Socialist and Peoples' History

বাকু কমিউন

বাকু কমিউন 

রোনাল্ড সানি

অনুবাদ- প্রবুদ্ধ ঘোষ

সম্পাদনা – কুণাল চট্টোপাধ্যায়

 

 

বাকুর প্রাসাদের মসজিদ -- ১৯১০

বাকু কমিউনের নেতৃত্ব, যাঁরা গণতান্ত্রিকভাবে ও অহিংসভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন; তাঁদের কাহিনী রুশ বিপ্লব সম্পর্কে প্রচলিত বহু কাল্পনিক ব্যাখ্যাকে ভুল প্রমাণ করে

রুশ বিপ্লবের অধিকাংশ বিবরণ একটি শহরের গল্প বলে- পেত্রোগ্রাদ; যেখানে রোমানভ সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে এবং বলশেভিকরা ক্ষমতায় এসেছিলেন অক্টোবরে। রাজধানীতে শ্রমিক, মহিলা ও সৈনিকেরা নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছিলেন বটে, কিন্তু সমস্ত রাশিয়া জুড়ে বছরভর বিপ্লবী কার্যক্রম চালিয়ে গেছিলেন দেশের জনগণ।

দক্ষিণ-পূর্বে ১৫০০ মাইল দূরে, বাকুতে, জাতি, ধর্ম, শ্রেণি বিভক্ত জনগণ ইতিহাসের ধারা বদল করছিলেন এবং বিপ্লবী নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছিলেন। সেখানে তেলের ওপর তৈরি এক শহরে, অক্টোবর একটু দেরিতে এসেছিল

যখন এসেছিল, তখন “ককেশিয়ার লেনিন” স্তেপান শাহুমিয়ান চেষ্টা করেছিলেন জনগণের জন্যে গণতান্ত্রিকভাবে ও অহিংসভাবে ক্ষমতা দখল করতে।তিনি যে বাকু কমিউন নির্মাণ করেছিলেন, তার আখ্যান থেকে রুশ বিপ্লব ও তজ্জনিত গৃহযুদ্ধের বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিশা পাওয়া যায়।

 

তেলের শহর

দক্ষিণ ককেশাসের বৃহত্তম শহর বাকু তেলের উপরে গড়ে উঠেছিল, এবং তা ছিল চতুর্দিকে মুসলিম কৃষকের গ্রাম দিয়ে ঘেরা শ্রমিকদের এক মরূদ্যান।বিংশ শতকের শুরুতে গোটা মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের থেকে বেশি তেল উৎপাদন হত এখানে। দুর্বিষহ যাপন ও শ্রমের শর্ত সত্ত্বেও গরিব পরিযায়ীরা এই তৈলক্ষেত্রে কাজ খুঁজতে আসতেন।

বাকু শুধুমাত্র রুশ সাম্রাজ্যের শিল্পবিপ্লবের কেন্দ্রই ছিল না, বরং শ্রমিক আন্দোলনের নির্মাণঘর ছিল। বস্তুতঃ শ্রমিক ও শিল্পপতিদের মধ্যে প্রথম যৌথ দরদামের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল এখানেই, ১৯০৪ সালে। এবং এই শহরটাই ছিল সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট, বিশেষতঃ বলশেভিকদে্‌ যেমন জোসেফ স্তালিনের আশ্রয়স্থল, যখন অন্য, কম আশ্রয়দায়ী শহরে তাঁদের সংগঠনগুলি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল শাসকরা

বাকুতে শ্রেণিপার্থক্য মিশে ছিল জাতিগত বৈচিত্রের সঙ্গে। সমাজ কাঠামোর উচ্চতম স্তরে মিলেমিশে ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ইঞ্জিনিয়াররা, আর্মেনীয় ও রুশ শিল্পপতি ও আজেরবাইজানি জাহাজ-মালিকরা। রুশ ও আর্মেনীয় শ্রমিকেরা যথেষ্ট দক্ষ স্থান অধিকার করে ছিলেন, মুসলিমরা ছিলেন অদক্ষ শ্রমিক শক্তি। সবচেয়ে অস্থায়ী ও অরক্ষিত শ্রমিক হিসেবে নিকৃষ্টতম কাজ জুটত তাঁদের।

সাম্রাজ্যের সঙ্গে ককেশাসের যে শোষণমূলক সম্পর্ক, সেটা সবচেয়ে স্পষ্ট বোঝা যায় বাকু থেকে। তেল থেকে রাজস্ব সংগ্রহ সেখানে অন্য সব চিন্তাকে ছাপিয়ে যেত। বিত্তবান অভিজাতরা, মানে রুশ ও আর্মেনীয়রা- শহরের কর্তৃত্বভার সামলাত, এবং নিম্নশ্রেণির কল্যাণভার ন্যস্ত ছিল বেসরকারি দাতব্য পরিষেবার ওপর। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খুব নগণ্য সংখ্যায় অ-খ্রিষ্টিয় প্রতিনিধি ছিল এবং সরকার ঘন ঘন মার্শাল ল্‌ ও জরুরি অবস্থা জারি করত যাতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনি ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা দর্শিত হত।

সাধারণ মানুষ ও শাসক শ্রেণি উভয়েই সংস্কার চাইত। কিন্তু জার বস্তুতঃ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংস্কারের কোনও পথই খোলা রাখেনি। পরিস্থিতি দাবি করছিল কিছু বেআইনি সংগঠনের বিপ্লবী কর্মীরা সংখ্যায় কম হলেও প্রয়োজনীয় অভিমুখ ও নির্দেশ দিয়েছিল।

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারিরা খেয়াল করেছিলেন যে, বাকুর শ্রমিকেরা দক্ষতা, বেতন এবং জাতি দ্বারা বিভক্ত ছিলেন এবং রাজনীতির থেকে বেতন নিয়ে বেশি ভাবিত ছিলেন। সৌভাগ্যবশতঃ তেল-কোম্পানিগুলি অন্যদের চেয়ে বেশী প্রস্তুত ছিল, কিছু সুবিধে দিয়ে শ্রমিকশক্তিকে বিশেষতঃ দক্ষ শ্রমিকদের হাতে রাখার জন্য

অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর প্রতি লক্ষ্য নিবদ্ধ রেখে ডিসেম্বর ১৯০৪-র সাধারণ ধর্মঘট আট থেকে নয় ঘণ্টার দৈনিক কাজ ও অসুস্থতাকালীন ছুটির দাবি জিতে নিতে পেরেছিল- এমনই ভাল চুক্তিপত্র, যা জনপ্রিয় নাম পেয়েছিল খনিজ-তেলের সংবিধান।

জার দ্বিতীয় নিকোলাস যখন ১৯০৫ সালে ‘অক্টোবর ইস্তাহার’ পেশ করলেন, এবং কিছু সীমাবদ্ধ নাগরিক অধিকার ও জনগণ কর্তৃক নিবার্চিত ডুমার কথা বলা হল, বাকু তখন তৈরি করল শ্রমিকদের ডেপুটিদের সোভিয়েত। ঐ বিপ্লবী বছরের শেষ দিকটাতে এইরকম অনেকগুলি পরিষদ শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরব ছিল। কিন্তু শ্রমিকেরা লক্ষ্য নিবদ্ধ রেখেছিলেন রাজনীতিকে পরিহার ক’রে অর্থমৈতিক স্বার্থের দিকে শাহুমিয়ান দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন-

সাধারণভাবে শ্রমিকরা এখানে ভীষণই বাণিজ্যিক দল। তারা একটা নতুন অর্থনৈতিক ধর্মঘটের ব্যাপারে ভাবছে এবং আলোচনা করছে যাতে আরেকটু বেতনবৃদ্ধি হয় এবং বেশি ‘বোনাস’ মেলে।

নিরবচ্ছিন্ন পুলিশি সক্রিয়তাকে এড়িয়ে বিপ্লবীরা ১৯০৫ সালের পরেও গুপ্ত কার্যকলাপ চালাচ্ছিলেন, যখন জারতন্ত্রসাধারণভাবে শ্রমিক আন্দোলন দমন করছিল এবং বহু বিপ্লবীকে হয় রাজনীতি ছাড়তে নয়তো নির্বাসিত হতে বাধ্য করেছিল। তাঁদের পরিশ্রম সার্থক হয়েছিল ১৯১৪ সালে, ঠিক যখন রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্র চেগে উঠছে, তখন এক প্রায় ৪০,০০০ শ্রমিকের ধর্মঘটে।

এইসব সাফল্য তলে তলে জেগে ওঠা উদ্বেগগুলোকে কিছুটা ঢেকে রেখেছিল। দক্ষ শ্রমিক, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন রুশ ও আর্মেনীয়, তাঁরা ইউনিয়নে যোগদান করে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের বার্তা গ্রহণ করছিলেন; সেসময় মুসলিম শ্রমিকেরা প্রতিবাদ ও ধর্মঘটে যোগ দিচ্ছিলেন অনেক ইতস্তত ভঙ্গীতে।

পর্যবেক্ষকেরা অবজ্ঞাভরে তাঁদের বলতেন, ‘তাতার’, তাঁদের বলা হত ‘তেমনিয়ে (কালো)’ ও ‘নেসোস্নাতেলনিয়ে (রাজনীতি অসচেতন)’। বহু মুসলিম শ্রমিক আটকে ছিলেন তাঁদের গ্রামে ও ধর্মগুরুদের নেতৃত্বতলে। যদিও অল্প সংখ্যক মুসলিম সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের প্রচার করেছিলেন; কিন্তু ককেশিয়ার বৃহদ্‌সংখ্যক মুসলিম শ্রমিকের রাজনীতি বিষয়ে কোনওই আগ্রহ ছিল না।

বাকুর জাতিগত ও ধর্মগত বিভেদ এক চরম পরিণতিতে পৌঁছাল ১৯০৫-এর ফেব্রুয়ারিতে যখন আর্মেনীয় ও মুসলিমরা একে অপরের বিরুদ্ধে দাঙ্গা ও আন্তঃজাতি হত্যায় লিপ্ত হলেন। মুসলিমরা, আর্মেনীয়রা অস্ত্র হাতে নিয়েছে, মুসলিমদের মধ্যে এই ধারণা ছড়িয়ে পড়লে, আতঙ্কিত হয়ে, মুসলিমরা প্রথম আক্রমণ করলেন। পুলিশ ও সৈন্য নিষ্ক্রিয় হয়ে রইল।

আর্মেনীয় বিপ্লবী ফেডারেশন (দাশনাক), প্রায় এক দশক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অটোমান সাম্র্যাজ্যের মধ্যে আর্মেনীয়দের রক্ষা করতে। তারা তাদের ফৌজ ব্যবহার করেছিল সম্প্রদায়কে বাঁচাতে। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও উদারনৈতিকরা সরকারের নিষ্ক্রিয়তার নিন্দা করলেন, সরকারকে দুষলেন ইচ্ছাকৃত জাতিদাঙ্গা বাধানোর জন্যে। হিংসা থামার পরেও আতঙ্কের ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল, এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে মানুষ ভয় পেয়ে গেছিল যে, আরেকটা হিংসাত্মক ঘটনা অবশ্যম্ভাবী।

 

সমর্থনের ওঠাপড়া

প্রায় সমস্ত রাশিয়ার মতো বাকুও ফেব্রুয়ারি-মার্চে সংক্ষিপ্ত মধুচন্দ্রিমা উপভোগ করছিল। বুর্জোয়া এক্সিক্যুটিভ কমিটি অব্‌ পাবলিক অর্গ্যানাইজেশনস (IKOO) হাত মিলিয়েছিল সদ্য নির্বাচিত শ্রমিকদের সোভিয়েত ও তার চেয়ারম্যান বলশেভিক শাহুমিয়ানের সাথে। রুশ সৈন্য যখন অটোমান আনাতোলিয়া দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তখন মনে করা হয়েছিল যে আভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে একতা জরুরি ছিল কিন্তু পূর্বের সামাজিক ও জাতিগত বিদ্বেষ শহরের শান্তিকে তখনও বিপন্ন রেখেছিল।

যেমন পেত্রোগ্রাদে, তেমন বাকুতেওঃ সরকারের দুই কেন্দ্র- IKOO ও বাকু সোভিয়েত -- জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার ও শহরের ক্ষমতা দখলের জন্য প্রতিদ্বন্দিতা করছিল। IKOO-তে ছিল সব পেশাদারেরা -- উকিল, আমলা ও উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবিরা- অন্যদিকে সোভিয়েতের নেতৃত্বে ছিলেন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট্‌স (বলশেভিক ও মেনশেভিক), এসআর এবং দাশনাকেরা। রুশ শ্রমিকরা এবং সৈন্যদের সঙ্গে আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের একটা অংশও সোভিয়েতের সমর্থক ছিলেন; কিন্তু মুসলিমরা এর বাইরে ছিলেন ১৯১৭-র গ্রীষ্ম পর্যন্ত।

IKOO-র উদারনৈতিকরা ও পেশাদাররা বলশেভিকদের আইন-প্রশাসনের শত্রু হিসেবে, নৈরাজ্যের উদ্‌গাতা হিসেবে দেখত। বাকু সোভিয়েতের এসআর সংখ্যাগরিষ্ঠরা যুদ্ধ ও সামাজিক শান্তি বিষয়ে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের নরমপন্থাকেই সমর্থন করতঃ তারা ‘দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান’ রেখেছিল এবং কোনরকম ক্ষতিপূরণ ছাড়াই নিঃশর্ত গণতান্ত্রিক শান্তির দাবি করেছিল।

বেশিরভাগ বলশেভিকই বসন্তকালীন সময়ে এই নীতিগুলির পক্ষে ছিলেন কিন্তু, শাহুমিয়ান আরও বিপ্লবী চিন্তাধারা পোষণ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ফেব্রুয়ারির বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব আদতে ‘ইউরোপের সামাজিক বিপ্লবের সূচনা, যার প্রভাবে ক্রমশঃ সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত হবে’। তার ওপরে, শাহুমিয়ানের অনড় যুদ্ধবিরোধী অবস্থান বাকুর সৈনিকদের কাছে চক্ষুশূল ছিল। দাশনাকদের ভয় ছিল যে, সন্ধি করলে ককেশিয়াতে তুর্কি অনুপ্রবেশ ঘটে অটোমান আর্মেনীয়রা বিপদগ্রস্ত হবে, তাই তারা বলশেভিকদের লাইন মানেনি। সেইজন্যেই যে রুশ সৈন্যরা সোশ্যাল রেভ্যল্যুশনারিদের সমর্থন করেছিল, তারাই শাহুমিয়ানকে সোভিয়েতের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।  

তবে, উত্তরের দুই রাজধানীর এবং বিভিন্ন রণাঙ্গনের মতোই, বাকুও ১৯১৭-র বসন্ত ও গ্রীষ্মে বামপন্থায় ঝুঁকল। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছিল এবং কেরেনস্কির জঘন্য ‘জুন অফেন্সিভ’ সৈন্যদের রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল।

পেত্রোগ্রাদে বিপ্লবী শ্রমিক ও নাবিকেরা জুলাইয়ের গোড়ায় একটা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন, যাতে সোভিয়েতকে চাপ দিয়ে ক্ষমতা দখল করানো যায়। কিন্তু, তারা যে শুধু ব্যর্থ হয়েছিলেন তা-ই নয় বরং বাকু ও পেত্রোগ্রাদের সোভিয়েত অল্প সময়ের জন্য বলশেভিকদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল, কারণ আপাতঃভাবে এই ব্যর্থ বিপ্লবের তারাও অংশীদার বলে মনে হচ্ছিল।

লেনিন ফিনল্যান্ডে আত্মগোপন করেছিলেন এবং সদ্য বলশেভিক নেতৃপদে আসা ট্রটস্কি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। শাহুমিয়ান এবং তাঁর সহকারী আলেশা ঝাপারিদঝে কমরেডদের প্রাণপণে রক্ষা করছিলেন। কিন্তু রাজধানীর ঘটনায় বলশেভিকদের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল আর, তাঁরা আপাতঃভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন হঠকারী হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছিলেন।

এই ধারণা অচিরেই উল্টোখাতে বইল যখন প্রতিবিপ্লবী জেনারেল লাভর কর্নিলভ পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের বিরুদ্ধে সামরিক বিদ্রোহ করল। ইতিমধ্যেই বাকুতে প্রবল অনাহার দেখা দিল, বিশেষতঃ দরিদ্র মুসলিমরা ক্লিষ্ট হল বেশি। শ্রমিকেরা সর্বাত্মক ধর্মঘট গড়ে তুললেন, অনিচ্ছুক তেল মালিকরা আত্মসমর্পণ করলেন, যদিও  চুক্তি সইয়ের ডাক পড়লে তারা যতটা সম্ভব ধীরগতিতে সেদিকে এগোলেন।

স্থানীয় বলশেভিকরা এই বিক্ষোভের ঢেউ ব্যবহার করে সোভিয়েতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বললেন। যখন লেনিন বারংবার জোর দিচ্ছেন শক্তি দিয়ে ক্ষমতা দখলের ওপর, তখন শাহুমিয়ান কৌশলের সঙ্গে বাকু সোভিয়েতে নির্বাচন সংঘটিত করলেন, যেখানে বলশেভিকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ল। যদিও তাঁর পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না, সোভিয়েত IKOO-কে উচ্ছেদ করে নিজেদের সার্বভৌম বলে ঘোষণা করতে রাজি হল।

এসআর সংখ্যাধিক্য বিশিষ্ট বাকু সোভিয়েত লেনিনের সরকারকে সমর্থন করতে অস্বীকার করল। অক্টোবরে বলশেভিকরা অগ্রণী ছিল, যদিও বাকুর আধিপত্যকামী পার্টি ছিল না, কিন্তু অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন যে, ক্ষমতা দখলের চেষ্টা নাগরিক বা জাতিগত দাঙ্গার দিকে মোড় নেবে।

শহরে সোভিয়েত একচ্ছত্র ক্ষমতাধিকারী ছিল না। শহরের ডুমার বিরোধিতা ছিল তাদের বিরুদ্ধে, এবং নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা সর্বশ্রেণির সহাবস্থানকারী মিলিজুলি সরকারে ফিরতে চাইছিল।

শহরে যেহেতু কোনও একটা মাত্র দল ক্ষমতাধিকারী ছিল না এবং দেশের সরকারেরও টালমাটাল পরিস্থিতি, তাই একটা আতঙ্কাবহ শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। সৈন্যরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়ে ককেশিয়ান ফ্রন্টের দিকে চলে গেছিলেন, যার ফলে অটোমান আক্রমণের পথ খুলে গেছিল।

 

স্তেপান শাহুমিয়ান                     প্রোকোফি ঝাপারিৎঝে                         মেশাদি আজিজবেকভ

সোভিয়েতকে শক্তিশালী করা

১৯১৭-র শেষদিকে জাতীয় নির্বাচনে জাতিকেন্দ্রিক পরিচিতি মূল শক্তিলাভ করছিল। জর্জিয়ান মেনশেভিকরা জর্জিয়া প্রদেশে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হলেন, আর একই সময় বাকুতে অগ্রণী মুসলিম দল মুসাভাত এবং দাশনাকরা বাকুর সংলগ্ন অঞ্চলে সহজেই জয়ী হল। দক্ষিণ ককেশাসের বিপ্লব শ্রেণিসংগ্রাম থেকে জাতি ও ধর্মগত বিরোধে রূপান্তরিত হচ্ছিল।

কোনও রুশ সৈন্যপ্রাচীর তাদের আর অটোমান সৈন্যের মধ্যে নেই দেখে, বাকুর আর্মেনীয়, জর্জিয়ান ও মুসলিম সম্প্রদায় নিজেদের সেনাদল প্রস্তুত করে নিলেন। সোভিয়েত অনেক দেরীতে নিজস্ব বহুজাতিক লালরক্ষী সেনাদল গঠন করেছিল।

মুসলিমরা সেনাবাহিনী থেকে পলাতক সৈনিকদের নিরস্ত্র করতে থাকে, এবং ১৯১৮-র জানুয়ারিতে শামখোরে একটা বিয়োগান্ত সংঘর্ষে হাজার হাজার রুশকে হত্যা করল। এই ঘটনা থেকেই প্রমাণিত হল যে ওই অঞ্চলে মুসলিমরাই সবচেয়ে সুদক্ষ সামরিক দল ছিল, এবং তাদের সম্ভাব্য অটোমান মিত্ররা যুদ্ধপূর্ব সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। শাহুমিয়ানের শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, শীঘ্রই সশস্ত্র মানুষেরাই স্থির করবে, কারা বাকুর শাসক হবে।

শহরের অভ্যন্তরে আর্মেনীয় ফৌজ ও মুসলিম বাহিনীগুলি রেড গার্ডদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল। সোভিয়েত শক্তি দাশনাকদের সঙ্গে কৌশলগত জোট করল মুসলিমদের বিরুদ্ধে, কারণ অনেকেরই মনে হচ্ছিল, এরা এক বড় প্রতিবিপ্লবী শক্তি হয়ে উঠেছিল।

শাহুমিয়ান এবার তিনদিক থেকে সামরিক আক্রমণের সামনে পড়লেনঃ  বাকুতে সোভিয়েত-বিরোধীদের কাছ থেকে; তিফলিসে, যেখানে মেনশেভিকরা বলশেভিক রাশিয়া থেকে দক্ষিণ ককেশিয়াকে স্বাধীন ঘোষণা করে দিয়েছে; এবং প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত শহর এলিজাভেটপোল থেকে,  যেখানের লড়াইয়ের ফলে বাকুতে খাদ্য সরবরাহ আসছিল না

মার্চ মাসের শেষে যখন মুসলিম স্যাভেজ ডিভিশনের সেনাদের নিয়ে একটি জাহাজ এসে পৌঁছাল, তখন ভীষণ যুদ্ধ লাগল। সোভিয়েত ও আর্মেনীয় শক্তি শহরের মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়তে শুরু করল। আর, তারপর রেড গার্ড তাদের কামান তাক করল মুসলিম মহল্লার দিকে। মুসলিম ফৌজ বনাম সোভিয়েতের দ্বন্দ্ব হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা কর্কটরোগের মতো ছড়িয়ে পড়ল সঙ্ঘবদ্ধ মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গাতে।

যুদ্ধের ফলে মুসলিমরা শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করল এবং আর্মেনীয়রা প্রতিবাদ শুরু করল এই অভিযোগে যে, সোভিয়েত মুসলিমদের সঙ্গে বড় মোলায়েম ব্যবহার করেছে। বলশেভিকরা গোটা পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত ছিলেন, কিন্তু নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, শহরের দখল তাদের হাতে। শাহুমিয়ান মস্কোকে জানালেন যে, “আমাদের, অর্থাৎ বলশেভিকদের প্রভাব আগেও ভালই ছিল, কিন্তু এখন আমরা প্রকৃত অর্থেই পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রক।”

যদিও সোভিয়েত শক্তি সশস্ত্র দাশনাকদের ওপরে নির্ভরশীল ছিল কিন্তু বাকুর বলশেভিকরা এক নতুন সরকার গঠন করল নিজস্ব সদস্যবৃন্দ এবং বামপন্থী এসআর-দের নিয়ে, যা থেকে বাদ পড়ল দক্ষিণপন্থী এসআর, মেনশেভিক ও দাশনাকরা। বাকু কমিউন এবার তার নিজস্ব গণ কমিশারবৃন্দ (সভনারকম) এবং বৈদেশিক বিষয়ের কমিসারিয়েট নিয়ে বাকুর জনজীবনের বৈপ্লবিক রূপান্তর করতে প্রস্তুত হল।

 

বাকু কমিউন

এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ১৯১৮-র এপ্রিল থেকে জুলাই মাত্র সাতানব্বই দিন স্থায়ী হল। বলশেভিকরা সোভিয়েত ও তার সভনারকমকে মার্ক্সের ১৮৭১ সালের প্যারী কমিউনের দৃষ্টিভঙ্গির অনুসরণ  করে দেখতে চেয়েছিলেন একাধারে কার্যনির্বাহী ও বিধান পরিষদ হিসেবে।

কমিউন তৈলশিল্পকে জাতীয়করণ করল এবং শিক্ষা ও আইন ব্যবস্থায় সংস্কারের চেষ্টা করল- পেশাদারি শ্রেণির বহু বাধা সত্ত্বেও -- এবং তারা বিশ্বাস করত যে সরকারি সন্ত্রাস ছাড়াই শহর শাসন করা যায়, যদিও তারা বিরোধীদের সংবাদপত্র বন্ধ করে দিল।

জুন মাসে এলিজাভেটপোল থেকে মুসলিমদের আক্রমণ বন্ধ করতে শাহুমিয়ান আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন। শহরের নেতৃবৃন্দ আলোচনায় তিফলিসের দিকে আরও এগোনো নিয়েও আলোচনা করেন, কিন্তু বাকুর ফৌজ কুরা নদীর কাছে পৌছলেই মুসলিম, জর্জিয়ান ও অটোমান যোদ্ধারা তাঁদের ফিরিয়ে দিলেন। শহর তখন প্রাণপণে চাইছিল যাতে অটোমান দখলদারি ঠেকানো যায়। শাহুমিয়ান কসাক ও ব্রিটিশদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন, পোষে এলেন, কিন্তু মস্কো তাঁকে জেনারেল ডানস্টারভিলের বাহিনীকে শহরে ঢুকতে দিতে বাস্রণ করে।

খাদ্যের যোগান বাড়াতে না পেরে এবং বাকুর শ্রমিকদের ও শহরের বাইরের কৃষকদের অপর্যাপ্ত সমর্থনের জন্যে বলশেভিকদের গণভিত্তি সঙ্গকুচিত হতে থাকল।  ২৫শে জুলাই সোভিয়েতে ২৫৯-র মধ্যে ২৩৬ ভোট পড়ল ব্রিটিশ সাহায্য চাওয়ার সমর্থনে।

শাহুমিয়ান ঘোষণা করলেন, “আপনারা এখনও ব্রিটিশ সরকারকে পাননি কিন্তু কেন্দ্রীয় রুশ সরকারকে হারিয়ে ফেলেছেন। আপনারা ব্রিটিশ সরকারকে পাননি, কিন্তু আমাদের হারিয়ে ফেললেন।” তাঁর সরকার পদত্যাগ করল, একটা অ-বলশেভিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হল এবং ব্রিটিশরা পদার্পণ করল।

মধ্য-সেপ্টেম্বরে যখন অটোমানরা প্রায় শহর দখল করেই ফেলেছে, তখন বাকু কমিউনের নেতারা পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু, তাঁদের জাহাজ আস্ত্রাখানের নিরাপদ বন্দর থেকে পথ বদলাল ক্রাস্নোভদস্ক-এ, যেখানে তুর্কমেন  এসআর-রা প্রাক্তন কমিশারদের গ্রেফতার করল।

বাকুর ২৬ জন বিপ্লবী, যাঁদের অধিকাংশই বলশেভিক, তাঁদের মরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হল। ১৯২০ সালে তাঁদের দেহাবশেষ পুনরুদ্ধার করে সোভিয়েত শহীদ হিসেবে পুনঃসমাধি দেওয়া হল বাকুর সেন্ট্রাল স্কোয়ারে। সেই সমাধিতেই তাঁরা পরবর্তী ৭০ বছর সমাহিত ছিলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত সোভিয়েত-পরবর্তী আজেরবাইজানি শাসক সোভিয়েত কমিশারদের স্মৃতিসৌধ ধ্বংস করে দিল।

 

বৈপ্লবিক পরাজয়

বাকুর বিপ্লবের কাহিনী ১৯১৭-র ঘটনাবলী ঘিরে বহু কাল্পনিক বা অতিকথার অবসান ঘটায়।  বাকুর বলশেভিকরা ক্ষমতালোলুপ ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন দীর্ঘদিনের সমাজতন্ত্রী সক্রিয় কর্মী যাঁদের শিকড় ছড়িয়ে ছিল শহরের শ্রমিক আন্দোলনের ভিতরে। তাঁদের আচরণ ছিল গণতান্ত্রিক, তারা ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে, এবং যখন তাঁরা সোভিয়েতের গুরুত্বপূর্ণ ভোটে পরাজিত হলেন, তখন সরকারি সব পদ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে পদত্যাগ করেছিলেন। যদিও তাঁরা শহরে ক্ষমতা হাতে পেয়েছিলেন রক্তাক্ত মার্চের দিনগুলোর জন্যে, কিন্তু বাকু বলশেভিকরা ক্ষমতায় থাকাকালীন শত্রুদের বিরুদ্ধে কোনওরকম সন্ত্রাসের শাসন প্রয়োগ করেননি।

শেষপর্যন্ত তাঁরা শ্রমিকদের জাতিগত ও সামাজিক স্তরভাগগুলিকে জয় করতে পারেন নি, খাদ্যসমস্যার সমাধান করতে পারেননি, এবং শত্রদের বিরুদ্ধে সফল লড়ায়ের মত যথেষ্ট সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

শাহুমিয়ান বাকুকে রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে গোটা ককেশিয়া জুড়ে প্রতিবিপ্লবকে ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি নরমপন্থী সমাজতান্ত্রিক দলগুলিকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকার করেছিলেন যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা মস্কোর সোভিয়েত সরকারকে স্বীকার করে। তাঁর ভিত্তি সত্যিই খুব সংকীর্ণ ছিল, তাই বলশেভিকরা শ্রমিকদের দাবিপূরণে ব্যর্থ হতেই শ্রমিকরা আস্থা হারালেন ও কমিউন ভেঙে পড়ল।

বাকুর ২৬ জন কমিশারের ভাগ্য চরম পরিহাসেরঃ মোলায়েম, গণতান্ত্রিক এবং মোটামুটিভাবে অহিংস। তাই শাহুমিয়ান, ঝাপারিৎঝে এবং অন্যরা গৃহযুদ্ধের সময় প্রচণ্ড নিষ্ঠুর শত্রুপক্ষের শিকার হলেন।

আর, ঠিক এর বিপরীতে, ১৯১৮-র গ্রীষ্মশেষে রুশ বলশেভিকরা ও তাঁদের শ্বেতারক্ষী বিরোধীপক্ষ যুদ্ধের যুক্তি অবলম্বন করেছিল, বলশেভিকরা গণতান্ত্রিক সরকারের মতাদর্শ সরিয়ে রেখে শত্রুদমনে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জারি করেছিলেন। গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতদের জয় হবে -- এই আশার পরিসমাপ্তি ঘটল সেই ভয়ানক হিংস্র সংঘর্ষে