Socialist and Peoples' History

১৯১৭-র ফিনল্যান্ডের বিপ্লব

১৯১৭র ফিনল্যান্ডের বিপ্লব

১৯১৭য় রাশিয়ার ঘটনা বহুল পরিস্থিতির তুলনায় ভুলে যাওয়া ফিনিশ বিপ্লব আজ হয়তো আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দেয়।

 

 

 

রচনা- এরিক ব্ল্যাঙ্ক; অনুবাদ- কৌশিক চট্টোপাধ্যায়; সম্পাদনা- কুনাল চট্টোপাধ্যায়

 

 

 

 

 

 

গত শতাব্দীর ইতিহাসবিদগণ ১৯১৭র বিপ্লব বলতে রাশিয়ার কথাই আগে ভাবেন এবং এই বিপ্লবের দুটি বিষয়কে তাঁরা মূলতঃ গুরুত্ব দেন – পেত্রোগ্রাদ এবং রুশ সমাজতন্ত্রীগণ। কিন্তু এটাও ইতিহাসসিদ্ধ যে রুশ সাম্রাজ্য প্রধানত অ-রুশীয়দের দ্বারাই গঠিত হয়েছিল এবং সাম্রাজ্যের সীমানায় টাল-মাটাল অবস্থা সৃষ্টির কারণ ছিল তার কেন্দ্রাঞ্চলে বিস্ফোরণ।

১৯১৭র ফেব্রুয়ারিতে জারতন্ত্রকে রাশিয়ার মাটি থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ায় তা রাশিয়া জুড়ে এক বাঁধভাঙা বৈপ্লবিক তরঙ্গের প্রবাহকে সঞ্চালিত করে। এই ধরনের অভ্যুত্থানের ব্যতিক্রমী চরিত্র হল ফিনল্যান্ড অধিবাসীদের [বা ফিনদের] বিপ্লব। বিষয়টিকে “বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের সুস্পষ্ট শ্রেণী সংগ্রাম” হিসেবে কোনো গবেষক বিবেচনা করতেই পারেন।  

 

ফিনল্যান্ডীয় ব্যতিক্রম

        ফিনল্যান্ডের অধিবাসীরাজারতন্ত্রের শাসনাধীন অনান্য জাতিগুলির মতো ছিলেন না। ফিনল্যান্ডকে১৮০৯ সালে সুইডেন থেকে দখল করারসে দেশকে স্বায়ত্বশাসন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং শেষে তার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পার্লামেন্টেরও অনুমোদন করা হয়েছিল। যদিও জার সেই স্বশাসনকে সীমিত করতে চেষ্টা করতেন, তবু হেলসিঙ্কির রাজনৈতিক জীবন পেত্রোগ্রাদের চেয়ে অনেক বেশী  ছিল বার্লিনের সদৃশ ।

        যে যুগে রুশ সাম্রাজ্যের অন্যত্র সমাজতন্ত্রীরা বাধ্য হতেন গোপন পার্টি সংগঠিত করতে,এবং যেখানে গোপন পুলিশ তাঁদের শিকার করে বেড়াত, তখন ফিনল্যান্ডে সোস্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এস ডি পি) খোলামেলাভাবে আইনি বৈধতার মধ্যেতাদের রাজনৈতিক প্রচার চালাতো জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসীর মত, ফিনরাও ১৮৯৯ সাল থেকে গড়ে তুলেছিলএক বিশাল, শ্রমিক শ্রেণী ভিত্তিকপার্টি এবং এক নিবিড় সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি। তাদের নিজেদের যেমন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাগৃহ ছিল, তেমনি ছিল শ্রমিক নারী গোষ্ঠী, গায়ক সমিতি, ক্রীড়া সংঘ, ইত্যাদি।

রাজনৈতিক দিক থেকে ফিনল্যান্ডীয় শ্রমিক আন্দোলন মূলতঃ পার্লামেন্টকেন্দ্রিক রণনীতিতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল, যেখানে জোর পড়ত ধৈর্যের সঙ্গে শ্রমিকদের শিক্ষিত ও সংগঠিত করার উপর।প্রথমদিকে তারা ছিল নেহাৎইনরমপন্থী, এবং উদারনৈতিকদের সঙ্গে সহযোগিতা ছিল সাধারণ ঘটনা।  

কিন্তু ইউরোপের গণ, আইনি সমাজতন্ত্রী দলগুলির মধ্যে এস ডি পি অনন্য ছিল, কারণ প্রথম মহাযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে তাদের জঙ্গী রাজনীতির তীব্রতা বাড়ে।ফিনল্যান্ড যদি জারের সাম্রাজ্যের অঙ্গ না হত, তাহলে হয়ত ফিনিশ সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটরা অধিকাংশ ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রী দলেদের মত নরমপন্থী পথ ধরত, যেখানে সংসদীয় ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং আমলাতন্ত্রীকরণের ফলে র‍্যাডিকালরা উত্তরোত্তর  অকিঞ্চিতকর বলে গণ্য হতে

কিন্তু ১৯০৫র বিপ্লবে ফিনল্যান্ডের অংশগ্রহণ পার্টিকে বাঁ দিকে ঘুরিয়ে দেয়।এই বছরের নভেম্বরে সাধারণ ধর্মঘটের সময়ে একজন ফিনল্যান্ডীয় সমাজতন্ত্রী নেতা গণ অভ্যুত্থানে পরম বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, “আমরা এক আশ্চর্যজনক সময়কালের মধ্যে বাস করছি … যে সকল মানুষ দাসত্বের জ্বালাকে হাসিমুখে মেনে নিত এবং সবিনয়ে তাকে বয়ে নিয়ে চলতো, সেই সকল মানুষ হঠাৎ করেই তার জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সেই সকল গোষ্ঠী যারা এতদিন পাইন গাছের ছাল খেয়েই খুশী ছিল, তারাও আজ রুটির দাবী করে।”

১৯০৫র বিপ্লবের তরংগের অনুসরণে, নরমপন্থী সমাজতন্ত্রী সাংসদ, ইউনিয়নের নেতারা, এবং পার্টির আমলারা এস ডি পি-র অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু হয়ে ওঠে। ১৯০৬ পরবর্তী সময়ে জার্মান মার্কসবাদী তাত্ত্বিক কার্ল কাউটস্কির ছকে দেওয়া রণনীতির অনুসরণে পার্টির বৃহদাংশ আইনী কৌশল এবং সংসদীয় দিশার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করেন তীক্ষ্ণ শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতিকে । পার্টির একটি প্রকাশনায় বলা হয়, “শ্রেণী বিদ্বেষকে স্বাগত, কারণ এটা একটা সদগুণ।”

এস ডি পি ঘোষণা করল যে কেবলমাত্র একটি স্বাধীন শ্রমিক আন্দোলন শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ এগিয়ে নিতে পারবে, রাশিয়ার হাত থেকে ফিনল্যান্ডের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ও সম্প্রসারণ করতে পারবে, এবং পূর্ণ রাজনৈতিক গণতন্ত্র আনতে পারবে। কালক্রমে সময়ের দাবী হয়ে উঠবে একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। কিন্তু তাঁর আগে পর্যন্ত পার্টিকে সাবধানে নিজের শক্তিবৃদ্ধি করতে হবে এবং শাসক শ্রেণীর সঙ্গে কোনোরকম অসময় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া এড়াতে হবে

বিপ্লবী সোশ্যাল ডেমোক্রেসীর এই কৌশল – তার জংগী মর্মবাণী এবং ধীরগতি কিন্তু অবিচল পদক্ষেপ নিয়ে --ফিনল্যান্ডে ব্যাপক সফলতা পায়। ১৯০৭ সালে প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক পার্টিতে যোগ দেন। ফলে এক সাংগঠনিক প্রকৃতিতে ও পরিচিতিতে এস ডি পি দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্বের বৃহত্তম সমাজতন্ত্রী দলে পরিণত হয়। ১৯১৬র জুলাই মাসে ফিনল্যান্ডীয় সোশ্যাল ডেমোক্রেসী ইতিহাস সৃষ্টি করে যখন তারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম কোনো দেশ যেখানকার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।  কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলির জারতন্ত্রী “রুশীকরণ” প্রক্রিয়ার ফলে রাষ্ট্রক্ষমতার বড় অংশই চলে গিয়েছিল রুশ প্রশাসনের হাতে।কেবলমত্র ১৯১৭ সালেই  সমাজতন্ত্রীরা ধনতান্ত্রিক সমাজে সংসদীয় সমাজতন্ত্রী সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাখার চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে বাধ্য হলেন

 

বিপ্লবের প্রথম মাসগুলিঃ

        ফিনরা যখন পেত্রোগ্রাদের ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের খবর শুনলো, সেই চমকপ্রদ খবরে তারা  প্রথমে কিছুটা বিস্মিত হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই বিস্ময় তারা কাটাতে পারলো যখন দেখলো হেলসিঙ্কিতে থাকা রুশ সেনাঘাঁটির সৈন্যরা তাদের অফিসারদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করছে। বিষয়টি তখন আর নিছক গুজব থাকলো না। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়, “সকালবেলা রাস্তায় সেনারা এবং সাধারণ নাবিকরা মার্চ করছিল তাদের লাল পতাকা নিয়ে। এই সুশৃঙ্খল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় একটা অংশ দেশাত্মবোধক বিপ্লবের-গান জুড়েছিল, আর তাদেরই একটা অংশ লাল ফিতে এবং লাল কাপড়ের টুকরো নিয়ে তাদেরই সঙ্গে কিছুটা বিশৃঙ্খলভাবে হাঁটছিল। শহরের সর্বত্র নীল জ্যাকেট পরা সশস্ত্র বাহিনীর টহলদারি চলছিল। তারা সেনা অফিসারদের অস্ত্র ত্যাগ করে লাল প্রতীক গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছিল। কিন্তু যে অফিসাররা বিষয়টিকে নিয়ে অল্প হলেও প্রতিবাদ করছিল, টহলে থাকা সেনারা তাদের বুলেটে বিদ্ধ করছিল এবং সেখানেই ফেলে রেখে যাচ্ছিল।”

        রাশিয়ান প্রশাসকদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়েছিল। ফিনল্যান্ডে থাকা রুশ সেনাদল পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করে। এবং ফিনল্যান্ডীয় পুলিশী ব্যবস্থাকে পাকাপাকিভাবে ধ্বংস করে ফেলা হয়। রক্ষণশীল লেখক হেনিং সোদেরঝেলম্, এই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ পর্যালোচনা করেছেন। ১৯১৮ সালে করা তাঁর এই সরাসরি অনুসন্ধান মূলতঃ ফিনল্যান্ডের উচ্চ শ্রেণীর বক্তব্যকেই তুলে ধরে। তিনি তাঁর বক্তব্যে হিংসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অধিকার হরণের বিষয়টি প্রসঙ্গে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, “ফিনল্যান্ডীয় পুলিশী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করা  এস ডি পি-র এক ঘোষিত কর্মসূচী। বিপ্লবের শুরুতেই বিপ্লবীদের পক্ষ নিয়ে রুশ সেনা পুলিশ বাহিনীকে একেবারে নীচের স্তর থেকে যেভাবে উচ্ছেদ করে তাতে তার পুনর্বিন্যাস আর সম্ভব হয় না। ফিনল্যান্ডের ‘জনগণ’-ও আর এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা রাখতে পারেন না, এবং এর বিকল্প হিসেবে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আঞ্চলিক সেনাবাহিনীর সহায়তায় গড়ে ওঠে ‘রক্ষীবাহিনী’। এই রক্ষীবাহিনীর সদস্যগণ মূলতঃ ছিলেন লেবার পার্টির সদস্য।”

        পুরনো আঞ্চলিক রুশ প্রশাসনের স্থান কে নেবে? র‍্যাডিকালদের একটা অংশ ‘লাল সরকার’-এর কথা বলেন। কিন্তু তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন না। ফলে প্রস্তাব গ্রহণের কোনো সম্ভাবনা দেখা গেল না। মার্চ মাসে সাম্রাজ্যের অন্য অংশের মতোই ফিনল্যান্ডও ‘‘জাতীয় ক্য’’ গঠনের ডাক দেয়। আশা করা হয় যে রাশিয়ায় সদ্য গঠিত নতুন সরকার ফিনল্যান্ডকে স্বশাসনের অধিকার দেবে। এস ডি পি-র নরমপন্থী অংশের নেতৃত্ব পার্টির দীর্ঘদিনের ঘোষিত অবস্থান থেকে সরে আসেন। তারা ফিনল্যান্ডীয় উদার মতাবলম্বীদের পক্ষ নেন এবং জোট প্রশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালান। বিভিন্ন র‍্যাডিকাল-প্রগতিবাদী-সমাজতন্ত্রী এই ধরনের প্রয়াসকে “বিশ্বাসঘাতকতার নিদর্শন” হিসাবে আখ্যা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না। তারা বিষয়টিকে এস ডি পি-র মার্কসীয় নীতি থেকে বড় মাত্রায় বিচ্যুতি হিসাবেও ব্যাখ্যা দেন। এস ডি পি-র মুখ্য নেতৃত্ব অবশ্য পার্টির অনিবার্য বিভাজন এড়াতে সরকারে যাওয়ার পক্ষে মত দেন।

        এই রাজনৈতিক মধুচন্দ্রিমা ফিনল্যান্ডে বেশী দিন টেঁকে না। নতুন মিলি-ঝুলি সরকার এক সর্বব্যাপী শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভেঙে পড়ে। সারা দেশে অভূতপূর্ব সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরী হয়। এই অভ্যুত্থান কেবলমাত্র কল-কারখানা, অফিস-কাছারিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্রাম-নগর-মহল্লা, রাস্তা-গলি-তস্যগলি - সর্বত্রই তা ব্যাপক আকার নেয়। ফিনল্যান্ডীয় সমাজতন্ত্রীদের একটা অংশ সশস্ত্র শ্রমিক রক্ষীবাহিনী গঠনের ওপর জোর দেন। আরেক অংশ তখন হরতাল, জঙ্গি শ্রমিক-সংঘাত এবং দোকান-কর্মচারী মহলে সক্রিয়তা ওপর গুরুত্ব দেন। এমন পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির বর্ণনায় সোদেরঝেলম্ লেখেন, “এহেন পরিস্থিতিতে সর্বহারা করুণার কাঙালী হয় না, সে তার প্রাপ্য অধিকার দাবী করে। আমি কখনোই মনে করি না যে এই দাবী তাদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বরং বলা ভালো যে খুবই রুক্ষভাবে তারা ক্ষমতা দখলের জন্য হাঁসফাঁস করছিল — ১৯১৭য় ফিনল্যান্ডে যেমনটি ঘটেছিল”

        ফিনল্যান্ডের উচ্চবর্গীয়রা প্রাথমিকভাবে আশা করেছিল যে জোট সরকারে নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীদের অন্তর্ভুক্তি, এস ডি পি-র নীতিকে শ্রেণী সংগ্রামের লাইন থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে সফল হবে। কিন্তু এই প্রত্যাশা অচিরেই হতাশায় পরিণত হয়। এই প্রসঙ্গে সোদেরঝেলমের খেদোক্তি, “অপ্রত্যাশিত দ্রুততার সঙ্গে একটা নিছক উচ্ছৃঙ্খল জনতার-শাসন পরিপূর্ণতা পেতে থাকে। … প্রথম এবং প্রধান কারণ হয় লেবার পার্টির রণকৌশলগুলি। যদি এটাও ধরে নেওয়া হয় যে লেবার পার্টি তাঁর অফিসিয়াল চালচলনে, আচরণে কিছুটা মার্জিত ভাব প্রকাশ করে, তাহলেও এটা সত্য যে বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে পার্টির বিক্ষোভনীতি তখনও অক্লান্ত উদ্যমের সঙ্গে সচল ছিল।”

        যেখানে সরকারে ঢোকা নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা, এবং শ্রমিক আন্দোলনে তাঁদের মিত্ররা, গণ অভ্যুত্থানের তীব্রতা কমাতে সচেষ্ট হলেন, সেখানে পার্টির বিপ্লবী বামপন্থী অংশ একনিষ্ঠভাবে ডাক দিতে থাকলেন বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে ভাঙ্গনের। এই দুই সমাজতন্ত্রী মেরুর মধ্যে ছিল এক দোদুল্যমান মধ্যবর্তী ধারা,  এই পরিস্থিতি সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে একটা মেরুকরণকে অনিবার্য করে। সেই মেরুকৃত অবস্থানের মধ্যে যারা নতুন প্রশাসনকে সীমিত সমর্থন করতে থাকে। আর, যদিও এস ডি পি-র বেশিরভাগ নেতাই সাধারণভাবে সংসদীয় ক্ষেত্রকে অগ্রবর্তী করতে চাইতো, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরু অংশ সমর্থন করত, বা অন্তত গা ভাসাতো, নীচের থেকে বিক্ষোভের জোয়ারে।

         অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধের ঝড়ের মুখোমুখি হয়ে ফিনল্যান্ডের বুর্জোয়াশ্রেণী উত্তরোত্তর আক্রমণাত্মক এবং আপসবিমুখ হয়ে পড়ে। ইতিহাসবিদ মরিস ক্যারেজলক্ষ্য করেছেন যে ফিনল্যান্ডের উচ্চবিত্ত শ্রেণী কোনোদিনই সাক্ষাৎ শয়তান বলে দেখত যে রাজনৈতিক কাঠামোকে, তার সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিতে” হাল ছেড়ে দেওয়া ভাব দেখায় নি।

শ্রেণী মেরুকরণঃ           

        গ্রীষ্মকাল থেকে ফিনিশ জোট সরকারের ভিতর থেকে ভেঙ্গে পড়া শুরু হল। আগস্টের মধ্যে সাম্রাজ্যের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছিল, এবং অনাহারের প্রেত ফিনল্যান্ডের শ্রমিকদের গ্রাস করতে বসেছিল। এই মাসের শুরু থেকেই গোটা ফিনল্যান্ড জুড়ে খাদ্যের জন্য দাঙ্গা বাঁধতে শুরু করলো। এস পি ডি-র হেলসিঙ্কিসংগঠন সরকার সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে নির্ণায়ক পদক্ষেপ নিতে অস্বীকার করায় তাকে তীব্রভর্ৎসনা করেএই প্রসঙ্গে এস পি ডি-র বামপন্থীদের প্রধানতাত্ত্বিক অটো কুসিনেন, যিনি পরের বছর ফিনল্যান্ডের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিলেন, তিনি লেখেন, “ক্ষুধার্ত শ্রমজীবী মানুষ অচিরেই জোট সরকারের ওপর সকল আস্থা হারায়।”

জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে সমাজতন্ত্রীদের আপসবিমুখ অবস্থান পুনরায় শ্রেণী মেরুকরণে গতি আনে। ফিনল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ জীবনে রাশিয়ার নাক গলানো বন্ধে সমাজতন্ত্রীরাকঠোর লড়াই করেন তাঁরা আশা করেন  যে স্বাধীনতা অর্জন করে সংসদে তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং শ্রমিকদের রক্ষীবাহিনীর উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণের উপর ভিত্তি করে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কারের কর্মসূচী ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।

জুলাই মাসে একজন সমাজতন্ত্রী নেতা বলেন, “এযাবৎ আমরা দুটো শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে বাধ্য হয়েছিলাম -- আমাদের নিজেদের বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে, এবং রুশ সরকারের বিরুদ্ধে। যদি আমাদের শ্রেণী যুদ্ধকে সফল হতে হয়, এবং যদি আমরা আমাদের সকল ক্ষমতা একটা রণক্ষেত্রে জড়ো করতে পারি, আমাদের নিজেদের বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে, তবে আমাদের চাই স্বাধীনতা, যার জন্য এখনই সুপরিণত।”

ফিনল্যান্ডের রক্ষণশীল এবং উদারপন্থী উভয় পক্ষই তাদের নিজেদের প্রয়োজনে ফিনল্যান্ডের স্বায়ত্বশাসন জোরদার করতে চায়। কিন্তু এই লক্ষ্যপূরণে তারা কেউই বৈপ্লবিক পদ্ধতি অনুসরণে ইচ্ছুক ছিলেন না। এমনকি এক পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য তারা এস পি ডি-লড়াইকেও সমর্থন করত না।

জুলাই মাসে সংঘাত চূড়ান্ত আকার নেয়। ফিনল্যান্ডের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজতন্ত্রীরা  এক দিগন্তকারী ভালতালাকি (ক্ষমতার আইন)বিল আনে। ক্ষমতা–আইন প্রসঙ্গে এই বিল ফিনল্যান্ডকে একটি পূর্ণ সার্বভৌম দেশ হিসাবে দাবি করে। সংসদে রক্ষণশীল সংখ্যালঘু অংশ অবশ্য এর তীব্র বিরোধিতা করে। কিন্তু সংখ্যাগুরুর ভোটে ১৮ই জুলাই তা সংসদে পাশ হয়ে যায়। কিন্তুলেকজান্ডার কেরেনেস্কর নেতৃত্বে রাশিয়ার অস্থায়ী সরকার তৎক্ষণাৎ ভালতালাকি-র বৈধতাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে খারিজ করার নির্দেশিকা জারি করে। এই ঘোষণা কার্যকরী না হলে প্রয়োজনে ফিনল্যান্ড দখল করার হুমকিও রাশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে দিয়ে রাখা হয়।

ফিনল্যান্ডের সমাজতন্ত্রীদের তখন আর পিছিয়ে আসার কোন জায়গা নেই। তারা ভালতালাকি-র দাবি ছাড়তেও নারাজ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে ফিনল্যান্ডের উদারপন্থী এবং রক্ষণশীল উভয় অংশই তৎপর হয়। এস পি ডি-কে জন-বিচ্ছিন্ন করার প্রত্যাশায় এবং সংসদে তাদের সংখ্যাধিক্য–অবস্থান খর্বের লক্ষ্যে তারা কেরেনেস্কির সিদ্ধান্তে অসূয়ক সমর্থন জানায়, এবং কেরেনস্কী কর্তৃক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ফিনিশ সংসদ  ভেঙ্গে দিয়ে পুনরায় নির্বাচনের পক্ষে মত দেয়। নতুন নির্বাচনে অ-সমাজতন্ত্রীরা অল্প কিছু আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে

ফিনল্যান্ডের সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনা এক নির্ণায়ক সন্ধিক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্ত পর্যন্ত,  শ্রমজীবী মানুষের কাছে এবং তাদের সাংসদদের কাছে এই প্রত্যাশা প্রবল ছিল যে সংসদকে ব্যবহার করেও সামাজিক অগ্রগতির পথ নিশ্চিত করা সম্ভব। এই প্রসঙ্গে কুসিনেন লেখেন, “আমাদের বুর্জোয়া শ্রেণীর কোনো সেনা দল ছিল না। এমনকি তাদের কোনো পুলিশ বাহিনীও নেই যাদের উপর তারা ভরসা করতে পারে। … অতএব সেখানে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল যে সংসদের বৈধতার বাঁধা পথেও সোশ্যাল ডেমোক্রেসী একটার পরও একটা  জয় ছিনিয়ে আনতে পারবে।”

কিন্তু উত্তরোত্তর বেশী সংখ্যায় পার্টি নেতৃত্ব এবং শ্রমিকদের কাছেএটা ক্রমশঃ স্পষ্ট হচ্ছিল যে সংসদের উপযোগিতা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

সমাজতন্ত্রীরা গণতন্ত্র বিরোধী ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থানের তীব্র নিন্দা করে এবং ফিনল্যান্ডের জাতীয় অধিকার এবং তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে রুশ রাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন আঁতাত করার জন্য বুর্জোয়াদের আচ্ছারকম কষাঘাত করেন। এস ডি পি-র মতের, নতুন  সংসদ নির্বাচন অবৈধ এবং এক বৃহত্তর নির্বাচনী প্রতারণায় তাদেরকেপরাজিত করা হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি পার্টি তার সকল সদস্যকে সরকার থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। কম তা ৎ পর্যপূর্ণ নয়, যে এই সময় থেকে ফিনল্যান্ডের সমাজতন্ত্রীরা ক্রমান্বয়ে বলশেভিক পার্টির সঙ্গে নিবিড় সংযোগনিষ্ঠ হতে থাকে, কারণ বলশেভিকরা ছিল রাশিয়ার একমাত্র পার্টি যারা ফিনল্যান্ডবাসীর স্বাধীনতার লড়াইকেসমর্থন করছিল। সব পক্ষই এইভাব লড়াইয়ের ঘোষণা করেছিল, এবং এযাবৎ শান্তিপূর্ণ ফিনল্যান্ড বিপ্লবী বিষ্ফোরণের দিকে  সরবে এগিয়ে যায়।

 

ক্ষমতার জন্য লড়াইঃ                                    

         অক্টোবরে রুশ সাম্রাজ্য জুড়ে এক সর্বব্যপী সংকট ঘনীভূত হয়। ফিনল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণী গ্রাম ও শহর জুড়ে ক্রুদ্ধভাবে তাদের নেতৃত্বকে ক্ষমতা দখলের দাবী জানায়। হিংসাশ্রয়ী সংঘর্ষ গোটা ফিনল্যান্ড জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে অবশ্য এস ডি পি নেতৃত্বের একটা বড় অংশ এই ধারণাও পোষণ করতো যে বিপ্লবের পরিপূর্ণ পরিসর তখনও ফিনল্যান্ডে তৈরি হয়নি কারণ শ্রমিক শ্রেণী তখনও তেমনভাবে সংগঠিত নয় এবং তাদের হাতে যথেষ্ট পরিমান অস্ত্র নেই। আর এক অংশ আবার সংসদীয় অবস্থা পরিত্যাগে কিছুটা ভয় পায়। এই প্রসঙ্গে অক্টোবরের শেষ দিকে সমাজতান্ত্রিক নেতা কুলেরভো মান্যের লেখেনঃ “আমরা বেশীদিনের জন্য বিপ্লবকে এড়িয়ে চলতে পারি না। … শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের মূল্য আজ বিশ্বাস হারিয়েছে। এবং শ্রমিক শ্রেণী আজ তার নিজের ক্ষমতার ওপরই কেবল আস্থা রাখতে শুরু করেছে। … আমরা যদি বিপ্লবের গতিময় দিকটিকে ভুল বুঝি, আমি উল্লসিত হবো।”  

        অক্টোবরের শেষ দিকে বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করায় এটা মনে হল যে এর পরেই বুঝি ফিনল্যান্ডের পালা। কিন্তু তেমনটা ঘটলো না। রাশিয়ার অস্থায়ী সরকারের কাছ থেকে সামরিক সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়ে ফিনল্যান্ডের উচ্চবর্গীয়রা বিপজ্জনকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।একাধিক দশ হাজারের মাপের রুশ সেনা ফিনল্যান্ডে মজুত ছিল, এবং তারা সাধারণভাবে বলশেভিকদের এবং তাঁদের শান্তির ডাককে সমর্থন করত। একজন ফিনিশ উদারপন্থী মন্তব্য করেন “বলশেভিকবাদের বিজয় তরঙ্গ আমাদের সমাজতন্ত্রীদের বল যোগাবে, এবং তারা অবশ্যইসেটা কাজে লাগাবে”

        এস ডি পি-র সাধারণ কর্মীরা, এবং  পেত্রোগ্রাদেবলশেভিকরা ফিনল্যান্ডের সমাজতন্ত্রী নেতাদের অতিসত্ত্বর ক্ষমতা দখলের অনুরোধ করেন। কিন্তু পার্টি নেতৃত্ব কৌশলে বিষয়টিকে এড়িয়ে যায় এটা প্রায় সকলের কাছেই অস্পষ্ট ছিল, যে বলশেভিক সরকার কয়েকদিনের বেশী টিকবে কি না। নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীরা যে বদ্ধমূল প্রত্যাশা আকড়ে থাকেন, তা হল শান্তিপূর্ণ সংসদীয় পথেই বর্তমান সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। কিছু র‍্যাডিকাল অবশ্য বলেন যে ক্ষমতা দখল যুগপৎ শুধু সম্ভবই নয়, এটা সেই সময়ের প্রধান চাহিদাও বটে। এই দুই প্রকার সম্ভাবনার মধ্যে কোনটি গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়ে বেশিরভাগ নেতাই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।  

         এই সংকটময় পরিস্থিতিতে পার্টির সিদ্ধান্তহীনতাকে স্মরণ করে কুসিনেন লেখেন, “আমরা সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটরা ‘শ্রেণী সংগ্রামের ভিত্তিতে একত্রিত’ হয়েছিলাম, কিন্তু তারপর প্রথমে একদিকে এবং পরে অন্য আর একদিকে আমরা ঝুঁকলাম। এইভাবে আন্দোলিত হতে থাকায় বিপ্লব প্রসঙ্গে আমরা কোনো জোরালো শিক্ষা পেলাম না, কেবল নিজেদের দুর্বলতাগুলিকেই বজায় রেখে চললাম।”         

        সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পক্ষে কোনো ঐকত্যে না আসতে পারায়, পার্টি কেবলমাত্র ১৪ই নভেম্বর একটা সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়-- বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে, শ্রমিকদের আশু অর্থনৈতিক চাহিদাপূরণে, এবং ফিনল্যান্ডের  সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই হিসাবেসমাজের একেবারে নীচের তলা থেকে সমর্থন ছিল অভাবনীয়। বস্তুত, তা অপেক্ষাকৃত সাবধানী ধর্মঘটের সচেতন আবেদনের তুলনায় অনেক বেশী এগিয়ে যায়

        ফিনল্যান্ড একদম থমকে দাঁড়ালবিভিন্ন শহরে এস ডি পি-র আঞ্চলিক সংগঠনগুলি এবং লাল রক্ষীবাহিনী ক্ষমতা দখল করে, রণনীতিগতভাবে জরুরী বাড়িগুলি দখল করে এবং বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করে।

        মনে হল, অভ্যুত্থানের এই ধাঁচ হেলসিঙ্কিতে দ্রুত পুনরাবৃত্তি হবে১৬ই নভেম্বর রাজধানীর সাধারণ ধর্মঘট কাউন্সিল ক্ষমতা দখলের পক্ষে ভোট দেয়। কিন্তু নরমপন্থী ইউনিয়ন এবং সমাজতন্ত্রী নেতৃত্বের একটা অংশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করলে কাউন্সিল সেইদিনই তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। কাউন্সিল স্থির করে, “যেহেতু কাউন্সিলে কিছু ছোটখাটো মতানৈক্য আছে তাই এখনই শ্রমিক শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা নিতে অপারগ, কিন্তু বুর্জোয়া শ্রেণীর ওপর চাপ বাড়াতে প্রয়োজনীয় কর্মসূচী ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে।” এর অল্পকাল পরই ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

        ফিনল্যান্ডের ইতিহাসবিদ হান্নু সৈক্কানেন খুব জোরের সঙ্গে দাবী করেন যে নভেম্বরের ধর্মঘট একটা বড় সুযোগ হাতছাড়া করে। তাঁর কথায়ঃ

        “শ্রমিক সংগঠনগুলির কাছে ক্ষমতা দখলের যে এটা সবচেয়ে ভালো সময় সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কমই ছিল। নিচের স্তর থেকে চাপ ছিল সবচেয়ে বেশী এবং এর জন্য তারা লড়াই করতেও প্রস্তুত ছিল। …সাধারণ ধর্মঘট বুর্জোয়া শ্রেণীকে, মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম ছাড়া, বুঝিয়েছিল যে সমাজতন্ত্রীরা গভীর বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারা প্রকাশ্য গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত সময়টা ব্যবহার করল দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের পরিচালনায় নিজেদের সংগঠিত করতে।”

        গণঅভ্যুত্থানের অভিমুখে তাকাতে এস ডি পি-র ইতস্তত ভাব দেখে আন্টনী আপটন লিখছেন, “ফিনল্যান্ড বিপ্লবীগণ ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত বিপ্লবী”। এই ধরনের বক্তব্য মানা যেত, যদি আমাদের গল্পটা  নভেম্বরে শেষ হয়ে যেত। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাবলী দেখাল, ফিনল্যান্ডের সোশ্যাল ডেমোক্রেসীর বিপ্লবী হৃদয় শেষ অবধি অন্তর্দ্বন্দ্বে জয়ী হয়েছিল।   

        সাধারণ ধর্মঘটের পর হতাশ শ্রমিকরাঅস্ত্রের খোঁজ করেন এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রামের দিকে তাকান। সরাসরি প্রত্যাঘাত দাবী করে এবং সংগঠিত হতে থাকে। বুর্জোয়া শ্রেণীও অবশ্য তখন বসে নেই। গৃহযুদ্ধের প্রস্তুতি তখন তারাও নিতে শুরু করেছে। আপন স্বার্থরক্ষায় গড়ে তুলেছে “হোয়াইট গার্ড” রক্ষীবাহিনী। গোপনে যোগাযোগ চলছে জার্মান সরকারের সঙ্গে যাতে তারা সৈন্যবাহিনীর সাহায্য নিশ্চিত করে।

        সামাজিক সংসক্তিপ্রবণতার দ্রুত অবলুপ্তি সত্ত্বেও বহু সমাজতন্ত্রী নেতা নিষ্ফল সংসদীয় আলোচনা চালাতে থাকেন। কিন্তু এই দফায়  এস ডি পি-র বামপন্থী ধারা মেরুদন্ড শক্ত করেন ও ঘোষণা করেন যে বিপ্লবী পথ ধরতে আর দেরী হলে কেবল সর্বনাশই হবে।  ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারীর শুরু পর্যন্ত পার্টির আভ্যন্তরীণ পরিমণ্ডলে লড়াই করে র‍্যাডিকালরা অবশেষে জয়যুক্ত হলেন।

        জানুয়ারিতে এস ডি পি-র বৈপ্লবিক বক্তব্য কাজে পরিণত হয়।অভ্যুত্থানের সূচনা সংকেত দিতে পার্টির নেতৃত্ব এই মাসের ২৬ তারিখের সন্ধ্যায় হেলসিঙ্কির শ্রমিক হলের গম্বুজের মাথায় একটা লাল লন্ঠন ঝুলিয়ে দেয়। পরের দিন থেকেই সোশ্যাল- ডেমোক্র্যাটরা এবং তাদের শ্রমিক সংগঠনগুলির জোট, ফিনল্যান্ডের সকল বড় শহরগুলিতে ক্ষমতা খুব সহজেই দখল করে নেয়। তার বিপরীতে ফিনল্যান্ডের উচ্চ শ্রেণীর হাতে থাকল মূলত উত্তরের গ্রামীণ এলাকা।

        ফিনল্যান্ডের বিদ্রোহীরা এক ঐতিহাসিক বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বলা হয় বিপ্লবের প্রয়োজন তখনই অনুভূত হয়েছে যখন ফিনল্যান্ডের বুর্জোয়া শ্রেণী বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার এবং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটা প্রতি-বিপ্লবী অভ্যুত্থান চালিয়েছেঃ

        “শ্রমিক শ্রেণী এবং তাঁর সংগঠনগুলির ওপর ভিত্তি করেই ফিনল্যান্ডে বৈপ্লবিক ক্ষমতার প্রসার ঘটেছে। … সর্বহারা বিপ্লব হল এক মহৎ আদর্শ এবং তা আপসহীন। … মানুষের উদ্ধত শত্রুর বিরুদ্ধে সে শক্তি বড়ই কঠিন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রান্তিক, বঞ্চিত, শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের সাহায্যার্থে সে সদা তৎপর।”

        সদ্য গঠিত লাল সরকার প্রথমে চেষ্টা করে খুবই সচেতন ও সাবধানী পথে তার কাজ চালাবারকিন্তু ফিনল্যান্ড দ্রুত নেমে গেল এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে। ক্ষমতা দখলের এই দেরী ফিনিশ শ্রমিক শ্রেণীর অনেক ক্ষতি করে দিয়েছিল, যেহেতু জ্যানুয়ারির মধ্যে অধিকাংশ রুশ ফৌজ দেশে ফিরে গিয়েছিল। নভেম্বরের ধর্মঘট থেকে জানুয়ারির শেষ - এই তিন মাস সময় বুর্জোয়া শ্রেণী হাতে পেয়েছিল যেখানে তারা নিজেদের সশস্ত্র করে তুলতে এবং জার্মানির সাহায্য নিশ্চিত করতে কাজে লাগায়। এই গৃহযুদ্ধে লাল রক্ষীবাহিনীর সাতাশ হাজার তাজা প্রাণ সমর্পিত হয়েছিল। ১৯১৮ সালের এপ্রিলে ফিনল্যান্ডীয় সমাজতন্ত্রী শ্রমিক প্রজাতন্ত্র ধ্বংস করে দক্ষিণপন্থীরাআরও আশি হাজার শ্রমিক ও সমাজতন্ত্রীকে বন্দী শিবিরে নিক্ষেপ করেছিল।

        ফিনল্যান্ডের বিপ্লব আগে শুরু হলে এবং আরো আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ও সামরিক রণনীতি নিলে জয়যুক্ত হত কি না তা নিয়ে ইতিহাসবিদরা বিভক্ত। কেউ কেউ মনে করেছেন যে চূড়ান্ত নির্ণায়ক উপাদান ছিল ১৯১৮-র মার্চ ও এপ্রিলে সাম্রাজ্যবাদী জার্মান সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ। কুসিনেনও এমনই এক হিসেব টেনে বলেছেন

        “আমাদের বুর্জোয়া শ্রেণীর বিলাপে জার্মান সাম্রাজ্যবাদ কান দিয়েছিল। এবং ফিনল্যান্ডের সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাদের অনুরোধেরাশিয়ার সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ফিনল্যান্ডকে যে স্বাধীনতা দিয়েছিল, তাকে জার্মানরা গ্রাস করতেগ্রহী হয়েছিল। ফিনল্যান্ডের বুর্জোয়া শ্রেণীর জাতীয়তাবাদী চেতনা এতে কষ্ট পায় নি। বৈদেশিক সাম্রাজ্যবাদের জোয়াল কাঁধে তুলে নিতে তাদের একটুকুও ভয় করে নি। বরং তারা এটা ভেবে নিজেদের খুশী রেখেছিল যে তাদের ‘পিতৃভূমি’ ক্রমে শ্রমিক শ্রেণীর পিতৃভূমিতে পরিণত হচ্ছে। ফলে তারা স্বেচ্ছায় তাদের দেশবাসীকে মহান জার্মান দস্যুদের হাতে উৎসর্গ করলো যা তাদের নিজেদের জন্য দাস চালকের হীনমর্যাদার অবস্থানকে নিশ্চিত করে।”

 

শিক্ষণীয় বিষয়সমূহঃ

        ফিনল্যান্ডের বিপ্লব থেকে আমরা কি পেলাম? এই ঘটনা অবশ্যই আমাদের সামনে হাজির করলো যে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লব একমাত্র মধ্য রাশিয়ার ঘটনা নয়। এমনকি শান্তিপূর্ণ সংসদীয় ফিনল্যান্ডেও শ্রমিক  শ্রেণী ক্রমেই মিনে করতে থাকে যে একমাত্র একটি সমাজতন্ত্রী সরকারই পারে তার জাতীয় নিপীড়ন ও সামাজিক সংকটকে মুছে ফেলতে।

        একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে একমাত্র বলশেভিকরাই সাম্রাজ্যের ভিতরে শ্রমিক শ্রেণীকে ক্ষমতা দখলের পথে পরিচালিত করেনি। একটু অন্যভাবে দেখলেও দেখা যায় যে ফিনল্যান্ডের এস ডি পি এই অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে যেখানে বিপ্লবের সাবেকী রূপ আদতে কার্ল কাউটস্কির প্রস্তাবিত রণনীতির সমর্থন করে : ধৈর্যের সঙ্গে শ্রেণী সচেতন সংগঠন ও শিক্ষার মাধ্যমে সমাজতন্ত্রীরা সংসদে সংখ্যাধিক্য লাভ করে, ফলে  দক্ষিণপন্থীরা সেই প্রতিষ্ঠানটিকেই ভেঙ্গে দিতে চায়, যা আবার সমাজতন্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত বিপ্লবের বারুদে বিক্ষোভের ফুলকি ছড়ায়।

        একটা রক্ষণাত্মক সংসদীয় রণনীতির প্রতি পার্টির অগ্রাধিকার তাকে পুঁজিবাদী শাসন অবসানের লক্ষ্যপূরণে এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বিপরীত দিকে কাউটস্কির রণনীতি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যাগ করা আমলাতান্ত্রিক জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাসি, ১৯১৮-১৯ সালে পুঁজিবাদী শাসনকে সক্রিয়ভাবে তুলে ধরে এবং তাকেউল্টানোর চেষ্টাকে হিংসাশ্রয়ী ধ্বংসাত্মক পথে পরাস্ত করেছিল।

 

        ফিনল্যান্ড বৈপ্লবিক সামাজিক গণতন্ত্রের শুধুমাত্র সামর্থ্যগুলিকেই প্রকাশ করেনি, কিছু সম্ভবনাময় দুর্বলতাকেও তুলে ধরেছিলঃ সংসদীয় মল্লভূমি পরিত্যাগ করতে একটা দ্বিধা;গণক্ষোভের আঁচ না বুঝতে পারা ও তাকে খাটো করা; এবং পার্টির ঐক্য ধরে রাখতে নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে সহমতে আসার প্রবণতা