Socialist and Peoples' History

বিপ্লবী গণতন্ত্রঃ ১৯১৭তে ও তারপর

 

পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সাধারণ সভা -- ১৯১৭

 সোমা মারিক

প্রায় এক শতাব্দী ধরে, উদারপন্থীরা, রক্ষণশীলরা, এমনকি বহুলাংশে নরমপন্থী বামপন্থীরা একমত, যে রুশ বিপ্লব ছিল অগণতান্ত্রিক। উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে বাড়তে না দিয়ে, বলশেভিকরা দ্রুত গণতন্ত্র ধ্বংস করতে এগোলেন। কিন্তু সমগ্র ১৯১৭ জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্র ঠিক কতটা গণতান্ত্রিক ছিল? সত্যিই কী কোনো বিকল্প বিপ্লবী গণতন্ত্র ছিল না, যা বিন্যস্ত ছিল সোভিয়েত, ফ্যাক্টরী কমিটি, কৃষকদের জমি কমিটি ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে?

ফেব্রুয়ারী বিপ্লবে উদারনীতিবিদরা এবং বিপ্লবী গণতন্ত্রঃ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছিল, উদারনৈতিক রাজনীতিবিদরা তখন যে কোনো রকম বিপ্লব এড়াতে উদগ্রীব ছিলেন। যখন ফেব্রুয়ারী বিপ্লব শুরু হয়, তারা তখন জারের প্রতি অনুগত ছিলেন, এবং প্রধানমন্ত্রী গোলিৎসিন যখন ডুমা ভেঙ্গে দেওয়ার নির্দেশ সই করলেন, তারা তখনও আপত্তি জানান নি। উদারনৈতিক রাজনীতিবিদরা সবচেয়ে বেশীদূর যেতে রাজি হলেন, ডুমা সদস্যদের একটি বেসরকারী কমিটি তৈরী করে ঘতনাপ্রবাহের উপর নজর রাখতে। কিন্তু সেটাও ডুমার আনুষ্ঠানিক কমিটি নয়। যখন বোঝা গেল, জারের পতন অপ্রতিরোধ্য, তখনই এই বেসরকারী কমিটি নিজেকে অস্থায়ী সরকারে রূপান্তরিত করল। সুয়োশি হাসেগাওয়া প্রায় চার দশক আগে ব্যাখ্যা করেছিলেন, উদারপন্থীরা এক অসম্ভব নীতির পিছনে দৌড়েছিলেন, যা হল একদিকে এক অস্থায়ী সরকার তৈরী করা, আর অন্যদিকে সেই সরকারের ন্যায্যতা খোঁজা পুরোনো ব্যবস্থার আইনী ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মধ্যে। যদিও ডুমা ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল এবং তারা সেটা মেনেও নিয়েছিলেন, তবু তারা ভান করলেন, যেন অস্থায়ী সরকার যেটা বেরোলো সেটা ডুমা থেকে নিসৃত। জারের সঙ্গে ব্যবহারে তারা নিজেদের দেখালেন নোইরাজ্যের বিরুদ্ধে আইন-শৃংখলার রক্ষক হিসেবে। এমনকি তারা যখন দ্বিতীয় নিকোলাসের ইস্তফা দাবী করলেন, তখনও তাঁদের আশা ছিল, এর ফলে বিপ্লব ঠেকিয়ে দেওয়া যাবে।  

একবার প্রিন্স লভভের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার গঠিত হলে, এই সরকার যে কোনোরকম গণতন্ত্র আনতে উৎসাহী ছিল না, সেটা দ্রুত বোঝা গেল। ফরাসী বিপ্লবের অভিজ্ঞতার পর থেকে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল সত্ত্বর এক সংবিধান সভা ডাকা, যা নির্বাচিত হবে গণতান্ত্রিকভাবে। রুশ বিপ্লবে অস্থায়ী সরকার প্রচুর সময় কাটালো, সংবিধান সভা ডাকতে যতটা পারে দেরী করল। ৩রা মার্চ, অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল যে নির্বাচন হবে সার্বজনীন, গোপন, প্রত্যক্ষ এবং সমমানের ভোটের ভিত্তিতে। এ ছিল অবশ্যই অগ্রগতি, কারণ জারের যুগে ডুমা নির্বাচন হত পরোক্ষ, এবং শ্রেণী ভিত্তিক ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু পরের দিনই, প্রধান উদারনৈতিক দল ক্যাডেট দলের নেতা পাভেল মিলিউকভ ফরাসী রাষ্ট্রদূত প্যালিওলোগকে জানালেন, তিনি ভোটের নির্দিষ্ট তারেইখ ঘোষণা এড়াতে চেষ্টা করছেন। ১৯০৫-এর বিপ্লবের সময় থেকে রাশিয়াতে একটা শক্তিশালী নারীবাদী আন্দোলন ছিল, এবং তাদের অন্যতম বলিষ্ঠ দাবী ছিল মেয়েদের জন্য ভোটের অধিকার। নারীবাদীরা সংকিত ছিলেওন, কাওরণ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, “সার্বজনীনকথাটা মেয়েদের নিয়ে নেয় কি না সেটা অস্পষ্ট। ১১ই মার্চ, অস্থায়ী সরকারের একমাত্র সমাজতন্ত্রী সদস্য, আলেক্সান্দর কেরেনস্কী, ঘোষণা করলেন যে মেয়েদের জন্য ভোটের অধিকারকে অপেক্ষা করতে হবে সংবিধান সভা বসা পর্যন্ত। সরকারের এই বিরোধিতার জবাবে, নারীবাদীরা ১৯শে মার্চ এক বিশাল মিছিল সংগঠিত করলেন, যার দাবী ছিল মেয়েদের জন্য ভোট, এবং যাতে আসেন ৪০,০০০ মেয়ে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক মেয়েরাও এদের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু মিছিলের নেতৃত্ব বলশেভিক নেত্রী আলেক্সান্দ্রা কোলোন্তাই বক্তৃতা দিতে গেলে তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেন। অস্থায়ী সরকার বলার চেষ্টা করল যে মেয়েদের ভোট দিতে হলে নির্বাচনের দেরী হবে। নারীবাদীরা তখন প্রথমে সোভিয়েতের নরমপন্থী সমাজতন্ত্রী নেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করেন। তবে তারা সমর্থন পেলেন। তবু, আইন পালটে মেয়েদের ভোটের অধিকার স্বীকৃত হল ২০ জুলায়। ইতিমধ্যে, উদারপন্থীরা একজন দক্ষিণপন্থী সেনাপতির সঙ্গে সামরিক অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছেন, তাই এই পদক্ষেপ তাদের দিক থেকে কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ ছিল না।  

সংবিধান সভা ডাকার গোটা প্রক্রিয়াটা একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, গণতন্ত্রের প্রতি কতটা বাস্তব অবহেলা ছিল।  শুধু নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নাম ঘোষণা করতেই তিন সপ্তাহ লাগল। কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে সেটা স্থির করতে লাগল দুমাস। নানা তর্ক হল ভোটের বয়াস ১৮, না ২০, না ২১? যারা সেনাবাহিনী ছেড়ে পালিয়েছে (সংখ্যা বহু লাখ) তাদের কী ভোট থাকবে? রোমানভ পরিবারের ( জারের পরিবারের) কী ভোট থাকবে (সংখ্যা ৪৭)। মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোট পিছিয়ে দেওয়া। অবশেষে, জুন মাসে, বলশেভিকরা প্রথম সোভিয়েত কংগ্রেসের সময়ে সোভিয়্বেতের হাতে সব ক্ষমতার দাবীতে মিছিল ডাকতে চাইলে, এবং রাজধানী পেত্রোগ্রাদে তাদের শক্তি প্রবল বুঝে, চাবুকের আঘাতে অস্থায়ী সরকার কাজ করতে বাধ্য হল। ১৪ই জুন ঘোষণা করা হল, ১৭ই সেপ্টেম্বর ভোট হবে। কিন্তু জুলাইয়ের গোড়ায় উদারপন্থীরা প্রায় সকলে অস্থায়ী সরকার থেকে ইস্তফা দিলেন। নতুন করে জোট সরকার নিয়ে আলোচনা হলে তারা দাবী করলেন, ভোটের তারিখ পিছিয়ে দিতে হবে ১২ই নভেম্বর অবধি। আর একই সঙ্গে তারা জড়িয়ে পড়লেন জেনারাল কর্নিলভের ষড়যন্ত্রে। সেটা সফল হলে অবশ্যই কোনো ভোট হত না।

শ্রেণীগত স্ব-সংগঠন: সোভিয়েতগুলি

১৯০৫ সালে, সোভিয়েত তৈরী হয়েছিল তলা থেকে, দলীয় অবস্থান অগ্রাহ্য করে শ্রমিকদের উদ্যোগে। তারা তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করেছিলেন,  এবং যে কোনো দলীয় নেতা, শ্রমিক না হলে, মত দিতে পারতেন কিন্তু তাদের ভোট ছিল না। ফেব্রুয়ারী ১৯১৭তে সোভিয়েতের ডাক আসে দুদিক থেকে। জংগী শ্রমিক তথা বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরা, বিশেষ করে দুটি গোষ্ঠী, বলশেভিক দলের ভাইবর্গ জেলা কমিটি, এবং রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক দল আন্তর্জাতিকতাবাদী নামের একটি সংগঠন, যারা মেঝরাইয়নকা (ব্যক্তি সদস্য হলে মেঝরাইয়নেৎস, বহুবচনে মেঝরাইয়ন্তসি) নামে পরিচিত ছিলেন, এরা প্রথম সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন এবং এরাই প্রথম সোভিয়েত গঠনের ডাক দেন, কারণ এরা সোভিয়েতকেই দেখেছিলেন অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার হিসেবে। অন্যদিকে, মেনশেভিক্রা উদ্যোগ নিলেন প্রথমে সোভিয়েতের কার্যনির্বাহক কমিটি প্রতিষ্ঠা করার, যেখানে তারা ১৯০৫-এর ত্রুটি শুধরে নিলেন, এবং প্রথমে তাতে নেতাদের ঢুকিয়ে তবে প্রতিনিধি নির্বাচনের ডাক দেন।

কিন্তু যেখানে উদারপন্থীরা এবং নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা উভয়েই মনে করেছিলেন যে শ্রমিক এবং সৈনিকরা কার্যনির্বাহক কমিটির নেতৃত্ব মেনে চলবেন, বাস্তবে ততটা একপেশেভাবে ঘটনা ঘটে নি। মেনশেভিক আন্তর্জাতিকতাবাদী নেতা সুখানভ তার স্মৃতিচারণে চার বছর পরে লিখেছিলেন যে, মেনশেভিকদের রাজনৈতিক বীজগণিত অনুসারে, জারের সরকারের পর যে সরকার আসবে তাকে হতে হবে পুরোপুরি এক বুর্জোয়া সরকার। এখানেই শ্রমিক ও সৈনিকরা দ্বিমত হলেন। তাদের মতে, যে বিপ্লব তাদের স্বার্থ দেখবে না, সেটা আদৌ কোনো বিপ্লব নয়। তারা দাবী পেশ করা শুরু করলেন।

কার্যনির্বাহক কমিটির নেতারা যখন উদারপন্থীদের কাছে আবেদন করছিলেন যে তারা যেন ক্ষমতা হাতে তুলে নেন, এবং তার বিনিময়ে শুধু কিছু মোলায়েম দাবী করছিলেন, সেই সময়ে সৈন্যরা দাবী করছিলেন যে সামন্ততান্ত্রিক সামরিক জীবনের অবসান ঘটাতে হবে, এবং তারাই কার্যত মেনশেভিক বুদ্ধিজীবী স্কোবেলেভকে ১ নং নির্দেশ বলে খ্যাত সোভিয়েতের নির্দেশের বয়ান বলে দেন। এতে বলা হল যে সমস্ত সামরিক ইউনিটে সৈন্যদের নির্বাচিত সৈনিক কমিটি থাকবে, সোভিয়েতে সৈনিকরা নির্বাচিত প্রতিনিধি পাঠাবে, রাজনৈতিক বিষয়ে সরকারের হুকুম নয়, সোভিয়েতের মত মেনে চলবে, ডিউটি থাকলে সামরিক শৃংখলা মেনে চলবে কিন্তু সৈনিকদের জন্যও নাগরিক অধিকার থাকবে, সেনাবাহিনীতে সব সামন্ততান্ত্রিক প্রথা দূর করা হবে এবং অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে সৈনিকদের কমিটিগুলির।

অস্থায়ী সরকার যখন নগর ডুমা ধাচের সংস্থাগুলিতে প্রাণসঞ্চারের চেষ্টা করছিল,  যেগুলিতে সব শ্রেণীর মাস্নুষ নাগরিক হিসেবে ভোটদাতা হলেন, সেখানে কার্যত মুখ্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা দিল সোভিয়েতগুলি। সোভিয়েতরা এমনকি স্থানীয় স্তরেও যেভাবে কাজ করছিল, তার অর্থ হল, অক্টোবরের আগেই, দেশের ক্রমবর্দ্ধমান অংশে নগর ডুমা বা গ্রামীণ জেমস্টভোদের হাত থেকে স্থানীয় স্বায়ত্বশাসনের দায়ভার নিয়ে নিচ্ছিল সোভিয়েতরা। এবং তারা আমলাতন্ত্রকেও তাদের তত্ত্বাবধানে আনছিল। মস্কো, ইয়ারোস্লাভ, কাজান, নিকোলায়েভ, রস্টভ-অন-ডন সহ বিভিন্ন শহরে নগর সোভিয়েতগুলির নীচে স্থানীয় সোভিয়েত গড়ে উঠছিল। নগর সোভিয়েতের কাছ থেকে সামরিক নিরাপত্তা পেয়ে তারা স্থানীয় নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে থাকে। তৈরী হয় ফ্যাক্টরী কমিটি, ট্রেড ইউনিয়ন, নানা নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানে অন্য নানা কমিটি, এবং স্থানীয় মিলিশিয়া।

বড় শহরগুলির সোভিয়েতদের সঙ্গে গ্রামীণ সংগঠনদের যোগাযোগের ভিত্তিতে খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ শুরু হল। ৫ই মার্চ, পেত্রোগ্রাদের শ্রমিকরা জানতে পারলেন যে ১৮০ ট্রাক খাদ্যশস্য যাচ্ছে ব্যক্তিগত ক্রেতার কাছে। পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের খাদ্য কমিশন ঐ ট্রাকগুলি দখল করে এবং উত্তর ফ্রন্টের সৈন্যদের কাছে পাঠায়, কারণ খবর এসেছিল, ঐ ফ্রন্টে আর মাত্র একদিনের খাদ্য মজুত আছে।  

ক্রাসনোয়ারস্ক সোভিয়েতের কার্যনির্বাহক কমিটি সাইবেরিয় রেলপথ ধরে টেলিগ্রাম পাঠালো, ফাটকাবাজীর জন্য খাদ্য সরবরাহ যেন বন্ধ করা হয়। মে ১৯১৭তে মস্কো সোভিয়েতের ডাকে ৩৩৩ জন প্রতিনিধি জমায়েত হন, সারা রাশিয়া খাদ্য কংগ্রেসে। সোভিয়েত ইতিহাসবিদ আন্দ্রিয়েভ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে এরকম ব্যাপক তথ্য হাজির করেন। গ্রামাঞ্চলে সভিয়েত একটু দেরীতে আসে। কিন্তু ১৯১৭-র জুলাইয়ের শেষের মধ্যে, ৭৮টি গুবার্নিয়ার মধ্যে ৫২টি তে গুবার্নিয়া স্তরের কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত গড়ে উঠেছিল। আরো নীচের স্তরে, ৮১৩টি উয়েঝদের মধ্যে ৩৭১টিতে ইতিমধ্যে কৃষক সোভিয়েত সৃষ্ট হয়েছিল।

শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ

১৯১৭-র মার্চ থেকে শুরু করে আট ঘন্টার শ্রম দিবসের লড়াই ফ্যাক্টরীতে, এবং শিল্প স্তরে, পৌর স্তরে ও জাতীয় স্তরে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ফ্যাক্টরী শ্রমিকরা চেয়েছিলেন বেশী গণতান্ত্রিক কাজের পরিবেশ, কম শোষণ এবং আবশ্যক অধিকারসমূহ।  এই দবীগুলির সংঘাত হল মুনাফার জন্য পুঁজির চাহিদা এবং যুদ্ধের প্রয়াসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারী আকাংখ্যার সঙ্গে। এই লড়াই থেকে শ্রমিকরস বুঝলেন, তাঁদের এক নতুন ব্যবস্থার দরকার কেবল সরকারী স্তরে নয়, কর্মক্ষেত্রেও।   

তাঁরা শুরু করলেন ফ্যাক্টরী কমিটি নির্বাচন করে। এগুলির দায়-দায়িত্ব এবং উদ্দেশ্য ছিল নানা জায়গায় নানা রকম। স্টিভ স্মিথ এবং ডেভিড ম্যান্ডেলের গবেষণা এই সংগঠনগুলির উপর আলোকপাত করে। এর মধ্যে স্মিথের রেড পেত্রোগ্রাদ  অপেক্ষাকৃতভাবে বলশেভিকদের প্রতি সমালোচনামূলক, আর ম্যান্ডেলের দ্য পেত্রোগ্রাদ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড দ্য ফল অফ দ্য ওল্ড রেজিম এবং দ্য পেত্রোগ্রাদ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড দ্য সোভিয়েত সেজার অফ পাওয়ার অনেক বেশী সহানুভূতিশীল।

ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের আগে কোনো সমাজতন্ত্রী দলেরই কর্মসূচীতে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ দেখা দেয় নি। এমনকি বলশেভিকরা, যারা লেনিন দেশে ফেরার পরও অনেকটা বাঁয়ে সরেছিলেন বিশেষ  করে কামেনেভ ও স্তালিন প্রস্তাবিত অস্থায়ী সরকারের প্রতি শর্তাধীন সমর্থনের নীতি থেকে তারাও কিন্তু অস্পষ্ট ছিলেন, যে ক্ষমতা কখন সোভিয়েতদের দিকে সরবে। এপ্রিল থিসিসে লেনিন উল্লেখ করেন যে লক্ষ্য হল সামাজিক উৎপাদন ও বন্টনকে শ্রমিকদের প্রতিনিধিদের সোভিয়েতের কন্ট্রোলে আনা। কারমেন সিরিয়ানি থেকে ম্যান্ডেল, বহু লেখক দেখিয়েছেন যে রুশ ভাষায় controlশব্দটির অর্থ ইংরেজী থেকে স্বতন্ত্র। রুশ শব্দের অর্থ তদারকী, পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়। কিন্তু বাস্তব সমস্যা শ্রমিকদের ঠেলে এগিয়ে দিল। অন্যতম প্রথম আহবান ছিল ফ্যাক্টরীগুলিতে গণতান্ত্রিক বা সাংবিধানিক প্রশাসন চালু করার। কিন্তু দ্রুত পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। বুর্জোয়া শ্রেণী আটঘন্টা শ্রমদিবসের দাবীর বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াই শুরু করে। পুঁজিপতিরা প্রচার শুরু করল, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকরা মারা যাচ্ছেন, অথচ শ্রমিকরা স্বার্থপর দাবী করছে। এইভাবে তারা শ্রমিক-সৈনিক সংহতিতে ফাটল ধরাতে চাইল।

প্রচারটা কিন্তু মালিকদের বিরুদ্ধেই চলে গেল। নানা তর্কের মাঝে, শ্রমিকরা প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলিকেই প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। কিছু ফ্যাক্টরী মালিক দাবী করছিল যে পুরোদমে উৎপাদন হচ্ছে না, কারণ সরবরাহ বন্ধ। ফ্যাক্টরী কমিটিগুলি দাবী করল, যে এই ধরণের সত্যাসত্য যাচাই করার ক্ষমতা তাঁদের দিতে হবে। এইভাবে শ্রমিকদের শক্তি গঠিত হতে থাকল। মে মাসের মধ্যে এমন কি দক্ষিণপন্থী মেনশেভিকরাও সন্দেহ করছিলেন যে ধনিকশ্রেণী গোপন লক আউটের দিকে এগোচ্ছে। ১৯০৫ সালে মালিকদের সম্মিলিত পুঁজি ধর্মঘটের ফলেই আটঘন্টার লড়াই হেরে গিয়েছিল, যেটা শ্রমিকদের স্মৃতিতে তখনও ভীষণভাবে জীবিত ছিল। 

মে-মাসের মাঝামাঝি, পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত  অর্থনীতিকে চাংগা করার জন্য একটা নেহাতই মোলায়েম নিয়ন্ত্রণ আনার প্রস্তাব গ্রহণ করল। এর জবাবে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী আলেক্সান্দার কোনোভালোভ ইস্তফা দিলেন, এবং সাবধান করে দিলেন যে অদূর ভবিষ্যতে শয়ে শয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। আরেক প্রধান শিল্পপতি, রিয়াবুশিনস্কি, ব্যাখ্যা করলেন যে অর্থনীতির উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ রাষ্ট্র ছিল সোভিয়েতের নিয়ন্ত্রণাধীন। 

এই আক্রমণগুলির মোকাবিলা করতে পেত্রোগ্রাদের শ্রমিকরা শহরজোড়া ফ্যাক্টরী কমিটিদের একটি সম্মেলন ডাকলেন। ১লা জুন এই সম্মেলন সোভিয়েতদের হাতে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তুলে দিতে আহবান করে বলশেভিকদের আনা একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিল। ফ্যাক্টরী কমিটিরা পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের শ্রমিক শাখাকে বাঁ দিকে ঠেলে দিল। ৩১শে মে, এই সংগঠনটি প্রস্তাব করল যে ক্রমবর্দ্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রকৃত সমাধান রয়েছে একই সঙ্গে তলা থেকে (ফ্যাক্টরী স্তরে) এবং উপর থেকে (রাষ্ট্রের মাধ্যমে) শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করাতে।

ফ্যাক্টরী কমিটিরা সংখ্যাতে এবং প্রভাবে বাড়তে থাকল, এবং ক্রমেই বেশী বামপন্থী হতে থাকল। জুন সম্মেলনে বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী কর্মী ভি এম লেভাইন বলেন, শ্রমিকদের সক্রিয় হতে হয়েছে, কারণ শিল্পপতিরা হয় নি। কিন্তু নৈরাষ্ট্রবাদীরা যখন তলা থেকে দখল নেওয়ার দাবী তুললেন, তখন বলশেভিকরাও তার বিরুদ্ধে ছিলেন। একজন বলশেভিক প্রতিনিধি ব্যাখ্যা করেনঃ

কন্ট্রোল মানে সমাজতন্ত্র নয়...। আমাদের হাতে কন্ট্রোল তুলে নিলে আমরা হাতে কলমে শিখব, উৎপাদনের কাজ কীভাবে করতে হয়, এবং সেটাকে সংগঠিতভাবে নিয়ে যাব সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনের অভিমূখে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে, ফ্যাক্টরী কমিটিরা প্রশাসনিক দায়িত্ব হাতে তুলে নেয় ফ্যাক্টরী চালু রাখার জন্য। এর ফলে বাম-ডান দুপক্ষের সংগেই তাঁদের দ্বন্দ্ব হয়। অক্টোবরে ফ্যাক্টরী কমিটিদের জাতীয় সম্মেলনে ডেভিড রিয়াজানভ মন্তব্য করেন যে ফ্যাক্টরী কমিটির একজন সদস্য  অনিচ্ছাকৃতভাবেই পরিণত হন বিনিয়োগকারীর চরে। এর আগের একটি সম্মেলনে লেনিন বলেছিলেন, ফ্যাক্টরী কমিটিরা হল ধনিক শ্রেণীর ফাই-ফরমাইশ খাটার লোক। এর জবাবে নিউ আর্সেনাল ফ্যাক্টরীর এক প্রতিনিধি বুঝিয়ে বলেন, যদি শ্রমিকরা কাঁচা মাল জোগাড় না করেন, তা হলে ফ্যাক্টরীগুলি বেশীদিন চালু থাকবে না।

এই মতভেদ, বিতর্ক, দেখিয়ে দেয়, বিপ্লবের ঐ বছরে গণতান্ত্রিক বৈচিত্রের মধ্যে কতটা প্রাণ ছিল। তৃণমূল স্তরের সংগঠনরা একজোট হত, নানা সমস্যা সমাধান করতে, এবং সেজন্য তারা যে সব পথ বেছে নিত তা সব সময়ে নেতাদের মনঃপূত হত না।

কৃষক ও গণতন্ত্রঃ

ট্রটস্কী তাঁর রুশ বিপ্লবের ইতিহাস গ্রন্থে, কৃষক সংগ্রামের গতিপ্রকৃতি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। লেনিন প্রত্যাশা করেছিলেন যে ক্ষেতমজুররা আলাদা হয়ে যাবেন এবং নিজেদের সোভিয়েত গড়বেন। বাস্তবে তা হল না। সামন্ততন্ত্র-বিরোধী লড়াই ক্ষেতমজুর, গ্রামীণ আধা-প্রলেতারীয়, এবং গরিব ও মাঝারি চাষীকে একজোট করল। ট্রটস্কী অনেক রকম প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যেমন শহরের স্তরে জমি ও খাদ্য কমিটিদের কার্যনির্বাহক কমিটিগুলি। আবার ছিল সোভিয়েতও। কিন্তু জমি ও খাদ্য কমিটিগুলি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছিল বলেই, গ্রামস্তরে কৃষকরা তাদের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে লড়াইয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারতেন, যদিও উপরের দিকে ঐ কমিটিগুলি দক্ষিণমুখী হচ্ছিল। আন্দ্রিয়েভের বিপরীতে, ট্রটস্কী প্রস্তাব করেন, যে কৃষকরা বেশ কিছুদিন সভিয়েত সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন,এবং তার কারণ হল সোভিয়েতদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। পরে, যখন সোভিয়েতরা তাদের রাজনৈতিক গতি পরিবর্তন করে, তখন সোভিয়েতের প্রতি কৃষকের দৃষ্টিভঙ্গীও পালটায়।

অক্টোবর ও তারপরঃ

কিন্তু যে সব উদারনৈতিক ইতিহাসবিদ ১৯১৭ সালে বিপ্লবী গণতন্ত্রের এই বিষ্ফোরণকে স্বীকারও করেন,  তারাও বলেন যে অক্টোবর ছিল এক সংখ্যালঘু , ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুথান, যা এই গণতন্ত্রের অবসান ঘটাল। বাস্তবটা অনেক বেশী জটিল। কোনো অভ্যুত্থানই গণভোটের মাধ্যমে সংঘটিত হয় না। কিন্তু বলশেভিকরা, বিশেষ করে রণক্ষেত্রে বাস্তব নেতৃত্ব ছিল যে দুজনের হাতে সেই ট্রটস্কী এবং সভের্দলভ, যে রণকৌশল অনুসরণ করেন তাতে সোভিয়েতদের, এবং সৈনিকদের কমিটিগুলিকে ব্যবহার করে সেনা ছাউনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার এবং বাকিদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দরকার ছিল। সেনাবাহিনী ছাড়া, শ্রমিক আন্দোলন নিজের মধ্য থেকে লালরক্ষী বাহিনী গড়তে চেয়েছিল। রেক্স ওয়েড দেখিয়েছেন, এ ছিল একটা শ্রেণীভিত্তিক লড়াই, এবং মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীরা খুব গোড়ার দিক থেকেই এটাকে অবিশ্বাস করতেন, ও বলশেভিক ফন্দী বলে দেখতেন। জুলাইয়ের দিনগুলির পরে লালরক্ষী বা শ্রমিক রক্ষীদের উপরে বলশেভিকদের প্রভাব কমে গিয়েছিল, কিন্তু কর্নিলভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে বলশেভিক মতাদর্শগত প্রাধান্য মজবুত হয়।   

হাল আমলে রুশ বিপ্লবের বহুলপঠিত দক্ষিণপন্থী ইতিহাসবিদদের মধ্যে অন্যতম হলেন ওর্ল্যান্ডো ফাইজেস। তিনি ছাত্রপাঠ্য কিছু অনলাইন লেখা লিখেছেন, যার মধ্যে একটির শিরোনাম হল লেনিন ও অক্টোবরের ক্যু। ফাইজেস জোর করেছেন, যে লেনিন তাঁর দলকে ক্যু দেতার দিকে যেতে জোর দিয়েছিলেন, কারণ ক্ষমতা দখলকে তিনি ঐ ভাবেই দেখতেন। ফাইজেস কিন্তু লেনিন ক্ষমতা দখলকে কীভাবে দেখতেন তার আদৌ কোনো প্রমাণ দেন নি। আর, তিনি একেবারেই দেখাতে তৈরি না, যে লেনিন প্রস্তাবিত রণনীতি, যা ছিল গোটা দেশ জুড়ে অভ্যুত্থান ঘটানো, আর কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের হয়ে ট্রটস্কী ও সভের্দলভের অনুসৃত নীতি, এক ছিল না।  

অক্টোবর বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল একটি সোভিয়েত প্রতিষ্ঠান সামরিক বিপ্লবী কমিটি। অভ্যুত্থানের পরে পরে চেষ্টা করা হল সর্বোচ্চ স্তর অবধি সোভিয়েত ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তোলার। সোভিয়েত কংগ্রেস জমি, শান্তি, সোভিয়েত ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে কয়েকটি মৌলিক ডিক্রী গ্রহণ করল। সেই সঙ্গে কংগ্রেস মার্তভের প্রস্তাব গ্রহণ করল, যে সব সমাজতন্ত্রী দলদের নিয়ে একটি সরকার গঠিত হোক। কিন্তু মেনশেভিকরা এবং দক্ষিণপন্থী ও মধ্যপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীরা, এমনকি শেষে মার্তভের নেতৃত্বাধীন মেনশেভিক আন্তর্জাতিকতাবাদীরাও, সেরকম কোনো সরকারে থাকতে অস্বীকার করলেন। বলশেভিকদের সঙ্গে তাঁদের সকলের বিভাজনরেখা ছিল, নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা সরকার সোভিয়েত কংগ্রেসের অধীনে থাকবে এবং তার সিদ্ধান্তগুলি মেনে নেবে, এই নীতি গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। 

সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী দলে ভাঙ্গন হয়েছিল অক্টোবর অভ্যুত্থানের সামান্য আগে। স্পিরিদনোভা, ক্যামকভ ও অন্যদের নেতৃত্বে গঠিত বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী দল সোভিয়েত কংগ্রেসের সিদ্ধান্তগুলিকে সমর্থন করেন, এবং নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত বিশেষ কৃষক প্রতিনিধি কংগ্রেস ও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নিয়মিত কৃষক কংগ্রেসে তাঁরাই ছিলেন প্রধান শক্তি। কয়েকও মাস ধরে তাঁরা সরকারে অংশগ্রহণ করেছিলেন, এবং সেখানে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের অভ্যাস, এই পর্যায়টিকে অগ্রাহ্য করা, যার ফলে বিপ্লবী গণতন্ত্র ক্ষমতায় থেকে কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল সেটাও দেখা হয় নি।

সোভিয়েত কংগ্রেস একটি সারা রাশিয়া সোভিয়েত কার্যনির্বাহী কমিটি বা VTsIK-র নির্বাচন করেছিল। VTsIK-র কার্যবিবরণী পড়লে বোঝা যায়, এর মধ্যে বাস্তবে নানা প্রসঙ্গে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছিল, এবং বলশেভিকরাও নানা মত পোষণ করতেন। VTsIK-র মধ্যে নতুন করে সব সমাজতন্ত্রীদের নিয়ে সরকার গড়ার প্রসঙ্গ ওঠে। ১ নভেম্বরের সভার কার্যবিবরণী থেকে দেখা যায়, এ নিয়ে সেদিন দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছিল। বলশেভিকরা অন্য দলেদের সরকারে রাখতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু এই শর্তে, যে তাঁরা সোভিয়েত কংগ্রেসকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে মেনে নেবেন, এবং সরকার VTsIK-র অধীনস্থ থাকবে। নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করে দেখিয়ে দিলেন, তাঁরা আসলে সোভিয়েত ক্ষমতাকেই মানতে রাজি ছিলেন না। কৃষক কংগ্রেসের পর, VTsIK-র কলেবর দ্বিগুণ করা হয়, সমান সংখ্যক কৃষক প্রতিনিধিকে এনে।

অন্য যে কারণে নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা বিঘ্নিত হল, তা হল তাঁদের দাবী, যে কোনো জোট সরকার হলে তা থেকে লেনিন এবং ট্রটস্কীকে বাদ রাখতে হবে। বলা হয়, এটা যে আলোচনা ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে পরিণত হল, তার জন্য দায়ী বলশেভিকদের, বা বিশেষভাবে তাঁদের লেনিনবাদী উপধারার একগুঁয়েমি। বরং আমাদের বুঝতে হবে, এটা দেখায় নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীদের একগুঁয়েমিকে। তাঁরা বুর্জোয়া উদারপন্থীদের সঙ্গে জোট বাঁধতে তৈরী ছিলেন, বা গৃহযুদ্ধের সময়ে জারতন্ত্রী জেনারালদের সঙ্গেও জোট বেঁধেছিলেন, অথচ বিশেষ করে সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীরা বিপ্লবী গণতন্ত্র মানতে প্রস্তুত ছিলেন না।  

তবু একটা দাবী বারে বারে ফিরে আসে, যে বলশেভিকরাই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছিলেন। গৃহযুদ্ধের ভূমিকা, সেই সময়ে বলশেভিকদের ত্রুটি, এবং বলশেভিক বিরোধীদের ভূমিকা,  অন্যত্র আলোচনা করতে হবে, কারণ সে এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের একটা কথার উপর জোর দিতে হবে। সেটা হল, অক্টোবরের পরেও সোভিয়েতগুলি প্রাণবন্ত ছিল। আর, একটা সামরিক শৃংখলাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল গোড়া থেকে সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চেয়েছিল, এই দাবীটা সম্পূর্ণ হাস্যকর। ১৯১৭-র ফেব্রুয়ারীতে বলশেভিকদের সংখ্যা ছিল মোটামুট ২৪,০০০। জুলাইয়ের মধ্যে তাঁরা কলেবরে বেড়েছিলেন মোটামুটি দশগুণ। অক্টোবরের মধ্যে সদস্যসংখ্যা হয়েছিল প্রায় ৪,০০,০০০। স্পষ্টতই, এঁরা সকলে তথাকথিত কট্টর লেনিনপন্থী”, (অর্থাৎ ইঙ্গিত করা হচ্ছে যে এঁরা লেনিনের অন্ধ আজ্ঞাবহ ছিলেন), এমন বলা যায় না। ১৯১৭-১৮ সালে অন্তত লেনিনের ধারণা, যে একটি শ্রমিক রাষ্ট্রে যে কোনো রাঁধুনিও প্রশাসন করতে পারবে, এটার অর্থ ছিল বাস্তবে বিশ্বাস করা, যে নতুন ধরণের রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসনপদ্ধতির সরলীকরণ ঘটবে।  

গৃহযুদ্ধের আগে, অর্থাৎ ১৯১৭-র শেষদিকে এবং ১৯১৮-র গোড়ায়, মোট জাতীয়করণের মাত্র ৫ শতাংশের সামান্য বেশী হয়েছিল গণকমিশার পরিষদ,VTsIK,  বা সর্ব্বোচ্চ অর্থনৈতিক পরিষদের উদ্যোগে। অধিকাংশ জাতীয়করণ করা হয়েছিল তলা থেকে, ফ্যাক্টরী কমিটিদের উদ্যোগে, শ্রেণী সংগ্রামের তাগিদে, পুঁজিপতিরা নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করলে।  এবং সোভিয়েত ধাঁচের প্রতিষ্ঠান বাড়তেই থাকে।  আলেক্সান্ডার রাবিনোউইচ দেখিয়েছেন যে পেত্রোগ্রাদে প্রথম নগর জেলা সোভিয়েত তার নিজের বিচার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, পুরোনো বিচারকদের হঠিয়ে। তাদের ছিল একটি তদন্ত কমিশন, একটি সমাজকল্যাণ কমিশন, একটি আইন কমিশন, একটি গৃহ কমিশন, একটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা কমিশন, এবং তাদের নিজস্ব প্রেস। মে-জুন মাসে তাঁরা একটি সম্মেলন করে, যেখানে ২০১জন ভোটসহ প্রতিনিধির মধ্যে ছিলেন ১৩৪ জন বলশেভিক, ১৩ জন বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী, ৩০ জন মেনশেভিক ও মেনশেভিক আন্তর্জাতিকতাবাদী, এবং ২৪ জন সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী। রাবিনোউইচ বলেছেন, এ ছিল গৃহযুদ্ধের সাড়া পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও জনগণের সঙ্গে অর্থবহ সংযোগ ফিরিয়ে আনার এক সৎ প্রয়াস। এই বিপ্লবী গণতন্ত্রের মৃত্যু কেন হল, তা বুঝতে হলে গৃহযুদ্ধের ভূমিকা অবহেলা করা যাবে না। কিন্তু যারা অক্টোবর ১৯১৭ থেকে স্তালিনবাদ পর্যন্ত একটি সরলরেখা টেনে দেন, তাঁরা অনিবার্য ভাবেই গৃহযুদ্ধকে হয় তাচ্ছিল্য করেন, অথবা একেবারে এড়িয়ে যান।