National Situation

দুর্নীতি, দুর্নীতি দমন ও গণতন্ত্র

দুর্নীতি, দুর্নীতি দমন ও গণতন্ত্র

সিঙ্গুরের জমি দখল আন্দোলন তখন জোর কদমে চলছে। এই সময়ে, নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করা হল আন্দোলনের অগ্রণী কর্মী, তরুণী তাপসী মালিককে। শাসক দল সিপিআই(এম) ও বামফ্রণ্ট সরকার চট করে জানিয়ে দিল, খুনের কারণ পারিবারিক দ্বন্দ্ব। এই একই মিথ্যার আন্তর্জাতিক প্রচারে নেমে পড়লেন বিজয় প্রসাদের মত কিছু বামপন্থী নামাবলী জড়ানো সিপিআই (এম)-এর স্তাবক। রাজ্য সি আই ডি-র প্রতি বহু মানুষেরই আস্থা ছিল না। দাবী উঠল সিবিআই তদন্তের। ধরা পড়ল এবং নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হল শাসকলের দুই সদস্য

গত দুই দশকে এরকম ঘটনা কম ঘটেনি। টাকা কারচুপি, দলীয় কর্মীদের বে-আইনীভাবে চাকরী বা কণ্ট্র্যাক্ট পাইয়ে দেওয়া, অনেক রকম অপরাধ, এবং অপরাধ ঢাকতে  দুর্নীতি, ভারতের রাজ্যে রাজ্যে সব রাজ্য সরকার, এবং সব রঙের কেন্দ্রীয় সরকার, করেছে বলেই মানুষের বিশ্বাস। তাই বার বার দাবী উঠেছে সিবিআই তদন্তের জন্য, অথবা সরকারের বা দলের হস্তক্ষেপ-মুক্ত পুলিশ ও প্রশাসনের জন্য। এই প্রবণতা যে কেবল সিবিআই-কে ঘিরে দেখা দিয়েছে, এমন নয়। একের পর এক সাংবিধানিক বা আইনভিত্তিক স্বয়ংশাসিত প্রতিষ্ঠান দেখা গিয়েছে, যাদের মাধ্যমে দুর্নীতি রোধ, নির্বাচন ব্যবস্থাকে অপরাধ মুক্ত করা, এ সবের চেষ্টা হয়েছে।  

এক্ষেত্রে প্রথম আসে আদালতের কথা। সংবিধান-প্রদত্ত অধিকার প্রয়োগ করে, সরকারী কার্যকলাপ কতটা আইনী তা বিচার করে আদালতেরা। তার ফলে গত কয়েক দশকে, বিশেষত পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (পি আই এল)--এর মাধ্যমে, মানুষ আদালতের কাছেই ন্যায়, সামাজিক সুরক্ষা, সব চাইতে গেছেন। এর কারণ, তাঁদের মনে হয়েছে, নির্বাচিত সরকার সামাজিক ন্যায়, দুর্নীতি দমন, এসবে উৎসাহী নয়। ১৯৮৪-তে ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পর দিল্লীতে যে সুপরিকল্পিত দাঙ্গা হয়েছিল, নতুন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এক কথায় তা উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, একটা বড় গাছ পড়লে চারদিকে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে স্বাধীন তদন্তের পর, সুপ্রীম কোর্টের বারংবার হস্তক্ষেপের ফলে সামান্য কিছু কিছু ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। না হলে কংগ্রেসের সরকার (১৯৮৪-১৯৮৯, ১৯৯১-১৯৯৬, ২০০৪-২০১৩) সজ্জন কুমার, জগদীশ টাইটলার, এদের বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে। একই ভাবে, গুজরাটের ফ্যাসীবাদী দাঙ্গার (২০০২) পর, সাম্প্রদায়িকতাবাদ ও ফ্যাসীবাদ বিরোধীরা যে লড়াই চালাতে পেরেছেন, এবং মোদী-আদবাণীদের সব চেষ্টা সত্ত্বেও যে মায়া কোদনানি বা বাবু বজরঙ্গীর কড়া শাস্তি হয়েছে, তাতে আদালতের ভুমিকা অস্বীকার করা যায় না।

এ ছাড়া অন্য ধরণের প্রতিষ্ঠানদের কথাও বলা যায়। ভারতে যে গত তিন দশকে নির্বাচনে সাধারণ মানুষ মোটামুটি নিজের পছন্দমতো ভোট দিতে পেরেছেন, তার জন্য কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য নির্বাচন কমিশনরা কিছুটা প্রশংসার দাবী করতেই পারে।

এর অন্য পিঠে দেখা যায়, ভারতের প্রতিটি রাজ্যে, প্রায় প্রতিটি দলে, দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে। শাসক দল গুণ্ডাদের মদত দেয় না, এমন রাজ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেমন কঠিন, শাসক সমর্থিত গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা খুঁজে পাওয়া। ১৯৫০-এর এবং ১৯৬০-এর দশকে বলা হত, বামপন্থীরা অন্তত সৎ। বামপন্থী রাজনীতি করলে সুবিধা জুটত না, বরং পুলিশ ভেরিফিকেশনে চাকরি যেত। ১৯৮০-র দশক থেকে ২০১০ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রণ্টের সরকারী বামপন্থীরা সেই দুর্নীতির পথ ধরলেন। দেখা গেল, ‘নকশাল’, ‘দক্ষিণপন্থী’, ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে অনেকের চাকরী আটকানো হচ্ছে। দেখা গেল, পার্টির মদতে বড় মাপের আর্থিক দুর্নীতিও হচ্ছে।

তাই দুটো সমান্তরাল ভুল ধারণা বারবার মাথা তুলেছে। একটা হল সিপিআই (মাওবাদী) ও তাঁদের মত দলেদের ধারণা, যে শ্রমিক শ্রেণীর ডিক্টেটরশিপ কথাটার অর্থ একটিমাত্র “সঠিক” দলের হাতে চিরকালের জন্য সমস্ত ক্ষমতা। এ বিষয়ে আমরা অতীতে আলোচনা করেছি। আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয় হল দুর্নীতি ঠেকানোর নামে দক্ষিণপন্থী গণতন্ত্রবিরোধী রাজনীতি। গত কয়েক বছর ধরে, নির্বাচনী দুর্নীতি, সরকারী অর্থবরাদ্দে দুর্নীতি, ইত্যাদি ঘটনাকে পুঁজি করে আমলাতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে সাধারণ মানুষের উপকারের পথ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এই দাবী বাস্তবে অতি-দক্ষিণপন্থীদেরই হাত শক্ত করবে।

আমরা যদি আদালতের প্রসঙ্গ থেকেই শুরু করি, তা হলে দেখা যায়, শাসক শ্রেণী ও তাদের রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ রক্ষা সবসময়েই আদালতের কাজ থেকে গেছে। নর্মদা বাঁধ প্রসঙ্গে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের মামলাতে সুপ্রীম কোর্টের রায় ছিল, দেশের স্বার্থে কিছু লোককে তো ক্ষয় স্বীকার করতেই হবে।

আফজল গুরুর মামলার ক্ষেত্রে তো ব্যাপারটা স্পষ্ট এরকম ছিল, যে, সংসদে হামলা বলে কথা, একটা-দুটো ফাঁসী হতেই হবে। দু-তিন্টি কথা বলা এখানে জরুরী। সুপ্রীম কোর্টের কাজ “জাতীয়” কামনা পূরণ করা নয়, আইনকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। গুরুর মামলাতে কী হল? দায়রা আদালতের রেকর্ড দেখায়, তার আদৌ যথাযথ বিচার হয় নি। সে এত দরিদ্র ছিল যে সে কোনো উকিল নিতে পারে নি। কোর্ট যে উকিলকে তার হয়ে লরতে বলে, তিনিও অসম্মত ছিলেন। কোর্টের ভাষ্য থেকেই পড়া যায়ঃ “শ্রী নীরজ বনশল মামলা থেকে সরে যেতে চেয়েছেন, কিন্তু আদালত তাঁকে বিচার চলাকালীন সাহায্য করতে অনুরোধ করছে”। অর্থাৎ তিনি ছিলেন, আইনী বঘাষায়, ডিফেন্স ল’ইয়ার না, অ্যামিকাস কুরিয়ে (কোর্টের বন্ধু)। সরকার যে ৮০ জন সাক্ষীকে খাড়া করেছিল, তাদের ৫৬ জনকে তথাকথিত “আফজলের উকিল” কোনো প্রশ্নই করেন নি।  ৭৬ নম্বর সাক্ষী, ইনস্পেক্টর গিল, যার সাক্ষ্যের ফলেই আফজলের ফাঁসীর হুকুম হয়, তাকে তো চূড়ান্ত অপটুভাবে ক্রশ-এক্সামিন করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, সুপ্রীম কোর্ট নিজেই স্বীকার করেছিল যে আফজলের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল অত্যাচার করে। তৃতীয়ত,  সে যে কোনো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সদস্য, তা প্রমাণিত হয় নি। চতুর্থত, সে নিজে খুনের সঙ্গে যুক্ত, তাও প্রমাণিত হয় নি। মৃত্যুদণ্ড সম্বন্ধে বলা আছে, কেবল বিরলতম ক্ষেত্রে এই দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। আমরা মৃত্যুদণ্ড বিরোধী। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টকে আমাদের মত গ্রহণ করতেও আমরা বলছি না।  আমাদের বক্তব্য, মহম্মদ আফজল গুরুর ঘটনা তো বিরলতম ছিল না। তার ক্ষেত্রে তো সন্দেহের অবকাশ ছিল। তবে কেন অন্তত মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল না সুপ্রীম কোর্ট? কারণটা কোর্টের রায়েতেই লেখা আছেঃ “এই ঘটনা [ অর্থাৎ সংসদে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ ]... গোটা জাতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং সমাজের সার্বিক চেতনা একমাত্র তৃপ্ত হবে যদি দোষীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়”। সুতরাং এখানে ন্যায়বিচার নয়, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনই সামনে ছিল।

সুপ্রীম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন, “স্বাধীন পুলিশ”, কেউই মৌলিক জায়গায় শোষিতের পক্ষে থাকে না। কিন্তু শাসক শ্রেণীর স্বার্থেই, বিভিন্ন সময়ে তারা আলাদা অবস্থান নিতে পারে। গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যদি জনরোষ তীব্র হতে থাকে, তখন কিছু বিশেষভাবে অপরাধী বুর্জোয়া রাজনীতিবিদকে গ্রেপ্তার করা, তাদের জেলে পাঠানো, ব্যবস্থার প্রতি শ্রমজীবি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। আর, এইরকম ক্ষেত্রে, দুর্নীতি বিরধী লড়াইয়ের চরিত্রটা হয়, সমাজ ব্যবস্থা অটুট রেখে, প্রধানত পেটি-বুর্জোয়া আক্রোশকে পুঁজি করে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সকুচিত করা। ঠিক যেমন করতে চায় আন্না হাজারে বা কেজ্রিওয়ালদের আন্দোলন, এবং যে কারণে তাদের প্রতি বহুবার সমর্থন এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টির কাছ থেকে।

কিন্তু তাহলে আমাদের কর্তব্য কী? আমরা কি সংস্কারবাদীদের মত বলব যে ফ্যাসীবাদের বিপদ আছে, তাই শেষ পর্যন্ত এই দুর্নীতিগ্রস্থ বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থায় কংগ্রেস বা “তৃতীয় ফ্রণ্টকে” সমর্থন করার কোনো বিকল্প নেই? নাকি মাওবাদিদের রাজনীতিকেই সঠিক বলব? বামপন্থী রাজনীতিকে এই দুই অন্ধ গলি থেকে বেরোতে হবে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রে মেহনতী মানুষের অধিকার বুর্জোয়ারা দেয় নি, মেহনতীরা লড়ে আদায় করেছেন। তাই, আমরা আমাদের স্বার্থে আদালতে যাব, নির্বাচন কমিশনের কাছে পক্ষপাতহীন ব্যবহার দাবী করব, পারলে সংসদীয় নির্বাচনকে ব্যবহার করব। কিন্তু সর্বাগ্রে আমাদের কাজ শ্রমিক শ্রেণীর নিজস্ব সংগঠন নির্মান, গণ আন্দোলনের পথে শ্রেণী সংগ্রাম।

প্রলেতারিয়েতের নিজেরও এ থেকে, এবং বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস থেকে, কিছু শেখার আছে। আমরা রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাধীনতা চাই না, তার ক্রমাগত ক্ষয় চাই। তাই স্বাধীন সিবিআই না, চাই প্রশস্ততর গণতন্ত্র, যেখানে দমনপীড়নের যন্ত্র সমাজের নিয়ন্ত্রনে আসবে ও স্বাধীনতা হারাবে। অন্যদিকে, বুর্জোয়া ব্যবস্থায় যেটা আদালতের সামান্য স্বাধীনতা, তাকে ক্রমাগত বাড়ানো শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থে আসে। কিন্তূ আদালত তখনই পুঁজির স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে শ্রমজীবি মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে, যখন পুঁজির শাসন চুর্ণ করা হবে। তাই যখন বুর্জোয়া ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণকারী সংস্কারবাদী বামপন্থীরা নিজেদের সাময়িক লাভের কথা ভেবে আমলাতন্ত্রের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়, আমাদের কাজ তাদের বিরোধিতা করে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মধ্যে প্রলেতারিয় গণতন্ত্রের যে অঙ্কুর দেখা যাচ্ছে, তাকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করা।