Socialist and Peoples' History

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কাহিনী

জ্যাকব্যাঁ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ২০১৭ ধরে রুশ বিপ্লবের উপর অনেকগুলি প্রবন্ধ প্রকাশিত হবে। ইতিমধ্যেই চারটি প্রকাশিত হয়েছে। আমরা সেগুলির বাংলা অনুবাদ (প্রয়োজনে কিছু টীকা সহ, কিন্তু মূল প্রবন্ধের পরিবর্তন না ঘটিয়ে) প্রকাশ করছি। প্রবন্ধগুলির মতামত লেখকদের।-- অ্যাড মিনিস্ট্রেটার – র‍্যাডিকাল সোশ্যালিস্ট।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কাহিনী

 

১৯১৭ সালের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে রুশ শ্রমিকদের ধর্মঘট শুরু হয়। শেষ হয় জার শাসনের অবসান ঘটিয়ে।

 

কেভিন মারফি

বাংলা অনুবাদ আত্রেয়ী দাশগুপ্ত, সম্পাদনা কুণাল চট্টোপাধ্যায়

 

 

১৯১৭ সালের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে (পুরোনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৩শে ফেব্রুয়ারি), রাশিয়ারপেত্রোগ্রাদে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মঘট যে টেক্সটাইল শিল্পের নারী-শ্রমিকদের নেতৃত্বে হয়, তা কোনো নিছক সমাপতন ছিল না 

স্বামী ও সন্তানেরা যখন যুদ্ধ-সীমান্তে, তখন এই নারীদের ওপরেই সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল পরিবারের দেখাশোনার দিনে তেরোঘন্টা খাটুনির পরে শুধু রুটি জোগাড়ের আশায় প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যে তাঁদের ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হত। তাই, সুয়োশি হাসেগাওয়ার ফেব্রুয়ারী বিপ্লব সম্পর্কিত সবচেয়ে মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ আমাদের জানায়, এই নারীদের প্রতিরোধে উদ্দীপ্ত করতে কোনো বিশেষ প্রচারের প্রয়োজন হয়নি।[i]

একদম ওপরতলার বিত্তবান শ্রেণি এবং সমাজের বাকি মানুষের মধ্যেকার অর্থনৈতিক বিভেদ দূর করতে বা কোনোরকম অর্থবহ সংস্কার জারি করতে জারতন্ত্রী প্রশাসন চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়। এবং এই ব্যর্থতার মধ্যে দিয়েই রাশিয়ার গভীর সঙ্কটের শুরু হয় দুমা, অর্থাৎ রাশিয়ার নির্বাচিত সংসদ তখন আদতে ক্ষমতাহীন, কিন্তু আইনত বিত্তবানদের প্রভাবে। রাশিয়ার তৎকালীন শাসক স্বৈরতন্ত্রী জার দ্বিতীয় নিকোলাসের নির্দেশে দুমা বারবার খারিজ হয়ে যাচ্ছে

যুদ্ধের প্রাক্কালে শ্রমিকদের ধর্মঘটের কার্যবিধি ১৯০৫এর বিপ্লবকেও টেক্কা দিতে পারত। শ্রমিকেরা রাজধানীর রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড গঠন করেন। যুদ্ধের জন্য জার-সাম্রাজ্য সাময়িক উপশম পেলেও, উপর্যুপরি সামরিক ব্যর্থতা এবং প্রায় সাতকোটি মানুষের মৃত্যুর জন্য সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে দুর্নীতির অভূতপূর্ব অভিযোগ উঠে আসে। পচন এত গভীরে চলে গেছিল যে সরাসরি কিছু না করেও ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স লভভের নেতৃত্বে এক চক্রান্ত করা হয় জারকে দেশ থেকে বিতাড়িত ও জারিনাকে এক মঠে নির্বাসিত করার, যদিও তাঁরা বাস্তবে কাজ করেন নি। এই সময়ে, ১৯১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে কুখ্যাত ঠগ সন্ন্যাসী রাসপুটিন,  যিনি জারের সভাতে বিরাট প্রভাব অর্জন করেছিলেন, তিনি খুন হলেন, নৈরাষ্ট্রবাদীদের হাতে না, রাজতন্ত্রীদের হাতে

বামদিকে তখন বলশেভিকরা ছিলেন প্রশস্ততর এক বিপ্লবী মহলের মধ্যে  সবচেয়ে প্রভাবশালী, যারা মিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ধর্মঘটের (নরমপন্থী সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে যুদ্ধের সমর্থকরা সাধারণত ধর্মঘট করা থেকে বিরত থাকত)।

এই বিপ্লবী বামপন্থীরা বছরের পর বছর  জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে  লড়াই করে চলেছেন  ১৯১২ সালের লেনা স্বর্ণখনিতে ২৭০ জন শ্রমিকের গণহত্যার অর্ধ-দশকের মধ্যে তিরিশটি ধর্মঘট পালিত হয়, এবং জারের গুপ্ত-পুলিশের (ওখরানা) হাতে অসংখ্যবার ধরা পড়েও এঁরা লড়াই জারি রাখেন। ১৯১৫ ও ১৯১৬র বন্দী-নামায় বিপ্লবীদের সংখ্যা বিভাজন দেখিয়ে দেয় পেত্রোগ্রাদে বামেদের আপেক্ষিক শক্তি কতটা ছিল:  বলশেভিক - ৭৪৩, নির্দলীয় - ৫৫৩, সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী (Socialist Revolutionaries – SR) - ৯৮,  মেনশেভিক - ৭৯,  মেজরাইওন্তসি (Mezhraiontsy) - ৫১,  নৈরাষ্ট্রবাদী - ৩৯। ভাইবর্গ জেলার ধাতু, প্রযুক্তি, ও টেক্সটাইল শিল্পে প্রায় ৬০০র কাছাকাছি বলশেভিক সদস্য নিযুক্ত ছিলেন। ফলে এই জেলা গোটা যুদ্ধ পর্ব জুড়ে সবচেয়ে জঙ্গী  ছিল

১৯১৭ সালের ৯ই জানুয়ারি, রক্তাক্ত রবিবার গণহত্যা থেকে স্ফুরিত ১৯০৫'র বিপ্লবের দ্বাদশ বার্ষিকীতে,  ১৪২,০০০ জন শ্রমিক ধর্মঘট শুরু করেন। ১৪ই ফেব্রুয়ারি, দুমা খুললে, যুদ্ধ-সমর্থক মেনশেভিকদের নেতৃত্বে, আরও ৮৪,০০০ শ্রমিক বেরিয়ে আসেন।

ক্রমবর্ধমান খাদ্য-সংকটের দরুন সরকার গ্রামের দিকে শস্য-ফরমান জারি করে। পেত্রোগ্রাদে রুটি তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়, সরবরাহ কমে মাত্র কয়েক সপ্তাহের তলানিতে এসে ঠেকে। তার পরেও জারতন্ত্রী কর্তৃপক্ষ দাবী করে যে কোনও রকম খাদ্য-সংকট নেই। এই সময়ে ওখরানা নিয়মিতভাবে পেত্রোগ্রাদে রুটির জন্য লাইনে দাঁড়ানো মহিলাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর জমা দিত উপরমহলের কাছে। "যে মা চোখের সামনে নিজের উপোসী, রুগ্ন শিশুদের দেখছেন তিনি শ্রীযুক্ত মিলিউকভ, রোদিচেভ এবং তাদের সাগরেদদের চেয়ে বিপ্লবের অনেক কাছাকাছি অবস্থিত এবং তিনি অবশ্যই অনেক বেশি বিপজ্জনক।

২২শে ফেব্রুয়ারি বলশেভিক নেতা কায়ুরভ ভাইবর্গের মেয়েদের একটি সভায় বক্তব্য রাখেন, যেখানে তিনি মেয়েদের আসন্ন আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ধর্মঘট না করতে আহ্বান করেন, এবং পার্টির নির্দেশাবলী মেনে চলতে বলেন। কায়ুরভের গভীর ক্ষোভ সত্ত্বেও --পরবর্তীকালে তিনি লিখেছিলেন যে বলশেভিক মেয়েরা পার্টির নির্দেশ অগ্রাহ্য করাতে তিনি  অত্যন্ত রুষ্ট হয়েছিলেন  পরদিন, ২৩শে ফেব্রুয়ারী সকালে পাঁচটি টেক্সটাইল মিলে ধর্মঘট শুরু হয়।

নেভা থ্রেড মিলের মহিলারা উস্কানী দিয়ে গর্জন করেনঃ রাস্তায় নামো, থামো! অনেক হয়েছে, আর না!”,  এবং তাঁরা বন্ধ দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে শয়ে শয়ে মেয়েদের বার করে নিয়ে যান আশেপাশের ধাতু এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানাগুলিতে। কাতারে কাতারে মহিলারা নোবেল ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার গায়ে তুষারপিণ্ড ছুঁড়ে শ্রমিকদের আহবান জানান যোগদানের জন্য। হাত নেড়ে, চিৎকার করে তাঁরা ডাকেন, "বেরিয়ে এস! কাজ বন্ধ!" মিছিল এরিকসন ওয়ার্কস অবধি পৌঁছে যায়। এখানে কায়ুরভ এবং অন্যান্য বলশেভিকরা কারখানার সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী (স-বি) এবং মেনশেভিকদের সঙ্গে সংক্ষেপে মিলিত হয়ে সর্বসম্মতিক্রমে অন্যান্য শ্রমিকদের যোগদানের আহবান জানানোর সিদ্ধান্ত নেন।

পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী অসংখ্য মহিলা ও অল্পবয়সী শ্রমিকদের মুখে তখন রুটির দাবী ও বিপ্লবের গান। পুরুষদের হাত থেকে লাল পতাকা কেড়ে নিয়ে মহিলাদের মিছিল এগিয়ে যায় - আজ আমাদের ছুটির দিন, আজ পতাকা আমরা বইবশহরের কেন্দ্রে যাবার পথে লিটেয়িনি ব্রিজের কাছে, মিছিলকারীদের বারংবার এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা স্বত্তেও পুলিশ মিছিল অবরোধ করে, যাতে তাঁরা শহরের কেন্দ্রে যেতে না পারেন।

শেষ বিকেলে শত শত শ্রমিক বরফের মধ্যে এগিয়ে যায় ও পুলিশ দ্বারা আক্রান্ত হয়। শহরের মাঝখানে নেভস্কি প্রস্পেক্টে "একহাজার মানুষ, মূলত নারী ও তরুণ এসে পৌঁছলে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।  ওখরানার খবর অনুযায়ী জনতা এতই বিক্ষুব্ধ ছিল যে "সর্বত্র পুলিশ নিয়োগ করা জরুরী হয়ে পড়েছিল।

ধর্মঘটে মোট ৭৮,০০০ জনের  মধ্যে ষাট হাজার ছিলেন ভাইবর্গ জেলা থেকে। মিছিলে যুদ্ধবিরোধী এবং জার বিরোধী স্লোগান উঠলেও, মূল চাহিদা ছিল, রুটি। বস্তুত, জারের  প্রশাসনের মনে হয়েছিল এটা আরও একটা রুটির জন্য দাঙ্গা; যদিও তাদের বিশ্বস্ত কসাক সৈন্যদের আন্দোলনকারীদের উপর হামলা করতে দ্বিধা তাদের শঙ্কিত করে তোলে। সেই রাতে ভাইবর্গ বলশেভিকরা মিলিত হয়ে ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন তিনদিনব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের এবং নেভস্কি অবধি মিছিলের।

পরেরদিন যোগদানকারীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ১৫৮,০০০ জনের এই ধর্মঘট যুদ্ধের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক ধর্মঘটের আকার নেয়। ৭৫,০০০ জন ভাইবর্গ শ্রমিকের পাশে, ধর্মঘটে যোগ দেন পেত্রোগ্রাদ, ভাসিলেভস্কি, ও মস্কো জেলা থেকে ২০ হাজার করে শ্রমিক। এছাড়া, ৯ হাজার জন আসেন নার্ভা থেকে। শ্রমিক শ্রেণির পোড় খাওয়া যুবকেরা এগিয়ে যান ব্রিজের কাছে পুলিশ ও সৈন্যদের মোকাবিলা করতে এবং শহরের কেন্দ্রস্থিত নেভস্কি দখল করতে।

আভিয়াজ কারখানায় মেনশেভিক এবং স-বির বক্তারা তখন সরকার অপসারণের ডাক দিচ্ছেন, শ্রমিকদের অনুরোধ করছেন দায়িত্বহীন কিছু থেকে বিরত থাকতে এবং আহবান করছেন তৌরিদে প্রাসাদে মিছিল করে যেতে, যেখানে দুমার সদস্যরা তখন আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন জারতন্ত্রকে কিছু রেয়াৎ করাতে।  এরিকসন কারখানার বলশেভিকরা শ্রমিকদের অনুরোধ করেন কাজান চত্বরের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যাবার। পুলিশের সাথে আসন্ন লড়াইয়ের জন্য সঙ্গে নিয়ে যেতে বলছেন ছুরি, যন্ত্রাদি, বরফ ইত্যাদি। ৪০,০০০ বিক্ষোভকারীর এক বড় জনতা লিটেইনি ব্রিজের ওপরে পুলিশ ও সৈন্যদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় কিন্তু আবার পিছু হঠতে বাধ্য হতে হয়। সাম্পসোনিয়েভস্কি প্রসপেক্টে কসাকদের মুখোমুখি হন প্রায় ২৫০০ এরিকসন শ্রমিক। অফিসারেরা ভিড়ের দিকে ধেয়ে রাস্তা করে দিলেও, কসাকরা খুবই সন্তর্পণে সেখান দিয়ে এগোচ্ছিল। কায়ুরভ স্মৃতিচারণ করেছেন, “কেউ কেউ হেসে তাকাল, একজন শ্রমিকদের চোখ টিপে ইশারা করলঅনেক জায়গায় মহিলারা উদ্যোগ নিলেন: আমাদের স্বামী, বাবা, ভাই যুদ্ধ-সীমান্তে... আপনাদেরও তো মা, স্ত্রী, বোন, শিশু আছে। আমরা চাই রুটি আর এই যুদ্ধের শেষ

ঘৃণিত পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীরা সখ্যতার কোনও চেষ্টাই করেনি। তরুণেরা রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে, বিপ্লবী গান গেয়ে, পুলিশের দিকে বরফ, বোল্ট ছুঁড়ছিল। কয়েক হাজার শ্রমিক বরফ পার হয়ে পৌঁছলে, নেভস্কি দখলের জন্য পুলিশের সাথে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হয়। এরমধ্যেই শ্রমিকেরা মিছিল করতে সক্ষম হন কাজানের প্রথাগত বিপ্লবী ক্ষেত্রগুলিতে ও ঝনামেনস্কায়া চত্বরের বিখ্যাত তৃতীয় অ্যালেক্সান্দারের জলহস্তী মূর্তির কাছে । ক্রমশ দাবীগুলো আরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে যখন বক্তারা শুধু রুটির দাবীই না, যুদ্ধ ও স্বৈরতন্ত্রর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। [ii]

২৫ তারিখ, এই ধর্মঘট, সাধারণ ধর্মঘটে পরিণত হয় যখন ২,৪০,০০০ কারখানার শ্রমিকদের পাশাপাশি, অফিসে চাকুরিজীবি,  শিক্ষক-শিক্ষিকা, রেস্তোঁরা-কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, এমনকি উচ্চ-বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও যোগ দেন। ট্যাক্সিচালকরা শপথ নেন কেবলমাত্র এই প্রতিরোধের নেতাদের তাঁরা যাতায়াত করাবেন। শ্রমিকেরা আবার তাদের কারখানায় আন্দোলন শুরু করেন। ভাইবর্গের পারভিয়ান কারখানার এক উত্তেজনাময় মিটিং চলাকালীন বলশেভিক, মেনশেভিক এবং স-বি বক্তারা শ্রমিকদের নেভস্কি অবধি মিছিল করে এগিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। এক বক্তা শেষ করেন বৈপ্লবিক কবিতা দিয়ে –“পথ ছেড়ে দাও এই আপাদমস্তক পচে যাওয়া পুরাতন বিশ্ব, নবীন রুশ আজ আসছে এগিয়ে

পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের সতেরোটি তীব্র সংঘর্ষ হয়, এবং শ্রমিক ও সৈন্যরা পুলিশের আওতা থেকে কমরেডদের বার করে আনতে সফল হন। বিদ্রোহীরা পুলিশের উপর টেক্কা দেওয়ার মত অবস্থায় এলেন, এবং বেশ কিছু ব্রিজে জারতন্ত্রী বাহিনীকে সফলভাবে মোকাবিলা করে অথবা বরফের উপর দিয়ে কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যান। নেভস্কি দখল করে বিক্ষোভকারীরা আবার ঝনামেনস্কায়াতে মিছিল বার করেন। পুলিশ আর কসাকেরা জনতাকে বেত দিয়ে মারতে থাকে, কিন্তু যখন পুলিশের প্রধান জনতার দিকে ধেয়ে যায়, তখন তাকে কেটে ফেলে এক কসাকের ছুরি। এই সময় মহিলা শ্রমিকেরা আরও একবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন, “বেয়নেট নামিয়ে রাখুন, আমাদের সঙ্গে আসুন বলে তারা ডাক দেন।

সন্ধ্যের মধ্যে ভাইবর্গের দিকটা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশ স্টেশন লুঠ করে, সেপাইদের থেকে বন্দুক, ছুরি বাজেয়াপ্ত করে এবং পুলিশ ও বিশেষ পুলিশ (জান্দার্ম)দের বাধ্য করে পালিয়ে যেতে।

বিদ্রোহ অবশেষে জার নিকোলাসকে কোণঠাসা করে তোলে। তিনি ঘোষণা করেন, "আমি আদেশ করছি, রাজধানীতে এই অরাজকতা আগামীকাল বন্ধ হোক! পেত্রোগ্রাদ সেনানিবেশের কম্যান্ডার খাবালোভকে নির্দেশ দেওয়া হয় গুলির সাহায্যে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার। খাবালোভ এই নির্দেশ সম্পর্কে সন্দিহান (এক দিনের মধ্যেই কীভাবে এদের থামানো সম্ভব?) থাকলেও আদেশ মেনে নেন। অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী, প্রোটোপোপভ পৌর ভবনে স্বৈরাচারের সমর্থকদের বিক্ষোভ দমন করার আহ্বান জানান: "জয়ের জন্য প্রার্থনা ও আশা করুন" বলেন তিনি। পরদিন ভোরবেলা বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে ঘোষণাপত্র প্রচার করা হয় এবং জানানো হয়, নির্দেশটি দরকারে অস্ত্র দিয়ে লাগু করা হবে।

রবিবার, ২৬ তারিখ সকালে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলশেভিক পিটার্সবার্গ কমিটির মুখ্য সদস্যদের এবং অন্যান্য সমাজতন্ত্রীদের। বন্ধ করে দেওয়া হয় কারখানা, ব্রিজগুলি তুলে নেওয়া হয়[iii] এবং শহরের কেন্দ্রকে সশস্ত্র ছাউনীতে পরিণত করা হয়। খাবালোভ সদর দপ্তরে টেলিগ্রাফ পাঠান, “শহর আজ সকাল থেকে শান্ত। এই রিপোর্টের একটু পরেই হাজার হাজার শ্রমিক বরফ পার করে বিপ্লবী গান গাইতে গাইতে ও স্লোগান দিতে দিতে   নেভস্কি এসে পৌঁছন, কিন্তু সৈন্যরা ক্রমাগত তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে।

ভলিনস্কি রেজিমেন্টের কয়েকটি দলের কাজ ছিল ঝনামেনস্কায়া চত্বরে মিছিল আটকানো। অশ্বারোহী বাহিনী চাবুক মেরেও জনতাকে হঠাতে পারেনা। কম্যান্ডার তখন সেনাবাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। কিছু সৈন্য শূন্যে গুলি চালালেও, ঝনামেনস্কায়ার কাছে ৫০জন বিক্ষোভকারী গুলিতে মারা যান, কিছু শ্রমিক লোকের বাড়িতে কিম্বা ক্যাফেতে আশ্রয় নেন। এই নিধনযজ্ঞের বেশিটাই করেছিল উচ্চস্তরের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জারের অনুগত ফৌজ, যাদের ব্যবহার করা হত নন-কমিশনড অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার।

কিন্তু এই রক্তপাত বিদ্রোহ থামাতে পারলনা।

বিপ্লবীদের এই অসম্ভব আপোষহীন ও স্বার্থহীন মনোভাবের কথা পুলিশ রিপোর্টে পাওয়া যায়:

বিশৃঙ্খলার মধ্যেও সাধারণ পর্যবেক্ষণ ছিল যে, বিক্ষোভকারী জনতা, সামরিক বাহিনীর সামনে তীব্র প্রতিরোধ দেন। এদের যখন সরে যেতে বলা হয়, এরা রাস্তা থেকে পাথর আর বরফ কুড়িয়ে ছুঁড়তে থাকে। প্রথমদিকে যখন শূন্যে গুলি চালানো হয়, জনতা নিজের জায়গা থেকে সরে তো যায়ইনা, বরং প্রবল হেসে উত্তর পাঠায়। একমাত্র যখন ভিড়ের দিকে সরাসরি গুলিবর্ষণ হয়, তখন এরা আশেপাশের বাড়ির বাগানে লুকোনোর চেষ্টা করেন আর গুলি থামতেই আবার রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।

শ্রমিকরা সৈন্যদের অনুরোধ করেন অস্ত্র নামিয়ে রাখতে, এমনকি তাদের বিবেকের প্রতি আবেদন করে কথা চালানোর চেষ্টা করেন। যেমন ট্রটস্কী বলেছিলেন, “রাইফেল আর মেশিন-গানের আওয়াজে বিদীর্ণ আকাশের তলায় নারী ও পুরুষ শ্রমিক এবং সৈন্যদের মধ্যেকার এই যোগাযোগ, স্থির হয়ে যাচ্ছিল শাসকের, যুদ্ধের এবং সমগ্র দেশের ভবিষ্যৎ। 

২৬শে সন্ধ্যাবেলা শহরের ঠিক বাইরে এক সব্জি-বাগানে ভাইবর্গের বলশেভিকরা মিলিত হন। অনেকে প্রস্তাব দেন, বিদ্রোহ এইবার থামানো হোক, কিন্তু এরা ভোটে হেরে যান। লড়াই জারি রাখার পক্ষে সবচেয়ে জোরালো সওয়াল যিনি করেন, পরে জানা গেছিল সে আসলে ওখরানার চর। সামরিক পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ তারিখের পর বিপ্লবের চাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথাই ছিল । কিন্তু বিদ্রোহ দমন করতে পুলিশের কয়েক হাজার সৈন্যের সমর্থন দরকারছিল।

আগের দিন দুপুরে শ্রমিকরা পাভলোভস্কি ব্যারাকের সাথে যোগাযোগ করেন: আপনাদের কমরেডদের বলুন যে পাভলোভস্কিও আমাদের দিকে গুলি চালাচ্ছে। আপনাদের পোশাক পরা সৈন্যদের আমরা নেভস্কিতে দেখেছি। সৈন্যদের আতঙ্কিত ও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। অন্যান্য রেজিমেন্টের ব্যারাকেও প্রায় একই আবেদন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যাবেলা, পাভলোভস্কির সৈন্যরা প্রথম বিদ্রোহে যোগদান করে, (যদিও পরে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বুঝতে পেরে তারা ব্যারাকে ফিরে আসেন এবং অবিলম্বে উনচল্লিশ জন নেতা গ্রেপ্তার হন)।

২৭ তারিখ দিনের শুরুতে ভোলিনস্কি রেজিমেন্টে বিদ্রোহ পৌঁছে যায়। এখানেরই প্রশিক্ষণ দল ঝনামেনস্কায়া চত্বরে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে ছিল। চারশো জন বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাদের লেফট্যানান্টকে জানায়, “আমরা আর গুলি চালাবো না আর অনর্থক আমাদের ভাইয়ের রক্তপাত আর হতে দেবনা। লেফট্যানান্ট যখন বিদ্রোহ দমন করতে জারের আদেশ পড়ে শোনাতে যায়, তাকে সোজাসুজি গুলি করে হত্যা করা হয়। ভোলিনস্কির অন্যান্য সৈন্যরাও এরপর বিপ্লবে যোগ দেয় এবং পার্শ্ববর্তী প্রিওব্রাজেনস্কি ও লিথুয়ানিয় রেজিমেন্টের ব্যারাকে চলে যায়, এবং তারাও বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

পরবর্তীকালে এক অংশগ্রহণকারী এই দৃশ্যের বর্ণনা করেন: হাতে রাইফেল সহ সৈন্য দিয়ে ঠাসা একটা ট্রাক ভিড় চিরে সাম্পসোনিয়েভস্কি দিয়ে ছুটে চলেছে। রাইফেলের বেয়নেট থেকে লাল পতাকা উড়ছে, এ দৃশ্য কেউ কখনো দেখেনি এর আগে সৈন্যবাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, ট্রাকের সাথে আসা এই খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে গেল”।

জেনেরাল কুটেপভের নেতৃত্বে শাস্তি দেওয়ার জন্য পাঠানো এক বাহিনী কয়েকঘন্টা ধরে অভিযান চালায়, অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বিক্ষোভকারী ও ট্রাক-ভর্তি শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। কিন্তু সন্ধ্যের মধ্যে, কুটেপভ জানায়, “আমার বাহিনীর এক বড় অংশ জনতার মধ্যে মিশে গেছে।

সেদিন সকালেই জেনেরাল খাবালোভ শহরের ব্যারাকগুলিতে ঘুরে সৈন্যদের হুমকি দিয়ে বেড়িয়েছেন যে বিদ্রোহ করলেই তাদের মৃত্যুদণ্ড হবে। ঐদিন সন্ধ্যাবেলা জেনেরাল ইভানোভ, যার বাহিনী তখন জার-অনুগতদের সাথে যোগ দিতে এগিয়ে আসছে, পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য খাবালোভকে টেলিগ্রাফ করেন

ইভানোভঃ শহরের কোথায় কোথায় শান্তি বজায় আছে?

খাবালোভঃ পুরো শহরই এখন বিপ্লবীদের দখলে।

ইভানোভঃ মন্ত্রণালয়গুলো ঠিকঠাক কাজ করছে?

খাবালোভঃ বিপ্লবীরা সব মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করেছে।

ইভানোভঃ আপনার হাতে এই মুহূর্তে কোন পুলিশ বাহিনী রয়েছে?

খাবালোভঃ কিছুই নেই।

ইভানোভঃ প্রযুক্তি ও রসদের কোন বিভাগগুলো এখন আপনার নিয়ন্ত্রণে?

খাবালোভঃ আমার হাতে কিছুই নেই।

অবস্থার বিচার করে জেনেরাল ইভানোভ পিছু হঠার সিদ্ধান্ত নেন। বিপ্লবের সামরিক ধাপের এখানেই ইতি।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আপাতবিরোধিতা এখানেই যে তা জারের শাসনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করলেও, তাকে পালটে আনল এমন এক অনির্বাচিত উদারপন্থীদের সরকারকে, যারা তাঁদের ক্ষমতায় আনল যে বিপ্লব তার ভয়েই ভয়াবহ ভীত ছিলেন।

২৭ তারিখ এক উদারপন্থী দুমা ডেপুটি (প্রতিনিধি) লিখছেনঃ দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাচ্ছিলাম... এসে গেছে, অথবা বাস্তবিক জীবন নাশের আশঙ্কায় অকপট ভীতির অভিব্যক্তি । এরই মাঝে আনন্দদায়ক, কিন্তু আদতে বেঠিক খবর এলো যে শীঘ্রই অরাজকতা দমন করা হবেআরেক পর্যবেক্ষক লেখেন, “ওরা সন্ত্রস্ত ছিল, প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপছিল, ওদের মনে হচ্ছিল শত্রুপক্ষের হাতে বন্দী হয়ে যেন এক অজানা রাস্তায় চলেছে ওরা”।

বিপ্লবের সময় পুঁজিপতিদের অবস্থান খুবই পরিষ্কার ছিল। একদিকে তারা বিপ্লব থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখত এবং দরকারে জারের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা করত, আর অন্যদিকে নিজেদের সুবিধার্থে তাকে ব্যবহার করতএই মূল্যায়ন করেছিলেন সুখানোভ, যিনি পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের নেতা ছিলেন ও মেনশেভিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, আর উদারপন্থীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে যিনি এক চরম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

অধিকতর নরমপন্থী সমাজবাদীদের কাছ থেকে ইনি অনেক সাহায্য পেয়েছিলেন। তৌরিদে প্রাসাদে একটি ঘর পাবার জন্য মেনশেভিক নেতা স্কোবেলেভ যোগাযোগ করেন চতুর্থ দুমার চেয়ারম্যান রোডজিয়াঙ্কোর সাথে। স্কোবেলেভের উদ্দেশ্য ছিল শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শ্রমিক ডেপুটিদের এক সোভিয়েত সংগঠন করার। এই সোভিয়েত বিপজ্জনক হতে পারে, রোডজিয়াঙ্কোর এ আশঙ্কাকে প্রশমিত করতে কেরেনস্কী বলেন, “কাউকে তো শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে”।

বিদ্রোহের পর ফেব্রুয়ারি ২৭এর এই সোভিয়েত, ১৯০৫এর শ্রেণি-সংগ্রাম থেকে উঠে আসা শ্রমিকদের সোভিয়েত থেকে আলাদা ছিল। এই সোভিয়েতের নির্বাহী কমিটির মুখ্য সদস্যরা প্রায় সবাই একচেটিয়াভাবে বুদ্ধিজীবী ছিলেন, যারা বিপ্লবে সরাসরি কোনও অংশ নেননি। এছাড়াও আরও বিচ্যুতি ছিল: শ্রমিক ও সৈন্যদের এই সোভিয়েতে পেত্রোগ্রাদের  ১৫০,০০০ সৈন্যর তরফ থেকে প্রতিনিধিত্বের আধিক্য ছিল। মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল শোচনীয় - সিংহভাগ পুরুষ। গোড়ায় ১২০০ (শেষ অবধি ৩০০০) সদস্যের মধ্যে মুষ্টিমেয় ছিলেন মহিলা। উনিশে মার্চের মহিলাদের ভোটাধিকারের বিক্ষোভ, যাতে হাজার হাজার শ্রমিক-শ্রেণির মহিলা সহ ২৫,০০০ জন অংশ নিয়েছিলেন, সে নিয়ে সোভিয়েত কোনও আলোচনার উত্থাপনই করেনি।

পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত অবশ্য বিখ্যাত আদেশ সংখ্যা -১-এর অনুমোদন করে। এই আদেশ দ্বারা সৈন্যরা নিজেদের বিভাগ চালানোর জন্য কমিটি নির্বাচন করতে পারবে, এবং আধিকারিক ও অস্থায়ী সরকারের নির্দেশ মানতে পারবে যতক্ষণ তা সোভিয়েতের নিজস্ব নির্দেশের বিরোধিতা না করছে কিন্তু এই আদেশ বিপ্লবী সৈন্যদের নিজেদের উদ্যোগেই লিপিবদ্ধ করা হয়।

এসব সত্ত্বেও সোভিয়েত গঠনের ফলে উদারবাদীরা ও তাদের স-বি সহযোগী কেরেনস্কী বাধ্য হয় নড়ে উঠতে। রোডজিয়াঙ্কো যুক্তি দেন, “এখন যদি আমরা ক্ষমতা দখল না করি তাহলে অন্য কেউ করবেকেননা কারখানাগুলোতে এর মধ্যেই কোন না কোন  বদমাশকে নির্বাচিত করে রেখেছে। কেরেনস্কী লিখেছিলেন আমরা এখনই অস্থায়ী সরকার না বানালে, সোভিয়েত নিজেকে বিপ্লবের সর্বময় কর্তা বলে ঘোষণা করবেএই পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক স্বনির্বাচিত সমিতি, নিজেদের অস্থায়ী কমিটি নাম দিয়ে সোভিয়েতের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করবে, এই ঠিক হল। কিন্তু চক্রান্তকারীরা নিজেদের এই পরিকল্পনায় নিজেরাই খুব একটা আস্থা রাখতে পারেননি; তারা মেনশেভিক ও স-বি নেতাদের দিয়েই নিজেদের নোংরা কাজ সারতে চান।

সুখানোভ লিখেছেন, মেনশেভিকদের বিপ্লবের বীজগাণিতিক হিসেব অনুযায়ী যে সরকার জার-শাসনের জায়গায় আসবে, তাকে সম্পূর্ণভাবে বুর্জোয়া হতে হবে সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র... শুধু মিলিউকোভের আদেশ মানতে পারতমার্চের এক তারিখ সোভিয়েত কার্যনির্বাহী সমিতি অনির্বাচিত উদারপন্থী নেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়। মিলিউকভ  পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন যে কার্যনির্বাহী সমিতি  এমন জায়গায় আছে যেখান থেকে বুর্জোয়া সরকারকে ক্ষমতা দেবে কি দেবেনা, তা ঠিক করতে পারেকিন্তু, সুখানোভ যোগ করেন, “জার শাসনকে প্রতিস্থাপন করতে কেবলমাত্র বুর্জোয়া ক্ষমতাই পূর্বনির্দিষ্ট হয়ে আছে... আমাদের এই দিকেই যেতে হবে, নইলে অভ্যুত্থান সার্থক হবেনা, এবং বিপ্লব ভেঙ্গে পড়বে

সোভিয়েত নেতারা উদারপন্থীরা ক্ষমতায় আসুক, এই প্রচেষ্টায় এমনকি বিপ্লবী দলগুলির ন্যূনতম সর্বসম্মত - "তিন তিমি" কার্যক্রম (আট ঘণ্টার দিন, ভূমি-সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ, এবং গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র) ছাড়তেও রাজি ছিলেন। শাসন করতে হতে পারে এই ভয়ে মিলিউকভ  রাজতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার জন্য মরীয়া চেষ্টা চালান।

অবিশ্বাস্য ভাবে, সমাজবাদীরা তা মেনে নেন এবং জারের ভাই মাইকেলকে সিদ্ধান্ত নিতে দেন সে শাসন করতে চায় কিনা। নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা না পেয়ে, গ্র্যান্ড ডিউক সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। অবশ্যই এই সব অন্দরমহলের আলোচনা শ্রমিক ও সৈনিকদের আওতার বাইরে হয়েছিল।

এই আলোচনাগুলো থেকে যে "দ্বৈত ক্ষমতা" ব্যবস্থার উদ্ভব হল অর্থাৎ একদিকে সোভিয়েত ক্ষমতা, এবং অন্যদিকে অনির্বাচিত অস্থায়ী সরকার তা আটমাস টিঁকেছিল।

জিভা গালিলি এই সমঝোতার বর্ণনা দিয়েছেন এই বলে, এ ছিল মেনশেভিকদের শ্রেষ্ঠ সময়কালট্রটস্কী একে তুলনা করেছেন দুই ভাগে বিভক্ত এক তামাশা-নাট্যের সাথে: প্রথমাঙ্কে বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখতে বিপ্লবীরা অনুনয় করছেন উদারপন্থীদের কাছে, পরের অঙ্কে উদারপন্থীরা উদারনীতি বাঁচিয়ে রাখতে রাজতন্ত্রের কাছে অনুনয় করছেন

তাহলে এত বীরত্বের সাথে লড়াই করে জারের শাসন উৎখাত করার পরে, শ্রমিক ও সৈনিকরা কেন বিত্তবানদের তৈরি এমন সরকারের কাছে সোভিয়েতকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে দিলেন?  প্রথমত, বেশির ভাগ শ্রমিক তখনো বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর নীতি বুঝে উঠতে পারেননি। উপরন্তু, বলশেভিকরা নিজেরাই পরিষ্কার ছিলেন না তারা কিসের জন্য লড়াই করছেন। এর জন্য অংশত দায়ী ছিল বিপ্লব সম্পর্কে তাদের (দ্রুত অচল হয়ে যাওয়া) ধারণা যে বিপ্লবটা হবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক, যেখানে শাসন করবে এক অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার। ব্যবহারিক স্তরে এই ধারণা, বিশেষ করে অস্থায়ী সরকারের চরিত্র কি হবে, তা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা সম্ভব ছিল।

যদিও জঙ্গী বলশেভিক কর্মীরা বিপ্লবের দিনগুলোতে মহত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তারা তা অনেক সময়ই করেছেন তাদের নেতাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও। টেক্সটাইল শিল্পের মহিলা শ্রমিকরা ফেব্রুয়ারিতে ধর্মঘট করেন তাদের নেতাদের আপত্তি, যে  এখনও সময় আসে নি জঙ্গী বিরোধিতা করার , অগ্রাহ্য করে।

বলশেভিক ব্যুরোর নেতৃত্ব (শ্লিয়াপনিকোভ, মলোটভ, এবং জালুৎস্কি) ঘাটতি দেখিয়েছিল।  ২৩শে ফেব্রুয়ারির ধর্মঘটের পরেও শ্লিয়াপনিকোভ যুক্তি দেন যে এখনও সাধারণ ধর্মঘট ডাকার সময় হয়নি। সৈনিকদের জন্য কোনও ইস্তেহার তৈরি করতে ব্যুরো ব্যর্থ হয় এবং আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য শ্রমিকদের অস্ত্রের দাবী নাকচ করে দেয়। বেশিরভাগ উদ্যোগ আসে হয় ভাইবর্গ জেলা কমিটি, যারা বস্তুত শহরে পার্টির নেতা হিসেবে কাজ করেন, তাদের থেকে, অথবা একদম প্রথম স্তরের সদস্যদের থেকে, বিশেষ করে প্রথম দিন, যেদিন মহিলারা তাদের পার্টি নেতাদের আদেশ অমান্য করে ধর্মঘটের ভবিষ্যৎ নির্ণয় করেন।

মার্চ মাস ধরে বিভ্রান্তি আর বিভাজনে ঢেকে রেখেছিল বলশেভিকদের। মার্চের এক তারিখ, যেদিন পেত্রোগ্রাদ বুর্জোয়াদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দেয়, সেদিন কার্যকারী সমিতির এগারোজন বলশেভিকের একজনও এর বিরোধিতা করেননি। যখন সোভিয়েতে উপস্থিত বাম বলশেভিক প্রতিনিধিরা সোভিয়েতকে সরকার গঠনের জন্য প্রস্তাব দেন, তখন মাত্র উনিশ জন পক্ষে এবং  বহু বলশেভিক বিপক্ষে ভোট দেন। মার্চের পাঁচ তারিখ, শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাবার জন্য সোভিয়েতের আহ্বানকে পিটার্সবার্গ কমিটি সমর্থন জানায়। যদিও আট-ঘন্টার দিন, বিপ্লবী আন্দোলনের এই অন্যতম প্রধান দাবী তখনও আদায় হয় নি। ভাইবর্গের জঙ্গী রা, যারা সোভিয়েত শাসনের ডাক দিয়েছিলেন, শ্লিয়াপনিকোভের অধীনে পার্টি ব্যুরো তাদের দিকে হেলে। কিন্তু যখন কামেনেভ, স্তালিন, এবং মুরানোভ সাইবেরিয়ার নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন এবং ১২ মার্চ ব্যুরোর দখল নিলেন, পার্টির নীতি একদম ডানদিকে টাল খায়। এই পরিবর্তন মেনশেভিক ও স-বির নেতৃত্বের আনন্দের কারণ হলেও, কারখানার জঙ্গী  পার্টি-সদস্যদের বিরক্তির উদ্রেক করে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ এই ত্রয়ীকে বিতাড়নের আহ্বান জানান।

বিরক্ত সদস্যদের একজন ছিলেন লেনিন। মার্চ মাসের ৭ তারিখ, সুইৎজারল্যান্ড থেকে তিনি লেখেন, “এই নয়া সরকার এখনই সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির কাছে, যুদ্ধ এবং লুঠের সাম্রাজ্যবাদী নীতির কাছে, নিজের হাত-পা বাঁধা দিয়েছে। উল্টোদিকে, মার্চের পনেরো তারিখ কামেনেভ প্রাভদায় লিখছেন, “মুক্ত মানুষ নিজের খুঁটিতে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, প্রতিটি বুলেটের উত্তর বুলেটে, প্রতিটি শেলের উত্তর শেলে দেবে। মার্চের শেষদিকে স্তালিন মেনশেভিকদের সাথে এক জোটের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন এবং যুক্তি দেন যে অস্থায়ী সরকার, “বিপ্লবের বিজয় রক্ষার্থে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে”।

নেতৃত্বের এই দক্ষিণদিকে বাঁক নেওয়া লেনিনকে এতটাই চিন্তিত করে তুলেছিল যে ৩০শে মার্চ তিনি লেখেন কেরেনস্কী ও তার দলবলের এই সমাজবাদী দেশভক্তির প্রতি আমাদের পার্টির যারা আপোস করতে চাইছে, তাঁরা যারাই হোক না কেন, তাঁদের সঙ্গে আশু ভাঙ্গন তাঁর কাছে কাম্য। লেনিনের বক্তব্যকে স্পষ্ট করার জন্য বা কার সম্বন্ধে বলছেন তা বোঝার জন্য কোন উকিলের প্রয়োজন হয়না। কামেনেভের বোঝা উচিৎ  যে তাঁর উপর এক বিশ্ব-ঐতিহাসিক দায় বর্তাচ্ছে

১৯০৫ থেকে লেনিনবাদের সারতত্ত্ব জোর দিয়েছে প্রতিবিপ্লবী শক্তি হিসেবে উদারনীতির ওপর সম্পূর্ণ অবিশ্বাসে, এবং সেই সব সমাজবাদীদের তীব্র সমালোচনায়, যারা আপ্রাণ চেষ্টায় উদারপন্থীদের তুষ্ট করতে চাইছেন।

লেনিনের ১৯০৫র লেখায় যা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে তিনি অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারকে আহবান করছেন বুর্জোয়া বিপ্লবের জন্য, যা তার মতে ট্রটস্কীর "সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব" -এর "অদ্ভুত ও আধা নৈরাজ্যবাদী ধারনা"র বিপরীতে। অথচ লেনিন নিজেই এখন এই সমাজতান্ত্রিক অদ্ভুত ধারণার দিকে ঝুঁকছেন আর তাই অন্যদিকে রক্ষণশীল পুরোনো বলশেভিকরা তাকে ট্রটস্কীবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করছেন।

মার্চের শুরুর এই অভ্যুত্থান অনেক দিক দিয়েই পূর্ববর্তী শতকের বহু ঘটনার প্রতীকস্বরূপ। একটি অনির্বাচিত,  ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ক্ষমতা বেদখল করা নিজেদের শ্রেণি স্বার্থে, যে আন্দোলন তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে, তাদেরই ব্যবহার করে ও তাঁদের স্বার্থহানি করে। কিন্তু এক্ষেত্রে দুটি প্রধান তফাৎ রয়েছে। প্রথমত, শ্রমিক-শ্রেণির নিজের একটা পার্টি ছিল, যা নিজের স্বার্থেই নিরলস যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। এবং দ্বিতীয়ত, সোভিয়েত ছিল।

 

রুশ বিপ্লবের সবে শুরু হল।

 

[i]Tsuyoshi Hasegawa, February Revolution: Petrograd, 1917, University of Washington Press, Seattle, 1981.

[ii]ইংরেজী প্রবন্ধে মারফি autocracy শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আমরা তাকে স্বৈরতন্ত্র প্রতিশব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছি। তবে সেই সঙ্গে বলে রাখা ভাল, এই উপাধিটি মধ্যযুগের গ্রিক থেকে এসেছে। সে সময়ে সম্রাট উপাধিধারী সকলকেই গ্রিক ভাষাতে autokrates বলা হত। কনস্ট্যান্টিনোপলের পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের পতন হলে মাস্কোভির গ্র্যান্ড ডিউকরা নিজেদের ঐ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী বলে দাবী করেন। ফলে তাঁদের অন্যতম উপাধি হয় autokrates। পিটার দ্য গ্রেটের সময় থেকে বাস্তবে জারেদের একচ্ছত্র ক্ষমতা তৈরী হয়।

 

[iii]শহরের শ্রমিক এলাকাগুলির অধিকাংশ ছিল নেভা নদীর ওপারে, এবং ব্রিজগুলি তুলে নিলে বিত্তবান-মধ্যবিত্তদের এলাকা থেকে শ্রমিক এলাকাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যেত।