহ বলশেভিক নেতারা বিপুল ভোটে স্থির করেন যে কেরেনস্কীর পরিকল্পনার প্রতিবাদে একটি মিছিল হবে। বলশেভিক পত্রিকা সোলদাতস্কায়া প্রাভদা অস্থায়ী সরকারের ডাকঃ “বিজয় পর্যন্ত যুদ্ধ”কে ব্যঙ্গ করে তাদের নিজেদের স্লোগান দিলঃ “পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে বিজয় পর্যন্ত যুদ্ধ”।  

তৃণমূল স্তরে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও, বলশেভিকদের এই আহবান সোভিয়েত কংগ্রেস এবং পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত, উভয়কেই অগ্রাহ্য করেছিল। ১০ই জুনের গোড়ায়, বলশেভিক কেন্দ্রীয় কমিটির এক ছোট সভাতে ৩-০ ভোটে মিছিল বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইয়াকভ সভের্দলভ এবং লেনিন নেতৃত্বের দক্ষিণপন্থী অংশের বিরুদ্ধে ভোটদান থেকে বিরত থাকেন।

এই সিদ্ধান্ত পার্টির জঙ্গী কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্রোধের সঞ্চার ঘটায়। ভাইবর্গের কিছু সদস্য তাঁদের সদস্যপদ ছিঁড়ে ফেলেন। পিটার্সবুর্গ কমিটিতে একের পরও এক বক্তা কেন্দ্রীয় কমিটিকে তীব্র কষাঘাত করেন। প্যারী কমিউনের মত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়ে লেনিন তার কমরেডদের কাছে আহবান করেন সর্বাধিক শান্তি, সতর্কতা, ধৈর্য এবং সংগঠিত হওয়ার জন্য।

পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত এবং সোভিয়েত কংগ্রেসের সভাপতিমন্ডলীর এক যৌথ অধিবেশনে ১১ই জুন উদভ্রান্ত সেরেতেলি বলশেভিকদের নামে অভিযোগ আনলেন বিপ্লবের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার এবং দমনমূলক ব্যবস্থার ডাক দিলেন। বলশেভিকদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন কামেনেভ। তিনি বলেন, কোনো স্লোগান দেওয়া হয় নি, ক্ষমতা দখলের জন্য। কেবল স্লোগান তোলা হয়েছিলঃ সোভিয়েতদের হাতে সব ক্ষমতা। তিনি চ্যালেঞ্জ করে বলেনঃ “ আমাকে গ্রেপ্তার করে বিপ্লবের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার জন্য বিচারে তুলুন”। তিনি ও অন্য বলশেভিকরা প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেন।

পরদিন, সোভিয়েত কংগ্রেস কেরেনস্কীর পরিকল্পিত আক্রমণাত্মক যুদ্ধনীতি অনুমোদন করল। সেই সঙ্গে তাঁরা ১৮ই জুন ঐক্যের নামে মিছিলের ডাক দিল। কিন্তু পেত্রোগ্রাদের সোভিয়েত নেতাদের চিন্তা ছিল যে বলশেভিকরা তাঁদের মিছিল কেড়ে নেবে, তাই তাঁরা প্রস্তাব করলেন, কেবল সোভিয়েত কর্তৃক অনুমোদিত স্লোগান থাকতে পারবে।

বিপ্লবী রীতির সঙ্গে এই খোলাখুলি ভাংগন, যদিও সেটা বাস্তবে চাপিয়ে দেওয়া অসম্ভব হত, বহু শ্রমিক ও সৈনিককে রক্ষণশীল নেতৃত্বের বিরোধী করে তুলল। বহু ফ্যাক্টরী, যেখানে আগে মেনশেভিক ও এস আর রা প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন, সেখানে সিদ্ধান্ত হল বলশেভিকদের স্লোগান সমর্থন করার।  

ইজভেস্তিয়া অভিযোগ করল যে “জনতার নীচের দিকের, অজ্ঞ অংশগুলি” আকৃষ্ট হচ্ছে “নৈরাষ্ট্রবাদী-বলশেভিক প্রচারে”মিছিলের পূর্বাহ্নে সেরেতেলি বলশেভিক প্রতিনিধিদের বলেন, “আমরা দেখব সংখ্যাগরিষ্ঠ কাদের অনুসরণ করে – তোমাদের না আমাদের”।    

ম্যাক্সিম গোর্কির নোভায়া ঝিঝন পরদিন স্বীকার করেছিল, চার লাখের ঐ মিছিল দেখিয়েছিল “পিটার্সবুর্গ প্রলেতারিয়েতের মধ্যে বলশেভিকবাদের সম্পূর্ণ বিজয়”। বলশেভিকদের ব্যানার ও স্লোগানে ভরে গিয়েছিল। “সোভিয়েতদের হাতে সব ক্ষমতা”, এবং “দশজন পুঁজিবাদী মন্ত্রী নিপাত যাক”, এই দুই স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ডের সমুদ্রে দ্বীপের মত দেখা্ দিচ্ছিল সামান্য কিছু সরকারী সোভিয়েত, মেনশেভিক ও এস আর স্লোগান।

এই মিছিল আর কেরেনস্কীর আক্রমণাত্মক রণনীতির সমাপতন ঘটেছিল। ঐ আক্রমণের ফলে চল্লিশ হাজার সৈনিকের মৃত্যু হয়। ইজভেস্তিয়াতে রিপোর্ট বেরোয়, একটি প্রতিনিধি দল দশম সেনাবাহিনীর কাছে “রুশ গণতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গী ব্যাখ্যা করতে গেলে” কি হয়েছিলবহু রেজিমেন্টে কমিটির সদস্যদের বলা হয়, সৈন্যরা তাঁদের কর্তৃত্ব, পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের কর্তৃত্ব, বা যুদ্ধমন্ত্রীর কর্তৃত্ব মানবে না, এবং আক্রমণে নামবে না। রাশিয়াতে যেখানে স্বাধীনতা এসেছে, একটু জমি পাওয়ার সুযোগ এসেছে, সেখানে তারা মরতে চায় না।

৭০৩ নং রেজিমেন্টে সৈন্যরা কমিটিকে বিদ্রুপ করে, কারণ তারা “আমাদের তাড়া দিচ্ছে কেরেনস্কীর হুকুম মানতে”, এবং তারপর পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের প্রতিনিধিদের মারধর করে, মেরে ফেলার হুমকি দেয়, এবং শেষে তাঁদের গ্রেপ্তার করে।  

কেরেনস্কীর বহু প্রত্যাশিত আক্রমণ এক ভয়ংকর বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিল। প্রকাশ্যে সাফল্য দাবী করলেও, তিনি ২৪ জুন এক সাংকেতিক ভাষায় লেখা টেলিগ্রামে স্বীকার করেন যে “প্রথম দিনগুলির পর, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘন্টার পর ... তেজ কমতে থাকে”, এবং বিভিন্ন [সামরিক] ইউনিট “প্রস্তাব গ্রহণ করতে থাকে, যাতে ছিল অবিলম্বে রণাঙ্গণের পিছনে অপসারণের দাবী ছিল”।

জুলাইয়ের আধা-অভ্যুত্থানঃ

জুলাইয়ের দিনগুলি এই সংঘাত তীব্রতর করে তুলল। বিদ্রোহীরা পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের কাছে আকুল আবেদন করলেন যেন সোভিয়েত ক্ষমতা নেয়, আর নেতারা আশ্চর্যভাবে সৈনিকদের হাতে পায়ে ধরলেন ঐ বিদ্রোহীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। একজন বলিষ্ঠ চেহারার শ্রমিক এক বিখ্যাত ঘটনায় এই দ্বন্দ্বটা তুলে ধরেন, যখন টাউরিডে প্রাসাদের বাইরে তিনি এস আর নেতা ভিক্টর চের্নভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বলেনঃ “কুত্তার বাচ্চা, ক্ষমতা যখন তোমাদের দেওয়া হচ্ছে, তখন সেটা নাও”।  

ফেব্রুয়ারীতে প্রথম মেশিন গান রেজিমেন্টের হাজার হাজার সৈনিক ওরেনবুর্গ থেকে শোভাযাত্রা করে এসে বিপ্লবকে রক্ষা করার জন্য পেত্রোগ্রাদেই থেকে গিয়েছিলেন। এই সৈনিকদের দুই-তৃতীয়াংশকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাবার হুকুম দিলে তাঁরা বিদ্রোহ করেন, কারণ তাঁরা ঐ হুকুমকে মৃত্যুদন্ডের চেয়ে কম কিছু বলে মনে করেন নি। ১ জুলাই সোভিয়েত দাবী করে, মেশিন গান চালকরা যেন তাঁদের ছাউনীতে ফিরে যান, কিন্তু তাঁরা সশস্ত্র শোভাযাত্রার পরিকল্পনা করে যেতে থাকেন।

বলশেভিকদের সারা রাশিয়া সামরিক সংগঠনের সম্মেলনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হলেন পিঠে বন্দুক নিয়ে, লড়তে প্রস্তুত হয়ে।প্রাদেশিক সংগঠনরা জানালেন কেরেনস্কীর ও তার যুদ্ধ-পরিকল্পনার প্রতি তীব্র ক্ষোভের কথা।.তাৎক্ষণিক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের দাবী নিয়ে বারে বারে সৈন্যরা এসে সম্মেলনকে বাঁধা দেন। লেনিনের বক্তৃতায় লেনিন অসংগঠিত, বেশী আগে ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থান যে সরকারের হয়াতে খেওলবে, এই কথা বলে অত্যুৎসাহীদের উপরে যেন ঠান্ডা জল ঢাকার চেষ্টা করলেন।

জুলাইয়ের মধ্যে কিছু হঠকারী বলশেভিকদের দেখাচ্ছিল যেন নৈরাষ্ট্রবাদীদের মতো। ২রা জুলাই নৈরাষ্ট্রবাদীদের একটি সভা থেকে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়া হয়। বস্তুত, আলেক্সান্ডার রাবিনোউইচ লিখেছেন যে এই গোষ্ঠীটি “অভ্যুত্থানে এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল”।  নৈরাষ্ট্রবাদী ব্লেইখম্যান মেশিন গান বাহিনীকে আহবান করেন সরকারকে উচ্ছেদ করতে, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, যে “রাস্তাই আমাদের সংগঠিত করবে”, কেবল বিশৃঙ্খলা ঘটিয়েছিল। যখন ক্রোনস্টাড থেকে দশ হাজার সশস্ত্র নাবিক হাজির হলেন, তখন সোভিয়েতের নেতারা তাঁদের কাছে আবেদন করছিলেন ফিরে যেতে, কিন্তু তাঁরা ব্লেইখম্যানের প্রস্তাবিত অভ্যুত্থানের প্রস্তুতির প্রতি অনেক বেশী সহানুভূতিশীল ছিলেন। এই বিশাল মিছিল সারা রাশিয়া সোভিয়েত কার্যনির্বাহী কমিটির কাছে যে দাবীগুলি পেশ করেছিল, ইজভেস্তিয়া তা ছেপে দেয়ঃ

দশজন বুর্জোয়া মন্ত্রীর অপসারণ, সোভিয়েতদের হাতে সব ক্ষমতা, আক্রমণাত্মক যুদ্ধ বন্ধ করা, বুর্জোয়া পত্রপত্রিকার ছাপাখানাগুলি বাজেয়াপ্ত করা, জমি হবে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, উৎপাদনের উপরে চাই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ।

সেই রাতে কামেনেভ ও জিনোভিয়েভ বলশেভিক নেতৃত্বকে বোঝালেন যে পরদিনের মিছিল বাতিল করতে হবে, কারণ তাঁদের উৎকন্ঠা ছিল যে মিছিল হলে তা দলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। যখন বোঝা গেল, যে মিছিল হবেই, এবং দক্ষিণপন্থী বলশেভিকদের রণনীতি দেখাবে বিশ্বাসঘাতকতার মত, তখন ৪ঠা জুলাইয়ের প্রাভদা তে যেখানে মিছিল বাতিল করার আহবান ছাপা হচ্ছিল, সেখানটা সাদা পাতা হিসেবে ছাপা হয়।

সেদিন পাঁচ লাখের মিছিল হয়। সরকার হিংস্রভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ইজভেস্তিয়া একটা সুপরিকল্পিত আক্রমণের বর্ণনা দিয়েছিলঃ  

তাঁরা [প্রতিবাদীরা] যখন একটা গীর্জা পেরোচ্ছিলেন, তখন গীর্জার মাথা থেকে একটা ঘন্টা বাজে, এবং যেন ঐ ইঙ্গিতের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িগুলির ছাদ থেকে বন্দুক আর মেশিন গান দুয়েরই গুলিবর্ষণ শুরু হয়। মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা যখন উল্টোদিকে দৌড়ে গেলেন, তখন উল্টোদিকের ছাদ থেকেও গুলি চালানো হয়। মেনশেভিকদের সংবাদপত্রে আরো রিপোর্ট বেরোয় যে কসাকরা মিছিলের উপর কামান দেগেছিল।

জুলাইয়ের দিনগুলি দেখাল যে নিকোলাসের ইস্তফার সময়ে যে ক্ষণস্থায়ী জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল সেটা খতম হয়ে গেছে। একজন অংশগ্রহণকারী লিখেছেনঃ

“লাল পতাকার নীচে হেটেছিলেন কেবল শ্রমিক আর সৈনিকরা। আমলাদের লাল রিবন, ছাত্রদের চকচকে বোতাম, “ভদ্রমহিলা সহমর্মীদের” সৌখীন টুপি দেখা যাচ্ছিল না ... মিছিলে হাটছিলেন ধনতন্ত্রের সাধারণ দাসেরা”।

ক্যাডেট নেতা নাবোকভ লিখেছিলেন, প্রতিবাদিদের মুখে ছিল সেই উন্মত্ত, নির্বোধ, পাশবিক চেয়ারা, যা আমাদের মনে আছে ফেব্রুয়ারির দিনগুলি থেকে”। শ্রেণী ঘৃণা এখন পারস্পরিক। শ্রমিকরাও ব্যানার নিয়ে হাঁটছিলেন, যাতে লেখা ছিল, “পুঁজিপতিরা মনে রেখো,  মেশিন গান আর ইস্পাত তোমাদের ধ্বংস করবে!” কেরেনস্কী রেলপথে ফ্রন্টের দিকে যাচ্ছেন শুনে কিছু মেশিন গান ফৌজ বাল্টিক স্টেশনে তাঁকে খুজতে চলে গেলেন। অন্যরা বিত্তবানদের মোটরগাড়ি দখল করে অস্ত্র দেখিয়ে নেভস্কির পথে টহল দিতে থাকলেন।

টাউরিডে প্রাসাদের বাইরে চের্নভ শান্তির আবেদন করতে থাকলেন, যতক্ষণ না ক্রোনস্টাডের নাবিকরা তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। শেষমেশ ট্রটস্কীকে এসে হস্তক্ষেপ করে এস আর নেতার মুক্তির ব্যবস্থা করতে হয়।

সশস্ত্র শ্রমিকরা সেরেতেলির খোঁজ করতে করতে প্রাসাদের মধ্যে সোভিয়েতের একটা অধিবেশনে ঢুকে পড়েন। সুখানভের ভাষায়, কিছু কিছু প্রতিনিধি “যথেষ্ট সাহস এবং আত্ম-সংযম দেখাতে পারলেন না”। একজন শ্রমিক বক্তার জায়গাতে লাফিয়ে উঠে, তাঁর রাইফেল ঝাঁকিয়ে ঘোষণা করলেনঃ

কমরেডরা, শ্রমিকরা আর কতদিন এই বেইমানী মেনে নেবেন? আপনারা এখানে তর্ক করছেন, জমিদারদের সঙ্গে রফা করছেন ...। আপনারা শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে ব্যস্ত! এখানে আমরা পুতিলভ [কারখানা] থেকে সবশুদ্ধু ৩০,০০০ জন আছি। আমরা আমাদের দাবী আদায় করবই। সভিয়েতদের হাতে সব ক্ষমতা! আমরা আমাদের রাইফেল শক্ত হাতে ধরেছি। আপনাদের কেরেনস্কী রা আর সেরেতেলীরা আমাদের ঠকাতে পারবে না!”

ক্ষমতার ভারসাম্য সোভিয়েত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরে গিয়েছিল। অনুগত সৈনিক খুঁজে বার করার ভারপ্রাপ্ত মেনশেভিক ভ্লাদিমির ভইটিনস্কি ব্যাখ্যা করেন যে তিনি টাউরিডে প্রাসাদ রক্ষার জন্য ফৌজ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। প্রথম যে সৈনিকরা এলেন, তাঁরা ট্রটস্কীদের মেঝরায়ন্তসি সংগঠনের অনুগত ছিলেন। সন্ত্রস্ত সোভিয়েত নেতৃত্ব তাঁদের দেখেই আনন্দের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানালেন।

সেই রাতে বলশেভিকরা মিছিল শেষ করার ডাক দিলেন, এবং পর দিন অস্থায়ী সরকার লেনিন ও তার কমরেডদের বিরুদ্ধে  জার্মান চরবৃত্তির অভিযোগ এনে প্রচার শুরু করে। জুলাইয়ের দিনগুলির পরিপ্রেক্ষিতে অস্থায়ী সরকারের অ-সমাজতন্ত্রীরা স্থির করলেন যে বিপ্লবকে  নির্মূল করতে হবে, সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে, এবং সোভিয়েতকে ধ্বংস করতে হবে। অভ্যুত্থানের জবাবে এই কসাইখানা আনার আকাংখ্যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে তাঁদের লক্ষ্যের পায়ে পড়ে। বিপ্লবকে রক্ষা করতে শেষ অবধি সোভিয়েত রুখে দাঁড়াবে।

.

সোভিয়েতে জঙ্গী ভাবের বিকাশ

শয়ে শয়ে বলশেভিককে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করয়া হল। লেনিন আত্মগোপন করে পালিয়ে গেলেন ফিনল্যান্ডে। মিথ্যা অভিযোগের নমুনা হল, সরকার দাবী করল, ট্রটস্কী লেনিনের সঙ্গে জার্মানদের দেওয়া তথাকথিত সীলমারা ট্রেনে করে রাশিয়া এসেছিলেন, যেটা নাকি প্রমাণ করে যে এই দুই বিপ্লবীই আসলে রাশিয়ার শত্রুদের সেবাদাস। আসলে লেনিন যখন রাশিয়াতে ফেরেন তখন ট্রটস্কী নোভা স্কোশিয়াতে ইংরেজ সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী।

সেরেতেলি লেনিনের গ্রেপ্তারের ওয়ারেন্টে সই করলেন, এবং মনে হচ্ছিল যেন মেনশেভিকরাও প্রতিবিপ্লবে যোগদান করেছেন। কিন্তু ধাতু শ্রমিক ইউনিয়নের দপ্তরে, মেনশেভিকদের বিভিন্ন অফিসে, আক্রমণ, এবং সোভিয়েতের কিছু কিছু প্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করা দেখিয়ে দিল যে তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল সমাজতন্ত্রীরাও সরকারের বিছিয়ে দেওয়া দমন-পীড়নের জাল থেকে নিরাপদ না।  ক্যাডেট দলের সম্মেলন গণতান্ত্রিকতার ভান ছেড়ে এক কড়া একনায়কের দাবী তুলল। বক্তারা কেরেনস্কী এবং ১ নং নির্দেশকে “রাশিয়ার বর্তমান ভয়াবহ বিপদের” জন্য দায়ী করলেন।  

শিল্প ও বাণিজ্যের কংগ্রেসে বক্তারা দাবী তুললেন যে “সোভিয়েতের একনায়কতনন্ত্রের থেকে আমূল বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে”, কারণ সেটা রাশিয়াকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। ইউনিয়ন অফ রাশিয়ান পীপল [রুশ রাজতন্ত্রী, উগ্র ইহুদী ও সমাজতন্ত্রী বিদ্বেষী, বস্তুত ফ্যাসীবাদের পূর্বসুরী এমন সংগঠন]-এর প্রতিষ্ঠাতা ও বিখ্যাত দাংগাবাজ ভ্লাদিমির পুরিশকেভিচ গলা মেলালেন ও দাবী করলেন যে শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলিকে অবিলম্বে ভেঙ্গে দিতে হবে।   

প্রতিবিপ্লবীরা তাঁদের কড়া মানুষ খুঁজে পেলেন রুশ সেনাবাহিনীর সদ্য নিযুক্ত প্রধান, জেনারাল লাভর কর্নিলভের মধ্যে। যেদিন তিনি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন, তার আগের সন্ধ্যায় কর্নিলভ বলেনঃ “সময় এসেছে জার্মান চর ও গোপন দূতদের ফাঁসীতে লটকাতে, যাদের মধ্যে প্রথমেই থাকবে লেনিন। সময় এসেছে সোভিয়েতকে ভেঙ্গে দেওয়ার”। তিনি আরো বলেন, প্রয়োজন হলে “শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতিনিধিদের সোভিয়েতের গোটা সদস্যবৃন্দকে ফাঁসী” দেওয়া হবে। এই ফাঁসী ব্যাপারটা এই জেনারালের সাধারণ বুলি ছিল। বিপ্লবের আগে তিনি বারে বারে কথা বলেছিলেন “ঐ সব গুচকভ আর মিলিউকভদের” ফাঁসী দেওয়ার কথা। কিন্তু এখন তিনি উদারপন্থীদের সঙ্গে হাত মেলালেন, কারণ উভয়েরই প্রথম লক্ষ্য ছিল বিপ্লবকে ধ্বংস করা।

শৃঙ্খলা কিভাবে ফেরানো হবে তা নিয়ে কেরেনস্কী আর কর্নিলভের মধ্যে শলা-পরামর্শ হল। তাঁরা একমত হলেন যে সেনাবাহিনীতে মৃত্যুদন্ড ফিরিয়ে আনতে হবে, সেনা কমিটিদের ভিঙ্গে দিতে হবে, এবং পেত্রোগ্রাদে সামরিক আইন আনতে হবে।  

বিপ্লবী রাজধানীর দিকে সৈন্যরা যেতে শুরু করল ২৫সে অগাস্ট, আর, দুদিন পরে, কর্নিলভ রিপোর্ত করলেন যে তৃতীয় কোর সেই সন্ধ্যার মধ্যে রাজধানীর কাছে পৌঁছে যাবে। তিনি এইবার কেরেনস্কীকে সামরিক আইন জারী করতে বললেন।

ঐ একই দিনে, মেনশেভিকরা প্রস্তাব করলেন, প্রতিবিপ্লবের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষা কমিটি গড়া হোক। সুখানভ মন্তব্য করেছেন, “যদি এই কমিটি সত্যিই কাজ করতে চায়, তাহলে সেরকম রশদ ছিল শুধু বলশেভিকদের কাছে”।

বিপ্লবের সমর্থনে বেরিয়ে এলেন চল্লিশ হাজার পর্যন্ত লাল রক্ষীবাহিনীর স্বেচ্ছাসেবক। জঙ্গী ধাতুশ্রমিকেরা ষোল ঘন্টা করে কাজ করে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে একশ’ কামান বানালেন। মনে হচ্ছিল বিপ্লবী রাশিয়া  প্রকাশ্য গৃহযুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে। কিন্তু সামরিক দ্বন্দ্বটা ঘটল না। কর্নিলভ থেকে গিয়েছিলেন তার হেডকোয়ার্টার মগিলেভে। কসাকদের এবং ককেশিয় নেটিভ ক্যাভালরী ডিভিশন (যা স্যাভেজ ডিভিশন বা হিংস্র ডিভিশন নামে সমধিক খ্যাত ছিল) নিয়ে এগিয়ে গেলেন জেনারাল আলেক্সান্দর ক্রাইমভ। ইতিমধ্যে সোভিয়েত বিপ্লবী রেল শ্রমিকদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁরা ত্রেন চলাচল ব্যাহত করলেন, এবং আশিটা স্বতন্ত্র জায়গায় ক্রাইমভের সৈন্যদের ছড়িয়ে দিলেন। সোভিয়েতের প্রচারকরা স্যাভেজ ডিভিশনের মধ্যে প্রচারে নেমে পড়লেন, এবং শেষে দেখা গেল, যে সৈন্যদের উপর নির্দেশ ছিল বিপ্লবকে দমন করার, তাঁরাই লালঝান্ডা তুললেন “জমি আর স্বাধীনতা”র দাবীতে।

পেত্রোগ্রাদে, এক নকল বলশেভিক অভ্যুত্থান দেখিয়ে তার জবাবে দুহাজার সমর্থক সাড়া দেবে, এমন প্রত্যাহা ছিল। কিন্তু কসাক নেতা আলেক্সান্দ্র ডুটভ অভিযোগ করলেন, “আমি লোকজনকে রাস্তায় নামতে ডাকলাম, কিন্তু কেউ আমার পিছনে এল না”।

পেত্রোগ্রাদ থেকে জেনারাল খ্রিস্টোফর বারানভস্কি মগিলেভে জেনারাল আলেক্সিয়েভকে পীড়াপীড়ি করলেনঃ  “সোভিয়েতরা ফুঁসছে। পরিস্থিতি হাল্কা করার জন্য চাই ক্ষমতা প্রদর্শন। কর্নিলভকে গ্রেপ্তার করুন”। আলেক্সিয়েভ জবাব দিলেন, “আমরা একেবারেই সোভিয়েতের নাছোড়বান্দা খপ্পরে পড়েছি”।

মধ্যবর্তী অবস্থানের পতনঃ

৩০শে অগাস্টের মধ্যে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের স্পষ্টতই অবসান ঘটেছিল। ক্যাডেট পার্টিও তার সঙ্গে পরাস্ত হল। তাঁদের সংবাদপত্র ঘোষণা করেছিল, “কর্নিলভের লক্ষ্য আমাদেরও লক্ষ্য, কারণ আমরা মনে করি দেশের উন্নতির জন্য ঐ কাজগুলি করা জরুরী ... কর্নিলভের অনেক আগেই আমরা এই পন্থার হয়ে কথা বলেছিলাম”।

১ সেপ্টেম্বর, সেরেতেলিতার প্রাক্তন মিত্রদের পক্ষে কথা বলতে চেষ্টা করেন। মিলিউকভের প্রস্তাব ছিল, জেনারাল আলেক্সিয়েভকে একনায়ক করা হোক, কারণ তিনি আশা করেছিলেন এতে কেরেনস্কী এবং কর্নিলভ দুজনেই খুশী হবেন। সেই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে সেরেতেলি বললেন, “অন্তত তাঁদের [ক্যাডেট দলের] প্রামাণ্য ব্যক্তিত্বরা বিপ্লবের পক্ষে ছিলেন।  

মেনশেভিকরা এবং এস আররা, দুই দলই তাঁদের উদারপন্থী মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করার পর, সপ্তাহ দুয়েক বাদেই পিছু হঠলেন।  ইতিমধ্যে সোভিয়েত, এবং সাধারণ মানুষ, জানতে পারলেন যে কেরেনস্কী কর্নিলভের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জনগণের পরিষদ ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। বামপন্থী এস আর পত্রিকা ঝনামিয়া ত্রুডা সজোরে জানালঃ  “এটা [কর্নিলভের অভ্যুত্থান] অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ছিল না, ছিল তার সঙ্গে পরামর্শ করে গণতান্ত্রিক সংগঠনদের বিরুদ্ধে  চক্রান্ত”।

মেনশেভিকরা এবং দক্ষিণপন্থী এস আররা ব্যাকুলভাবে আঁকড়ে থাকলেন চূড়ান্ত নিন্দিত কেরেনস্কী সরকারকে, এবং শেষ অবধি তার দাম তাঁদের দিতে হল। সেপ্টেম্বরের গোড়ায়, এস আরদের পেত্রোগ্রাদ সম্মেলনে বামপন্থী এস আররা প্রাধান্য পেয়েছিলেন। মেনশেভিকদের গোটা ভাসিলেভস্কি জেলা বলশেভিক দলে যোগ দিল। যে সব ফ্যাক্টরী একদা মেনশেভিক ঘাঁটি ছিল তারা সোভিয়েত থেকে তাদের প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে আনল ও বলশেভিকদের পাঠাল। অন্যান্য ফ্যাক্টরিতে প্রাক্তন প্রতিনিধিরা তাঁদের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইলেন এবং এমন কি কেরেনস্কীর ছবি ছিঁড়ে ফেললেন।

পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্ণায়ক লড়াই হল ৯ই সেপ্টেম্বর সভাপতিমন্ডলী নির্বাচনের সময়ে। কয়কদিন আগে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও তার প্রথম বক্তৃতায় ট্রটস্কী শ্রতাদের মনে করিয়ে দিলেন, “ওরা যখন সভাপতিমন্ডলীর রাজনৈতিক দিশার প্রতি সম্মতি জানাতে বলেন, ভুলে যাবেন না যে আপনারা তখন কেরেনস্কীর নীতিকে মদত দেবেন”।

ট্রটস্কী পরে লিখেছিলেন, “সকলেই বুঝেছিলেন যে তাঁরা ক্ষমতার প্রশ্ন, যুদ্ধের প্রশ্ন, বিপ্লবের ভবিষ্যতের প্রশ্ন স্থির করছেন”। এক এক জনকে নামে ডেকে ভোটের বদলে স্থির হয়, যারা সভাপতিমন্ডলীর ইস্তফা গ্রহণ করবেন, তাঁরা যেন হলঘরটা ছেড়ে বেরিয়ে যান।

শ্রমিক ও সৈনিকরা দরজার দিকে যেতে থাকেন চীৎকারের মধ্যে – একদল বলেঃ কর্নিলভপন্থী, অন্যদল চেঁচায়ঃ জুলাইয়ের বীর। চূড়ান্ত ভোট হয়, মেনশেভিক এস-আর সভাপতিমন্ডলী এবং জোট সরকারের পক্ষে ৪১৪ ভোট; বিপক্ষে ৫১৯ ভোট; এবং ভোটদানে বিরত ৬৭।

সেরেতেলি নিজের এবং অন্যান্য প্রাক্তন নেতাদের পিঠ চাপড়ে বললেন যে তাঁরা সচেতন, বছরের অর্ধেকটা সময় ধরে তাঁরা বিপ্লবের পতাকা ঊর্ধে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। ট্রটস্কী উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া নেতাদের মনে করিয়ে দিলেন, বলশেভিকদের বিরুদ্ধে জার্মান সেনাবাহিনীর সেবাদাস হওয়ার অভিযোগ তুলে নেওয়া হয় নি। সোভিয়েত প্রস্তাব গ্রহণ করল, “এই কুৎসার স্রষ্টা, প্রচারকর্তা এবং মদত দাতাদের  ঘৃনার সঙ্গে চিহ্নিত করা হবে”। ক্যাডেট দল এবং কেরেনস্কী উভয়েই কুখ্যাত হয়ে পড়ায় লেনিন অল্পদিনের জন্য সোভিয়েত নেতৃত্বের সঙ্গে সহযোগিতার কথা বললেন। সোভিয়েত নেতৃত্ব যদি ক্ষমতা হাতে নেয়, তাহলে বলশেভিকরা বিরোধী পক্ষ হিসেবে নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে থাকবেন। কিন্তু আপোসপন্থী সমাজতন্ত্রীরা যখন কেরেনস্কী র জোটকে সমর্থন করা বন্ধ করলেন না, যে জোটে ছিল ক্যাডেটরাও, এবং বলশেভিকরা যখন পেত্রোগ্রাদ, মস্কো ও অন্যান্য সোভিয়েতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেন, তখন লেনিন “সোভিয়েতের হাতে সব ক্ষমতা” স্লোগানে ফিরে গেলেন। পরবর্তী ছয় সপ্তাহ ধরে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিকে দ্রুত অভ্যুত্থান ঘটানোর দাবী তুলে বিদ্ধ করতে থাকলেন।

সোভিয়েতের হাতে সব ক্ষমতা

১০ই অক্টোবর “সশস্ত্র অভ্যুত্থানের” পক্ষে বিখ্যাত প্রস্তাব গ্রহণের পরেও, বলশেভিক নেতাদের মধ্যে দোনামনা ছিল। কেউ লেউ এমনকি বিপ্লবী রণনীতির পায়ের তলা থেকে জমি সরিয়ে নিতে গেলেন। যখন কামেনেভ এবং গ্রিগরী জিনোভিয়েভ ১৮ই অক্টোবর নোভায়া ঝিঝন-এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে তাঁদের যুক্তি প্রকাশ করলেন, তখন লেনিনের ধৈর্যচ্যুতি হল। তিনি দাবী করলেন, “ধর্মঘট বিরোধীদের লাথি মেরে” পার্টি থেকে বার করে দেওয়া উচিত।  

গণ সমর্থন বাড়ানোর জন্য, নেতারা স্থির করলেন যে অভ্যুত্থান সংগঠিত করবে বলশেভিক পার্টি নয়, পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের একটি সংস্থা। ১৬ অক্টোবর ইতিমধ্যে বিপ্লবীদের নিয়ন্ত্রনাধীন পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের কার্যনির্বাহী কমিটি  রাজধানী রক্ষার জন্য সামরিক বিপ্লবী কমিটি গঠনের ঘোষণা করল।

সৈনিকদের উপর কর্তৃত্বের লড়াইয়ে কমিটি পেত্রোগ্রাদ সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে জানাল, এখন থেকে “আমরা যে নির্দেশ স্বাক্ষর করিনি সেগুলি অবৈধ”। জেনারালরা এই কথা মানতে অস্বীকার করলেন। পরদিন কমিটি ঘোষণা করল যে সোভিয়েতের কথা অমান্য করে সামরিক সদর দপ্তর সরাসরিভাবে প্রতিবিপ্লবের হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়েছে।

দ্বিতীয় সারা রাশিয়া সোভিয়েত কংগ্রেসের আগের কটা দিনে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সভাগুলিতে বহু নবাগত সৈনিক দাবী করতে থাকেন, যে সোভিয়েত যেন ক্ষমতা দখল করে। মেনশেভিকরা বারে বারে বলতে থাকেন, অভ্যুত্থান হলে রক্তের নদী বইবে।  

যখন ইভা ব্রোইডো প্রশ্ন করলেন, সামরিক বিপ্লবী কমিটি অভ্যুত্থান সংগঠিত করছে কি না, ট্রটস্কী পাল্টা প্রশ্ন করেন, “ব্রোইডো কার নামে প্রশ্নটা করছেন – সে কি কেরেনস্কীর নামে, সামরিক গুপ্তচর বিভাগের নামে, গোপন পুলিশের নামে, না ঐ রকম অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে”? বস্তুত, মেনশেভিকরা নিজেরাও তো আর  নিজেদের সামরিক পরিকল্পনা আগে থেকে ঘোষণা করেন নি। ২৩শে অক্টোবরের এক সভায়, মস্কোর সোভিয়েত নেতা লোমোভ রিপোর্ট দেন যে কসাক সৈনিকরা কালুগা সোভিয়েতকে ভেঙ্গে দিয়েছে। মেনশেভিক ও এস আর পরিচালিত নগর দুমা সৈন্য চেয়েছিল, এবং সেই ফৌজ সোভিয়েত নেতাদের উপর হিংসা প্রয়োগ করেছে।

সেই রাতেই ট্রটস্কী বলেন, সামরিক বিপ্লবী কমিটি গঠন  ছিল ক্ষমতা দখলের এবং সোভিয়েতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দিকে একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। কিন্তু ২৪শে অক্টোবর পর্যন্ত তিনি অস্বীকার করেন যে সেই পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই করা হচ্ছে।

পরদিন, সাধারণ সভায়, এক আপ্লুত শ্রোতৃমন্ডলীর কাছে ট্রটস্কী জানালেন যে “অস্থায়ী সরকার আর নেই। ... বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে আমি দ্বিতীয় কোনো নজীর জানিনা , যেখানে এত বিপুল সংখ্যক জনগণ জড়িত ছিলেন অথচ যা এত রক্তপাতহীনভাবে ঘটেছে”।

লেনিনের বিরোধীরা, এমনকি তাঁর নিজের দলেও তাঁর সমালোচকরা, অনেকে মনে করেছিলেন যে নতুন সোভিয়েত সরকার বড়জোর কয়েক সপ্তাহ টিঁকবে। কিন্তু লেনিন স্থির বিশ্বাস করেছিলেন যে এই তৃতীয় রুশ বিপ্লব সমাজতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত করবে। লেনিন মনে করেছিলেন, “আমরা এই কাজে সাহায্য পাব বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের, যা ইতিমধ্যেই দানা বাধছে ইতালীতে, ব্রিটেনে এবং জার্মানীতে”।

মেনশেভিক এবং দক্ষিণপন্থী এস আরদের রণনীতি, অর্থাৎ ধনতন্ত্রের সঙ্গে আপোস করা, ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছিল। শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের এক চরম মুহুর্তে মেনশেভিকদের বড় অংশ এবং দক্ষিণপন্থী এস আররা সোভিয়েত কংগ্রেস ত্যাগ করে হাত মেলালেন পুরিশকেভিচ সহ সবরকম সমাজতন্ত্র বিরোধীদের সঙ্গে।  

অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষে কমিউনিস্ট বিদ্বেষীরা আবার বলশেভিকদের বিজয়কে দেখাতে চাইবে সংখ্যালঘু ষড়যন্ত্র হিসেবে। এই মিথ্যা গল্প বলশেভিকরা মাসের পর মাস লড়াই করে কীভাবে গণতান্ত্রিক সমর্থন আদায় করেছিলেন তাকে অগ্রাহ্য করে।