National Situation

সাধারণ ধর্মঘট ২০১৩

সাধারণ ধর্মঘট ২০১৩ – ফৌজি শক্তির চেয়েও সবল

সোমা মারিক, সুশোভন ধর, কুণাল চট্টোপাধ্যায়

 

        ১৯১৫ সালে মার্কিন বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী র‍্যালফ চ্যাপলিন রচনা করেছিলেন তাঁর অমর সঙ্গীত – Solidarity Foreverশ্রমিক শক্তির মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা যে বাস্তব দুর্বলতার বৈপরীত্য টেনে তিনি লিখেছিলেন –

 

                We can break their haughty power,

                gain our freedom when we learn that

                The union makes us strong

 

ঐ গানেই তিনি বলেন -

 

                In our hands is placed a power

                greater than their hoarded gold

                Greater than the might of armies

                magnified a thousand fold

                We can bring to birth a new world

                from the ashes of the old for

                The union makes us strong.

 

        ২০-২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ভারতের সমস্ত প্রান্তে ১০ কোটির বেশী শ্রমিক ধর্মঘট করেন। নিখুঁত সংখ্যা জানা কঠিন, কিন্তু ইউনিয়ন নেতৃত্ব এবং শাসক শ্রেণী, উভয়েরই হিসেবের চেয়ে অংশগ্রহণ বেশী হয়েছিল। দুদিন ধরে, ভারতের প্রায় সমস্ত টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও এবং ইন্টারনেট ভর্তি ছিল অজস্র মন্তব্য ও টীকা টিপ্পনীতে, যার মর্মার্থ হল, ধর্মঘট ব্যর্থ, ধর্মঘট করা অর্থহীন, শ্রমিকরা হিংস্র, ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা সবাই স্বার্থপর, ধাপ্পাবাজ লোক, যারা বেচারা গরীব শ্রমিকদের মিথ্যে নাচাচ্ছে, ইত্যাদি। এই প্রচারের তীব্রতাই কিন্তু দেখায় এক ঘুমন্ত মহাশক্তি, ভারতের শ্রমিক শ্রেণী, স্বল্পমাত্রায় হলেও নিজের সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। সচেতনতা বাড়লে, লক্ষ্য স্থির হলে, তার শক্তি ফৌজী ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশী। কিন্তু এখনও অনেকাংশে তার পায়ে বেড়ী লাগানো। ধর্মঘটের পর্যালোচনা করতে হলে লড়াই ও সীমাবদ্ধতা, দুটোই বুঝতে হবে।

 

সাধারণ ধর্মঘটঃ

 

        সাধারণ ধর্মঘট কথাটা বেশী লঘু করে ব্যবহার করলে সমস্যা থাকে। বিশেষত আজকের দিনে, কেবল ১৯০৫-এর পর লুক্সেমবুর্গ বা ট্রটস্কী কী লিখেছিলেন, বা বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপের অভিজ্ঞতা কী ছিল, তা দেখলে হয় না।

        খুব সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা দেখায়, সাধারণ ধর্মঘটের ধারণার প্রথম উদ্ভব হয় নৈরাজ্যবাদী-সিন্ডিক্যালবাদীদের মধ্যে। তাঁরা মনে করেছিলেন, ঐ লড়াই হবে অন্তিম লড়াই, যখন ধনতন্ত্র ও রাষ্ট্র, উভয়েই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এই তত্ত্বই গ্রহণ করেছিলেন আমেরিকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অভ দ্য ওয়ার্ল্ড বা আই.ডব্লু.ডব্লু। চ্যাপলিন তাদেরই কর্মী ছিলেন। নৈরাজ্যবাদী-সিন্ডিক্যালবাদীদের মতে, শ্রমিকরা লক আউট করে শিল্পের নিয়ন্ত্রণ মালিকদের হাত থেকে কেড়ে নিতে পারবেন, ফলে পৃথিবীর বুক থেকে ধনতন্ত্র বিলুপ্ত হবে।

        তাঁরা মনে করতেন, আধুনিক যুগে, আধুনিকভাবে নির্মিত শহরগুলিতে ও ফৌজী প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে, ব্যারিকেডের লড়াই সম্ভব নয়। কিন্তু দেশজোড়া, বা আন্তর্জাতিক ধর্মঘটের এমনই বিপুল শক্তি হবে যে সেনাবাহিনী তাকে ভাঙতে পারবে না। দ্বিতীয়ত তাঁদের মতে, আধুনিক পুঁজিবাদের বিন্যাস এমন, যে শ্রেণীর সংখ্যালঘু অংশও যদি সাধারণ ধর্মঘট শুরু করে, তারা ঠিক মতো জায়গায় সুসংহত হলে মালিকরা ধর্মঘট ভাঙতে পারবে না। কিন্তু দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মার্ক্সবাদীরা অন্যভাবে ভেবেছিলেন। তাঁরা নৈরাজ্যবাদীদের বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ তাঁরা জানতেন, শ্রমিকশ্রেণীর সব অংশের মধ্যে শ্রেণী চেতনা একইভাবে বিকশিত হয় না। তাই উপর থেকে ডাকা সাধারণ ধর্মঘট সর্বাত্মক হবে না। কিন্তু এই নেতিবাচক বক্তব্যের পর তাঁদের নরমপন্থী অংশ ক্রমেই সংসদীয় নির্বাচনকেই লড়াইয়ের প্রধান ক্ষেত্র বলে মনে করতে থাকেন।

        ১৯০৫-এর বিপ্লবের ফলে রোজা লুক্সেমবুর্গ ও লিওন ট্রটস্কী সাধারণ ধর্মঘট সম্পর্কে নতুন ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। লুক্সেমবুর্গ ব্যাখ্যা করেন, সাধারণ ধর্মঘট গড়ে ওঠে লড়াই থেকে। প্রথমে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসীর দক্ষিণপন্থী আমলাতন্ত্র, পরে স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্র, ধর্মঘট সম্পর্কে লুক্সেমবুর্গের ধারণার বিকৃতিসাধন করেছিল করেছিল। বাস্তবে তিনি মনে করতেন যে সাধারণ ধর্মঘট একটি স্বয়ং-সম্পূর্ণ ঘটনা হতে পারে না। বস্তুত, সাধারণ ধর্মঘট হল শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশের প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, তিনি আদপে বলেন নি যে স্বতঃস্ফূর্ত সাধারণ ধর্মঘট থেকে বিপ্লব হবে। বরং, বিপ্লবী যুগ সেই সব রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি করে যার ফলে সাধারণ ধর্মঘট হয়। তিনি বলেছিলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত লড়াইকে পার্টি পুরো ছক বেঁধে বা শৃঙ্খলা চাপিয়ে পরিচালন করতে পারে না। তবে তিনি মনে করেছিলেন, পার্টির কাজ অবশ্যই সেরকম লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেওয়া। তিনি লেখেন, পার্টি কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত মারফৎ ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ঘটানো যায় না, ... কিন্তু [পার্টির] কার্যক্রমকে প্রস্তুত করা যায়।

        ১৯০৫-এ রাশিয়াকে সাধারণ ধর্মঘটের অভিজ্ঞতা থেকে ট্রটস্কীও মনে করেছিলেন, শ্রেণী সংগ্রামের একটা স্তরে সাধারণ ধর্মঘট ক্ষমতার প্রশ্ন উত্থাপিত করবে, যদিও সাধারণ ধর্মঘট সরাসরি শ্রমিকদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে না।

        ইউরোপে ১৯১৮-র জার্মান বিপ্লব, ১৯৩৬-এ ফ্রান্সের সাধারণ ধর্মঘট, ইত্যাদি দেখায়, শ্রেণী সংগ্রাম তীব্র হলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবী একত্রে চলে আসে।

        ভারতের ক্ষেত্রে, সাধারণ ধর্মঘটের ধারণাটা দুভাবে গড়ে ওঠে। গান্ধীবাদী নেতৃত্ব শ্রেণী সংগ্রামকে বর্জন করতে চাইত। তাই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কখনো প্রলেতারীয় লড়াইয়রে ধাঁচ গ্রহণ করেনি। তার বাছাই করা রূপ ছিল হরতাল, যেখানে দোকান, বাজার, সবই বন্ধ থাকবে। কিন্তু লড়াই থেকেই এর মধ্যেও জঙ্গী ধারা কখনো কখনো দেখা দিত, গান্ধীবাদ তখন তার বিরোধিতা করত। দ্বিতীয় যে পথে সাধারণ ধর্মঘটের ধারণা গড়ে উঠল তা হল কমিউনিস্ট আন্দোলন ও জঙ্গী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের বিকাশ। বড় বড় শিল্প ধর্মঘট থেকে সাধারণ ধর্মঘটের ধারণা গড়ে ওঠে। ১৯৪৬ সালে ধর্মঘটের ডাক ও তার কর্মীদের সমর্থন আনুষ্ঠানিক সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয় নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস – সেকালের একমাত্র সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন। এর আগেই বড় বড় ধর্মঘট হয়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রশিদ আলীর বিচারকে কেন্দ্র করে এবং বোম্বাইয়ের নৌবিদ্রোহের সমর্থনে।

        স্বাধীনতার পর জাতির নেতা হওয়ার পরিচিতি ব্যবহার করে কংগ্রেস দলের নেতৃত্ব একটা বড় সময়ের জন্য শ্রমজীবি মানুষের উপর বুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শগত আধিপত্য রাখতে পেরেছিল। ফলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যখন হঠকারীভাবে সাধারণ ধর্মঘট ডাকে, তখন তা পরাস্ত হয়।

        ইতিমধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও রূপান্তর ঘটে। নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এ.আই.টি.ইউ.সি) ক্রমে সিপিআই দলের নিয়ন্ত্রণে আসে। একের পর এক দল তার জবাবে দলীয় নিয়ন্ত্রণাধীন ইউনিয়ন গঠন করে। ফলে ভারত আজ অনেকগুলি সর্বভারতীয় ফেডারেশন আছে। এক একটি কর্মক্ষেত্রে বহু ইউনিয়নের রেষারেষি শ্রমিক ঐক্যকে দুর্বল করে।

 

নয়া-উদারনীতি ও শ্রেণী সংগ্রাম

 

        নয়া-উদারনীতির আক্রমণের ফলে বহুধা-বিভক্ত শ্রমিক আন্দোলনেও পরিবর্তন আরম্ভ হয়। সংগঠিত ক্ষেত্রে প্রকৃত আয় কমতে থাকে। চাকরীর নিশ্চয়তা কমে। চুক্তিতে শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ে। ফলে শিল্প ও পরিষেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মঘট বাড়ে। বৃহত্তর (সাধারণ) ধর্মঘটও বাড়ে। ১৯৯১ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১২-র মধ্যে ভারতে ১৫টি সাধারণ ধর্মঘট হয়। অবশ্যই, তার অর্থ এই নয় যে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে শ্রেণী সংগ্রাম ক্রমাগত তীব্র হয়েছে। ১৯৯১ সালে মূলতঃ বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন ও অন্যান্য গণ সংগঠনের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল জাতীয় প্রচার কমিটি। কিন্তু ভারতের বামপন্থী আন্দোলনে স্তালিনবাদী প্রাধান্যের প্রভাব এখানেও পড়ে। প্রথমত, আজ স্তালিনবাদ ক্রমেই সোশ্যাল ডেমোক্রেসীতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে শ্রেণী সংগ্রামের প্রসঙ্গে তাদের কোনো স্পষ্ট দিশা আদৌ নেই। দ্বিতীয়ত, স্তালিনবাদী রাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ ফ্যাসীবিরোধী যুক্তফ্রণ্টের মুখোশ পরে শ্রেণী সমঝোতামূলক পপুলার ফ্রন্টের রাজনীতি, শ্রমিক শ্রেণীর পা বেঁধে রেখেছিল। ১৯৯২ সালে সাম্প্রদায়িক ফ্যাসীবাদী সংঘ পরিবার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করল। এর পরে এল সিদ্ধান্ত, যে ফ্যাসীবাদকে রোখার জন্য নয়া-উদারনীতি বিরোধী লড়াইয়ের তীব্রতা কমাতে হবে। ফলে বামপন্থী দলগুলি সংসদে নরসিংহ রাওয়ের সরকারকে কম পাপী মনে করে মেনে নিল। তারপর এল তথাকথিত যুক্তফ্রন্ট সরকার। সিপিআই-এতে যোগ দিল। সিপিআই(এম) এবং আর.এস.পি. বাইরে থেকে তাকে সমর্থন করল। কিন্তু এতে নয়া-উদারনীতির অগ্রগতি একটুও থামল। পি চিদাম্বরম, যিনি অতীতে নরসিংহ রাওয়ের সরকারে মন্ত্রী ছিলেন, এবং পরে আবার মনমোহন সিংহ সরকারের মন্ত্রী হবেন, তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে যে বাজেট পেশ করলেন, বুর্জোয়া শ্রেণী সেই বাজেটকে স্বপ্নের বাজেট বলে ঘোষণা করল। তারপর এল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এন.ডি.এ. সরকার। তারা আনল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, গুজরাটের মারাত্মক গণহত্যা। সঙ্গে সঙ্গে সরকারী বামপন্থীরা আবার যুক্তি খুঁজে পেলেন, কেন ইউ.পি.এ.-১ গঠন ও কংগ্রেসকে সমর্থন করতে হবে। যদিও ২০০৪-এর নির্বাচনে ভারতীয় সংসদীয় নির্বাচনের ইতিবাসে বামপন্থীরা সবোর্চ্চ সংখ্যক আসন পান, তবু, যে নীতির আপাতঃ সমর্থক হিসেবে তাঁরা ভোট পেয়েছিলেন, তার জন্য আপ্রাণ লড়াই করার বদলে, তাঁরা ঐ প্রসঙ্গগুলিকে যথাসম্ভব মোলায়েম করে দেখতে চাইলেন। পশ্চিমবঙ্গে তো বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কেন্দ্রের অনুগামী হয়ে সরকার চালাতে চাইলেন।

        অন্যদিকে, অ-বাম ইউনিয়নগুলি, যথা কংগ্রেসের অনুগামী আই.এন.টি.ইউ.সি বা বিজেপি-ঘনিষ্ঠ বি.এম.এস.ও অতীতে জঙ্গী লড়াইয়ের সমর্থন করতে তৈরী ছিল না। বিজেপি মুখে স্বদেশীর নামে নয়া-উদারনীতির সমালোচনা করে। কিন্তু কাজে তারা সরকারে থাকলে ঐ নীতিই চালু করেছিল। ফলে সাধারণতঃ বি.এম.এস. বড় মাপের লড়াই করে নি। ২০১০-এও সাধারণ ধর্মঘটে তারা অংশ নেয় নি।

        ২০১২-১৩-র মধ্যে কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছিল। ১৯৯১-৯২তে বাম দলগুলি ও তাদের অনুগামী সব ট্রেড ইউনিয়ন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের আামলাতন্ত্র শাসিত শ্রমিক রাষ্ট্রগুলির পতনে ভেঙে পড়েছিল। আজ এক নতুন শ্রমিক শ্রেণী গড়ে উঠেছে -- অনেক সময়ে অসংগঠিত, কিন্তু অতীতের পরাজয়ের স্মৃতি এবং মিথ্যা মতাদর্শের ঠুলিও তাদের ভরাক্রান্ত করেনি।

        শ্রমিকরা এই যে বারে বারে ধর্মঘট করেছেন, তা ভারতের বাইরেও এ ভিন্ন ছবি নিয়ে গেল। তাঁদের লড়াই দেখাল, ভারত কেবল অর্থনৈতিক যাদুর দেশ নয়। তাতে হল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমিক শ্রেণীরও দেশ, যে শ্রমিক শ্রেণী আজও লড়াকু।

 

পুরোনো ও নতুন ইউনিয়নঃ

 

        কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি এত বড় লড়াইয়ে নামল কেন ? প্রথমত, শ্রমিক শ্রেণীর উপর ক্রমাগত চাপ ছিল। ফলে তাঁদের মধ্যেও বেতন হ্রাস, শিল্প ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমা, ঠিকা শ্রম প্রথার বৃদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে আক্রোশ বেড়েছে। এই শ্রমিকদের একটা অংশই এই সব ইউনিয়নের সদস্য। ফলে তাঁরা ইউনিয়নদের কাছে কোনো না কোনো পদক্ষেপের দাবী করছিলেন।  ইউনিয়ন নেতৃত্ব যত আমলাতান্ত্রিক হোক না কেন, তারা নীচে থেকে আসা এ চাপ অগ্রাহ্য করতে পারে না। অবশ্যই, প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনগুলির জাতীয় নেতৃত্বরা লড়াইকে প্রতীকী স্তরে রাখতে পারলে খুশি হতেন। কিন্তু তলা থেকে দাবী বেড়েছে, জঙ্গী লড়াই চাই, প্রয়োজনে ধর্মঘট চাই। এ কারণেই, গত বছরের এক দিনের ধর্মঘটের পর এবছর দুদিনের ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হল।

        একরকম অতিবাম মত আছে, যাতে ট্রেড ইউনিয়ন আমলাতন্ত্রের ব্যবহারে কেবল বিশ্বাসঘাতকতাই ধরা পড়ে। আমরা মনে করি, ট্রেড ইউনিয়ন আমলাতন্ত্র তাদের সামাজিক অবস্থান, মালিকের কাছ থেকে ছিটে-ফোঁটা আদায়, সবই ভোগ করে শ্রমিক শ্রেণীর উপর তাদের নিয়ন্ত্রন শক্তি আছে বলেই। আর সেটা রাখতে হলে তাদের মাঝেমধ্যে লড়াই না করলে চলেনা। তাই বিশ্বায়নের পর সামাজিক সম্পর্ক পাল্টানোয় তারা গভীরভাবে বিচলিত। কোনো কোনো সময়ে তারা সংস্কারবাদী কাঠামোর মধ্যেই, বামপন্থী দলগুলির নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ২০১০ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যখন ট্রেড ইউনিয়নদের সমালোচনা করে বলেন, তারা বড় সহজে ধর্মঘট করে, তখন এ.আই.টি.ইউ.সি. নেতা গুরুদাস দাসগুপ্ত বলেন, বুদ্ধদেব জন্মানোর আগে থেকে, আমি জন্মাবার আগে থেকে শ্রমিক ধর্মঘটের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন।

        গত দু-দশকে ট্রেড ইউনিয়নদের সদস্য সংখ্যা বাড়ছে না, হয়ত বা কমেছে। তাদের সক্রিয়তা কমবেশী সীমাবদ্ধ ছিল সংগঠিত ক্ষেত্রে, বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে, যেখানে রয়েছে তাদের সদস্যদের ৯০ শতাংশের বেশী। অতীতে, বহু শিল্পে রাষ্ট্রীয় মালিকানা এবং ট্রেড ইউনিয়নদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির নিবিড় সম্পর্কের ফলে ইউনিয়ন গঠনও সহজ ছিল, রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানগুলিতে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়াও সহজ ছিল। কিন্তু উদারীকরণ প্রক্রিয়ার ফলে রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। অতএব ট্রেড ইউনিয়নদের পক্ষে দাবী আদায়ের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবিত করার ক্ষমতাও কমে গেল। তার ফলে শ্রমিক অন্দোলন অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

        উপরন্তু, পার্টি ইউনিয়ন সন্পর্কের অনিবার্য ফল, ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যাবৃদ্ধি। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই প্রায় একাধিক ইউনিয়ন তৈরী হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অতি-কেন্দ্রীভূতভাবে। সংগঠন চলে চটজলদি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, সেকেলে রণনীতি নিয়ে, শ্রমিকদের সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং অত্যন্ত বয়স্ক নেতাদের উপর ভর করে। বহু ইউনিয়নে নেতৃত্ব ব্যক্তিকেন্দ্রীক, এবং নেতৃত্ব ক্ষমতার দিকে তাকানো। দ্বিতীয় স্তরের নেতৃত্ব নেই, এবং নেতৃত্ব, দাবী, কর্মসূচী কোনো স্তরেই খুব একটা লিঙ্গ সচেতনতা নেই। এ সবের ফলে ট্রেড ইউনিয়ন ও ব্যাপক শ্রমিকদের মধ্যে বড় ফারাক তৈরী হয়েছে। যদিও শ্রমিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিয়নের সদস্যপদ রেখেছেন, তবু আজ আর অতীতের মতো তাঁদের মধ্যে ইউনিয়নের অঙ্গ হওয়ার অনুভূতি নেই। ২০০৪-এ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-র একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, শিল্পসমৃদ্ধ গুজরাটে মাত্র ২০ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রেড ইউনিয়নের সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, এবং কর্মক্ষেত্রে স্বার্থরক্ষার সেরা পন্থা কী, এই প্রশ্নের উত্তরেরর ৩৩ শতাংশ বলেন, মালিকের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ৭.৪ শতাংশ বেছে নেন ইউনিয়নকে, এবং ১৪.৮ শতাংশ পছন্দ করেন সরাসরি যৌথ লড়াইকে।

        অতীতে রাজনৈতিক দলগুলি শ্রমিকের উপর আধিপত্য রাখার জন্য এবং নির্বাচনে ভোট পওৈয়ার জন্য ট্রেড ইউনিয়নদের উপর নির্ভর করত। কিন্তু পুঁজি সঞ্চয়ের আধুনিকতম পর্বে, পার্টিরা ইউনিয়নদের আমল দেয় না, কারণ জঙ্গী শ্রমিক আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে, তারা নখদন্তহীন। শাসক কংগ্রেস দলের ট্রেড ইউনিয়ন আই.এন.টি.ইউ.সি.-র সভাপতি জি. সঞ্জীব রেড্ডি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, অথচ পার্টির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিশার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো জোর নেই। এরকম আরেকটি ঘটনা হল, ২০০৬ সালে বিমানবন্দর বেসরকারীকরণের জন্য চারদিনব্যাপী ধর্মঘট ও সর্বাত্মক সংগ্রামের সময়ে, সিটু তথা সিপিআই(এম) নেতা এম. কে. পান্ধে আন্দোলনকে সমর্থন করেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেন। অথচ সিপিআই(এম) নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শিল্পপতিদের এক সভায় গিয়ে কলকাতা বিমানবন্দর বন্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর পার্টির শ্রমিক সদস্যদের ভূমিকার জন্য মার্জনা ভিক্ষা করেন। এবারেও , বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সাধারণ ধর্মঘটের বিরোধিতা করেন। আর পশ্চিমবঙ্গে বুর্জোয়া চাপে নতি স্বীকার করে সিপিআই(এম) । মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের নামে তারা সিটুর থেকে দলকে বিচ্ছিন্ন করে।

        বছরের পর বছর মূলস্রোতের বামপন্থী দলগুলি শ্রমিক শ্রেণীর স্বাধীন লড়াই গড়ে তোলার বদলে আঞ্চলিক ক্ষমতাকেন্দ্র গড়া, পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি, এবং তার ভিত্তিতে স্থানীয় ছোটো পুঁজিপতি থেকে বেকার তরণ – এদের নিয়ে বামফ্রণ্ট এক অন্যরকম গণভিত্তি তৈরী করার দিকে ঝুঁকেছে। বছরের পর বছর, দশকের পর দশক, তারা পুঁজিবাদী ব্যস্থার মধ্যে কাজ করে চলেছে। ফলে শ্রমিকদের উপর আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প তাদের সামনে থাকে না। ১৯৫০-এর বা ১৯৬০-এর দশকে, পার্টি নেতৃত্বে ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। বর্তমানে, ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা খুব কম সময়েই প্রভাবশালী পার্টি নেতা।

        ১৯৮০-র দশকের মধ্যভাগে থেকে, সংগঠিত শ্রমিকরা শাসক শ্রেণীর মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন নি। বহু ইউনিয়ন থাকায় আন্তঃ-ইউনিয়ন দ্বন্দ্ব বেড়েছে। সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নেতাদের মধ্যে অনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে। অবশেষে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইউনিয়নরা বোঝে, সদস্যরা যে ইউনিয়নের প্রতি প্রকৃতই অনুগত, তার উদ্যোগে স্বাধীন, শক্তিশালী আন্দোলন গড়লেই কেবল মালিক ও সরকারের মোকাবিলা করা যাবে। যেহেতু মনে হচ্ছিল যে জাতীয় ইউনিয়ন বা ইউনিয়ন ফেডারেশনরা বিভিন্ন দলের পিছনে হাঁটছিল, তাই স্বাধীন ইউনিয়ন যারা গড়ে উঠল তাদের অনেকে এক সময়ে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার নামে রাজনীতি ছেড়ে দেয়। কিন্তু আরেক ধরণের ইউনিয়নও তৈরী হয়, যেগুলি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নয়, কিন্তু জঙ্গী। ফ্যাক্টরী স্তরে এমন ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে কানোরিয়া ও ভিক্টোরিয়া জুট মিলে, মহারাষ্ট্রের কামানি টিউবস-এ, কেরালায় মাদুরা কোটস-এ এবং মানেসরে মারুতি ফ্যাক্টরীতেকোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাধীন ইউনিয়নরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও লড়াই করেছেসিমেন্স, ব্রুক বন্ড, ফাইজার, ইত্যাদি বহুজাতিক কোম্পানীদের ক্ষেত্রেও স্বাধীন ইউনিয়ন রয়েছে

        এই পথে, দেখা গেছে কিছু কিছু স্বাধীন ইউনিয়ন শ্রমিকদের কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য। নিউ ট্রেড ইউনিয়ন ইনিশিয়েটিভ (NTUI) নামে যে স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ গড়ে উঠেছে, বর্তমানে তার সদস্য সংখ্যা ১১ লক্ষের বেশী। শ্রমিক শ্রেণীর অনৈক্য কত ক্ষতিকর,  তা বুঝে একদল জঙ্গী ও সমাজ সচেতন শ্রমিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন এমন এক সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন গড়তে, যা শ্রেণী সংগ্রামের পথ ধরবে কিন্তু যার কোনো দলীয় আনুগত্য থাকবে না। তাঁরা শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন বাড়াতে চান না। তাই গোড়া থেকেই NTUI –র স্লোগান হল আমাদের দিশা ঐক্যNTUI প্রতিটি লড়াইয়ে এ.আই.টি.ইউ.সি., সিটু, এইচ.এম.এস. প্রভৃতির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য চেয়েছে। এই অবস্থায়, পুরোনো ধরণের ট্রেড ইউনিয়নরা শ্রমিকদের চাপ একেবারে অগ্রাহ্য করলে তাদের গণভিত্তিই কমত।

 

নয়া উদারপন্থার যুগে শ্রমিক শ্রেণীঃ

 

        বুর্জোয়া পত্রপত্রিকায় প্রাবন্ধিকদের রচনা, বা তথাকথিত সাধারণ মানুষ যারা ঘন্টার পর ঘন্টা ইন্টারনেটে লিখতে পারে, তাদের মতামত পড়লে মনে হয়, অলস শ্রমিকরা চাইছে, সরকার তাদের জন্য ব্যয়বরাদ্দ বাড়াক, যার বোঝাটা পড়বে পরিশ্রমী সাচ্চা মানুষদের উপর। যেমন, ইন্টারনেটে এক ব্যক্তির উক্তিঃ নাগরিকরা বিলিয়ে দেওয়া টাকায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে এটাই হয়। ট্রেড ইউনিয়নরা দেখল দিয়ে সরকার হরির লুঠ দিচ্ছে। তাই তারাও এখন ভাগ চাইছে. কেউ বুঝতে পারছে না, টাকা উপার্জন করতে হয়। টাকা নিছক ছাপা যায় না। যত বেশী ছাপা হবে, তত তার দাম কমবে, ফলে পরিস্থিতি বেহাল হবে।

        শাসক শ্রেণীর উগ্র দক্ষিণপন্থী কন্ঠ দ্য টেলিগ্রাফ, যারা মুনাফা বৃদ্ধির স্বার্থ ফ্যাশিষ্ট নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়, তাদের সম্পাদকীয়তে বলা হলঃ

        যদি ধর্মঘটের উদ্দেশ্য হয় সরকারের কিছু কিছু নীতি বদল করানো, তবে তা ইতিমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নদের চাপে সরকার সংস্কারবাদী নীতিগুলি ঠেলে পিছিয়ে দেবে মনে হয় না। ট্রেড ইউনিয়নরা যে সব সংস্কারবাদী নীতির বিরোধী, সেগুলি দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মঘটের অন্যতম কারণ হল শ্রম আইন লঙ্ঘনবাস্তব ঘটনাটা হল ভিন্ন। বস্তাপচা শ্রম আইনের জন্যই ভারতে বিনিযোগের হার কম, উৎপাদনশীলতাও কম। শ্রম আইনকে সংশোধন করে তাদের একটি আধুনিক অর্থনীতির উপযোগী করতে হবে। মূল্যবৃদ্ধি সরকার ও সাধারণ মানুষ উভয়ের কাছেই সমস্যা। কিন্তু, যারা মনে করেন ধর্মঘট করে দাম কমানো যাবে তাঁদের অবশ্যই একটি অর্থনীতি কীভাবে চলে সে বিষয়ে অদ্ভূত ধারণা আছে।

        ২০শে ফেব্রুয়ারী গোটা দিন ধরে টেলিভিশন চ্যানেলরা একটা দৃশ্য দেখিয়ে গেল – একটা গাড়িতে আগুন লাগানো হচ্ছে এবং একটা ফ্যাক্টরীর অফিসে ইট ছোঁড়া হচ্ছে। এই গুলিই হল আলোচনার সূচনাবিন্দু।

        আমরা জানতে পারছিঃ

·        ধর্মঘটীরা হিংস্র (মালিকরা নয়  ?)

·        শ্রম আইন বস্তাপচা, তাই তাকে অর্থনীতির স্বার্থে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর স্বার্থে, পাল্টাতে হবে

·        ধর্মঘট দাম কমাতে পারে না

·        শ্রমিকরা অলস, এবং কাজ না করে টাকা চায়।

        ২০০৮ থেকে ২০১১-র মধ্যে ভারতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ৭.৬ শতাংশ, আর শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমেছে ১ শতাংশ। ILO-র ২০১২-র বিশ্ব বেতন প্রতিবেদন এই তথ্য দিয়ে দেখাচ্ছে, সংস্কার অল্পবিত্ত মানুষের উপকার করবে, এই দাবী রূপকথা মাত্র। ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ পর্বে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেড়েছিল ৫ শতাংশ, এবং শ্রমিকের প্রকৃত আয় কমেছিল ১ শতাংশ। অর্থাৎ, বারো বছরে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ১২.৬ শতাংশ, আর প্রকৃত আয় কমেছে ২ শতাংশ। তথ্যটা দু টুকরো করে দিয়ে আমরা দেখাতে চাই, বিশ্ব পুঁজিবাদী সংকটের আগে হোক বা পরে, উগ্র নয়া-উদারপন্থী সংস্কার শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে গেছে এবং শ্রমিকদের নিংড়ে নিয়েছে।

        দুজন গবেষক প্রদত্ত তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি যে অর্থনৈতিক উদারনীতি আনার ফলে বাজারে পুঁজিকরণে সবচেয়ে বড় ৫০টি প্রতিষ্ঠানের ভাগ ১৯৯৭-এ ছিল ৩২ শতাংশ, এবং ২০০১-এ প্রায় ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ একচেটিয়া বড় পুঁজিই সবচেয়ে লাভ করছে।

        গত এক দশকে বেতনের তুলনায় মুনাফার অনুপাত দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। এটা উৎপাদন ও পরিষেবা, দুই ক্ষেত্রেই ঘটেছে। কোম্পানীরা, এমনকি সরকার নিজেও শ্রম আইনের গলতি ব্যবহার করে তাকে স্রেফ অগ্রাহ্য করে, চুক্তিবদ্ধ (কন্ট্র্যাক্ট) শ্রমিক ব্যবহার করে, বেতন কমিয়েছে এবং শ্রমের উতপাদন্সীলতা বাড়িয়েছে শোষণের মাত্রা তীব্রতর করেই।

        সুতরাং ১৯৭০-এর কন্ট্র্যাক্ট লেবার রেগুলেশন অ্যান্ড অ্যাবলিশন এ্যাক্ট এমন এক আইন, যা মালিকরা অগ্রাহ্য করে, এবং যাকে তারা পুরোপুরি খারিজ করতে চায়। মীনাক্ষি রাজীবের গবেষণা দেখায়, তিনি যে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা করেছেন, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মাসিক আয় ২০০০ টাকা মাত্র।

        আইন অনুযায়ী, কন্ট্র্যাক্ট শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড পাওয়ার কথা। এটা তাদের উপর চাপ বাড়ায় কারণ তাদের মাইনে থেকে টাকা কাটা হয়, কিন্তু কন্ট্র্যাক্টর পাল্টালে আগের টাকা উদ্ধার করা যায় না।

        অনেক অরেজিস্ট্রীকৃত কন্ট্র্যাক্ট প্রতিষ্ঠান আছে যারা টাকাটা কেটে নেয়, কিন্তু কখনোই জমা দেয় না, এবং কয়েক বছর বাদে অফিস পাল্টে, নাম পাল্টে, একই ব্যবসায় নামে। এদের কর দিতে হয় না, শ্রমিকদের ই.এস.আই. বা পি.এফ. দিতে হয় না, ফলে মুনাফা বাড়ে।

        শিল্প ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রেই চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের সংখ্যা ৫০ শতাংশের উপর। বেসরকারী ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ৮০ শতাংশের বেশী। একটি সরকারী সংস্থানের সমীক্ষা দেখাচ্ছে, লাইসেন্স প্রাপ্ত কন্ট্র্যাক্টরদের কাছেই তিন কোটি ষাট লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমমন্ত্রকের হিসেবে কন্ট্র্যাক্ট শ্রমিকরা ভারতের ৪৫ কোটি ৯০ লাখ শ্রমিকের ২৮ শতাংশ (এতে আছে সবরকম কন্ট্র্যাক্ট শ্রমিক, এবং এই হারে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের সংখ্যা হবে ১২ কোটি ৮০ লক্ষ)।

        ভারত সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৭ অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০০৬-এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে ৮,৭০,০০০ চাকরী কমানো হয়েছিল। একই সময়ে ‘ঠিকা বা ‘চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের চাকরীর সংখ্যা বাড়ে। এরকম প্রতিটি ঘটনা, ভারতের শ্রম আইনের আওতায় পড়া শ্রমিকদের সংখ্যা কমায়। আনুষ্ঠানিকভাবে যাঁরা ফর্ম্যাল ক্ষেত্রে পড়েন, তাঁদের অনেকেও আইনের সাহায্য পান না। ২০০৫-এ ভারতের মোট ৪৫.৭ কোটি শ্রমজীবি ৩৯.৫ কোটি ছিলেন ইনফর্ম্যাল ক্ষেত্রে। যাঁরা ফর্ম্যাল ক্ষেত্রে, তাঁদেরও ৪৭ শতাংশের চাকরী ছিল অনুরূপ। নানা পরিসংখ্যান দেখানো হয়, কিন্তু সাধারণভাবে আমরা অনুমান করতে পারি যে শ্রমজীবিদের ৯০ শতাংশ শ্রম আইনের আওতায় পড়েন না। সুতরাং লড়াইয়ের চরিত্রটা স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে টেলিগ্রাফ, সকলে চায়, বাকি ১০ শতাংশও যেন শ্রম আইনের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হন, তাঁদের আয় যেন প্রবলভাবে কমে যায়। “শ্রমিকরা অলস”-- কথাটার প্রকৃত অর্থ হল, কোন সাহসে শ্রমিকরা দুবেলা পেট ভরে খেতে চায়, নিজেদের সন্তানদের স্কুল-কলেজ পড়াতে চায়, সুচিকিৎসা চায় ? এসব চাওয়া, দিনে ১২ ঘন্টা কাজ করতে না চাওয়া, হল আলস্যের লক্ষণ

        বিশ্ব ব্যাঙ্কের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৩: চাকরী অনুযায়ী, ভারতে আংশিক সময়ের কাজ বাড়ছে। দেশে অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যার ২০০৯ সালে বেড়েছিল ৯ শতাংশ, ২০১০-এ ১৮ শতাংশ। সংগঠিত ক্ষেত্রেও এরকম শ্রমিক বেড়েছে -- ২০০০ সালে সিমেন্ট, লৌহ ও ইস্পাত, বস্ত্রশিল্প ও চটশিল্পে, ঠিকা শ্রমিকের সংখ্যা ৬০-৭০ শতাংশ। নির্মাণ শিল্পে তা ৮০-৯০ শতাংশ।

        নয়া উদারনীতির অধীনে শ্রমিক শ্রেণী প্রতিনিয়ত বিদ্রোহে ফেটে পড়েন নি। কিন্তু তাঁদের বিচ্ছিন্নতাবোধ বেড়েছে। বিশ্বজোড়া ফ্যাক্টরীর ফলে চাকরীর পুনর্বিন্যাস ক্রমাগত ঘটে চলেছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে অবস্থাটা আরও খারাপ।

        ১৯৯৫ সালেই মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দেখিয়েছিল, দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারীদের ৭০ শতাংশ নারী। নারী ও পুরুষ উভয়ে শোষণ নির্যাতন সহ্য করে হুবহু এক ভাবে নয়, স্বতন্ত্রভাবে, যেহেতু পিতৃতন্ত্র ধনতন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। এক দিকে চাহিদা আছে মেয়েদের সরাসরি পুঁজির নিয়ন্ত্রণ মজুরী শ্রমের আওতায় টেনে আনার। অন্যদিকে শ্রমশক্তি পুনরুৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিবারকে বজায় রাখারও চাহিদা রয়েছে. ফলে পরিবারের মধ্যেও মেয়েদের গৃহশ্রমিকের ভূমিকাকে অক্ষত রাখার চেষ্টা করা হয়। এই পরস্পরবিরোধী প্রবণতা ধরা রয়েছে শ্রম প্রক্রিয়া সংগঠনের বিভিন্ন পন্থায় – নমনীয় কাজের শিফট (flexible Shift), আংশিক সময়ের কাজ, বাড়ি থেকে কাজ করা ইত্যাদি। তার মানে এই না, যে মজুরী শ্রমিক এবং গৃহশ্রমিক, এই দুটি স্বত্ত্বা মেয়েদের জীবনে সুষম ভাবে যুক্ত। পরিবারে পুরুষেরা পারিবারিক সম্পদ সম্পর্কে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেয়। কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের মর্যাদা পুরুষদের সমান হয় না। তাদের অধিকাংশ পড়ে থাকে কম মাইনে, কম দক্ষতা এবং অনিয়মিত শ্রম প্রক্রিয়ায়। বিশ্বায়ন এই প্রক্রিয়াকে তীব্রতর করেছে। কর্মক্ষেত্রেও লিঙ্গ বৈষম্য পুনরায় সৃষ্ট হয়। মালিক, ম্যানেজার ও সুপারভাইজাররা অধিকাংশই পুরুষ, আর অ্যাসেম্বলী লাইনের শ্রমিকরা মেয়ে। মেয়েরা নিয়মিত অভিযোগ করে, তাদের শৌচাগারে যাওয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়। কাজের জায়গার ভিতরে ও বাইরে যৌন হয়রানি নিয়মিত ঘটে। কাজের পরিবেশ এত খারাপ, যে পেশাজনিত রোগ বাড়ে, ফলে সেই সব মেয়েদের কাজ চলে যায়। এই দারিদ্র্য, বহু রকম চাপ, এদের ফলেই মেযেদের উপর একটা হিংসা বাড়ে। একটি অতি সাম্প্রতিক ঘটনা হল মহারাষ্ট্রের  সুর্মাদিতে ৫, ১০ এবং ১১ বছর তিনটি গরীব মেয়েকে খাদ্যের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ ও খুন করা। যে সব মেয়েরা শিল্পক্ষেত্রে কাজ করে, তারা প্রতিদিন ঝুঁকিতে থাকে। অর্থনৈতিক সংকট যত বাড়ে, মেয়েরা তত নিরাপত্তাহীন হতে থাকে

        মূল্যবৃদ্ধি ও কম বেতন হালফিল শ্রমিক অসন্তোষের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ। ২০০১-এর হিসেবকে ১০০ ধরে দেখা যাচ্ছে, শিল্প শ্রমিকদের নির্বাচিত ভোগ্যপণ্যের দাম সরকারী হিসেবে প্রবলভাবে বেড়েছে। কলকাতা শহরের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সরকারী হিসেবে ২০০৬ থেকে ২০১০-এর মধ্যে শ্রমিকদের ভোগ্য পণ্য মূল্য বেড়েছে নীচের সারণী অনুযায়ীঃ১০

 

পণ্য                   ২০০৬-এর মূল্য                             ২০১০-এর মূল্য  

                        (টাকায় কিলো প্রতি)                        (টাকায় কিলো প্রতি)

 

চাল                            ১৩.৬৭                               ২২.২১           

গম                            ১০.৬৫                                ১৬.৭৮               

ডাল (বিভিন্ন)                ৩৩ থেকে ৪৫                                ৭০ থেকে ১১০      

ভোজ্য তেল (বিভিন্ন)৪৬ থেকে ৪৭                               ৬০ থেকে ৬৭       

মাছ                           ৯১                                     ১৫৭                  

পেঁয়াজ                        ৯.৫৮                                 ২৮.৬                

 

        আমরা কলকাতার তথ্য দেখালাম। সরকারী হিসেব দেখাচ্ছে প্রত্যেক শহরেই একই চিত্র। ২০০২-২০১২ এই দশকে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ২৮৪ শতাংশ। বাড়ি কেনা, ভাড়া করা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা সবের ব্যয় বেড়েছে বিপুলভাবে। এবং শ্রমজীবি মানুষের কাছে সর্বাধিক জরুরী রাজনৈতিক প্রসঙ্গ হল খাদ্য পাওয়া। ভারতের পুষ্টির মাপকাঠি পৃথিবীতে অন্যতম নিকৃষ্ট। গত ক-বছরে মাথাপিছু ক্যালোরী গ্রহণ আরো কমেছে।

        মূল্যের উল্টোদিক হল বেতন। দিল্লীতে অদক্ষ শ্রমের ন্যূনতম দৈনিক বেতন ২০৩ টাকা, দক্ষ শ্রমের জন্য ২৪৮ টাকা। মহারাষ্ট্রে তা হল ১১৬-৫৪ থেকে ৩১০-৬২ (চলচ্চিত্র শিল্প); পশ্চিমবঙ্গে ৮৭.৫০ থেকে ১৬৩.৩০। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের রায় অনুযায়ী চার প্রধান নগরীতে দৈনিক ন্যূনতম মজুরী হওয়া উচিৎ ৩৪৬.৪২ টাকা।

        কৃষিক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরী এত কম যে ক্ষেতমজুরেরা প্রতিটি দিন কাজ পেলে এবং ন্যূনতম মজুরী পেলেও, তারা পঞ্চদশ ভারতীয় শ্রম কংগ্রেস নির্ধারিত মানদন্ড এবং ইউনিচয় বনাম কেরালা ১৯৬১, এবং র‍্যাপট্যাকোস, ব্রেট বনাম শ্রমিকবৃন্দ, ১৯৯১ এ দুটি মামলায় সুপ্রীম কোর্টের রায় অনুযায়ী পরিবারের মৌলিক চাহিদার যে সংজ্ঞা, তা মেটাতে পারবে না। সুপ্রীম কোর্ট বিভিন্ন সময়ে বলেছে যে মানবিকতার স্বার্থে, ঘোষিত ন্যূনতম মজুরীর নীচে মজুরীকে নামতে দেওয়া যাবে না, এবং কীরকম প্রতিষ্ঠান, তার লাভ-ক্ষতি কত, ও সব না দেখেই ঐ ন্যূনতম মজুরী দিতে হবে। তা না দেওয়া হল সংবিধানের ২৩ তম ধারায় নিষিদ্ধ বাধ্যতামূলক শ্রম, এবং মালিক যদি নূন্যতম মজুরী না দেয় তবে তার প্রতিষ্ঠান চালাবার কোনো এক্তিয়ার নেই।

        অ্যাডভাইজরি বোর্ডরা যেভাবে নূন্যতম মজুরী স্থির করে, সেখানে বেতনের সঙ্গে মহার্ঘ্যভাতা যুক্ত নয়। ফলে প্রকৃত আয় কমতে থাকে। আরেকটা সমস্যা হল, ন্যূনতম মজুরী আইন অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছরে ন্যূনতম মজুরী বাড়ানোর কথা, কিন্তু কার্যত তা ঘটে না, ফলে শ্রমিকের উপর চাপ বাড়ে।

        আইনমাফিক ন্যূনতম মজুরীতে তাই একেবারে নীচের দিকে যারা আছে, অর্থাৎ মেয়েরা, অনগ্রসর জাতিভুক্ত শ্রমিকরা, রাজ্যের বাইরে থেকে আসা শ্রমিকরা, তারা কিছুটা উপকৃত হয়। আইনমাফিক মাপিক ন্যূনতম মজুরী চালু করলে দারিদ্র্য কমত। আইনত ন্যূনতম মজুরী হল মজুরীর একেবারে নীচের তলা। আজ উল্টে তা হইয়ে দাঁড়িয়েছে অসংগঠিত ক্ষেত্রে মজুরীর ছাদ। দারিদ্র্য দূরীকরণের বদলে তা হয়ে পড়েছে দারিদ্র্য সৃজনের মজুরী।

 

ধর্মঘটের দাবীঃ

 

        পুর্বোল্লিখিত পরিস্থিতিগুলি ধর্মঘটের মূল কতকগুলি দাবী নির্ধারণ করেছিল। সেগুলি হল –

·       সবার জন্য মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে বাঁধা হারে বাঁচার মজুরী;

·        সার্বজনীন খাদ্য নিরাপত্তা;

·        NREGA মজুরী ন্যূনতম মজুরীর চেয়ে কম রাখা চলবে না;

·        ন্যূনতম মজুরী মাসিক ১০,০০০ টাকা করতে হবে;

·        সার্বজনীন, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে চিকিৎসা;

·        চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক ও নারী শ্রমিকদের জন্য সমান কাজে সমান বেতন চাই;

·        কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধ কর, প্রতিটি কর্মক্ষেত্রের যৌন হয়রানি নিরোধেক কমিটি প্রতিষ্ঠা কর;

·        রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে রক্ষা করা ও পুনরুজ্জীবিত কর।

        অধিকাংশ দাবীকে আর ব্যাখ্যা করা অপ্রয়োজনীয়। শুধু বলে রাখা দরকার আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০১১-র বিশ্ব ক্ষুধা ইনডেক্স অনুযায়ী, ভারতের ৬ কোটি শিশু অপুষ্টিতে ভোগে এবং তাদের ওজন প্রয়োজনের চেয়ে কম। গোটা জনসংখ্যার ২১ শতাংশ অপুষ্টিতে ভোগে।১১ আরেকটি সমীক্ষা দেখাচ্ছে যে ২০০০ সালে ১৫-৪৯ বছরে বয়স্কা মেয়েদের মধ্যে যা গর্ভবতী তাদের ৭৫ শতাংশ এবং বাকিদের ৭০ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল।১২

        সরকার দাবী করেছে, নরেগা (NREGA) হল দারিদ্র কাটানোর রাস্তা। দক্ষিণপন্থীরা একে আক্রমণ করছে। বাস্তবে, এ হল এক করুণ আধা-পদক্ষেপ, যদিও যে দেশে বেকার সমস্যা এমন মর্মান্তিক সেখানে এটুকুও কাজে লাগে। NREGA প্রকল্প অনুযায়ী, প্রতি পরিবারে একজন করে সদস্যকে বছরে ১০০ দিন করে কাজ দেওয়া হবে। বাস্তবে এতটাও হচ্ছে না। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে মানুষ NREGA তে যতখানি কাজ পাচ্ছে তাদের ততখানি অন্তত কম মজুরীর বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি আসছে – অবশ্য যদি NREGA–র মজুরী সরকার নির্ধারিত নূন্যতম মজুরী হয় তবেই।

        শ্রমিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান দাবী ছিল শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যেহেতু ভারতে লোকসভা, বিধানসভা, পৌরসভা ও পঞ্চায়েতে নির্বাচন হয়, তাই দাবী করা হয়, ভারতে যথেষ্ট গণতন্ত্র আছে। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর ব্যাপক অংশের দৈনন্দিন জীবনে গণতন্ত্রের ছোঁয়া লাগে না। তাই ধর্মঘটের দাবীগুলির মধ্যে ছিল ৪৫ দিনে বাধ্যতামূলকভাবে ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রীকরণ; এবং ILO–র ৮৭ নং এবং ৯৮ নং কনভেনশন অবিলম্বে মেনে নিতে হবে। ILO-র ৮৭ নং কনভেনশন রাষ্ট্রের নিজের হস্তক্ষেপমুক্ত পথে পছন্দসই ট্রেড ইুনিয়ন বাড়ার পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়, আর ৯৮ নং কনভেনশন ইউনিয়ন গড়ার অধিকারকে শক্তিশালী করে এবং রাষ্ট্র কি কি করতে পারবে না, সে কথা বলে।

        কেন্দ্রীয় স্তরে লিঙ্গ সচেতনার অভাব পরিলক্ষিত হয়, যখন আমরা দেখি নারী শ্রমিক-নির্দিষ্ট দাবীগুলি জোরের সঙ্গে উঠে আসে নি। ক্রেশে প্রতিষ্ঠা এবং মেয়েদের জন্য স্বতন্ত্র শৌচাগার নির্মাণের মত সহজ দাবীও দাবী সনদে যথাযোগ্য স্থান পায় না। কিন্তু কিছু দাবী উঠেছে। আমরা দেখেছি কেন্দ্রীয় দাবীর মধ্যেই সমান কাজে সমান মজুরী এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা বন্ধের দাবী উঠেছে। ভাঁওরি দেবীর ঘটনা ও তারপর বিশাখা রায়ের সময় থেকে যৌন আক্রমণ, হয়রানি, কিছুটা নজরে এসেছে। কিন্তু এটা আজও বাস্তব, যে বিশাখা মামলার রায়ে১৩ যে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেরকম কমিটি চালু নেই। যদি মেয়েরা সমান মানুষ হিসেবে কাজ করতে চান, তাহলে তাঁদের উপর যৌন হিংসা বন্ধ হতে হবে এবং ট্রেড ইউনিয়নরা যে এ দাবী তুলেছে তা দেখায় ইউনিয়নরা এ বিষয়ে সচেতন। অন্যদিকে, মালিক ও ম্যানেজমেন্ট এ প্রসঙ্গে এখনও দায়িত্ব নেয় না।

        ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যুক্ত মেয়েরা আরো অনেক বেশী দাবী রেখেছেন। সামাজিক নিরাপত্তার দাবীর সঙ্গে রাখতে হবে সব মেযেদের জন্য মাতৃত্ব কালীন সুবিধার দাবী। যেখানে এত মেয়ে অসংগঠিত ও চুক্তিবদ্ধ সেখানে তা করা শক্ত কিন্তু আবশ্যক।

 

ধর্মঘট সমস্যার সমাধান করে না

 

        এই কথাটা বুর্জোয়া রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের প্রিয় উক্তি। গত দুই দশকের রেকর্ড অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে আয়ের অসাম্য দ্বিগুণ হয়েছে। তথাকথিত আগন্তুক অর্থনীতিদের মধ্যে ভারত সবার পিছনে। মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমের পুনর্বিন্যাস, বেসরকারীকরণ ও অর্থনৈতিক নিয়মমুক্ত করা, বেতন বৃদ্ধি বন্ধ করা ও নয়া-উদারনৈতিক অন্যান্য পদক্ষেপ, যারা কাজ পেয়েছে তাদের জীবনকেও দুর্বিসহ করে তুলেছে। আর শহরতলী ও গ্রামের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন দারিদ্র্যে পূর্ণ।

        প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি নিয়ে ক্রমান্বয় হৈ-হট্টগোল দেখা গেছে. আন্না হাজারেকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন, তা গরম বুকনিতে ভরা ছিল। তার পিছনে ছিল কর্পোরেট পুঁজির একাংশ, যারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের আক্রমণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশজোড়া ধূমায়িত বিক্ষোভকে বিপথগামী করা।

        ভারতের বুর্জোয়া প্রচারমাধ্যমগুলি মেহনতী মানুষের প্রকৃত সমস্যগুলির বিষয়ে ঘৃণ্য নীরবতা পালন করে চলেছে, এবং ক্রমাগত ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা বাড়িয়ে তুলছে। কিন্তু ১১টি বড় কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়ায় নেতিবাচক প্রচারের বন্যা বয়ে গেল। উপরে দ্য টেলিগ্রাফের যে সম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, তা ছিল এ প্রচারের মোদ্দা বক্তব্যঃ ধর্মঘট সফল হতে পারে না, কারণ সরকার তোমাদের দাবী মানবে না।

        গোটা ভারত থেমে না গেলেও, বাস্তব ঘটনা হল, এবারের ধর্মঘট ছিল শাসক শ্রেণীর মতাদর্শগত এজেন্টদের চাপানো সবরকম সংস্কার, বিভাজন অগ্রাহ্য করে ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর অন্যতম প্রধান লড়াই। ২০১২-র মতই, এবারও ধর্মঘট ডেকেছিল সবকটি সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থানীয় ইউনিয়ন। মোটামুটি দশ কোটি শ্রমিক ধর্মঘট যোগ দেন। তলা থেকে শ্রমিকদের চাপ এত তীব্র ছিল যে ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের ধর্মঘটের ডাক দিতেই হত, যদি তাঁরা শ্রমিকদের মধ্যে সমান্যতম সমর্থন বজায় রাখতে চান। শাসক কংগ্রেস দলের নেতা তথা আই.এন.টি.ইউ.সি.-র সভাপতি জি. সঞ্জীব রেড্ডীকে বলতে হল – আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবী হল ঠিকা শ্রমের অবসান এবং বল্গাহীন মূল্যবৃদ্ধি রোধ। এমন কি ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত ইউনিয়নরাও ধর্মঘটে যোগ দেয়।

        আমরা যদি প্রাথমিক রিপোর্টগুলি দেখি, এবং বুর্জোয়া প্রচার মাধ্যমের বক্তব্য খুঁটিয়ে দেখি, তাহলে বুঝব, কি প্রচন্ড বিদ্রোহ ঐ দুদিন ফেটে পড়েছিল। আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রেড ইউনিয়নদের কাছ থেকে পাওয়া রিপোর্টগুলি অগ্রাহ্য করে গুরুগম্ভীর বুর্জোয়া পত্রপত্রিকাদের প্রতিবেদন দেখছি, কারণ সেগুলিতে শাসক শ্রেণী নিজের সঙ্গে কথা বলে।

        ওড়িষা থেকে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রথম দিনের প্রতিবেদনঃ রাজ্যে স্বাভাবিক জীবনযাপন পন্ড হয়েছিল, কারণ রাজ্যের অধিকাংশ জায়গায় গাড়ি পথে বেরোয় নি। রেল পরিষেবাও বিপর্যস্ত হয়। রেল রোকো-র ফলে নটি এক্সপ্রেস ট্রেনকে গন্তব্যস্থলের আগেই থামানো হয়, একটিকে বন্ধ করা হয়, এবং দুটির সময় পাল্টাতে হয়।

        বনধের প্রভাব বেশী ছিল রাউরকেল্লা, পারাদ্বীপ, সুন্দরগড়, কেওনঝাড়, তালচের ও আঙ্গুলের মত শিল্প নগরীতে।

        আঙ্গুল-ঢেঙ্কানল শিল্পাঞ্চলে বনধের প্রভাব ছিল মিশ্রজি.এম.আর এনার্জি এবং ভূষণ স্টীলে কোনো শ্রমিক কাজে না আসায় তাদের ইউনিটগুলি বন্ধ ছিল। তবে আঙ্গুলে কয়লাখনি সহ বিভিন্ন শিল্পে কাজ হয়েছিল।

        ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশনের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ন্যাশনাল অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানীর ধাতু গলানোর কেন্দ্রে কাজ হয়েছিল, যদিও অ্যালুমিনিয়াম প্রতিষ্ঠানে হাজিরা ছিল অল্প।

        মহানদী কোল ফিল্ডস লিমিটেডের কর্মকর্তারা বলেন, তালচের এবং ইব উপত্যকায় সব নিয়মিত শ্রমিকরা কাজ করতে এলেও ঠিকা শ্রমিকরা কাজ করতে আসেন নি।১৪

 

        ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে আরেকটি সংবাদ জানায়ঃ

        ব্যাঙ্ক পরিষেবা স্তব্ধ হয়ে পড়ে এবং ৮০,০০০ কোটি টাকা মূল্যের ১ কোটি ৪০ লক্ষ চেক গত দুদিনে খালাস হয় নি, কারণ ক্লিয়ারিং হাউসগুলি বন্ধ ছিল।১৫

 

        বিজনেস লাইন পত্রিকা জনায়, দেশের প্রধান বন্দরগুলিতে ধর্মঘট জনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি টাকা।১৬

 

        আরেকটি প্রতিবেদন জানায়, সারা দেশে পরিবহন বিপর্যন্ত হয়েছিল। অধিকাংশ প্রতিবেদন এ কথাও জানায় যে পশ্চিমবঙ্গে (যেখানে সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টকে হারিয়ে ভোটে জিতেছে তৃণমূল কংগ্রেস) বনধ ব্যর্থ ছিল। এই দাবী আরেকটু তলিয়ে দেখতে হবে। প্রথমতঃ অধিকাংশ সংবাদপত্র সাধারণ ধর্মঘট কথাটা ব্যবহার  না করে বনধ কথাটা ব্যবহার করেছে। এর যথেষ্ট কারণ আছে। ভারতে বনধ-এর রাজনীতি নির্দিষ্টভাবে প্রলেতারীয় নয়। দ্বিতীয়ত বহু সময়ে আদালতরা রায় দিয়েছে, ধর্মঘট করার অধিকারের মধ্যে বনধপড়ে না। এমন কি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে বনধ হলে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, যে দলগুলি বনধ ডেকেছে তারা তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।

        দ্বিতীয়ত, ১৯৭৭-২০১১ তে, বামফ্রন্টের শাসনকালে, সিপিআই(এম) বহু সময়ে বনধ সফল করার জন্য রাষ্ট্রশক্তি ও ক্যাডারশক্তি প্রয়োগ করতে। বনধের সাফল্য মাপা হত, শিল্প শ্রমিকরা কতটা ধর্মঘট করলেন তা দেখে নয়, নিছক সরকারী অফিসে হাজিরা কত, তা দেখে। শ্বেত কলার সরকারী কর্মচারীরাও অবশ্যই শ্রমজীবিদের অংশ। কিন্তু তাঁরা বাকি প্রায় সবার চেয়ে সামান্য হলেও ভাল আছেন। যথেষ্ট না হলেও, তাঁদের চাকরীতে মহার্ঘ্যভাতা পান (পশ্চিমবঙ্গে গত ফেব্রুয়ারীতেই তা দেওয়া হয়েছে) আর অন্যদিকে নতুন যে উগ্র দক্ষিণপন্থী সরকার এসেছে, তারা সরকারী কর্মচারীদের উপর এমন কোপ নামিয়েছে যে ধর্মঘট অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁরা এবার একটু কমজোর ছিলেন।

        কিন্তু কলকাতা সহ গোটা রাজ্যে পরিবহন ছিল অল্প। অফিসের সময়েও বাসে বসা যাচ্ছিল। চটকলে, চা বাগানে আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে, এবং অন্যত্র, ধর্মঘটে অংশগ্রহণের হার যথেষ্ট ভাল ছিল। ৪২০০০ বেসরকারী বাস ও মিনিবাসের মধ্যে মাত্র ২০০০ বেরিয়েছিল. বলপূর্বক সরকারী বাস বার করে কিছুটা ঠেকা দেওয়া হয়েছিল। উত্তরবঙ্গের ১২০টি চা বাগানের মাত্র কয়েকটিতে স্বাভাবিক কাজ হযেছিল। ব্যাঙ্ক একেবারে বন্ধ ছিল। ব্যারাকপুর ও তারাতলা অঞ্চলে ধর্মঘট ভাল সাড়া জাগাতে পেরেছিল।

 

দুটি প্রতিবেদন ও একটি অগ্রগতিঃ

 

        ২০ ফেব্রুয়ারী সমস্ত দিন টেলিভিশনে বারে বারে দেখানো হয়েছে একটি ঘটনা। আরেকটি ঘটনা, ২১ তারিখ খবরের কাগজে ছোটো করে লুকোনো। দ্বিতীয় খবরটি হল, এক দালাল ড্রাইভার আম্বালাতে এক এ.আই.টি.ইউ.সি.-র নেতাকে ধাক্কা মেরেছে ও তিনি নিহত হয়েছেন। আর বিশাল খবরটা হল নয়ডাতে শ্রমিকরা একটা গাড়িতে আগুন লাগিয়েছিল, এবং ফ্যাক্টরী অফিস আক্রমণ করেছেন। এই খবরটা ফলাও করে দেখানো জরুরী ছিল। এইভাবে প্রমাণ করতে হবে তো, যে হিংসার পথ নেয় -- সরকার নয়, মালিক নয়, ট্রেড ইউনিয়নরা। ঠিক যেমন গতবছর মানেসরে হিংসাত্মক ঘটনার পর শুধু রিপোর্ট করে বলা হল, শ্রমিকরা একজন ম্যানজারকে মেরেছেন; বলা হল না যে শ্রমিকদের উপর হিংসাত্মক ব্যবহার করা হয়েছিল, ফ্যাক্টরী গেট বন্ধ করে মারধোর করা হয়েছিল বা জাতের নামে অপমান করে গোলযোগের সূত্রপাত করা হয়েছিল।১৭

        গুরগাঁও, মানেসর, নয়ডা, এ সব হল ট্রেড ইউনিয়নরা চিরাচরিতভাবে দুর্বল, এমন এলাকা। এখানে ইউনিয়ন গঠন করতে গেলে সরকার ও মালিক হাত মিলিয়ে বাধা দিয়েছে, আক্রমণ করেছে, ছাঁটাই করেছে। এ সব জায়গায় ঠিকা শ্রমের পরিমাণও বেশী।

        প্রসেনজিৎ বোস ও সৌরীন্দ্র ঘোষের গবেষণা থেকে জানা যায় মারুতি-সুজুকিতে ২০০৭ থেকে ২০১১তে শ্রমিকদের বার্ষিক আয় বেড়েছিল ৫.৫ শতাংশ, যেখানে ফরিদাবাদের ভোগ্যপণ্যের গড় বৃদ্ধি ছিল ৫০ শতাংশের বেশী, আর মারুতি কোম্পানীর লাভ, ২০০১ থেকে কর দেওয়ার পর বেড়েছে ২২০০ শতাংশ।১৮

তাঁরা লিখেছেনঃ

        মারুতি-সুজুকি ইন্ডিয়া লিমিটেড-এর গুরগাঁও কারখানায় শ্রমিকরা ২০০৭-এ যা পেতেন এবং এখন যা পান (গুঁরগাও এবং মানেসরের বেতন বিন্যাস অনুরূপ), দেখায় সময়ের সঙ্গে বেতন কীভাবে পাল্টেছে। ২০০৭ সালে, একজন প্রবীণ স্থায়ী শ্রমিক এক বছরে একদিনও ছুটি না নিলে আয় করতেন বড় জোর ২ লাখ ৮০ হাজার। আজ তাঁর সর্বমোট বার্ষিক আয় হতে মোটামুটি ৩ লাখ, অর্থাৎ ৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধি। কিন্তু হরিয়ানার ফরিদাবাদ কেন্দ্রে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০৭ থেকে ২০১১-র মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশী। ফলে স্থায়ী শ্রমিকদের প্রকৃত আয়ের উপর চাপ বাড়ছে।...

        এর বিপরীতে, মারুতি-র প্রধান কার্যনির্বাহী অফিসারের বেতন ছিল ২০০৭-০৮-এ ৪৭ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা, আর ২০১০-১১-তে তা বেড়ে হল ২ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা, অর্থাৎ ৪১৯ শতাংশ বৃদ্ধি। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের বার্ষিক আয় বেড়েছে ৯১.৪ শতাংশ। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের বিক্রী ও মুনাফা বাড়ার লাভ প্রশাসন ও শ্রমিকের মধ্যে কেমন অসমভাবে বন্টন করা হচ্ছে”।১৯

        এই কারণেই সব রকম হুমকি অগ্রাহ্য করে, এ সব এলাকার শ্রমিকরা দলে দলে ধর্মঘটে যোগ দিয়েছিলেন। মালিকদের পক্ষে অপ্রত্যাশিত এ ঘটনার ফলে শাসক শ্রেণী যতটা ভেবেছিল, ধর্মঘট তার চেয়ে বেশী আঘাত দিয়েছে তাদের। অ্যাসোচ্যামের বিবৃতিতে বলা হয়েছেঃ প্রাথমিক হিসেব ছিল যে মোট আভ্যন্তরীন উৎপাদনে টান পড়বে ১৫০০০-২০০০০ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে তা বেড়ে হয়েছে ২৬০০০ কোটি টাকা।২০

        শাসক শ্রেণী এই এলাকাগুলি বন্ধ করে রাখতে চেয়েছিল। কোনো কিছু ঘটার আগেই তিনশ-র বেশী এফ.আই.আর করা হয়েছিল, শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। শাসক শ্রেণী ও সরকারের এই হিংস্র আক্রমণ, গণতান্ত্রিক অধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন, এ থেকেই দুয়েকটি ক্ষেত্রে পাল্টা হিংসা ঘটেছে। শাসক শ্রেণীর স্তাবকরা তো সেদিকেই তাকিয়ে ছিল। তারা সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দাবী উঠল, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে।

 

ধর্মঘটের পরঃ

 

        গত এক দশকের কিছু বেশীদিন ধরে, পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক পন্ডিতরা ভারতকে কুমীর ছানার মত তুলে ধরে দেখাচ্ছিলেন, নয়া-উদারনীতি কীভাবে একটা দেশের আধুনিকীকরণ সম্ভব করে তোলে। একটা উল্লেখযোগ্য মধ্য শ্রেণী স্ফীত হয়েছে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগের চরিত্র পাল্টেছে। বড় বড় উৎপাদকরা তাই লোলুপ দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ভারতের বাজারের দিকে। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, ভারতের গাড়ি শিল্প বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম। ২০১১তে তার বার্ষিক উৎপাদন ছিল ৩৯ লাখ ইউনিট।২১ ঐ একই বছরের মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট বিক্রী ২১ কোটি ৩০ লাখ ইউনিটে পৌঁছায়।২২ কম্পিউটার বিক্রী হয় ১ কোটি ১১ লাখ ৫০ হাজার।২৩

        যা রিপোর্টে বেরোয় নি, তা হল অর্থনৈতিক বৃদ্ধির একপেশে চরিত্র। দুই দশক ধরে নয়া উদারনীতি চালু থাকার পর অর্থনীতিতে বৃদ্ধি এলে শ্রমিকরাও উপকৃত হবেন, এই বুকনিতে ছাতা পড়ে গেছে। ইউনিয়নদের সঙ্গে সরকারের লড়াইয়ের মধ্যে একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হল, বাঁচার মত পেনশন পাওয়ার লড়াই। সরকার পেনশন বিলের মাধ্যমে মজুরের মাইনে থেকে টাকা কেটে তা বিনিয়োগ করতে চায় বাজার চালিত আর্থ সংস্থায়, যাতে বেসরকারী ইনসিওরেন্স ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের লাভ বাড়ে। এতে শ্রমিকদের অবসরকালীন আয় বিপদে পড়বে।

        আজ যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তা হল তলা থেকে বিপুল চাপ বনাম চিরাচরিত ইউনিয়নদের সীমাবদ্ধতা। ইউনিয়নদের যত সদস্য তার চেয়ে ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন অনেক বেশী। বুর্জোয়া দল এবং সংস্কারবাদী দল, দুয়ের সঙ্গে যুক্ত ইউনিয়নদেরই তাই ভূমিকা সন্দেহজনক। মুখে সাধারণ ধর্মঘট কথাটা বললেও, তারা এক প্রধান পরিবহণ ক্ষেত্র, অর্থাৎ রেল শ্রমিকদের অন্তত দুঘন্টার জন্য প্রতীক ধর্মঘট করার জন্যও অনুপ্রেরণা দেয় নি। এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব আসতে হবে নিউ ট্রেড ইউনিয়ন ইনিশিয়েটিভের মত উদ্যোগের কাছ থেকে। মূল স্রোতের বাম দলগুলির বিক্ষুব্ধ-দের এবং বিপ্লবী বাম দলগুলিকে, ট্রেড ইউনিয়নে কাজ করাকে কেন্দ্রীয় কাজ হিসেবে দেখতে হবে। এই সব রকম শক্তির ঐক্য থেকেই গড়তে হবে বিকল্প, প্রকৃত বামপন্থী জোট।

 

টীকা

 

১.     Rosa Luxemburg, The Mass Strike, in M.A. Waters (Ed), Rosa Luxemburg Speaks, New York,       Pathfinder Press, 1980, p.205

২.     দ্রষ্টব্য, Kunal Chattopadhayay, ‘The Fascist Upsurge’, http://www.radicalsocialist.in

৩.     দ্রষ্টব্য, Kunal Chattopadhyay and Soma Marik, ‘ The Left Front and the United Progressive Alliance(2004), http://www.radicalsocialist.in

৪.     দ্রষ্টব্য, Kunal Chattopadhyay ‘A First Assesment of Indian Strike: To Break Their Haughty Power’, http:internationalviewpoint.org

৫.     দ্রষ্টব্য, Class struggle versus Serving the Rulers and Becoming Regional Linguistic Chauvinist :   The Retreat of CITU in the coming General Strike, http://www.radicalsocialist.in/blog

৬.     http://www.firstpost.com/india/bharat-bandh-live-maruti-suzuki-workers-to-join-strike-   tomorrow-632059.html

৭.     দ্য টেলিগ্রাফ, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১২।

৮.     J. Dennis, Rajakumar and John S. Henley, ‘Growth and persistence of large Business Groups    in India,’ journals.hil.unb.ca/index.php/JCIM/article/download/5676/6681

৯.     Meenakshi Rajeev, Contract Labour Act in India : A Pragmatic View,         http://www.igidr.ac.in/pdf/publication/pp-062-33.pdf.

১০.    http://labourbureau.nic.in/CPI_Prices.htm

১১.    http://www.ifpri.org/publication/2011-global-hunger-index

১২.    Sunny Jose and K. Naraneethem, ‘A Factsheet on Women’s Malnutrition in India’,    http://www.jstor.org.stable/40277858

১৩.   http://www.iiap.res.in/files/Visaka vs Rajasthan_1977.pdf

১৪.    http://www.business-standard.com/article/current-affaires/trade-unions-strike-hits-normal-life-   inodisha-113022000740-1.html

১৫.hhhhttp://www.livemint.com/Politics/PAVKmFkOoAnwenQZUX4ubP/Strike-paralyses-bank-       industry-for-second-day.html

১৬.   http://www.thehindubusinessline.com/industry-and-economy/logistics/major-porrts-suffer-rs-     100cr-loss-as-strike hits-operrations/article 4439447.ece? homepahe = true & rf = wl_home

১৭.    http://www.radicalssocialist.in/articles/statement-radical-socialist/news/489 &      http://kafila.org/2012/07/19

১৮.   http://www.the hindu.com/opinion/op-ed/article2490903.ece

১৯.   

২০.   http://www.assocham.org/prels/shownews.php? Id = 3908

২১.    http://oica.net/wp-content/uploaads/all-vehicles-2010-provisional.pdf

২২.   http://www.ndtv.com/article/technology/mobile-device-sales-in-india-to-reach-231-mn-152315

২৩.   http://articles.economictimes.indiatimes.com/2011-08-31/news/29949477-1-indian-pc-market-        india-pc-first-tablet-computers.