Socialist and Peoples' History

রুশ বিপ্লব - সমাজ বিপ্লব না ষড়যন্ত্র ?

 

 

 

সোমা মারিক

[২০১৭-র ভূমিকাঃ এই প্রবন্ধটি মূল্যায়ন পত্রিকার অক্টোবর ’৯৭ – মার্চ ’৯৮ সংখ্যাতে প্রকাশিত হয়। পুরো নতুন করে তা ঢেলে সাজানো এখনই সম্ভব নয়। উপরন্তু, যে সংকলনে এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবে, তাতে অন্য একাধিক প্রবন্ধে কয়েকটি জরুরী বিষয় আলোচিত হবে। কেবল কিছু অন্তটীকার মাধ্যমে তথ্যসূত্র দিয়ে দেওয়া হল। সামান্য কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রবন্ধে কিছু সংযোজন বা পরিমার্জন করা হয়েছে। টীকা দেওয়ার ফলে সঙ্গের গ্রন্থপঞ্জী সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।]

রুশ বিপ্লবের, বিশেষত  অক্টোবর, ১৯১৭-এর সমালোচনা, নতুন নয়। যেদিন গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল, মেনশেভিক নেতা ফেদোর ড্যান সেই দিনই একটি বক্তৃতায় তাকে এক "অপরাধমূলক  কাজ" বলে চিহ্নিত করেছিলেন। লিওনার্দ শ্যাপিরোর মতে, একদল লোক, যারা সংখ্যায় অল্প, কিন্তু যারা নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে সজাগ ছিল, তারা কীভাবে ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করল এবং অধিকতর গণতান্ত্রিক দাবীদারদের ক্ষমতার কাছে আসতে দিল না, ১৯১৭ পরবর্তী রাশিয়ার ইতিহাসে সেটা এক প্রধান বিষয়।[i] গত এক দশকে মার্ক্সবাদী, কমিউনিস্ট   ইত্যাদি বলে নিজেদের সম্পর্কে দাবী করার পরও আরো অনেকে এই সুরে গলা মিলিয়েছেন। দক্ষিণপন্থী বলে সুপরিচিত রিচার্ড পাইপস, নৈরাষ্ট্রবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও আনাল স্কুলের ইতিহাসবিদ মার্কস ফেরো প্রমুখের সঙ্গে অনেকটা গলা মেলাচ্ছেন এরিক হবসবম, পরেশ চট্টোপাধ্যায়, শার্ল বেতেলহাইম ও অন্যান্যরা।[ii]

প্রত্যেক লেখকের প্রতিটি খুঁটিনাটি বক্তব্য পর্যালোচনা করার জন্য একটি গোটা বই লাগবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনার জন্য মূল কয়েকটি ধারা বা কয়েকটি যুক্তি ও প্রস্তাবনাকে তুলে ধরা হবে।

এই সমালোচকদের মতে (কমবেশী), 'সোভিয়েতের হাতে সব ক্ষমতা ' এই স্লোগান ছিল ভাঁওতা কারণ বাস্তবে লেনিন বারে বারে পার্টির হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত  করতে চেয়েছিলেন। 

দ্বিতীয়ত, সোভিয়েত কংগ্রেস যথেষ্ট প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল না। সংবিধান সভা ভেঙে দিয়ে বলশেভিকরা নিজেদের স্বৈরতান্ত্রিক উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে দেখিয়েছিলেন।

তৃতীয়ত, সোভিয়েত নয়, বলশেভিকরাই বাস্তবক্ষেত্রে অভ্যুথান পরিচালনা করেছিলেন তাঁদের নিজেদের তত্বে এই কমিটিগুলির কোনো জায়গা ছিল না।

সুতরাং এঁদের সিদ্ধান্ত মোটামুটি এইরকম --- ১৯১৭-র ফেব্রুয়ারিতে একটি গতান্ত্রিক  পরিকাঠামো রচিত হয়েছিল। গতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাঁদের অভিসন্ধি কার্যকর হবে না   বলে বলশেভিকরা ষড়যন্ত্র করে গতন্ত্র ধ্বংস করলেন। ১৯৩০-এর দশকে যে  স্তালিনবাদী স্বৈরতন্ত্র দেখা দিল তা নতুন কিছু নয়। রুশ ইতিহাসবিদ ভলকোগোনভের মত তাঁরাও মনে করেন,লেনিন এবং ট্রটস্কী, তথা ১৯১৭-র বলশেভিক নেতৃত্ব, স্তালিনবাদী ব্যবস্থা প্রকৃত স্রষ্টাদের মধ্যে পড়েন। স্তালিনবাদ বর্জিত কোনো প্রকৃত বিপ্লবী মার্কসবাদী সম্ভব নয়, যে একাধারে গণতান্ত্রিক এবং বিপ্লবী, আর বিপ্লবী মার্কসবাদ ইউটোপীয় এবং তাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে স্বৈরতন্ত্র অনিবার্য। এই শেষ সিদ্ধান্তটা অবশ্য তাঁরা সকলে এখনো গ্রহণ করেন নি। কিন্তু আমরা দেখব, ১৯১৭-র অক্টোবরকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করলে তার কোন বিকল্প থাকে না

১৯১৭-তে বলশেভিকবাদঃ   

লেনিন তাঁর একদল নগণ্য সংখ্যক অনুচর একটি একটি সুশৃঙ্খল রোবট-পার্টি নিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন, এই দাবী ঠিক কিনা তা যাচাই করার রাস্তা হল ১৯১৭ সালে বলশেভিক পার্টি কেমন ছিল, তার মতাদর্শ, তার দলীয় গণতন্ত্র কেমন ছিল, তার পর্যালোচনা। বে-আইনী থাকলে  আন্তঃপার্টি গণতন্ত্র কতটা থাকতে পারে বা না পারে, ফেব্রুয়ারির গ-অভ্যুথানের পর সে সব তর্কের শেষ হয়ে যায়।বলশেভিক পিটার্সবুর্গ কমিটি মনে করেছিল, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সাধারণ ধর্মঘটের চেষ্টা করা ভুল। সাধারণ ধর্মঘট ও বিপ্লবী সরকারের ডাক প্রথম দেয় ছোটো একটি সংগঠন, মেঝরায়াঙ্কা ( আন্তঃ জেলা কমিটি )। কিন্তু এই সংগঠন কয়েক মাস পরে, ষষ্ঠ কংগ্রেসে, বলশেভিক দলে যোগ দেয়। এমন কি, মার্চের গোড়াতেই দুই সংগঠনের ঐক্যের আলোচনা শুরু হয়। তা যে সাময়িক ভেঙে গেল, তার কারণ হল মার্চের মাঝামাঝি বলশেভিকদের ডাইনে মো ঘোরাপ্রাথমিকভাবে ইতস্তত করলেও, অভ্যুথান শুরু হওয়ার পর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্লিয়াপনিকভ বুর্জোয়াশ্রেণীর তৈরী অস্থায়ী সরকারের বিরোধী ছিলেন। ভাইবর্গ এলাকার  (রাজধানীর অন্যতম প্রধান শ্রমিক এলাকা) বলশেভিক কমিটি তো আরো আগেই সোভিয়েত গঠনের উদ্যোগ নেয়।

কিন্তু ১২ মার্চ সাইবেরিয়া থেকে স্তালিন, কামেনেভ, মুরানভ , এই তিন নেতা ফেরার পর কেন্দ্রীয় কমিটি ও পার্টির মুখপত্র প্রাভদা ডাইনে মোড় নেয়। ৮ মার্চ কেন্দ্রীয় কমিটির রুশ ব্যুরোর প্রস্তাবে বলা হয়, সোভিয়েতকে সমর্থন করা উচিত, যাতে তা একটি অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার তৈরী করে। ২২ মার্চ, স্তালিন-কামেনেভের প্রভাবে, নতুন প্রস্তাবে সোভিয়েতকে আর ক্ষমতার কেন্দ্র হিসাবে দেখা হল না।বলা হল,সোভিয়েতদের অস্থায়ী সরকার (বিদ্যমান বুর্জোয়া অস্থায়ী সরকার) তার প্রতিনিধিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে”। মার্চের শেষ দিকে, পার্টির এক সারা রাশিয়া সম্মেলনে স্তালিন তাঁর বক্তৃতায় সোজা বলেন, সরকারকে সমালোচনাত্বক সমর্থন জানাতে হবে।[iii]

ইতিমধ্যে লেনিন বিদেশ থেকে একাধিক চিঠি লিখেছেন(letters from Afar)[iv] তার সবকটি প্রাভদায় মুদ্রিত হয় নি। যখন তিনি ফিরে এসে তাঁর বিখ্যাত ‘এপ্রিল থিসিসে’ সোভিয়েতদের  হাতে সব ক্ষমতা-র কথা বলেন, প্রাভদা তা ছেপে সঙ্গে সম্পাদকীয় মন্তব্যে লেখে –এটা কমরেড লেনিনের ব্যক্তিগত মত।[v] কেন্দ্রীয় কমিটির অপেক্ষাকৃত বামপন্থী সদস্যরা (যথা শ্লিয়ানিকভ) পর্যন্ত লেনিনের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হলেন না। 

লেনিন ফেরার আগে মার্চ সম্মেলনে পার্টিতে তিনটি ধারা দেখা দেয়। ইতিনস্কির নেতৃত্বে সবচেয়ে নরমপন্থীরা মনে করলেন, মেনশেভিকদের সঙ্গে ঐক্যের পথে কোনো বাধাই নেই। স্তালিন ও কামেনেভের নেতৃত্বে মধ্যপন্থীরা জিমারওয়াল্ড কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্য চাইলেন[vi]আর মলোটভ ও পিওতর জালুৎস্কির নেতৃত্বে একাংশ মেনশেভিকদের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধিতা করলেন। 

সম্মেলনের মাঝপথে ফিরে লেনিন যেন বোমা ফাটালেন। ভইতিনস্কি ও তার সমর্থকরা মেনশেভিক দলে চলে যান। লেনিন ও কামেনেভের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বেধে ওঠে, তা গোটা বছর ধরেই চলেছিল। সপ্তম সারা রাশিয়া সম্মেলনে (২৪-২৯ এপ্রিল) লেনিনের প্রস্তাব পায় ৭১ ভোট, তার বিপক্ষে পড়ে ৩৯ ভোট এবং ৮ জন ভোট দান থেকে বিরত থাকেন। অর্থাৎ পার্টির তথাকথিত একনায়ক প্রথমে নিঃসঙ্গ ছিলেন, এবং পরে প্রায় ৪০ শতাংশ তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দেয়।[vii]

মতভেদের অধিকার শুধু পার্টির উপর মহলে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যত বড় সম্ভব সভা ডাকা হত। যেমন, জুন মাসে, অস্থায়ী  সরকারের অবসান দাবী করে একটি মিছিল ডাকা হবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় কমিটি, পিটার্সবুর্গ কমিটি, সামরিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কমিটি এবং ট্রেড ইউনিয়ান সেল ও ফ্যাক্টরী কমিটি সেলের প্রতিনিধিদের সম্মিলিত সভা। বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন কেন্দ্রীয় কমিটি পরে মিছিল স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়, তখন পার্টির বিভিন্ন কমিটি কেন্দ্রীয় কমিটিকে নিন্দা করে প্রস্তাব নেয় এবং লেনিন স্বীকার করেন, তাঁদের তা করার অধিকার রয়েছে।[viii]

এটাও লক্ষণীয় যে প্রতিটি কাজে বিভিন্ন মতের সদস্যদের যুক্ত রাখা হতষষ্ঠ কংগ্রেসে নির্বাচিত ২১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৬ জন ছিলেন কামেনেভপন্থীএর পিছনে একদিকে ছিল লেনিন ও অন্য বলশেভিক নেতাদের গণতান্ত্রিক মনোভাবথেকে আরেক দিকে ছিল তলা থেকে আসা চাপ

১৯১৭ সালে বলশেভিক পার্টির সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েফেব্রুয়ারীতে সদস্য সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২৩,৬০০এপ্রিল সম্মেলনে তা বেড়ে হয় ৮০,০০০ এবং ষষ্ঠ কংগ্রেসে ২,৪০,০০০ব্যাপক সংখ্যক জঙ্গী শ্রমিক পার্টিতে আসেনতাঁদের উপর রাতারাতি কঠোর শৃংখলা চাপানো হবে এবং গণতান্ত্রিক বাতাবরনের অস্তিত্ব সত্ত্বেও তাঁরা সেটা নীরবে মেনে নেবেন, এটা অসম্ভব ছিল। নীচের সারনীতে কয়েকটি বড় শহরে পার্টির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির ছবি তুলে ধরা হল  

 

সারনী-১[ix]  

মার্চ                     সপ্তম সম্মেলন           ষষ্ঠ কংগ্রেস

পেত্রোগ্রাদ                       ২০০০                  ১৬,০০০                        ৩৬,০০০

মস্কো                           ৬০০                    ,০০০                 ১৫,০০০

ইভানোভো ভসনেসেনস্ক          ১০                     ,৫৬৪                  ,৪৪০

একাতেরিনোস্লাভ                 ৪০০                    ,৫০০                  ,৫০০

লুগান                           ১০০                    ,৫০০                  ,৫৯৬

খারকভ                         ১০৫                    ,২০০

সারাতোভ                        ৬০                     ,৬০০                  ,০০০

কিয়েভ                          ২০০                    ,৯০০                  ,০০০

একাতেরিনবুর্গ                   ৪০                     ,৭০০                  ,৮০০

আমরা আগেই দেখিয়েছি, পার্টির পুরোনো কর্মীদের মধ্যে কোনো ফ্যাসিস্ত ধাঁচের (বা স্তালিনবাদী) হুকুমসর্বস্ব শৃঙ্খলা ছিল নাআর, যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়াও হয়, যে তা কিছুটা ছিল, ইভানোভো-ভসনেসেনস্কের  ১০ জন পুরোনো বলশেভিক ৫৪৩০ জন নতুন সদস্যকে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, বা এমনকি পেত্রোগ্রাদের ২০০০ জন ৩৬,০০০ জনকে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন (যে ৩৬,০০০-এর মধ্যে ছিলেন মেঝরায়ঙ্কা সংগঠনের ৪০০০ সদস্য), এটা অবিশ্বাস্য এবং অপ্রমাণিত

এই রকম একটি দল, যা প্রতিদিন  নতুন জঙ্গী শ্রমিকদের টেনে নিচ্ছে, তার পক্ষে গোপন, ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতি করাই অসম্ভব ছিলযদি আমরা ১৯১৭-র মূল সংকটের দিনগুলির দিকে তাকাই এবং তখন বলশেভিকরা কি করছিল তা দেখি, তাহলে ছবিটা সম্পূর্ণতা লাভ করবে  

লেনিন তাঁর এপ্রিল থিসিসে বলেন, “এখন, শ্রমিক প্রতিনিধি পরিষদ থেকে পার্লামেণ্টারি সাধারণতন্ত্রে ফিরে যাওয়া হবে পিছু হঠাঅর্থাৎ, তাঁর ঘোষিত বক্তব্য হল, পরিষদীয় (সোভিয়েত) গণতন্ত্র সংসদীয় গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নত, তাই সেটাই চাইএপ্রিল মাসে, পার্টির পেত্রোগ্রাদ নগর সম্মেলনে তিনি বলেন, রাশিয়াতে এখন এতটা স্বাধীনতা রয়েছে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ছাড়া ক্ষমতা দখল করা যায় না। বলশেভিকরা সংখ্যালঘু। সংখ্যাগরিষ্ঠের উদ্যোগ ছাড়া ক্ষমতা দখল সম্ভব নয়। পার্টির কাজ সোভিয়েতের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে নিজের মতে টেনে আনা।[x]

চারটি ঘটনার মাধ্যমে আমরা দেখব, এই দিশাই গোটা বছর ধরে বলশেভিকদের দিশা ছিলসেগুলি হল যথাক্রমে ‘ এপ্রিল সংকট , ক্রোনস্তাদে প্রায় অভ্যুত্থান, জুনের মিছিল ও জুলাইয়ের আধা-অভ্যুত্থান

ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের পরও থেকেই শ্রমিক আর সৈনিকদের দাবী ছিল, এই ভয়াবহ এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী যুদ্ধের অবসান চাই। বুর্জোয়া অস্থায়ী সরকার তাতে রাজী ছিল না। কিন্তু সোভিয়েতের সমর্থন ছাড়া অস্থায়ী সরকার টিঁকতে পারত না। ফলে সোভিয়েতের মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী নেতৃত্বের সঙ্গে অস্থায়ী সরকারের রফা হয়, তারা এক ঘোষণাপত্রে জানায়, রাশিয়া চায় কোনো দেশ দখল নয়, জনগণের অধিকারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শান্তি।কিন্তু এটা ছিল কৌশলগত ঘোষণা।  ১৮ এপ্রিল, অস্থায়ী সরকারের বিদেশমন্ত্রী পাভেল মিলিউকভ মিত্রশক্তিকে জানান, রাশিয়ার জারতন্ত্রী সরকারের যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিগুলি থেকে অস্থায়ী সরকার পিছু হঠবে না। এই চুক্তিগুলিতে রাশিয়ার পাওনা ছিল কনস্ট্যান্টিনোপল সহ বিভিন্ন এলাকা দখলের অধিকার। এই খবর জানার ফলে জনগণ অস্ত্র হাতে পথে বেরিয়ে আসেন। ধর্মঘট শুরু হয়। সোভিয়েতের নেতৃত্ব মেনশেভিক রেভল্যুশনারী জোটের হাতে। তারা এমন পথ খুঁজছিল, যাতে মিলিউকভের এই বক্তব্য খণ্ডিত হয়, কিন্তু বিপ্লব না ঘটেএই সময় কেরেনস্কীর বন্ধু স্টাঙ্কেভিচ সোভিয়েতকে বলেন, এত চিন্তার কি আছে। আপনারা ফোনে একটা কথা বললে পাঁচ মিনিটে সরকার ইস্তফা দেবে। আপনারা ক্ষমতা নিয়ে নিন। কিন্তু তা তাঁদের কাম্য ছিল না (এবং স্টাঙ্কেভিচ তা জানতেন)। এই চাপের ফলে তাঁরা এবার মিলিউকভের সঙ্গেও রফা করতে চেষ্টা করেন। 


কিন্তু পরদিন, বলশেভিক দলের পিটার্সবুর্গ কমিটি আরেক দফা মিছিলের ডাক দেয়। তাদের দাবী ছিল, “অস্থায়ী সরকার নিপাত যাক”। কেন্দ্রীয় কমিটির বক্তব্য ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে, সোভিয়েতের মধ্যে এই দাবী তোলা যায়, সোভিয়েত সরকার গড়ার কথা বলা যায়,কিন্তু অস্ত্র হাতে পথে বেরোনো যায় না, কারণ তাহলে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধে যেতে হয়, যেহেতু তাঁরা সোভিয়েত নেতৃত্বকে মেনে চলছেনএপ্রিল সম্মেলনে লেনিন বলেন, ঐ স্লোগানের অর্থ ছিল এমন পরিস্থিতিতে শক্তি ব্যবহার করা, যা অনুমোদনযোগ্য নয়তবে, ব্যাপক জনপ্রতিরোধের ফলে মিলিউকভ ইস্তফা দিতে বাধ্য হলেন।

এর সঙ্গেই যুক্ত ছিল ক্রোনস্তাদের সংকট। দ্বীপ-দূর্গ ক্রোনস্তাদের ৮২,০০০ জন প্রাপ্ত বয়স্কের মধ্যে ছিলেন ২০,০০০ সৈনিক, ১২,০০০ নাবিক এবং যুদ্ধ শিল্পের ১৭,০০০ কর্মী। গোড়া থেকেই ক্রোনস্তাদ অস্থায়ী সরকারকে অস্বীকার করে কেবল সোভিয়েত কার্যনির্বাহী কমিটির কর্তৃত্ব মানত। এপ্রিলের শেষদিকে ক্রোনস্তাদের বলশেভিক সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০০০ এবং সোভিয়েতে ৩০ শতাংশ আসন ছিল তাঁদের ।

মিলিউকভের বক্তব্যে ক্রোনস্তাদে তুমুল আলোড়ন হয়। নগর সোভিয়েতে নতুন নির্বাচন হয়ে বলশেভিক, বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী ও নৈরাষ্ট্রবাদীরা মিলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে১৩ মে নতুন ক্রোনস্তাদ নেতৃত্ব সোভিয়েত রাজ ঘোষণা করে দেয়। ১৪ মে বলশেভিক ও মেঝরায়ঙ্কা নেতৃত্বের পক্ষে ট্রটস্কী ক্রোনস্তাদে গেলেন। তিনি সেদিন এবং দুদিন পরে আবার তাদের কাছে আহ্বান করেন, জঙ্গী লড়াই লড়তে, কিন্তু সারা রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা অভ্যুত্থানের চেষ্টা না করতেপরে যখন ক্রোনস্তাদের বিদ্রোহীদের বিচার করার কথা ওঠে, তখন সোভিয়েত কার্যনির্বাহী কমিটিতে তিনি বলেন, যখন কসাক ফাঁসুড়েরা আসবে, তখন এই জঙ্গী যোদ্ধারাই কিন্তু সোভিয়েতকে বাঁচাবার জন্য প্রাণ দেবে। অর্থাৎ বলশেভিকরা জঙ্গী লড়াইয়ের মেজাজকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কোথাও এককভাবে যাতে সংখ্যালঘু বিদ্রোহ না হয়, তার জন্য সচেষ্ট ছিলেন।

এর পর নতুন সংকট আসে জুন মাসে। ৩ জুন প্রথম সারা রাশিয়া সোভিয়েত কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হয়। জমায়েত হন ২ কোটি শ্রমিক ও সৈনিকের (এবং কিছু ক্ষেত্রে কৃষকের ) প্রতিনিধিরা। বলশেভিক দল ও তার মিত্রেরা ছিলেন প্রতিনিধিবর্গের পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম। কিন্তু রাজধানী পেত্রোগ্রাদে তাঁদের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল। পৌর নির্বাচনে ৮০১ টি আসনের মধ্যে ১৫৬ টি পান তাঁরা, এবং বুর্জোয়া ক্যাডেট দলকে বাদ দিলে, বামপন্থীরা মোট যত ভোট পেয়েছিলেন তার এক  তৃতীয়াংশের বেশী তাঁদের দিকে পড়েছিল। সোভিয়েত কংগ্রেসে আসা দেশের প্রতিনিধিদের সামনে বলশেভিকরা প্রলেতারীয় পেত্রোগ্রাদের মেজাজটা তুলে ধরতে চাইলেন। ইতিমধ্যে প্রথম অস্থায়ী সরকারের পতন ঘটেছে, দশজন বুর্জোয়া ও ছ’জন সমাজতন্ত্রীকে নিয়ে জোট সরকার তৈরী হয়েছিল। বলশেভিকরা স্লোগান হিসেবে রাখেন,  ‘দশজন পুঁজিবাদী মন্ত্রী নিপাত যাক’ ‘সর্ব রুশ সোভিয়েতের হাতে সব ক্ষমতা’ ইত্যাদি।

যে মেনশেভিক- সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশানারী জোট তখন সোভিয়েতের নেতৃত্বে, তাঁরা সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে আদৌ রাজী ছিল না। তাঁরা কংগ্রেসে প্রস্তাব আনলেন, এই দাবিতে কোনো প্রকাশ্য মিছিল চলবে না। কারণ হিসেবে দেখালেন, তাঁদের কাছে খবর আছে, রাজতন্ত্রীরা ষড়যন্ত্র করছে এর সুযোগে গোলযোগ করার। এই অবস্থায় বলশেভিক নেতৃত্ব গভীর আপত্তি সত্ত্বেও একটি বিবৃতি দিয়ে মিছিল রদ করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, রাজতন্ত্রী ষড়যন্ত্র হচ্ছে এই দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে মিছিল স্থগিত রাখা হল, কিন্তু সোভিয়েত কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে প্রকৃত সরকারের সিদ্ধান্ত হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না বুর্জোয়া মন্ত্রীদের হঠিয়ে সোভিয়েতের কাছে দায়বদ্ধ সরকার গঠিত হচ্ছে। অর্থাৎ মিছিল স্থগিত রাখা হলেও, সোভিয়েত আইন ও শ্রেণী- সংগ্রাম  দুইয়ের উপর সমান জোর দেওয়া হল


পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সভা

 

আর কিছু দিন পর বলশেভিকদের পক্ষেও অসন্তোষকে সংহত  রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল। প্রতি পদে  তাঁদের ভয় ছিল, পেত্রোগ্রাদ যেন গোটা দেশের চেয়ে বেশী এগিয়ে না যায়। জুলাই মাসের গোড়ায় তাই ঘটল। প্রথম মেশিনগান রেজিমেন্টের বিদ্রোহী মেজাজকে তাতিয়ে তোলে পার্টির সামরিক সংগঠন। পার্টির পিটার্সবুর্গ কমিটিও লেনিনের সমালোচনা করে, কারণ তিনি লিখেছিলেন, জাতীয় স্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত তখনও মেনশেভিক-এস আর জোটের পক্ষেঅবশেষে ৩ জুলাই, প্রথম মেশিনগান রেজিমেন্ট স্থির করে ,তারা অস্ত্র হাতে বেরিয়ে আসবেই। ট্রটস্কী পরে লেখেন, ৩ জুলাই রাতে বলশেভিক ও মেঝরায়ঙ্কা নেতৃত্বের যৌথ সভা হয়, ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্যে নয়, বরং মিছিল আটকানো হবে, না তাকে সুশৃঙ্খল রূপ দেওয়ার জন্য তার শীর্ষে থাকতে হবে, সেই আলোচনার জন্য। কিন্তু রিপোর্ট আসতে থাকে, ভাইবর্গের শ্রমিক, ক্রোনস্তাদের নাবিক, সকলেই তাতে যোগ দেবেন। লেনিন পরে লিখেছিলেন, ঐ পরিস্থিতিতে স্বতঃস্ফূর্ত গ্ণ-আন্দোলনকে সমর্থন করতে অস্বীকার করার অর্থ হত প্রলেতারিয়েতের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা।

বলশেভিকদের এই ভূমিকা লক্ষণীয়। পারী কমিউনের সময় মার্কস, বা জার্মান বিপ্লবে জানুয়ারী ১৯১৯-এ বার্লিন অভ্যুত্থানে রোজা লুকসেমবুর্গের মতই, তাঁরা ঘটনা ঘটার আগে পর্যন্ত শ্রমিকশ্রেণী ও অন্য  সংগ্রামী জনতাকে সাবধান করতে চেয়েছিলেন, যে অসময়ে অভ্যুত্থান করলে বিপদ হবে, কিন্তু শ্রেণী যখন তা সত্ত্বেও লড়তে আরম্ভ করেছে, তখন শ্রেণীর লড়াইয়ে অংশ নেওয়াই কর্তব্য বলে মনে করেছেন। তফাৎ একটাই ছিল। বিগত কয়েক মাসের রণনীতি, অর্থাৎ পার্টি ও শ্রেণীর মধ্যে ক্রমাগত আদান-প্রদান বাড়ানো, পার্টিকে এমন এক নৈতিক কর্তৃত্ব দিতে পেরেছিল যে তাঁরা ঘটনাটাকে সশস্ত্র মিছিলের স্তরে ঠেকিয়ে রাখতে পারলেন, সামরিক অভ্যুত্থানে পরিণত হতে দিলেন না। পরবর্তী ঘটনাবলী দেখিয়ে দিল, তাঁদের এই কাজ কতটা ঠিক ছিল। এমন কি মস্কোতেও, অধিকাংশ শ্রমিক ও সৈনিক সংহতিমূলক লড়াইয়ে নামেন নি। উপরন্তু, হাতে অস্ত্র ধরলেও সৈনিকরা তখনো মেনশেভিক-এসআর নেতাদেরই ক্ষমতা হাতে নিতে বলেছিলেননরমপন্থীদের সম্পর্কে এই মোহ না কাটলে ক্ষমতা দখলের লড়াই সম্ভব ছিল না

মেনশেভিক-এস আর নেতৃত্ব বিদ্রোহী শ্রমিক ও সৈনিকদের ঠেকাতে কসাক ফৌজ ডাকেনবিদ্রোহী জনতাকেপ্রতিবিপ্লবীআখ্যা দেন, আর লেনিন সম্পর্কে বুর্জোয়া সংবাদপত্রগুলিতে এবং সৈনিকদের একাংশের কাছে প্রচার করা হয় যে লেনিন জার্মানীর চর, তাঁকে তথা বলশেভিক দলকে জার্মান সরকার টাকা পাঠায়  খুন করা হয় এক বলশেভিক কর্মীকেগ্রেপ্তার হন ট্রটস্কী সহ বহু বলশেভিক নেতাআত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন লেনিনবলশেভিকরা এই প্রথম সিদ্ধান্ত নিলেন, যে অভ্যুত্থান ছাড়া ক্ষমতা দখল হবে না, কারণ ফেব্রুয়ারী যে গণতান্ত্রিক বাতাবরণ এনেছিল, তাকে ধ্বংস করা হচ্ছেএরপর কী?’ শীর্ষক পুস্তিকায় ট্রটস্কী লেখেন, “ ৩-৫ জুলাইয়ের দিনগুলো মোড় ঘোরালো ... তারা দেখিয়ে দিল, পেটিবুর্জোয়া গণতন্ত্রের নেতৃস্থানীয় দলগুলি ক্ষমতা হাতে নিতে সম্পূর্ণই অপারগ’’। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প “ নিরন্তর বিপ্লব অথবা নিরন্তর হত্যা কাণ্ড ”। এটা যে নিছক বাগ্মীসুলভ গরম কথা ছিলনা, তার প্রমাণ কর্ণিলভের ষড়যন্ত্র, যাতে শুধু ক্যাডেট দল নয়, কেরেনস্কীও অনেকটা জড়িত ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল শক্তিশালী সরকার ( অর্থাৎ এক রকম বোনাপার্তবাদ ) কায়েম করে কড়া হাতে বলশেভিক ও সবরকম বিদ্রোহী জনতাকে দমন করা[xi]

যে রাজনৈতিক দল কোনো মৌলিক শ্রেণীর (বুর্জোয়া, প্রলেতারীয়) দল, তারা অবশ্যই মনে করে, তারা ক্ষমতায় যাবে। কিন্তু কী ভাবে? বলশেভিকরা নিশ্চয় ভবিষ্যতে গবেষকদের কথা মাথায় রেখে কথা বলতেন না তাই বিভিন্ন সময়ে “ আমরা ক্ষমতা দখল করতে চাই ’’ এমন কথা বলা আশ্চর্যের নয়। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই, তাঁদের কাজের বিবরণ দেখায়, তারা শ্রমিকশ্রেণীর অংশ হিসেবেই ক্ষমতা চেয়েছিলেন, শ্রমিক শ্রেণীর সংগেই ক্ষমতা চেয়েছিলেন।

শ্রমিকশ্রেণী, সোভিয়েত, ফ্যাক্টরী কাউন্সিলঃ

কিন্তু তবু, তাঁরা কি শ্রমিকশ্রেণীকে নিছকব্যবহার করতেচেয়েছিলেন? অর্থাৎ শ্রেণীকে উসকানি দিয়ে তাঁরা একক ক্ষমতা চেয়েছিলেন কি? এর উত্তরে শ্রমিক শ্রেণীর ভুমিকার পর্যালোচনা করতে হয়

১৯১৭-র ফেব্রুয়ারি থেকে রুশ শ্রমিকশ্রেণী ও অন্যান্য শ্রমজীবিরা যেমন নানা প্রতিষ্ঠানে সংগঠিত হচ্ছিলেন, তেমনি, সবরকম প্রতিষ্ঠানেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও হাজির ছিলসোভিয়েত ও ফ্যাক্টরী কাউন্সিল শ্রমিকের সংগঠন, এবং বলশেভিকরা শ্রমিকশ্রেণীরবহির্ভূত, এই দাবি অর্থহীনদুই মার্কিন গবেষক, ডায়েন  কোয়েনকার ও উইলিয়াম রোসেনবার্গ, এক বিপুল সংখ্যক ধর্মঘটের বিশ্লেষণ করে এই ধর্মঘটগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক স্তরে লড়াইয়ের একটা সম্পর্ক দেখাতে চেয়েছেন[xii]গবেষক মাইকেল মেলাসঁ রুশ বিপ্লবের মহাফেজখানা থেকে একটি ফাইল পেয়েছেন, যাতে এপ্রিল থেকে অক্টোবর, কেন্দ্রীয় সোভিয়েত নেতৃত্বের কাছে পাঠানো স্থানীয় সোভিয়েতদের প্রস্তাবসমূহ রয়েছেএমন শতশত প্রস্তাব থেকে একটি ছবি স্পষ্ট ফুটে ওঠেতা হল অক্টোবরের মধ্যে, এমনকি যেসব সোভিয়েত তখনো মেনশেভিক নেতৃত্বাধীন কার্যনির্বাহী সমিতির সাথে চিঠিপত্র লিখছে, তাদেরও বৃহদাংশ সোভিয়েতদের কাছে দায়বদ্ধ সমাজতন্ত্রী সরকারের জন্যই লড়াই করছিল

১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫শে অক্টোবরের মধ্যে কমপক্ষে ১২ লক্ষ শ্রমিক ধর্মঘট শুরু করেনঅন্যদিকে, লড়াইয়ের চরিত্র পাল্টাচ্ছিলঅগাস্ট-সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবর মাইনের দাবিতে ধর্মঘটের সাফল্যের হার কমছিলঅর্থাৎ বুর্জোয়া কাঠামোর মধ্যে যে সব দাবী, মালিকরা সেগুলিকে বেশি বেশি করে অগ্রাহ্য করছিল

অন্য দিকে, ফ্যাক্টরী কাউন্সিলগুলির প্রভাব বাড়ে, উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের লড়াই বাড়েমার্কসের কাছে, সমাজতন্ত্র মানে শুধু উৎপাদন ব্যবস্থার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব রূপ নয়, বরং শ্রমিক শ্রেণীর বিচ্ছিন্নতা বোধের অবসানতেমনি, ১৯০৫-এর বিপ্লবে ট্রটস্কী জোর দিয়েছিলেন, বিপ্লবের সময়ে ন্যূনতম আর পূর্ণ কর্মসূচীর প্রাচীর ভেঙে পড়বে এবং তার প্রধান কারণ হবে, মালিকেরা ন্যূনতম কর্মসুচী রূপায়ণে বাধা দিলে শ্রমিকরা উৎপাদন নিজের হাতে তুলে নেবেন, শিল্প জাতীয়করণ আর শ্রমিক শ্রেণী পরিচালিত সরকারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর প্রশ্ন তুলবেন[xiii]  

১৯১৭-তে কমবেশী এরকমই ঘটেছিলফেব্রুয়ারী বিপ্লবের সূচনা হয় পূর্বপরিকল্পিত পথে বিপ্লব করার জন্য নয়, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির প্রতিবাদ হিসেবেতাই শ্রমিকরা শুধু জারের পতনে খুশী হন নিতাঁরা ৮ ঘণ্টার শ্রমদিবস, ফ্যাক্টরীতে শ্রমিক ও প্রশাসনের সম্পর্কের গণতন্ত্রীকরণ, শোষণের মাত্রা হ্রাস এবং নূন্যতম অধিকারের দাবীতে লড়াই চালিয়ে যানশ্রমিকের কাছে সংবিধান শুধু ভোটের অধিকারের প্রশ্ন ছিল নাতাঁরা যখন সংবিধানসম্মত  ফ্যাক্টরীর দাবী তোলেন, তখন তাঁরা মনে করেন, সমাজে শ্রমিকের পরিস্থিতি ও মর্যাদা বাড়ানোর জন্য ফোরম্যান ও ম্যানেজারদের স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার বিলুপ্তি ছিল আবশ্যকএই গণতন্ত্রীকরণের লড়াই ছিল তীব্রপ্রথমেই, সবচেয়ে ঘৃণিত ফোরম্যান ও প্রশাসকদের তাড়ানো হয়, বা তারা ভয়ে পালিয়ে যায়পুতিলভ ওয়ার্কসের শ্রমিকরা আধা- ফ্যাসিবাদী ব্ল্যাক হান্ড্রেড নেতা পুজানভকে মালের ঠেলায় চাপিয়ে তার মাথায় লাল সিসে ঢেলে তাকে নিকটবর্তী খালে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেনএর পর আসে একের পর এক ফ্যাক্টরীতে পুরোনো শৃঙ্খলার বিধি পোড়ানোতারপর আসে, এর পাল্টা হিসেবে, ফ্যাক্টরী কমিটি গঠন[xiv]

বলশেভিকবিরোধী ইতিহাসবিদরা যখন বলেন, ফ্যাক্টরী কাউন্সিল আন্দোলন বলশেভিকরা সৃষ্টি করেন নি, তাঁরা ঠিকই বলেনস্তালিন রচিত সেই অপূর্ব রচনা, হিস্ট্রি অফ দ্য সি পি এস ইউ (বি)- শর্ট কোর্স ও তার অনুকরণগুলি ছাড়া, এমন দাবী কোথাও নেই যে গোটা লড়াইটা এককভাবে বলশেভিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রনে ঘটেছিলকোনো দল একক চেষ্টায় একটি দেশব্যাপী লড়াইয়ের পূর্ণরূপ দেবে, তা হয়ও নাকিন্তু যখন দাবী করা হয়, ঐ আন্দোলন নৈরাষ্ট্রবাদীরা সৃষ্টি করেছিলেন, তখনও তা মানা যায় নাশ্রমিকশ্রেণী তার জীবন্ত সমস্যার মোকাবিলা করতে গিয়ে এই আন্দোলনের জন্ম দেয়আর তাঁদের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁদের উত্তরোত্তর ক্ষমতা দখলের রণনীতির দিকে ঠেলে দেয়ফলে তাঁরা বলশেভিক নেতৃত্ব গ্রহণ করেনফ্যাক্টরী কমিটিগুলি যখন নির্বাচিত হতে থাকে, তখন দাবী করা হয়, তারাই ফ্যাক্টরীর অভ্যন্তরীণ শৃংখলা রক্ষা করবেপ্রথমে এর বেশী তারা যায় নিকিন্তু লক-আউট, সাবোতাজের সন্দেহ ইত্যাদির ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপরও তাঁরা নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে শুরু করেএকদিকে, মালিকপক্ষ          দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, কঠোর শ্রম-শৃংখলা ছাড়া পথ নেইঅন্যদিকে শ্রমিকরাও নিশ্চিত ছিলেন, পুঁজির বল্গাহীন স্বাধীনতা খর্ব না করলে অর্থনৈতিক সংকট কাটানোর পথ নেই

ফ্যাক্টরী কমিটিগুলি এবার একই সঙ্গে ফ্যাক্টরী স্তরে ম্যানেজারদের উপর নিয়ন্ত্রণ, আর জাতীয় স্তরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দাবী করতে থাকেঅস্থায়ী সরকার এর উত্তরে প্রস্তাব করে, ফ্যাক্টরীগুলোকে কাঁচামালের এলাকায় সরানো হোকতাদের উদ্দেশ্য ছিল, পেত্রোগ্রাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাঙাশ্রমিকরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন

১ জুন, ফ্যাক্টরী কমিটিদের প্রথম পেত্রোগ্রাদ সম্মেলনে বলশেভিকরা প্রস্তাব আনেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে প্রতিষ্ঠান স্তরে এবং জাতীয় স্তরে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ আনা দরকার এবং সেই সঙ্গে দরকার সোভিয়েতদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণেরযারা ফ্যাক্টরী কমিটি আন্দোলনকে বলশেভিক বিরোধী, বা নৈরাষ্ট্রবাদী বলে দাবী করেন, বা তার দাবীদাওয়ার মধ্যে অ-বলশেভিক, খাঁটি প্রলেতারীয় প্রতর্ক খুঁজে পান, তাঁরা এই প্রস্তাবের উপর ভোটাভুটির কথা ভুলে যান। বলশেভিকদের আনা প্রস্তাবটি পায় ২৯৭ ভোট, অর্থাৎ দুই- তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি। নৈরাষ্ট্রবাদীদের প্রস্তাব পায় ৪৫ ভোট, মেনশেভিক প্রস্তাব ৮৫ ভোট।[xv] অর্থাৎ ফ্যাক্টরী কমিটির কাজের অভিজ্ঞতা থেকে শ্রমিকরা ক্রমেই মনে করছিলেন, ক্ষমতা দখল না করলে, এবং কেন্দ্রীয় স্তরেও শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে শুধু ফ্যাক্টরী স্তরে লড়াই যথেষ্ট নয়।

ক্ষমতা দখল পর্যন্ত, এমনকি তার পরেও, বলশেভিকদের এ বিষয়ে দলগতভাবে কোনো ঐক্যবদ্ধ মত ছিল না। তাঁদের রচনায় ও কথায় শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের স্ব-শাসন এবং জাতিয়করণ, বিভিন্ন প্রস্তাবের সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। লেনিন মনে করেছিলেন, বেশী দ্রুত শিল্প অধিগ্রহণ ঠিক হবে না বরং, একদিকে শ্রমিক রাষ্ট্র, আরেক দিকে ফ্যাক্টরী কাউন্সিল, মালিকদের নিয়ন্ত্রণ কড়া নজরে রাখবে। জাতীয়করণের দাবী সীমাবদ্ধ ছিল ব্যাংক এবং কিছু একচেটিয়া সংস্থাকে ঘিরে। বামপন্থী বলশেভিকরা, যথা ক্রিপনিক, চুবার, আন্তিপোভ প্রমুখ মনে করেছিলেন, স্থানীয়ভাবে ফ্যাক্টরী কমিটির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণটাই বড় কথা আর ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা, যথা রিয়াজানভ, লঝভস্কি, শ্লিয়াপনিকভ প্রমুখ কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার উপর জোর দেন।[xvi]

অতএব, শ্রমিকশ্রেণী এই প্রশ্নে বিভক্ত ছিল, বলশেভিক দলও তাই। কেউই ভাবেনি রাতারাতি সব জাতীয়করণ করতে হবে। এমন কি ১৯১৮-র মার্চ পর্যন্ত যত ফ্যাক্টরী জাতীয়করণ হয়, তার ৯৪ শতাংশ হয়েছিল স্থানীয় উদ্যোগে। এই  পরিস্থিতি পাল্টেছিল গৃহযুদ্ধের ফলে। যে ইতিহাসবিদরা দাবী করেন, শ্রমিকদের ঠকিয়ে বলশেভিকরা পার্টি স্বৈরতন্ত্র কায়েম করল, তাঁরা ঐ গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার কথাটুকু ভুলে যান।

সোভিয়েত কংগ্রেস ও অভ্যুত্থানের রাজনীতি

১৯১৭-র শ্রেণী-সংগ্রামে শেষ চালগুলি চালা হয়েছিল অক্টোবরে। অস্থিতিশীল দ্বৈত ক্ষমতা- হয় বুর্জোয়া স্বৈরতন্ত্র অথবা সোভিয়েত রাজ, এই দুই বিকল্পের যে কোনো একদিকে যেতে বাধ্য ছিল। যাঁরা মনে করেন বা দাবী করেন যে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে “বলশেভিকরা কলুষিত করেছিল” তাঁরা বুর্জোয়া শ্রেণীর রণনীতি কি ছিল তা দেখন না। প্রথম অস্থায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল আলেকসিয়েফকে লেখা চিঠিতে খেদ প্রকাশ করেন, যে সোভিয়েতের চাপে পড়ে তাঁকে সেনাবাহিনীর গণতন্ত্রীকরণ মেনে নিতে হয়েছে। অক্টোবর অভ্যুত্থানের অনেক আগেই, নৌ-দপ্তরের সহকারী মন্ত্রী ক্যাপ্টেন দুদারেভ বাল্টিক নৌ-বন্দরের প্রধান অ্যাডমিরাল ভেরদেরভস্কিকে নির্দেশ দেন, ডুবোজাহাজ ব্যবহার করে বলশেভিকপন্থী ব্যাটলশিপ (সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ) গুলিকে দরকার মত ডুবিয়ে দিতে।

৩-৪ জুলাইয়ের ঘটনার পর মিথ্যা দলিলে প্রচার করা হয় যে লেনিন জার্মান চর। ট্রটস্কী, রাসকোলনিকভ ও অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করা। বিশেষ “অ্যাকশন স্কোয়াড” তৈরী শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে কেরেনস্কী ও কর্নিলভ হাত মেলায়। মার্চ মাসেই, শিল্পপতি পুতিলভ নেতৃস্থানীয় ধনিকদের এক গোপন কমিটি তৈরী করেন। এতে যুক্ত হন ক্যাডেট দলের নেতা কাটলার, রুশ-এশীয় ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর ঝাভোইকো ও অন্যরা। জেনারাল আলেক্সিয়েভ, জেনারাল দেনিকিন ও বহু জেনারাল মিলে তৈরী করে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধানদের এক সংগঠন। ১৯১৮-র মধ্যভাগে এরাই শ্বেতরক্ষী বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়।

কর্ণিলভ এদের নেতা হিসেবে দেখা দিয়েই, প্রতিক্রিয়াশীল অফিসারদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়তে শুরু করে। তার উদ্দেশ্য ছিল পেত্রোগ্রাদে সামরিক আইন জারী করা, সোভিয়েত ভেঙে দেওয়া, বলশেভিকদের বে-আইনী ঘোষণা করা এবং সরকারকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা। আর, তার সঙ্গে শতকরা ৯৫ ভাগ পথ একত্রে হাঁটেন “গণতন্ত্রী” কেরেনস্কী[xvii]

এই অবস্থাতে, গণতান্ত্রিকতা বলশেভিকরাই দেখিয়েছিলেন। কর্ণিলভের যড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর আরো একবার সুযোগ আসে, বিনা যুদ্ধে সোভিয়েত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার। তখনও, সোভিয়েতদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীরা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা প্রতিশ্রুতি দেন, সোভিয়েত-ভিত্তিক সমাজতন্ত্রী সরকার প্রতিষ্ঠা করা হলে তাঁরা শান্তিপূর্ণ প্রচারে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন। কিন্তু ঐ দুই দল এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে। জুলাইয়ের শেষ থেকে বলশেভিকদের পিছনে গণসমর্থন বাড়ছিল। ৩ আগস্ট, ওল্ড লেসানার এবং নিউ লেসানার ফ্যাক্টরীর চিকিত্‍সা ফান্ড কমিটির নির্বাচনে তাঁরা ৮০ শতাংশ ভোট পান। ২০ আগস্ট পেত্রোগ্রাদের পৌর নির্বাচনে তাঁরা পান ১,৮৪,০০০ ভোট আর মেনশেভিকরা ২৪,০০০। মস্কোতে বরো নির্বাচনে সেপ্টেম্বরে বলশেভিকরা এককভাবে ৫১ শতাংশ ভোট পান। ৩১ আগস্ট--১ সেপ্টেম্বর রাতে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতে বলশেভিকদের আনা প্রস্তাব যে অস্থায়ী সরকার নয়, সোভিয়েত হোক ক্ষমতার কেন্দ্র, ২৭৯-১১৫ ভোটে গৃহীত হল। ঐ সোভিয়েতের কার্যনির্বাহী কমিটি ইস্তফা দিল। ৯ সেপ্টেম্বর দুপক্ষ পূর্ণশক্তি এনে লড়াই করল, সোভিয়েতের সভাপতিমন্ডলী কার হবে তা স্থির করতে। বলশেভিকরা ৫১৯-৪১৪ (৬৭ ভোটদানে বিরত) জয়ী হলেন। ৬ সেপ্টেম্বর মস্কো সোভিয়েত অস্থায়ী সরকার ও কেন্দ্রীয় সোভিয়েত কার্যনির্বাহী কমিটিকে নিন্দা করে ৩৫৫-২৫৪ ভোটে প্রস্তাব পাশ করে। কিয়েভ সোভিয়েতে ৮ সেপ্টেম্বর বলশেভিক প্রস্তাব জয়ী হয় ১৩০-৬৬ ভোটে। ২১ সেপ্টেম্বর সারাতোভ প্রাদেশিক সোভিয়েতে বলশেভিকদের ছিল ৩২০ ভোট, এস. আর.-দের ১০৩, মেনশেভিকদের ৭৬, পার্টি পরিচিতিহীন ৩৪ জনক্রোনস্তাদে নরমপন্থীদের কার্যত প্রতিনিধিত্বই ছিল না রেভাল, দোরপাত, ওয়েনডেন, তালিন সর্বত্র বলশেভিক-বমপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।

এই পরিস্থিতিতে, পোত্রোগ্রাদ সোভিয়েত ট্রটস্কীর প্রস্তাব গ্রহণ করল, যে প্রথম সোভিয়েত কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিন মাস পরে পরে সোভিয়েত কংগ্রেস ডাকতে হবে। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নরমপন্থী নেতৃত্ব পাল্টা চাপ দিতে থাকে, সোভিয়েত কংগ্রেস না ডাকার জন্য। মস্কো আঞ্চলিক কংগ্রেস, সর্ব-সাইবেরিয় কংগ্রেস, বিয়েলোরুশ কংগ্রেস (মিনস্ক), উত্তর ককেশাস কংগ্রেস, ভ্লাদিমির ও তভারের প্রাদেশিক কংগ্রেস এবং উত্তরাঞ্চলের সোভিয়েত কংগ্রেস (পেত্রোগ্রাদ, মস্কো, আর্কেঞ্জেল, রেভাল, হেলসিংফোরস, ক্রোনস্তাদ, ভাইবর্গ, নারভা, গ্যাটচিনা,জারস্কোয়ে সেলো, বাল্টিক নৌবহর, পোত্রোগ্রাদ কৃষক সোভিয়েত এবং উত্তর পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম ও রুমানীয় ফ্রন্টের সোভিয়েতদের সম্মেলন) সোভিয়েত কর্তৃক ক্ষমতা দখলের দাবী তোলে। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সম্মেলন নাম দিয়ে যে সম্মেলন ডেকে নরমপন্থীরা নিজেদের জন্য নতুন ভিত তৈরী করতে চান, তা ছিল সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। বলশেভিকদের তীব্র সমালোচক, মার্ক ফেরোকেও বলতে হয়েছে, এই সম্মেলনে প্রকৃত সংখ্যাগত শক্তির প্রতিনিধি ছিল না। ১২৫০ জন প্রতিনিধির মধ্যে সোভিয়েতরা পেল ৪৬০টি আসন, সমবায়রা ১৬১টি (যার প্রতিনিধি হল বাণিজ্যিক সমবায়ের কর্মকর্তারা), আর জারের যুগের জেমস্তভোরা ২০০ ও পৌরসভারা ৩০০। এই সম্মেলন যে প্রাক-পার্লামেন্ট বা সাধারণতন্ত্রের পরিষদ তৈরী করল, তাতে উচ্চ শ্রেণীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করে তাদের প্রাধান্য বাড়ানো হল। লেনিন একে প্রতিবিপ্লবের পরিষদ আখ্যা দেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে লেনিন ও ট্রটস্কী অভ্যুখানের প্রসঙ্গ তোলেন। সোভিয়েত কংগ্রেসকে সফলভাবে অনুষ্ঠিত করার জন্যও বলপ্রয়োগের বিকল্প ছিল না। এ প্রসঙ্গে অনুস্টুপে পরেশ চট্টোপাধ্যায়ের উক্তি লক্ষণীয়। তিনি বলেন, দেশের পরিষদগুলির এক বৃহৎ সংখ্যা এই দ্বিতীয় কংগ্রেসে প্রতিনিধি পাঠায় নি, তার কারণ তাঁরা ছিলেন বহু প্রতীক্ষিত সংবিধান সভার বৈঠকের পর্বে পরিষদীয় কংগ্রেস ডাকার বিরোধী।

সংবিধান সভা ডাকতে কদিন লাগে? ফেব্রুয়ারী থেকে অক্টোবর, তা কেন ডাকা হয় না? কিন্তু কোনো বৈপ্লবিক পদক্ষেপ না দিতে চাইলে সংবিধান সভা ছিল ভাল অজুহাত। জমি দখল? সংবিধানসভা স্থির করবে। শান্তি প্রতিষ্ঠা (তখনও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে)? সংবিধান সভা স্থির করবে। সংবিধান সভা দীর্ঘজীবি হোক, যাতে তাকে দিয়ে সোভিয়েতদের ঠেকানো যায়। তারপর তাকেও ফেলা যাবে। ২৬ সেপ্টেম্বর, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সমিতিতে মেনশেভিক নেতা দান প্রস্তাব করলেন, সংবিধান সভার নির্বাচনের স্বার্থে সোভিয়েত কংগ্রেস মুলতুবি রাখা হোক। যে সংগঠনের তাঁরা নেতা, তার নিয়মাবলী অগ্রাহ্য করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকাটাই তাহলে গণতন্ত্র! আর এযুগের বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও তাতে গদগদ হয়ে পড়েন। যখন ট্রটস্কী উত্তরে বললেন, সোভিয়েত কংগ্রেস ডাকা হবেই – বিধিসম্মতভাবে না হলে তলা থেকে নতুন উদ্যোগ ণিয়ে – তখন মেনশেভিকরা পিছু হঠলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁরা তীব্র প্রচার চালাতে থাকলেন, যেন কংগ্রেস বয়কট করা হয়। এই কারণেই, প্রথম কংগ্রেসের চেয়ে দ্বিতীয় কংগ্রেসে প্রতিনিধি সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। কিন্তু দেশের প্রায় সমস্ত জনবহুল এলাকা থেকে প্রতিনিধি এসেছিলেন। অর্থাত্‍, বড় শিল্পাঞ্চল, সেনাবাহিনী, এরা সবাই হাজির ছিল। উপস্থিত আনুমানিক ৬৫০ প্রতিনিধির মধ্যে ৩৯০ জন ছিলেন বলশেভিক সমর্থক, এবং ১৭৯ – ৮০ জন অভ্যুখানের সমর্থক বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী। কিছু দক্ষিণপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী ও মেনশেভিক প্রতিনিধি আসেন নি ধরে নিয়েও বোঝা যায়, প্রতিনিধিত্ব বাড়লে ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত একই থাকত।   

        উপরন্তু, কৃষক সোভিয়েতদের কার্যনির্বাহী সমিতি অভ্যুখানের এবং সোভিয়েত রাজের বিরুদ্ধে হলেও চাপে পড়ে তারা ২৩ নভেম্বর এক জরুরী কংগ্রেস ডাকতে বাধ্য হয়। এর ৩৩৫জন প্রতিনিধির ১৯৫ জন ছিলেন বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী, ৩৭ জন বলশেভিক এবং ২২জন নৈরাষ্ট্রবাদী। ৯-২৫ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নিয়মিত কৃষক কংগ্রেসের ৭৮৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে ৩৫০ জন বামপন্থী এস. আর. এবং ৯১জন বলশেভিক ছিলেন। অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলেও সোভিয়েত রাজের পক্ষেই মত বেশী ছিল।


তাহলে কেন অভ্যুখান আবশ্যক ছিল? প্রশ্নটা যখন স্বঘোষিত মার্কসবাদীরা করেন, তখন কিন্তু বুঝতে হয়, প্রশ্নটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অভ্যুখান কেন দরকার – তার উত্তর হল, সেনাবাহিনীর প্রধানরা, বিচার বিভাগ, ব্যাঙ্ক, সকলেই আনুগত্য ঘোষণা করছিল অস্থায়ী সরকারের প্রতি। কেরেনস্কী যেহেতু স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়বে না, তাই তাকে যে সত্যিই হঠানো হয়েছে, তা দেখাতে পারলে তবেই সার্বভৌম ক্ষমতা সোভিয়েতদের হাতে যাবে। এবং শত্রু শ্রেণীও তা মানতে বাধ্য হবে। বিপ্লব ও শ্রেণী-সংগ্রাম পার্লামেন্টে ভোট নয়। বুর্জোয়াশ্রেণী একটা রাজনৈতিক দল নয়, যারা ভোটে হেরে সঙ্গে সঙ্গে স্পীকারের রুলিং মেনে চুপচাপ বসে পড়বে। পুরানো রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রীয় সংগঠন তাদের হাতেই থাকে। চিলিতে আলেন্দের সরকার, বা স্পেনের পপুলার ফ্রন্ট সরকার (১৯৩৬) এই ভুলই করেছিল। তারা মনে করেছিল, তারা নির্বাচিত সরকার, তাদের রুখবে কে? কিন্তু বুর্জোয়াশ্রেণীর টাকার থলেতে টান পড়লে তারা তখন সংসদীয় রেওয়াজ মেনে চলে না।

এরপরও মিথ্যা প্রচার রয়েছে, কুয়াশা সৃষ্টির চেষ্টা রয়েছে। খুব সংক্ষেপে কয়েকটির দিকে তাকানো যাক।

প্রচার ১ : লেনিন পার্টির হাতে ক্ষমতা চেয়েছিলেন।

উত্তর : এ প্রচার অবান্তর। একটি বিশেষ প্রসঙ্গে লেনিন বলেছিলেন, সোভিয়েত কংগ্রেসদের জন্য অপেক্ষা না করে পার্টির উচিত অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়া। তাঁর এই মত ভুল ছিল, কারণ সোভিয়েতকে এড়িয়ে পার্টি ডাক দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পথে বেরিয়ে আসত না। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি এ ক্ষেত্রে লেনিনের মতকে অগ্রাহ্য করেছিল। যে প্রস্তাব গৃহীত হল না, সেটাই আসল নীতি, এ কেমন কথা? বাস্তবে, যে পন্থা গৃহীত হল তার স্রষ্টা ছিলেন ট্রটস্কী। পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সভাপতি হিসেবে তিনি সোভিয়েত ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সোভিয়েতের নামেই অভ্যুত্থান সংগঠিত করেন। দ্বিতীয় সোভিয়েত কংগ্রেস বসবে কার তত্ত্বাবধানে – কেরেনস্কী না শ্রমিকশ্রেণী? এই প্রশ্ন তুলে সেনাবাহিনীকে জয় করে তিনি অভ্যুত্থানের ভিত্তি রচনা করেন।

প্রচার ২ : অভ্যুত্থান সোভিয়েত করে নি, করেছিল হঠাত্‍ গজিয়ে ওঠা সামরিক বিপ্লবী কমিটি।

উত্তর : পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সভায় গণতান্ত্রিক ভাবে স্থির হয়েছিল, প্রতিবিপ্লবী বিপদের মোকাবিলা করার জন্য একটি সামরিক বিপ্লবী কমিটি তৈরী হবে। সুতরাং, ঐ কমিটি সোভিয়েতেরই কমিটি। এই কমিটিকে রাজধানী রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি হন বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারী লাজিমির। পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের প্রতিনিধিদের ছাড়াও এতে টানা হয় নৌবাহিনী, ট্রেড ইউনিয়ন, ফ্যাক্টরী কমিটি, লাল রক্ষীবাহিনী ও ফিনল্যান্ডের আঞ্চলিক কমিটির প্রতিনিধিদের। মেনশেভিক ও দক্ষিণপন্থী এস. আর. রা এই সব পথে, এবং দলীইয় প্রতিনিধি পাঠিয়ে, নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখাতে পারতেন। তাঁরা স্বেচ্ছায় তা করেন নি। যদি এই কমিটিকে ষড়ষন্ত্রের সদর দপ্তর করারই পরিকল্পনা থাকত তাহলে কি এতটা গণভিত্তি রাখা হত, না মেনশেভিকদের জন্য জায়গা ছাড়া হত?

প্রলেতারিয়েত যে ক্ষমতা দখল করবে, তা তারা খালি হাতে করতে পারে না। তাদের চাই সংগঠন। সেই সংগঠন হল সোভিয়েত ও ফ্যক্টরী কমিটি। চাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সেটা দিল বলশেভিক পার্টি, এবং অংশত বাম এস. আর.রা। চাই অস্ত্র, যা এল সামরিক বিপ্লবী কমিটির মাধ্যমে। এই সব সংগঠনের বাইরে, শুধু কি পানশালায় শ্রমিকশ্রেণীকে খুঁজতে হবে, যেমন বলতে চেয়েছেন হালে, অর্ল্যান্ডো ফাইজেস?[xviii] না হলে, বিপ্লবটা শ্রমিকরা করে নি, বলশেভিকরা করেছিল, এমন মেকী বৈপরীত্য তৈরীর অর্থ কি? তার চেয়ে সহজে বলে দিলেই হয় – বলশেভিকরা জিতলে কিন্তু খেলব না। কিন্তু শ্রেণী-সংগ্রাম তো বাচ্চাদের খেলা নয়। তাই এই উক্তিগুলিও একটা শ্রেণীর দিকেই যায়, আর সে শ্রেণী শ্রমিকশ্রেণী নয়।

সোভিয়েত গণতন্ত্র ও সংবিধান সভা

অক্টোবর অভ্যুখানের পর সোভিয়েত ব্যবস্থা অনেক গভীরতা ও ব্যাপ্তি লাভ করে। গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মানুষ নিজের জীবন চালায়। এমন কি, গৃহযুদ্ধ সত্ত্বেও নীচের দিকে সোভিয়েতগুলি ১৯২০-২১ পর্যন্ত প্রাণবন্ত থাকে। উয়েঝদ্ কংগ্রেসগুলিতে নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সমিতিতে বলেশেভিকদের অনুপাত ছিল ১৯১৯-এ ১২.২. শতাংশ, ১৯২১-এ ৭.৬ শতাংশ। পেত্রোগ্রাদের প্রথম নগর জেলা সোভিয়েত ১৯১৭-র নভেম্বর থেকে ১৯১৮-র জুন পর্যন্ত পৌরসভাকে তো বটেই; কেন্দ্রীয় সোভিয়েত কতৃর্পক্ষ-কেও হঠিয়ে দিয়ে পরিষেবা ইত্যাদি সংগঠিত করতে থাকে। এপ্রিল ১৯১৮ থেকে তারা নিজেদের এলাকার সংবাদপত্র প্রকাশ করে। গৃহযুদ্ধের প্রথম সাড়ার মধ্যেও মে-জুনে ঐ সোভিয়েতের শ্রমিক সম্মেলনে আসেন ১৩৪ জন বলশেভিক, ১৩জন বাম এস আর, ৩০ জন মেনশেভিক ও ২৪ জন এস.আর।[xix] লেনিন যখন বলছিলেন, যে সোভিয়েত, অর্থাত্‍ প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের সমাজতন্ত্রী চরিত্র নিহিত হয়েছে এই তথ্যে যে এই প্রথম গোটা জনগণ প্রশাসন শিখতে শুরু করেছেন[xx], তখন তিনি ভাঁওতা দিচ্ছিলেন না।

এই সময়ে সমালোচকরা আবার রণহুঙ্কার দেন। তাঁদের হাতে পতাকা-সংবিধান সভা। তাঁদের মুখে এই শতাব্দীর মহত্তম বিপ্লবী শহীদদের অন্যতম, রোজা লুক্সেমবুর্গের নাম। লুক্সেমবুর্গও তো সংবিধান সভা ভাঙার সমালোচনা করেছিলেন, তাই নয় কি?

অবিভক্ত সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল তার দ্বিতীয় কংগ্রেসে, ১৯০৩ সালে, নারী ও পুরুষের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংবিধান সভার নির্বাচন দাবী করেছিল। ১৯১৭-তেও এই দাবী বলশেভিক কর্মসূচী থেকে বাতিল হয় নি। তার দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, ট্রটস্কী ছাড়া ১৯১৭-র আগে কেউই মনে করেন নি যে রুশ বিপ্লব বুর্জোয়া সীমানা ছাড়িয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, ১৯১৭-তেওযতক্ষণ না সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বাস্তব রূপায়ন হচ্ছে, ততক্ষণ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে সংবিধান সভার দাবী রাখা আবশ্যক ছিল। উপরন্তু, সংবিধান সভাকেও তখন ক্যাডেট, এস. আর এবং মেনশেভিকরা বানচাল করতে চাইছিল। রয় মেদভেদেভ তাঁর দ্য অক্টোবর রেভল্যুশন বইয়ে এস. আর. নেতা বোরিস সকো্লভের স্বীকারোক্তি তুলে ধরেছেন – যে এস. আর. –রা বাস্তবে সংবিধান সভা বসাতে চাইছিল না, আর যে ক্যাডেট দল কর্ণিলভের অভ্যুখানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তারা তো সংবিধান সভা অবশ্যই চায় নি। সুতরাং, যতক্ষণ না উন্নততর, সোভিয়েত গণতন্ত্র আসছে ততক্ষণ বুর্জোয়া স্বৈরতন্ত্রের প্রতিতুলনায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিকতার নিদর্শন হিসেবে সংবিধান সভার একটা আপেক্ষিক প্রগতিশীলতা ছিল।

        সংবিধান সভার নির্বাচন হয় ১৯১৭-র নভেম্বর-এ। ফল ঘোষিত হয় ৩০ ডিসেম্বর। ৭০৭ জন প্রতিনিধির মধ্যে দলগত ভাগ ছিল নিম্নরূপ :

মোট প্রতিনিধি                   : ৭০৭

এস. আর                       : ৩৭০

মেনশেভিক                      : ১৬

পপুলার সোশ্যালিস্ট               : ০২

ক্যাডেট                         : ১৭

বলশেভিক                       : ১৭৫

বাম এস. আর                   : ৪০

সংখ্যালঘু জাতি                   : ৮৬

অজ্ঞাত                          : ০১

 

এই পরিসংখ্যান দিয়ে করা হয়, এস. আর-রা এখানে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়েছিল। কিন্তু এস. আর দলের ইতিহাসবিদ র‍্যাডকি মনে করেন, সংখ্যালঘু ৮৬ জনের একটা বড় অংশ, এবং বিভিন্ন প্রশ্নে এস. আর-দের একাংশ, বলশেভিক-বাম এস. আর জোটের দিকে যেত, ফলে কোনো স্থিতিশীল অবস্থা হত না।[xxi]

দ্বিতীয়ত, ভোটের ইতিহাস উল্লেখযোগ্য। কোন কোনো এলাকায় ভোট হয়নি। যুদ্ধ এলাকায় সেনাধ্যক্ষরা অস্থায়ী সরকারের পতনের খবর পর্যন্ত লুকিয়ে রেখেছিল। তৃতীয়ত, এস.আর. দের প্রতি যে কৃষক সমর্থন, তার মূলে ছিল, এস. আর –দের পুরোনো কর্মসূচী১৯১৭-তে চের্নভ, আভকসেন্তিয়ভ প্রমুখ সেই কর্মসূচী বর্জন করেছিলেন। পুরোনো কর্মসূচী নিয়ে লড়াই করেছিলেন বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারীরা। তারাই ছিলেন ব্যাপক কৃষক জনতার কাছে বিপ্লবী বলে পরিচিত। কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামোতে তাঁরা ছিলেন দুর্বল। তাই দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের সময়ে তাঁরা বাদ পড়েন। আনুষ্ঠানিকভাবে এস, আর দল ভেঙে তাঁরা আলাদা দল তৈরী করেন ভোটের সামান্য আগে, এবং মাত্র কয়েকটি এলাকায় তাঁরা নিজস্ব প্রার্থী দিতে পেরেছিলেন | কৃষক কংগ্রেসের সঙ্গে সংবিধান সজায় তাঁদের প্রতিনিধির সংখ্যার তারতম্য দেখায় এই ব্যাখ্যা সঠিক | যেখানে স্বতন্ত্র  বাম এস. আর তালিকা ছিল , সেখানে ছবি অন্যরকম |

সারণী – ২

মোট প্রদত্ত ভোটের শতকরা অংশ হিসেব

এলাকা

বাম এস, আর-দের ভোট

দক্ষিণপন্হী এস. আর ভোট

পেত্রোগ্রাদ

কাজান

বাল্টিক নৌবহর

১৬.২

১৮.৯

১৬.৯

০.৫

২.১

১১.৯

 

আরেকটা বিষয়ের উপরও জোর দেওয়া দরকারবুর্জোয়া নির্বাচনী ব্যবস্থায় একজন নাগরিক একা গিয়ে শুধু ভোট দেন সোভিয়েত ব্যবস্থায় শুধু ভোট নয়, স্ব-শাসন চলে তাই যে শ্রমিক বা কৃষক সংবিধানসভায় আপাত নিস্পৃহ, যেখানে নিজে কাজ করছেন, ক্ষমতার অংশীদার হচ্ছেন, সেখানে কিন্তু তিনিই অন্য অবস্থান নিয়েছেন বোরিস সোকোলভ লেখেন যে একটি সৈনিক কংগ্রেসে, এস. আর. – রা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগারিষ্টতা লাভ করেন, কিন্তু ঐ কংগ্রেসেই সোভিয়েত রাজ্যের পক্ষে প্রস্তাবও গৃহীত হয়[xxii]

উপরে বর্ণিত কারণগুলি ব্যাখ্যা করে বলশেভিকরা সংবিধান সভা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন একদিকে, প্রলেতারীয় বিপ্লবের পর এই বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই (কারণ বিকল্প গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে) এই দাবী এবং অন্যদিকে নির্বাচন প্রত্রিূয়ার ত্রুটি, ও বিশেষত এস. আর দলের ভাঙন সংবিধান সভায় প্রতিফলিত না হওয়ার কথা তোলেন তাঁরার‍্যাডকি দেখাচ্ছেন, বলশেভিকদের ঐ মূল্যায়ন ভুল নয় তিনি লিখেছেন, “খবর যত দেরীতে পৌঁছেছে, তত বলশেভিকদের প্রতি সমর্থন কম তাই, সিদ্ধান্তটা অনস্বীকার্য যে দূরবর্তী ফ্রন্টগুলির পিটার্সবুর্গ গ্যারিসনের মত হয়ে ওঠার জন্য শুধু সময়ের দরকার ছিল[xxiii]

সংবিধান সভা ভাঙা মানেই স্বৈরতন্ত্রের সূচনা, এই দাবীর জনক সমাজতান্ত্রিক মহলে কার্ল কাউটস্কি। তিনি এমনকি সংবিধান সভার নির্বাচন যে অস্থায়ী সরকার পিছিয়ে দিয়েছিল, তাকেও সমর্থন করেন তিনি লেখেন, সোভিয়েতগুলিকে  প্রলেতারীয় গনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান বলা যায় না তাঁর মতে, গণতন্ত্র একরকমই হয়, আর তা হল পার্লামেন্টারী ব্যবস্থা।[xxiv]

রোজা লুক্সেমবুর্গের সমালোচনা (Zur Russischen Revolution) একটি অসমাপ্ত পান্ডুলিপি। সংবিধান সভা ভাঙা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, যদি গণচেতনা পাল্টে গিয়ে থাকে, তা হলে আরেকবার নির্বাচন করলেই তো হত। সোভিয়েত বনাম পার্লামেন্ট, এই প্রশ্নে তিনি তখন কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেন নি।

 


Whatever a party can, at a historic hour, provide in the way of courage, drive in action, revolutionary farsightedness, and logic, Lenin, Trotsky, and their comrades gave in full measure. All the revolutionary honor and the capacity for action that were lacking in the Social-Democracy in the West, were to be found among the Bolsheviks. Their October insurrection not only in fact saved the Russian Revolution, but also saved the honor of international socialism.



কিন্তু লুক্সেমবুর্গের এই সমালোচনা আজ ব্যবহার করা ভন্ডামী। ১৯১৮-র শেষে যখন জার্মানীতে বিপ্লব হয়, তখন তিনি ও কাউটস্কি একেবারে উল্টো অবস্থা নিলেন। সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের নামে কাউটস্কি জাতীয় সভার (জার্মান সংবিধান সভা) পক্ষে ওকালতি করলেন। আর লুক্সেমবুর্গ স্লোগান তুললেন, শ্রমিক ও সৈনিক পরিষদগুলির হাতে সব ক্ষমতা চাই। জাতীয় সভা এবং জাতীয় সভা ও শ্রমিক পরিষদ শীর্ষক গুলি প্রবন্ধ তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন, বৈপরীত্যটা আসলে দুটি শ্রেণীর ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে। শ্রেণী-সংগ্রামের তীব্রতম মুহুর্তে দুটি শ্রেণীর ক্ষমতা কাঠামোতে একই সঙ্গে চেপে বসার চেষ্টা করলে হয় যাঁরা প্রচেষ্টা করছেন, তাঁদের পতন হবে, অথবা তাঁরা শ্রমিকশ্রেণীকে ঠকাবেন, বুর্জোয়া আধিপত্যকেই সমাজতন্ত্রবলে চালাবেন, যেমন চালিয়েছিল জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক দল ১৯১৯-২০-তে, লুক্সেমবুর্গ-লিবকনেক্টদের হত্যা করার পরও। অক্টোবর অভ্যুত্থান ও সংবিধান সভা ভাঙার বিরোধীদের জায়গা লুক্সেমবুর্গের সঙ্গে নয়; তাঁর হত্যাকারীদের সঙ্গে।

উপসংহার :- সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, নিছক নির্বাচনভিত্তিক কোনো রাস্তায় এক শ্রেণীর হাত থেকে আরেক শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা যায় নি –বুর্জোয়া শ্রেণী থেকে শ্রমিকশ্রেণীর হাতে তো অবশ্যই নয়। খাঁটি সমাজ বিপ্লব হলেই শান্তি থাকবে, এই দাবী তাই ইতিহাসে প্রমাণিত নয়। আর, সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান পুরোনো নড়বড়ে জারতন্ত্রকে ফেলতে পারে, কিন্তু পাল্টা ক্ষমতা কাঠামো তৈরী করতে হলে সচেতনতা চাই, নেতৃত্ব চাই। বলশেভিক দল শ্রমিকশ্রেণীর উপর চেপে বসা বুদ্ধিজীবী বাহিনী ছিল না। তার ছিল জঙ্গী, রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রঅন্যান্য কেন্দ্র ছিল সোভিয়েত, ফ্যাক্টরী কাউন্সিল, ইত্যাদিএদের মিলিত উদ্যোগে অক্টোবর অভ্যুত্থান হয়। পরে গৃহযুদ্ধ, বলশেভিকদের পদস্খলন, স্তালিনীয় প্রতিবিপ্লব সব সত্ত্বেও এই ইতিহাস ও তার আজকের জন্য তাত্‍পর্য অক্ষত রয়েছে।



১  ড্যানের বক্তৃতার জন্য দেখুন, Mark Jones (Ed), Storming the Heavens: Voices of October, Atlantic Highlands, London, 1987, p.85. শ্যাপিরোর ব্যাখ্যা আছে Leonard Schapiro, The Origins of the Communist Autocracy, Bell, London, 1955.

Richard Pipes, The Russian Revolution 1899-1919, Collins Harvill, London, 1990, p. 491; Marc Ferro, The Bolshevik Revolution, Routledge and Kegan Paul, London, 1985, pp. 257-8; Eric Hobsbawm, ‘Waking from History’s Great Dream’, Independent on Sunday, 4 February, 1991;  পরেশ চট্টোপাধ্যায়, অনুস্টুপ, শারদ সংখ্যা, ১৯৯১, Charles Bettelheim, Class Struggles in the USSR: Third Period 1930-1941, Part One: The Dominated, T.R. Publications, Madras, 1994.

[iii]Ralph Carter Elwood (Ed), The Russian Social Democratic Labour Party 1898 – October 1917, volume 1 of R. H. McNeal, General Editor, Resolutions and Decisions of the Communist Party of the Soviet Union, University of Toronto Press, Toronto, 1974, p. 200; L. Trotsky, The Stalin School of Falsification, Pathfinder Press, New York, 1979, pp. 236-9;

[iv] V.I. Lenin, Collected Works, Volume 24,

[v]Pravda, 7 April 1917.

[vi]স্তালিনের ঐ অবস্থান গোপন করার জন্য ওই সম্মেলনের বিবরণী বহুদিন মুদ্রিত হয় নি। ট্রটস্কী প্রথম তাঁকে বহিস্কারের পর তা ছেপে দেন। ১৯৮৮ সালে অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়নে স্বীকার করা হয়, The Stalin School of Falsification গ্রন্থে মুদ্রিত দলিলগুলি সঠিক।

[vii]Sed’maia (Aprel’skaia) Vserossiskaia Konferentsiia RSDRP (bolshevikov), Moscow, 1958, p.372.

[viii] V. I. Lenin, Collected Works, Volume 25, p.81.

[ix] Voprosy Istorii KPSS, no.2, 1958.

[x] V. I. Lenin, Collected Works, Volume 24, pp. 145-6.

[xi]এ প্রসঙ্গে এখনো সেরা বিবরণ L. Trotsky, History of the Russian Revolution, Volume 2, Aakar, Delhi, 2013.

[xii] Diane P. Koenker and William G. Rosenberg, Strikes and Revolution in Russia, 1917, Princeton University Press, Princeton, N.J., 1989.

[xiii]  L. Trotsky, Permanent Revolution and Results and Prospects, Pathfinder Press, New York, 1976, pp 194-5, 200.

[xiv]S.A. Smith, ‘Petrograd in 1917’, in D. H. Kaiser (Ed), The Workers’ Revolution in Russia 1917, Cambridge University Press, Cambridge, 1987, p.63.  এছাড়া দেখুন  S.A. Smith, Red Petrograd, Cambridge University Press, Cambridge, 1983, এবং David Mandel, Factory Committees and Workers' Control in Petrograd in 1917 , International Institute for Research and Education, Amsterdam, 1993.

[xv] P.N. Amosov et al (Eds), Oktyabrskaya revoliyutsia I Fabzavkomy, Komissiya po izucheniu istorii professional’nogo dvizheniya v SSSR, Moscow, 1927, vol 1, p. 107.

[xvi]S.A. Smith, Red Petrograd, pp. 258-9.

[xvii]কর্নিলভের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ও তাতে কেরেনস্কীর ভূমিকার জন্য ট্রটস্কীর বই ছাড়া দ্রষ্টব্য, J.L. Munck, The Kornilov Revolt: A Critical Examination of Sources and Research. Aarhus University Press, Aarhus, 1987; H. Asher, ‘The Kornilov Affair: A Reinterpretation’. The Russian Review. 29 (3): 286–300, 1970.

 

[xviii]Orlando Figes, A People's Tragedy: The Russian Revolution 1891–1924, Random House, New York, 1996.

[xix] Alexander Rabinowitch, ‘The Evolution of Local Soviets in Petrograd, November 1917 – June 1918: The Case study of the First City District Soviet’, Slavic Review, 46:1, Spring 1987, pp. 20 22-4, 30-32, 37.

[xx] V.I. Lenin Collected Works, vol. 27, p. 272.

[xxi] O. H. Radkey, The Elections to the Russian Constituent Assembly of 1917, Harvard University Press, Cambridge, Mass., 1950.

[xxii]Roy Medvedev, The October Revolution, Constable, London, 1979, p.108.

[xxiii] O. H. Radkey, The Sickle Under the Hammer, Columbia University Press, New York, 1963, pp. 301, 344.

[xxiv]Karl Kautsky, The Dictatorship of the Proletariat, University of Michigan Press, Ann Arbor, 1964, pp 26, 161, 72-87.